সোমবার, ৭ই এপ্রিল, ২০২৫ খ্রিস্টাব্দ, ২৪শে চৈত্র, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

English

নারীর গৃহিনী হওয়া সম্পর্কে ইসলাম ও পাশ্চাত্যের দৃষ্টিভঙ্গি (১ম পর্ব )

পোস্ট হয়েছে: জুলাই ১৮, ২০১৬ 

news-image

পরিবার সমাজের অন্যতম প্রধান ভিত্তি। পরিবার ব্যক্তিকে যোগ্য নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলে সমাজ উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এ কারণে ইসলাম বিয়ে ও পরিবার গঠনকে বিশেষভাবে গুরুত্ব দেয়।

বেহেশতি নারীকুলের সর্দার হযরত ফাতিমা (আ.)’র পারিবারিক জীবন আমাদের এটা শেখায় যে, একজন স্ত্রীর প্রধান দায়িত্ব হল স্বামী, সন্তান ও ঘর-কন্নার দেখাশোনা করা। পরিবারের ভিত্তিকে মজবুত করার জন্যই এই দায়িত্ব পালন জরুরি। পারিবারিক ও সামাজিক কাজগুলোর কোনটি কে করবে তা নির্ধারিত না হলে সমাজে দেখা দেবে সংকট। পাশ্চাত্যের পারিবারিক সংকট, বিশেষ করে, পাশ্চাত্যের পরিবারগুলোতে ও ঘর-সংসারের কাজে নারীর অনুপস্থিতিই এর প্রমাণ।

আজ পশ্চিমা সমাজে নারীর মাতৃত্বের ভূমিকা প্রধান না হয়ে গৌণ হয়ে পড়েছে। বরং ঘরের বাইরে কাজ করাই পশ্চিমা নারীর জন্য প্রধান দায়িত্ব হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। কিন্তু ইসলাম মনে করে সংসার পরিচালনা নারীর প্রধান দায়িত্ব এবং তা পরিবারে দেয় অপেক্ষাকৃত বেশি শান্তি ও সমৃদ্ধি। পশ্চিমা সমাজ শান্তি ও সমৃদ্ধির এই চাবিকাঠির গুরুত্ব সম্পর্কে অচেতন হয়ে আছে।

পশ্চিমা নারীর ইতিহাসে দেখা যায় প্রাচীন, মধ্য ও রেনেসাঁর যুগেও পশ্চিমা নারী ছিল সম্মানহীন ও পুরুষের দাসীর সমতুল্য। ঘরের সবচেয়ে কঠোর ও কঠিন কাজগুলো করানো হত তাদের দিয়ে। প্রাচীন গ্রিসে নারীকে মনে করা হত ত্রুটিপূর্ণ মানব ও পুরুষের নির্দেশ বাস্তবায়নকারী। গ্রিক কবি হোমারের মতে নারীর কাজ হল কেবল সন্তান জন্ম দেয়া ও ঘর-কন্নার কাজ করা। গ্রিক দার্শনিক এরিস্টটল মনে করতেন পুরুষের সেবিকা হিসেবে নারী হল দাসী।

রেনেসাঁর যুগেও পাশ্চাত্যে নারীর অবস্থা তেমন উন্নত হয়নি। অভিজাত কয়েকটি পরিবারের মহিলারা ছাড়া সাধারণ নারীদেরকে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত পরিবারের কঠিন কাজগুলো করতে বাধ্য করা হত। তাদের মানবিক অধিকার বলতে কিছুই ছিল না।

আসলে ফেমিনিজম বা নারীবাদী আন্দোলন গড়ে উঠেছিল নারীর প্রতি পাশ্চাত্যের ঐতিহাসিক জুলুমের প্রতিবাদে। কিন্তু এই আন্দোলনও নারীর ভূমিকায় কোনো ভারসাম্য আনতে পারেনি বরং আন্দোলনটি উগ্রবাদ বা চরমপন্থী চিন্তার শিকার হয়েছে। কারণ, তারা নারী মুক্তির কথা বলে নারীকে তার স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্যের বিরুদ্ধে সংগ্রামে অবতীর্ণ করেছে।

নারীবাদীরা গিন্নিপনা ও ঘরের ভেতরে কাজ করাকে নারীর জন্য অপমানজনক বলে মনে করে। তারা মনে করে এটা হচ্ছে পুরুষের সেবা ও স্রেফ তাদেরই স্বার্থ রক্ষা করা। কিন্তু সঠিক নিয়ম-নীতির আওতায় ঘরের ভেতরে নারীর স্বেচ্ছাসেবী কাজকে যদি নির্ধারিত করা হয় তাহলে তা হবে খোদ নারী ও গোটা পরিবারের জন্যই কল্যাণকর। তাই এ ধরনের কাজকে নেতিবাচক দৃষ্টিতে দেখা চরমপন্থা বা উগ্রবাদ মাত্র।

নারীবাদীদের মতে, ঘর-কন্না ও সংসারের কাজ করা ঘরের বাইরে নারীর কর্মসংস্থান এবং তাদের সামাজিক ততপরতার পথে প্রধান বাধা। প্রখ্যাত মার্কিন নারীবাদী বিটি ফ্রিদান-এর মতে “গত কয়েক শতক ধরে পুরুষতান্ত্রিক মতাদর্শ নারীর ওপর কর্তৃত্ব করে এসেছে। এখন এই আদর্শ নারীদের ঘরে অবস্থানকে প্রেমময় বা রোমান্টিক বলে তুলে ধরছে এবং পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও গণ-মাধ্যমের মঞ্চ থেকে নারীকে অনুগত ও করুণাময়ী হওয়ার শিক্ষা দিচ্ছে। পুতুল ও রান্না ঘরের সামগ্রীর মত খেলনা ধরিয়ে দিয়ে নারীকে মা ও সহধর্মিণী তথা গৃহবধূ হওয়ার জন্য প্রস্তুত করছে পুরুষতান্ত্রিক মতাদর্শ।”

আসলে পাশ্চাত্যের মতাদর্শগুলো নারীর সাংসারিক কাজের গুরুত্বকে সঠিকভাবে বুঝতে ব্যর্থ হয়েছে। এ ছাড়াও এই মতাদর্শগুলো নারীকে সম্মান দেখানোর মূল দর্শন সম্পর্কে অজ্ঞ। তাই তারা গৃহবধূ বা গৃহিনীকে বিনা মূল্যে পুরুষদের সেবাকারী দাসী বলে মনে করছে। ইউরোপীয় সমাজবিজ্ঞানী এন্থনি গিডেন্স ও ফরাসি নারীবাদী ক্রিস্টিন ডেলফি ঠিক এমনটিই মনে করেন।

পাশ্চাত্যে নারীবাদের বিস্তারের ফলে বিয়ে করা, মা হওয়া ও সংসারী হওয়াকে নারীর জন্য অশালীন বলে মনে করা হয় এবং ঘরের বাইরে নারীর কাজ করাকে ব্যাপক উতসাহ দেয়া হয়। এ ছাড়াও চাকরি ও শিক্ষা ক্ষেত্রে পুরুষের সঙ্গে নারীর প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং পুরুষের নেতৃত্বের বিরুদ্ধে নারীর সংগ্রাম ব্যাপকভাবে প্রচলিত হয়েছে। শুলামিথ ফায়ারস্টোনের মত কোনো কোনো উগ্র নারীবাদী নারীর মা হওয়া ও ঘরের কাজ করার মত বিষয়গুলোকে নিম্নশ্রেণীর বা নিকৃষ্ট কাজ বলে মনে করেন। তিনি নারীকে কথিত এই নিকৃষ্ট অবস্থা থেকে মুক্ত হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। ফরাসি নারীবাদী সাইমন দ্যা বিভোয়ের মনে করেন গৃহবধূর কাজগুলো অর্থহীন বা পণ্ডশ্রম মাত্র এবং সমাজের জন্য এইসব কাজ প্রত্যক্ষভাবে লাভজনক নয়। তার মতে ঘরের কাজে কোনো কিছু উতপাদিত হয় না বলে গিন্নীরা হলেন দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক।

বামপন্থী নারীবাদী ওয়েলি সেকম্ব মনে করেন নারীরা ঘরের কাজ করায় পুঁজিবাদ পুরুষদেরকে বেশি শোষণের সুযোগ পায়। তাই পুঁজিবাদী ব্যবস্থা বিনামূল্যে শ্রম দানকারী এইসব গিন্নী বা গৃহীনি ছাড়া ধ্বংস হয়ে যাবে। কিন্তু এটা অবাস্তব এ কারণে যে ঘরের কাজ ও বাইরের কাজ সমান নয়। নারী ঘরের কাজ করেন দায়িত্বশীলতা ও ভালবাসার কারণে। তাই বাইরের কাজের সঙ্গে তার তুলনা হয় না।

মার্কিন নারীবাদী শার্লোট পারকিনস গিলম্যান মনে করেন ঘর ও শিশুদের শিক্ষালয়গুলো পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করার মত কাজগুলো যদি কোনো বিশেষ সংস্থার পেশাদার কর্মীদের মাধ্যমে করানো হয় তাহলে নারীরা নিশ্চিন্তে ঘরের বাইরে যেতে পারবেন এবং সহজেই সামাজিক ও অর্থনৈতিক ততপরতা চালাতে পারবেন। এ জন্য কোনো কোনো নারীবাদী তাত্ত্বিক ও কর্মী সমবায়-ভিত্তিক বাসভবন গঠনের পরামর্শ দিয়েছেন যাতে গৃহস্থালী কাজ ও শিশুদের প্রতিপালনের নানা সুযোগ থাকবে।

এভাবে নারীর ভূমিকা ও বিশেষ করে তার ঘর-সংসারকেন্দ্রীক কাজ সম্পর্কে পাশ্চাত্যে নানা প্রান্তিক বা চরমপন্থী ধারণাগুলো সেখানকার পরিবারগুলোর ভিত্তিকে দুর্বল করে দিয়েছে। কারণ, এইসব মতবাদ পশ্চিমা নারীকে তার স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য থেকে দিনকে দিন বেশি দূরে সরিয়ে নিচ্ছে। কিন্তু ইসলাম নারীর গৃহস্থালী ভূমিকাকে যৌক্তিক দৃষ্টিতে দেখে। সূত্র: পার্সটুডে