বৃহস্পতিবার, ৩রা এপ্রিল, ২০২৫ খ্রিস্টাব্দ, ২০শে চৈত্র, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

English

নওরোয উপলক্ষে রাহ্বার আয়াতুল্লাহ্ খামেনেয়ীর ভাষণ

পোস্ট হয়েছে: অক্টোবর ২৭, ২০১৬ 

নতুন বছরে সকল ক্ষেত্রে উন্নতি ও অগ্রগতি হাছি¡লের জন্য জনগণ ও সরকারের মধ্যে আন্তরিক সহযোগিতা গড়ে তুলতে হবে
[গত ২১শে মার্চ (২০১৫) ছিল নতুন ইরানী বছর ১৩৯৪ সালের প্রথম দিন। বসন্ত কালের প্রথম দিনে সূচিত ইরানী বছরের প্রথম দিন প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকে নওরোয হিসেবে বিখ্যাত এবং ব্যাপক আনন্দ-উৎসবের মধ্য দিয়ে ইরান, আফগানিস্তান ও মধ্য এশিয়ার দেশগুলো সহ আরো বহু দেশে উদ্যাপিত হয়ে আসছে। এবারের নওরোয উপলক্ষে ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের সর্বোচ্চ দ্বীনী ও রাজনৈতিক নেতা হযরত আয়াতুল্লাহ্ ‘উয্মা সাইয়্যেদ আলী খামেনেয়ী ইরানী জনগণের উদ্দেশে এক সংক্ষিপ্ত ভাষণ দেন। ভাষণটির পূর্ণ বিবরণ নিচে প্রদত্ত হলো।]
بسم اللَّه الرّحمن الرّحيم
يا مقلّب القلوب و الابصار، يا مدبّر اللّيل والنّهار، يا محوّل الحول و الاحوال،حوّل حالنا الى احسن الحال.
পরম দয়াময় মেহেরবান আল্লাহ্র নামে
হে অন্তরসমূহ ও দৃষ্টিসমূহের পরিবর্তনকারী, হে রাত্রি ও দিবসের নিয়ন্ত্রণকারী, হে বছর ও অবস্থা সমূহের বিবর্তনকারী, আমাদের অবস্থাকে সর্বোত্তম অবস্থায় পরিবর্তিত করে দাও।
السّلام على فاطمة و ابيها و بعلها و بنيها.
সালাম ফাতেমার ওপর, তাঁর পিতার ওপর, তাঁর স্বামীর ওপর ও তাঁর বংশধরদের ওপর।
নতুন ফারসি বছরের সূচনা হচ্ছে হযরত ফাতেমা যাহ্রা (সালামুল্লাহি ‘আলাইহা)র শাহাদাত বার্ষিকীর সম সময়ে। তাই নিঃসন্দেহে রাসূলুল্লাহ্ (সা.)-এর আহ্লে বাইত, বিশেষ করে তাঁর মহিমান্বিত কন্যা হযরত ফাতেমা যাহ্রার প্রতি আমাদের জনগণের ভালোবাসার কতক দাবি রয়েছে, আর সকলেরই উচিত এ দাবিগুলো পূরণ করা এবং নিঃসন্দেহে সকলেই এ দাবিসমূহ পূরণ করবেন। আশা করা যায় যে, এ দিনগুলো ও সদ্য সূচিত এ ১৩৯৪ ফারসি সাল পরিপূর্ণরূপে ফাতেমী বরকতের অধিকারী হবে এবং এ মহান ব্যক্তিত্বের স্মরণ সকলের জীবনে, বিশেষ করে ইরানী জনগণের যিন্দেগিতে গভীর ও স্থায়ী সুফল বয়ে নিয়ে আসবে। আমি আরো আশা করি যে, প্রকৃতিতে যে বসন্তের আগমন ঘটেছে এবং সেই সাথে নতুন ইরানী বছরের সূচনা হয়েছে তা আমাদের ইরানী জনগণের জন্য এবং যে সব জাতি নওরোয উদ্যাপন করে থাকে তাদের সকলের জন্য বরকতময় হবে।
এ উপলক্ষে আমি বাক্বীয়াতুল্লাহিল্ আ‘যাম্ হযরত ইমাম মাহ্দী (তাঁর জন্য আমাদের প্রাণ সমূহ উৎসর্গিত হোক) সমীপে বিনীত সালাম নিবেদন করছি এবং এ অবকাশে আমাদের মহান নেতা হযরত ইমাম খোমেইনী (রহ্.) ও শহীদানের উদ্দেশে গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করছি। আমরা আশা করি যে, আমরা ঐ পবিত্র সত্তাগণের বরকতের ও ঐ প্রিয় পবিত্র ব্যক্তিত্ববর্গের দো‘আর অধিকারী হতে পারব।
এ উপলক্ষে আমি বিগত ১৩৯৩ ফারসি সালের প্রতি একটি সংক্ষিপ্ত এজমালী (সার্বিক) দৃষ্টিপাত করব এবং এই মুহূর্ত থেকে যে চলতি ১৩৯৪ ফারসি সাল শুরু হলো তার সম্ভাব্য অবস্থার প্রতিও সংক্ষিপ্ত এজমালী দৃষ্টিপাত করব।
গত হয়ে যাওয়া ১৩৯৩ ফারসি সাল আমাদের দেশের জন্য যেমন অভ্যন্তরীণ ক্ষেত্রে, তেমনি বৈদেশিক ক্ষেত্রে ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে একটি ঘটনাবহুল বছর ছিল। এ বছরটিতে আমরা বহু চ্যালেঞ্জের মোকাবিলা করেছি এবং বিভিন্ন ক্ষেত্রে উন্নতি করেছি। ১৩৯৩ ফারসি সালের শুরু থেকেই আমাদেরকে যে সব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হয়েছে সে সব চ্যালেঞ্জের পরিপ্রেক্ষিতেই আমরা বছরের শুরুতেই এ বছরটির নামকরণ করেছিলাম ‘জাতীয় দৃঢ় প্রত্যয় ও জিহাদী ব্যবস্থাপনার বছর’।
১৩৯৩ ফারসি সালে যা কিছু সংঘটিত হয়েছে তার প্রতি দৃষ্টিপাত করলে আমরা দেখতে পাই যে, আল্লাহ্ তা‘আলার রহমতে এ বছরে আমাদের জাতীয় দৃঢ় প্রত্যয় বৃদ্ধি পেয়েছে ও অধিকতর প্রকাশিত হয়েছে। আমাদের জাতি একদিকে যেমন তার সামনে দেখা দেয়া কতক সমস্যাকে সহ্য করার ক্ষেত্রে দৃঢ় প্রত্যয় প্রদর্শন করে, অন্যদিকে ইসলামী বিপ্লবের বিজয় বার্ষিকীতে, বিশ্ব কুদ্স্ দিবসে ও র্আবা‘ঈনের বিশাল শোভাযাত্রার মাধ্যমে এ দৃঢ় প্রত্যয়ের প্রদর্শনী করে। আল্লাহ্র রহমতে কতক ক্ষেত্রে জিহাদী ব্যবস্থাপনার বিষয়টি সুস্পষ্টভাবে পরিদৃষ্ট হয়। যে সব ক্ষেত্রে জিহাদী ব্যবস্থাপনা লোকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে সে সব ক্ষেত্রে আমরা যথেষ্ট অগ্রগতির অধিকারী হয়েছি। অবশ্য জিহাদী ব্যবস্থাপনার জন্য যে আহ্বান জানানো হয়েছিল তা বিশেষভাবে কেবল ১৩৯৩ ফারসি সালের জন্য ছিল না; বরং আমাদের জাতির জন্য চলতি ফারসি বছরে ও ভবিষ্যতের সকল বছরেই জাতীয় দৃঢ় প্রত্যয় ও জিহাদী ব্যবস্থাপনার প্রয়োজন রয়েছে।
তবে এখন থেকে যে ১৩৯৪ ফারসি সাল শুরু হলো এ বছরটিতে আমাদের প্রিয় জনগণের কতগুলো বড় বড় আশা-আকাক্সক্ষা রয়েছে এবং এ আশা-আকাক্সক্ষাগুলোর সবগুলোই বাস্তবায়নযোগ্য। চলতি ফারসি সালে আমাদের জাতির বড় আশা-আকাক্সক্ষাগুলো হচ্ছে : অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে উন্নতি ও অগ্রগতি, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইরানী জাতির শক্তিমত্তা ও সম্মানের বৃদ্ধি, প্রকৃত অর্থে বৈজ্ঞানিক ক্ষেত্রে উল্লম্ফন, ন্যায়বিচার ও অর্থনৈতিক সুবিচার নিশ্চিতকরণ এবং ঈমান ও নৈতিকতাকে অধিকতর সুদৃঢ়করণÑ যা হচ্ছে অন্য সবকিছুর চাইতে অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ এবং অন্য সমস্ত ক্ষেত্রে উন্নয়ন ও অগ্রগতির পৃষ্ঠপোষক। আমাদের দৃষ্টিতে এসব চাওয়ার ও আশা-আকাক্সক্ষার সবগুলোই অর্জনযোগ্য। এসব চাওয়ার ও আশা-আকাক্সক্ষার কোনোটিই এমন নয় যা ইরানী জাতির সাধ্যের অতীত বা দেশের সরকারের নীতির আওতা বহির্ভূত বলে পরিগণিত হতে পারে। কারণ, আমাদের সাধ্য ও সক্ষমতা অনেক বেশি। এ ক্ষেত্রে বলার মতো কথা অনেক আছে, ইন্ শাআল্লাহ্, সেগুলোর মধ্য থেকে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সমূহ সম্পর্কে শীঘ্রই আরেক ভাষণে আলোচনা করব।
এই মুহূর্তে প্রিয় ইরানী জনগণের উদ্দেশে যা বলতে চাই তা হচ্ছে এই যে, এ বিরাট ও গুরুত্বপূর্ণ সম্ভাবনা নিঃসন্দেহে অর্জনযোগ্য, কিন্তু সে জন্য কতগুলো শর্ত রয়েছে। এসব শর্তের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হচ্ছে জনগণ ও সরকারের মধ্যে আন্তরিক সহযোগিতা। উভয়ের পক্ষ থেকেই যদি এ আন্তরিক সহযোগিতা প্রদান করা হয় তাহলে এতে কোনোই সন্দেহ নেই যে, আমাদের আশা-আকাক্সক্ষা সমূহে যা কিছু শামিল রয়েছে তার সবকিছুই অর্জনযোগ্য এবং আমাদের প্রিয় জনগণ তার সুফল স্বচক্ষে দেখতে পাবেন।
বস্তুত সরকার হচ্ছে জনগণের সামষ্টিক কাজকর্ম সম্পাদনকারী, আর জনগণ হচ্ছে সরকারকে কর্মে বিনিয়োগকারী। তাই জনগণ ও সরকারের মধ্যে আন্তরিকতা যত গভীরতর হবে, পারস্পরিক সহযোগিতা যত বেশি হবে ও সহমর্মিতা যত বৃদ্ধি পাবে ততই জাতীয় কর্মকা- অধিকতর উত্তমভাবে এগিয়ে যাবে।
এ ক্ষেত্রে জনগণ ও সরকারের পরস্পরের প্রতি আস্থা রাখতে হবে। তাই সরকারের কর্তব্য হচ্ছে জনগণকে আক্ষরিক অর্থেই কবুল করা। আর জনগণের মূল্যবোধসমূহকে, জনগণের গুরুত্বকে ও জনগণের সামর্থ্যকে সঠিকভাবে গ্রহণ করতে হবে। তেমনি জনগণেরও কর্তব্য হচ্ছে সরকারের ওপর-যে আক্ষরিক অর্থেই জনগণের মনোনীত কর্ম সম্পাদনকারী- আস্থা রাখা। এ বিষয়ে আমার কিছু বলার মতো কথা আছে এবং কিছু পরামর্শও আছে- যে সম্পর্কে আমি আমার পরবর্তী কোনো ভাষণে আভাস দেব।
মোট কথা, আমার মতে, চলতি ১৩৯৪ ফারসি সালকে জনগণ ও সরকারের মধ্যে ব্যাপক সহযোগিতার বছর বলে গণ্য করতে হবে। তাই আমি এ বছরের জন্য যে জাতীয় সেøাগান নির্বাচন করেছি তা হচ্ছে : دولت و ملّت، همدلى و هم زبانى (সরকার ও জনগণ- সহমর্মিতা ও অভিন্ন কণ্ঠ)। আমি আশা করি যে, এ সেøাগান বাস্তবে রূপায়িত হবে এবং এ সেøাগানের অন্তর্ভুক্ত দু’টি পক্ষ অর্থাৎ আমাদের প্রিয় জনগণ, আমাদের মহান জনগণ, আমাদের হিম্মতের অধিকারী ও সাহসী জনগণ, আমাদের দূরদৃষ্টির অধিকারী ও জ্ঞানী জনগণ এবং একইভাবে আমাদের সেবক সরকার এ সেøাগানকে এতে ব্যবহৃত শব্দাবলির আক্ষরিক অর্থেই বাস্তবে রূপায়িত করবেন এবং সকলে এর সুফল দেখতে পাবেন।
আমি মহান আল্লাহ্র কাছে আমাদের দেশের সকল কাজেই উন্নতি ও অগ্রগতি প্রদানের জন্য প্রার্থনা করছি এবং আমরা সকলেই যাতে দেশ ও জাতির খেদমত করতে পারি সে জন্য তাঁর কাছে তাওফীক কামনা করছি।
ওয়াস্-সালামু ‘আলাইকুম্ ওয়া রাহ্মাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ্।
অনুবাদ : নূর হোসেন মজিদী