তেহরান আন্তর্জাতিক বইমেলায় বাংলাদেশ দিবস
পোস্ট হয়েছে: সেপ্টেম্বর ৪, ২০১৮
ড. আবদুস সবুর খান
গত ২ মে থেকে ১২ মে ২০১৮ তারিখ পর্যন্ত ইরানের তেহরানে অনুষ্ঠিত হয়ে গেল ৩১তম তেহরান আন্তর্জাতিক বইমেলা। এ বছর মেলার পঞ্চম দিন অর্থাৎ ৬ মে মেলার বিশেষ আকর্ষণ ছিল ‘বাংলাদেশ দিবস’। বাংলাদেশ দিবসের অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণের জন্য ইরানের সাদি ফাউন্ডেশন (বুনিয়াদে সাদি)-এর আমন্ত্রণে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আমি এবং রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ফারসি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. তাহমিনা বেগম ইরানে গিয়েছিলাম। তুর্কি এয়ার লাইন্সের বিমানযোগে ইস্তাম্বুল হয়ে ৩ মে রাত দেড়টায় ইরানের ইমাম খোমেইনী ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্টে পৌঁছি আমরা। সেখানে আমাদের রিসিভ করার জন্য সাদি ফাউন্ডেশনের প্রতিনিধি জনাব কাসেমী আগে থেকেই অপেক্ষা করছিলেন। তাই আমাদের আর কোনো কিছুতেই বেগ পেতে হয় নি। ইমিগ্রেশন পার হয়ে বেল্ট থেকে লাগেজ নিয়ে সামনে আসতেই আগা কাসেমী আমাদের দেখে চিনে ফেলে ইশারা করেন।
আগা কাসেমীর সাথে করমর্দন করে আমরা বাইরে বেরিয়ে এলাম। বাইরে আমাদের জন্য গাড়ি অপেক্ষা করছিল। ইমাম খোমেইনী এয়ারপোর্ট থেকে উত্তর তেহরানের ভেলেঞ্জাকে অবস্থিত সাদি ফাউন্ডেশনের গেস্ট হাউজ প্রায় ৪০ কিলোমিটার পথ। রাতের তেহরান বলে বেশ ফাঁকা। আমরা এক ঘণ্টারও কম সময়ে পৌঁছে গেলাম গেস্ট হাউজে। আমাদের পৌঁছে দিয়ে আগা কাসেমী বিদায় নিলেন।
সাদি ফাউন্ডেশনের মূল কার্যালয়ের অষ্টম তলায় এই প্রতিষ্ঠানের গেস্ট হাউজ। এখানেই আমাদের থাকার ব্যবস্থা। এখানে বিদেশীদের মাঝে ৩ জন বসনীয় ও ১ জন পাকিস্তানি অতিথিও অবস্থান করছিলেন। সুন্দর পরিপাটি করে সাজানো চারটি পৃথক পৃথক ডুপ্লেক্স ফ্ল্যাট। প্রতিটির নিচ তলায় ডাইনিং-ড্রয়িং, কিচেন, টয়লেট এবং কাঠের সিঁড়ি বেয়ে ওপর তলায় টয়লেট আর ৩টি করে বেড রুম। প্রতি রুমে দুটি করে খাট, ইরানি কার্পেটে মেঝে মোড়া। ফ্ল্যাটে পৌঁছেই কাপড়-চোপড় ছেড়ে ফ্রেশ হয়ে শুয়ে পড়লাম। রাতের খাবার প্লেনেই সেরে এসেছি। দীর্ঘ পথযাত্রায় ক্লান্ত শরীর। ভেবেছিলাম বিছানায় গা এলিয়ে দিলেই ঘুমিয়ে পড়ব। কিন্তু হলো তার
উল্টোটা। অনেক রাত অবধি এপাশ-ওপাশ করলাম। কিন্তু কিছুতেই ঘুম এলো না।
শেষ রাতের দিকে সামান্য ঘুম এলেও খুব ভোরে ঘুম ভেঙ্গে গেল। ফজরের নামায পড়েই হাঁটতে বের হলাম। এই অঞ্চলে মূলত অভিজাত শ্রেণির বাস। সুন্দর পরিপাটি একটি আবাসিক এলাকা। উঁচু উঁচু অভিজাত সব ইমারত ঝক ঝক করছে। রাস্তার দু’ধারে সারিবদ্ধভাবে অসংখ্য গাড়ি পার্ক করা। ঝকঝকে তকতকে ফুট পাথে একটু পর পরই নানা ধরনের সবুজ গাছ আর ফুলের কেয়ারি। এখন বসন্তকাল বলে গাছে গাছে সবুজের সমারোহ আর নানা বর্ণের ফুলে আচ্ছাদিত কেয়ারিগুলো। বেশিরভাগই গোলাপ। নানা বর্ণের, নানা আকারের। ইতঃপূর্বেও আমি উত্তর তেহরানে থেকেছি। তাই এলাকাটা আমার বেশ পরিচিত। একেবারে পাহাড়ের ওপরে। পাশের রাস্তা ধরে আমি হাঁটতে হাঁটতে আরও ওপরের দিকে উঠতে লাগলাম। শেষ মাথায় পাহাড়ের চূড়ায় একটা কুঞ্জের মতো। বেশ কিছু ছোট ছোট ঝাউ আর চেনার গাছ। গাছে গাছে চড়–ই আর বুলবুলির কলকাকলিতে চারদিক বেশ মুখরিত।
সকালের রোদ একটু পরিণত হতেই গেস্ট হাউজের দিকে ফিরলাম। শুক্রবার বলে রাস্তাঘাটে লোকজন তেমন নেই। গেস্ট হাউজেও দারোয়ান ছাড়া আর কোনো কর্মচারী নেই। ফ্ল্যাটে পৌঁছেই কাপড় ছেড়ে শাওয়ার নিয়ে নাস্তা সেরে নিলাম। ফ্রিজে ইরানি রুটি নানে লাবাশ, জেলি আর মধু রাখা ছিল। দুধও ছিল। কিচেন ক্যাবিনেটে চা পাতা, চিনি, ইলেক্ট্রিক টি মেকার সাজানো। নিজেই তাতে পানি চাপিয়ে চা করে নিলাম।
কিছুক্ষণ পরই মুমিত এলো। মুমিত আল রশিদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফারসি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগের সহকারী অধ্যাপক, আমার ছাত্র। বর্তমানে তেহরানের টিচার্স ট্রেনিং ইউনিভার্সিটিতে পিএইচডি করছে। ইরান এলেই আমাকে সময় দিতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে সে। তার সাথে কুশলাদি বিনিময় করে ড. তাহমিনাসহ আমরা বেরিয়ে পড়লাম তাজরিশের উদ্দেশ্যে। তাজরিশ উত্তর তেহরানের বড় শপিং কমপ্লেক্স, সবকিছুই পাওয়া যায় সেখানে।
তাজরিশ সাজানো গুছানো, ঝকঝকে তকতকে বাজার। বসন্তকাল বলে স্থায়ী দোকানপাটের সামনের খোলা জায়গায় প্রচুর টাটকা ফলের পসরা সাজিয়ে বসেছে মৌসুমী ফলব্যবসায়ী এবং ফলচাষীরা। আলবালু, গিলাস (চেরি), গোলাবি, খরবুজে (মরু এলাকার বাঙ্গি) আরও কত কী! নানা সবজি এবং নানা রকমের সবুজ বিন। আমি ৭০০ তুমানে একটা খরবুজে কিনলাম। ড. তাহমিনা কিছু ড্রাই ফ্রুটস কিনলো। বাদাম, কিশমিস এসব। মুমিত আমাদের কিছু ডলার ভাঙ্গিয়ে দিল। মোবাইলে ইরানি সিমও সেট করে দিল। তারপর সে আমাদের কাছ থেকে বিদায় নিতে চাইল, তার অন্য একটি অ্যাপয়েন্টমেন্ট আছে। তাকে সানন্দে বিদায় দিয়ে গেস্ট হাউজে ফিরে এলাম।
গেস্ট হাউজে ফেরার কিছুক্ষণ পরই ড. দরুদগারিয়ানের ফোন পেলাম। ড. দরুদগারিয়ান আমার খুব ঘনিষ্ঠ বন্ধু। মাত্র বছর খানেক হলো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফারসি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগে ইরানি ভিজিটিং প্রফেসর হিসেবে দায়িত্ব সমাপ্ত করে ইরান ফিরেছেন। ইরানে পায়ামে নূর ইউনিভার্সিটির শিক্ষক তিনি। তাঁর স্ত্রী ড. এলহাম হাদ্দাদি ইরানের সাদি ফাউন্ডেশনে বাংলাদেশ ও ভারতের ডেস্ক প্রধান। তিনিও ড. দরুদের বাংলাদেশে দায়িত্ব পালনকালীন তাঁর সাথে ছিলেন। সেই সুবাদে তাঁর সাথেও হৃদ্যতাপূর্ণ সম্পর্ক আমার। আমাদের দুই পরিবারের মধ্যে একটি চমৎকার সম্পর্ক তৈরি হয়েছে। ড. এলহামের আমন্ত্রণে এই সফরে আমার স্ত্রীরও আমার সাথে আসার কথা ছিল। কিন্তু সাংসারিক নানা সমস্যার কারণে তাঁর আসার সম্ভব হয় নি।
ড. দরুদ ফোনে বললেন, ‘আমরা বইমেলায় আছি। তোমরা আসতে চাও কি-না। চাইলে আমি গাড়ি নিয়ে আসছি তোমাদের গেস্ট হাউজ থেকে পিক করব।’
আমি বললাম, ‘আমাদের প্রোগ্রাম তো ৬ তারিখ, মানে আগামী পরশু?’
‘হ্যাঁ, আজ আসলে মেলায় ঘুরেফিরে দেখলে। সেদিন তো মেলা ভালো করে দেখতে পারবে না।’
‘তা তুমি ঠিকই বলেছ। ওকে। আমরা লাঞ্চ করে নেই। তুমি চলে আস।’
দুইটার দিকে ড. দরুদগারিয়ান নিচে এসে ফোন দিলেন। আমি তাঁকে ওপরে আসতে বললাম। তিনি বললেন, ‘তোমরা তৈরি হয়ে চলে এসো। আমি নিচে অপেক্ষা করছি।’ দশ মিনিটের মাথায় আমরা নিচে নেমে এলাম। নিচে সাদি ফাউন্ডেশনের অলিন্দে ড. দরুদের হাস্যোজ্জ্বল মুখ দেখে দৌড়ে গিয়ে জড়িয়ে ধরলাম। তারপর আমাদের কুশল বিনিময় হলো। দুজনেই উচ্ছ্বসিত। প্রায় বছর খানেক পর দেখা। আমি ড. দরুদের জন্য বাংলাদেশ থেকে বোতলে করে ডাবের পানি নিয়ে এসেছি। গাড়িতে বসে ডাবের পানিতে চুমুক দিয়ে ভারি তৃপ্তি বোধ করলেন তিনি, সেই সাথে কৃতজ্ঞতাও জানালেন। গাড়ি ছুটল আমাদের নিয়ে বইমেলার উদ্দেশে। গাড়ি দক্ষিণমুখো চলছে। পাহাড়ি ঢাল বেয়ে নিচের দিকে। রাস্তার দুইধারে অসংখ্য চেনার গাছের সারি। ভরা বসন্তের পত্রপল্লবে সবুজে সবুজ হয়ে আছে গাছের সব শাখা-প্রশাখা। দক্ষিণা বাতাসে ভরা যৌবনা সবুজ পত্রপল্লবের নাচন আর ঝকঝকে তকতকে পথ- রিক্সা কিংবা সিএনজির উৎপাতহীন। কী যে চমৎকার সেই শহুরে পথ! চলতে চলতে ইরান-বাংলাদেশের নানা বিষয় নিয়ে কথা হলো আমাদের। এক সময় আমরা একটি খোলা উদ্যানের মতো জায়গায় এসে থামলাম। দরুদ বললেন, ‘এটি পার্কিং জোন। আমরা এখানে গাড়ি রেখে কিছুটা পথ হেঁটে যাব।’ আমরা গাড়ি থেকে নামলাম। রাস্তার পাশেই খোলা আকাশে ওভাবেই গাড়ি রেখে চললাম আমরা। কোনো গার্ড নেই। গাড়ি চুরি হবার কোনো ভ্রুক্ষেপও নেই। মিনিট দশেক হেঁটে সামনে যেতেই মেলার প্রবেশ পথ। ড. দরুদ বললেন, ‘এখান থেকে মূল মেলা প্রাঙ্গণে যেতে আরও মিনিট দশেক লাগবে। চাইলে শাটল মাইক্রোবাস আছে, ওগুলোতে যেতে পার।’ সামনের দিকে ইশারা করলেন। আমরা সেদিকে তাকাতেই দেখি লোকজন লাইন করে দাঁড়িয়ে আছে। দুটি মাইক্রোবাস এলে তাতে পালা করে উঠে পড়ল অনেকেই। বাস রওয়ানা হলো তাদের নিয়ে। আমি বললাম, ‘আমরা হেঁটেই যাব। তাতে চারপাশটা ভালো করে দেখা যাবে, মেলাফেরত মানুষও দেখা হবে।’
আমরা হাঁটছি মেলামুখো। ওদিক থেকে মেলাফেরত মানুষ ফিরছে। দলে দলে, ছেলে, বুড়ো, নারী, পুরুষ। নানা বয়েসী। অধিকাংশের হাতেই বইয়ের ব্যাগ। দেখে ভালই লাগল। আমাদের বাংলা অ্যাকাডেমির বইমেলায় প্রথম ১৫ দিন সাধারণত মেলাফেরত মানুষের হাতে বই দেখাই যায় না। এখানে তার ব্যতিক্রম। মূল মেলায় প্রবেশ করতেই ড. এলহাম হাদ্দাদি আমাদের স্বাগত জানালেন। আগে থেকেই তিনি আমাদের জন্য অপেক্ষা করছিলেন। মেলায় প্রবেশ করে আমার বিস্ময়ের আর অবধি রইল না। এতবড়, এত পরিপাটি মেলা! এবারের মেলা আয়োজন করা হয়েছে মোসাল্লায়ে ইমামে, যেখানে তেহরানের কেন্দ্রীয় জুমআর নামায অনুষ্ঠিত হয়। বিশাল বড় জায়গা নিয়ে চারপাশ খোলা এক ছাদের স্থাপনা। পূর্বপাশের অংশ দোতলা। নিচতলায় অজুখানা আর টয়লেট। এর ওপরে বিদেশী স্টল আর বিভিন্ন মিডিয়া। নতুন বইয়ের মোড়ক উন্মোচন এবং আলোচনার জন্য চারটি সুসজ্জিত সেমিনার কক্ষ। খোলা স্থানগুলোতে ইরানের বিখ্যাত কবি-সাহিত্যিকদের নানা ভঙ্গিমার আলোকচিত্রের ডিসপ্লে। পশ্চিম পাশের অংশে দেশীয় সব স্টল। মোট আশিটি বিদেশী স্টল আর দেশীয় প্রায় তিন হাজার স্টলে এবারের মেলার পরিসর। মেলার এই বিশালতা আর পরিপাট্য দেখে আমার কাছে মনে হলো এটি জার্মানির ফ্রাঙ্কফুর্ট বইমেলার তুলনায় আয়োজন আর পরিসরের দিক থেকে কোনো অংশেই ছোট নয়। প্রেস টিভি, ইরনা এবং বুনিয়াদে সাদিসহ বেশ কটি মিডিয়া আমার সাক্ষাৎকার নিল। মেলা সম্পর্কে আমার মতামত জানতে চাইল। আমি তাদেরকে গুরুত্বের সাথেই এ কথাটা বললাম।
প্রায় ঘণ্টা তিনেক সময় কাটালাম মেলায়। ঘুরে ঘুরে সব স্টল দেখলাম। আফগানিস্তানের স্টল থেকে একটি আফগানি ফারসি ছোটগল্পের সংকলন কিনলাম। সন্ধ্যার দিকে গেস্ট হাউজের দিকে রওনা হলাম। ফেরার ফেরার পথে দেখি বাইরের প্রাঙ্গণে বড় বড় বইয়ের রেপ্লিকায় বেশ উঁচু করে একটি বইয়ের স্তূপ করা হয়েছে। চমৎকার লাগছে সেই বইয়ের স্তূপ। আমরা যখন গেস্ট হাউজে পৌছলাম তখন সন্ধ্যা মিলিয়ে রাত হয়ে গেছে।
৫ মে শনিবার সকাল নয়টায় ড. এলহাম হাদ্দাদির ফোন পেলাম, ‘আমি অফিসে আছি। তোমরা আধা ঘণ্টার মধ্যে তৈরি হয়ে নিচে এসো।’ সাদি ফাউন্ডেশনের ষষ্ঠ তলায় ড. এলহামের অফিস। আর আমাদের গেস্ট হাউজ অষ্টম তলায়। আমরা তৈরি হয়ে ড. এলহামের অফিসে চলে এলাম। বাংলাদেশ থেকে ড. এলহাম এবং তাঁর সহকর্মীদের জন্য কিছু সুভ্যেনীর উপহার নিয়ে এসেছি সেগুলোও নিয়ে এলাম সাথে করে। ড. এলহামের সাথে কুশল বিনিময়ের পর তিনি আমাদের নিয়ে গেলেন সাদি ফাউন্ডেশনের দাপ্তরিক ও অর্থনৈতিক বিষয়ক প্রধান জনাব সাখায়ির কাছে। ছিমছাম গড়নের চমৎকার মানুষ জনাব সাখায়ি। ইতঃপূর্বে কাতারসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে কালচারাল কাউন্সেলরের দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। প্রায় ঘণ্টা খানেক স্থায়ী হলো আমাদের এই সাক্ষাৎ। বাংলাদেশের নানান বিষয় আলোচনায় এলো। রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর কূটনৈতিক প্রজ্ঞা সম্পর্কেও নানান বিষয়ে কথা বললেন তিনি। সম্প্রতি কানাডা থেকে প্রকাশিত বাংলাদেশী এক লেখকের রাসূল (সা.)-এর কূটনীতি বিষয়ে লেখা একটি বইয়ের ফারসি অনুবাদের কপিও উপহার দিলেন আমাকে। আমি বাংলাদেশের স্মারক উপহার পিতলের নৌকা শোপিস নিয়ে এসেছি কয়েকটি। তার একটি জনাব সাখায়িকে উপহার দিলাম। তিনি খুশি হলেন।
আমরা তাঁর রুম থেকে বের হয়ে আবারও ড. এলহামের রুমে গিয়ে বসলাম। এরই মধ্যে যাকারিয়া এসে উপস্থিত হলো। অতি সম্প্রতি ২০১৭ সনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ফারসি ভাষা ও সাহিত্য বিষয়ে মাস্টার্স শেষ করেছে। মাস্টার্সে ভালো ফলাফল এবং ফারসিতে তার দক্ষতার কারণে ইরান সরকার তাকে ইরানে মাস্টার্স এবং পিএইচডি অধ্যয়নের জন্য বৃত্তি প্রদান করেছে। সেই সুবাদে বর্তমানে সে তেহরানের খাওয়ারিজমি বিশ্ববিদ্যালয়ে মাস্টার্স করছে।
খানিক পর ড. এলহাম আমাদের নিয়ে গেলেন সাদি ফাউন্ডেশনের দাপ্তরিক ও আন্তর্জাতিক বিষয়ক প্রধান জনাব পালিজদারের সাথে সৌজন্য সাক্ষাৎ করাতে। জনাব পালিজদার খুবই দিলখোলা মানুষ। নানান বিষয়ে খুবই হৃদ্যতাপূর্ণ আলাপ হলো আমাদের। তাঁকেও একটা পিতলের নৌকা-শোপিস উপহার দিলাম।
মধ্যাহ্ন ভোজের পর ড. দরুদগারিয়ান আমাদের নিয়ে রওয়ানা হলেন গ্রামের বাড়িতে তাঁর অবকাশ ভিলা দেখানোর জন্য। তেহরান থেকে দক্ষিণ-পূর্ব দিকে আলবোর্জের পাদদেশে লালন গ্রামে তাঁর পৈত্রিক নিবাস। ড. দরুদ এখানেই মনোরম প্রাকৃতিক পরিবেশে একটি পাহাড়ের ঢালে নদীর তীরে জায়গা কিনে তাঁর অবকাশ ভিলা তৈরি করছেন। লালনের অসাধারণ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দেখে আমরা যার পর নাই বিস্মিত হলাম। বন্ধু দরুদকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘এই জায়গার নাম লালন হলো কীভাবে। লালন তো আমাদের বিখ্যাত বাউল সাধক।’
দরুদ হেসে বললেন, ‘তোমাদের লালনকে আমি চিনি। আসলে ইরানে একটি ফুল আছে লালে, টিউলিপ। যেটি বর্তমানে ইরানের জাতীয় ফুল। এই লালের বহুবচন হচ্ছে লালান। যেটি কথ্যভাষায় লালন রূপ পেয়েছে। এই অঞ্চলে প্রচুর লালে ফুল হতো এবং এখানে এক জাতীয় বুনো লালে আছে যার আকৃতি বেশ ছোট এবং রঙ হলুদ। লালের প্রাচুর্যের কারণেই হয়তো এই গ্রামের নাম লালন হয়েছে।’
আমরা লালন থেকে ফিরলাম সন্ধ্যারও পরে। যাকারিয়া পথে তার ইউনিভার্সিটির কাছাকাছি কোথাও নেমে গেল। ড. দরুদগারিয়ান আমাদের গেস্ট হাউজের গেটে নামিয়ে দিয়ে বাসায় চলে গেলেন। যাবার সময় বলে গেলেন আমরা যেন আগামীকালের ‘বাংলাদেশ দিবস’-এর অনুষ্ঠানের জন্য ভালো করে প্রস্তুতি নেই।
পরদিন ৬ মে রোববার। বইমেলার ‘বাংলাদেশ দিবস’ অনুষ্ঠান। মূলত এই অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণের জন্যই আমরা বাংলাদেশ থেকে আমন্ত্রিত হয়ে এসেছি। এদিনের অনুষ্ঠানমালায় রয়েছে বেলা একটায় ড. ফরহাদ দরুদগারিয়ান ও তাঁর সহধর্মিণী ড. এলহাম হাদ্দাদি রচিত ‘শুরে ক্বান্দে পারসি দার বাংলাদেশ’ (বাংলাদেশে ফারসি ভাষার উচ্ছ্বাস) শীর্ষক গ্রন্থের মোড়ক উন্মোচন ও গ্রন্থের ওপর আলোচনা অনুষ্ঠান এবং বিকেল তিনটায় সাম্প্রতিক ইরানের সবচেয়ে আলোচিত কথাসাহিত্যিক মুস্তাফা মাস্তুর এর উপন্যাস ‘রুয়ে মাহে খোদাভান্দ রা বেবুস’- খোদার চাঁদমুখে চুমু খাও) উপন্যাসের বাংলা, তুর্কি এবং আযারবাইজানীয় ভাষার অনুবাদগ্রন্থের পরিচিতি ও পর্যালোচনা অনুষ্ঠান।
ড. দরুদগারিয়ান ও ড. এলহাম বাংলাদেশ অবস্থানকালে বাংলাদেশে ফারসি ভাষা ও সাহিত্যের অতীত ঐতিহ্য, বিকাশ ও বিস্তার সম্পর্কে যেসব তথ্যউপাত্য সংগ্রহ করেছিলেন ইরানে ফিরে এসে এগুলোর সমন্বয়েই একটি গ্রন্থ রচনা করেছেন। সাদি ফাউন্ডেশনের প্রধান ইরানের বিশিষ্ট্য পণ্ডিত ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, সাবেক স্পিকার ড. গোলাম আলী হাদ্দাদ আদেল প্রধান অতিথি হিসেবে এই গ্রন্থের মোড়ক উন্মোচন করবেন। ইরানে নিযুক্ত বাংলাদেশের মাননীয় রাষ্ট্রদূত জনাব মজিবুর রহমান এতে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকার কথা। আমি মূল আলোচক এবং ড. তাহমিনা বেগম সহ-আলোচক।
বেলা এগারোটার দিকেই সাদি ফাউন্ডেশনের দাপ্তরিক ও আন্তর্জাতিক বিষয়ক প্রধান জনাব পালিজদার আমাদের নিয়ে মেলা অভিমুখে রওয়ানা হলেন। এবার গাড়ি আমাদের মেলা প্রাঙ্গণের মূল প্রবেশদ্বার পর্যন্ত নিয়ে গেল। ভিআইপি বলে এই সুবিধা। আমরা অনুষ্ঠানের জন্য নির্ধারিত কক্ষে প্রবেশ করলাম। এখানে আর একটা বইয়ের ওপর আলোচনা চলছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই অনুষ্ঠান শেষ হলো। ড. হাদ্দাদি এসে পৌঁছলেন। খানিক পর তেহরান রেডিওর বাংলা বিভাগের পরিচালক জনাব ইব্রাহিমী তাঁর সাংবাদিকদের নিয়ে উপস্থিত হলেন। তাঁদের অনেকেই আমার পরিচিত। তাঁরা এসে আমার সাথে করমর্দন করে কুশল বিনিময় করলেন। মিনিট পাঁচেক পর এসে উপস্থিত হলেন মাননীয় রাষ্ট্রদূত মজিবুর রহমান সাহেব। তাঁর সাথে তাঁর ফার্স্ট সেক্রেটারি জনাব হুমায়ুন কবির এবং কমার্শিয়াল সেক্রেটারি জনাব সবুর আহমেদ। মুমিতও তাঁদের সাথে রয়েছে।
যথাসময়ে অনুষ্ঠান শুরু হলো। ড. হাদ্দাদী তাঁর সূচনা বক্তব্য শেষ করে আমাদের সবাইকে নিয়ে বইয়ের মোড়ক উন্মোচন করলেন। বেশ চমৎকার মোড়ক উন্মোচন পদ্ধতি! আমাদের দেশের মতো র্যাপিং পেপারে মোড়া বই মোড়ক ছিড়ে বের করলেন না। মূল মঞ্চে একটা সাইড টেবিলে স্ট্যান্ডের ওপর সুন্দর একটা কাপড় দিয়ে বেশ কটি বই ঢাকা ছিল। ড. হাদ্দাদী আমাদের নিয়ে সেই কাপড় সরালেন। অবগুন্ঠণ মুক্ত হলো বই ‘শুরে ক্বানেদ পারসি দার বাংলাদেশ’। পাঁচটি অধ্যায়ে বিভক্ত এই গ্রন্থে বাংলাদেশের সংক্ষিপ্ত পরিচিতি, ভৌগলিক অবস্থা, ভূপ্রকৃতি, আবহাওয়া, জলবায়ু ইত্যাদির আলোচনা যেমন এসেছে। তেমনি বাংলাদেশের সাহিত্যে বিশেষ করে পুঁথি সহিত্যে ফারসি ভাষা ও সাহিত্যের প্রভাব, বাংলাদেশে ফারসি ভাষা ও সাহিত্যের আগমন-ইতিহাস ও তার বিকাশ ও বিস্তার, বর্তমান বাংলাদেশে ফারসি ভাষা ও সাহিত্যের পুনর্জাগরণ, বাংলাদেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ফারসি ভাষা ও সাহিত্যের বর্তমান অবস্থা, বাংলাদেশের ফারসি ভাষা ও সাহিত্যের শিক্ষক ও গবেষকগণের গবেষণাকর্মের সংক্ষিপ্ত পরিচিতি, বর্তমান বাংলাদেশের কবি-সাহিত্যিকদের মধ্যে ফারসি সাহিত্য সম্পর্কে আগ্রহ ও অবগতি ইত্যাকার নানা বিষয় স্থান পেয়েছে ‘শুরে ক্বান্দে পারসি দার বাংলাদেশ’ গ্রন্থে।
আমি আর মজিবুর রহমান সাহেব পাশাপাশি বসেছি। তাঁর সাথে আমার বহুদিনের সখ্যতা। সেই ১৯৯৮ সালে আমি যখন প্রথম ইরানে আসি তখন তিনি ছিলেন তেহরানে বাংলাদেশ দূতাবাসে ফার্স্ট সেক্রেটারি। সেই সময়ের তাঁর আতিথিয়তা আজও আমি ভুলতে পারিনি। সেই থেকেই আমাদের হৃদ্যতা। গতবছর জানুয়ারিতে যখন ইরান এসেছিলাম তখন তিনি ইরানে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত। মাত্র সাত দিনের সেই সফরে তাঁর বাসায় আমাদের দুই রাত আড্ডা এবং ডিনার হয়েছে। এখানেও বক্তৃতার ফাঁকে ফাঁকে আমরা কথা বলছিলাম। তিনি প্রস্তুতি নিয়ে এসেছিলেন ইংরেজিতে বক্তৃতা করবেন। আমি বললাম, বাংলায়ই বলেন। বাংলাদেশে ইরানি ডিপ্লোমেটরা সাধারণত ফারসিতে বক্তৃতা করে, সেগুলো বাংলায় অনুবাদ করা হয়। আপনি বাংলায় বলেন। মুমিত ফারসিতে অনুবাদ করবে। তিনি আমার প্রস্তাবে রাজি হয়ে বাংলায়ই তাঁর বক্তৃতা শুরু করলেন। মুমিত অনুবাদ করতে লাগলো। আমি দেখলাম উপস্থিত শ্রোতা-দর্শক বেশ উপভোগ করছে তাঁর বক্তৃতা। বিশেষ করে বাংলা ভাষা। তিনি তাঁর বক্তৃতায় বাংলাদেশে ফারসি ভাষার অতীত-ঐতিহ্যের প্রতি ইঙ্গিত করে বললেন, বাংলাদেশে ফারসি ভাষার এতটাই প্রশার ঘটেছিল যে বর্তমানেও আমরা আমাদের দৈনন্দিন জীবনের বাংলাভাষায় প্রায় সাড়ে ছয় হাজার ফারসি শব্দ ব্যবহার করি। তিনি রশিকতাছলে বললেন, ফারসি শব্দাবলি আমাদের কাছে খুবই পরিচিত। সুতরাং ইরানি বন্ধুরা আমাদের সামনে সতর্কতার সাথে ফারসি বলবেন। কারণ আমরা কিন্তু অনেক শব্দই বুঝতে পারি। তাঁর এ কথায় দর্শক-শ্রোতাদের মধ্যে হাসির রোল পড়ে গেল।
আমি ফারসিতেই আমার বক্তৃতা শুরু করলাম। বাংলাদেশীদের জন্য ফাঁকে ফাঁকে তা নিজেই বাংলায় অনুবাদ করতে থাকলাম। আমি আমার বক্তৃতায় বাংলাদেশ ও ইরানের মধ্যেকার সুদূর অতীতকাল থেকেই যে খুবই ঘনিষ্ট ভাষিক, সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় সম্পর্ক বিদ্যমান ছিল এবং অতীতে যে বাংলাদেশে ফারসি ভাষা ও সাহিত্যের ব্যাপক চর্চা হতো সেদিকে ইঙ্গিত করে বললাম, বর্তমানে ইরান ও বাংলাদেশের রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক, ধর্মীয় ও সাহিত্যিক সম্পর্ক এতটাই নিবিড় ও হৃদ্যতাপূর্ণ যে আমরা এখন আর কেউ কাউকে ভিনদেশী বলে অনুভব করি না। ইতঃপূর্বে আমি ইরানে আরও অনেক অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করেছি এবং আমার অনেক সহকর্মী ও বাংলাদেশী স্কলাররা ইরানে যেসব অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করেছেন সেসব অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের কোনো রাষ্ট্রদূত অংশগ্রহণ করেছেন বলে আমার জানা নেই। সেদিক বিবেচনায় এই অনুষ্ঠান অত্যন্ত গুরুত্বের দাবিদার এবং আমি আশাকরি এর মাধ্যমে দুইদেশের শিল্পী-সাহিত্যিকদের মধ্যকার সম্পর্ক আরও সুদৃঢ় ও হৃদ্যতাপূর্ণ হবে।
ড. তাহমিনাও ফারসি ও বাংলা উভয় ভাষায় তাঁর বক্তৃতা উপস্থাপন করলেন। তাঁর বক্তৃতায় ড. দরুদগারিয়ান ও ড. এলহাম রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ফারসি ভাষা ও সাহিত্যের প্রশিক্ষণ কোর্সে গিয়ে যে আন্তরিকতাপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন এবং তাঁদের উপস্থিতিতে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ফারসি ভাষা ও সাহিত্যের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা যে অনুপ্রেরণা লাভ করেছে সেদিকে ইঙ্গিত করলেন।
এরপর গ্রন্থকারদের বক্তৃতায় ড. দরুদগারিয়ান বাংলাদেশে অবস্থানকালে ফারসি ভাষা ও সাহিত্যের যে অবস্থা পর্যবেক্ষণ করেছেন এবং বাংলাদেশের সাধারণ পাঠক ও কবি-সাহিত্যিকদের মধ্যে ফারসি ভাষা ও সাহিত্যের প্রতি যে আগ্রহ সে বিষয়ে আলোকপাত করলেন।
জনাব পালিজদার তাঁর সভাপতির বক্তৃতায় উল্লেখ করলেন, এখন থেকে সাদি ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে আমরা প্রতিবছর বইমেলায় বাংলাদেশ বিষয়ক একটি করে গ্রন্থ প্রকাশের চেষ্টা করবো।
মধ্যাহ্ন ভোজের সময়ও পার হয়ে যাচ্ছে। জনাব পালিজদার অনুষ্ঠানের সমাপ্তি ঘোষণা করলেন। আমাদের নিয়ে যাওয়া হলো মেলা আয়োজন কর্তৃপক্ষের অফিসে, মধ্যাহ্ন ভোজের জন্য। ইরানি কাবাব, কোরমা সাবজি, মাস্ত (টকদই) আর ইরানি বেরেঞ্জ (ইরানি ভাত) দিয়ে আমরা মধ্যাহ্ন ভোজ শেষ করলাম। এরই মধ্যে ড. এলহাম আমাকে তাড়া দিতে শুরু করলো, মুস্তাফা মাস্তুর চলে এসেছে। আমার জন্য অপেক্ষা করছে। মুস্তাফা মাস্তুর রুয়ে মাহে খোদাভান্দ রা বেবুস উপন্যাসের মূল লেখক। তাঁর এই উপন্যাস ২০০০-২০০১ সালে ইরানের শ্রেষ্ঠগ্রন্থ নির্বাচিত হয়েছে। আমি এটি ‘খোদার চাঁদমুখে চুমু খাও’ শিরোনাম বাংলাভাষায় অনুবাদ করেছি। ২০১৪ সালের একুশের গ্রন্থমেলায় রোদেলা প্রকাশনি এটি গ্রন্থাকারে প্রকাশ করেছে। আরও বেশ কটি ভাষায় উপন্যাসটি অনূদিত হয়েছে। পরবর্তী অধিবেশনে বাংলা, তুর্কী এবং আজারবাইযানি অনুবাদের পরিচিতি ও পর্যালোচনা অনুষ্ঠান। এই অধিবেশনেও আমিই মূল আলোচক।
আমি খাওয়া শেষ করেই রাষ্ট্রদূত মহোদয়ের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে ড. এলহামের সাথে অনুষ্ঠানস্থলে চলে এলাম। মুস্তাফা মাস্তুরকে দেখে দৌড়ে গিয়ে জড়িয়ে ধরলাম তাঁকে। দুই ভাষার দুই লেখক শুধু লেখালেখির সূত্রে মুহূর্তে একাকার হয়ে গেলাম। মনে হলো দুজন দুজনার কতকালের পরিচিত।
যথাসময়ে অনুষ্ঠান শুরু হলো। এরই মাঝে মাননীয় রাষ্ট্রদূতকে বিদায় জানিয়ে অন্যরা সবাই সভাস্থলে এসে উপস্থিত হয়েছে। আমি আমার বক্তৃতায় বাংলাদেশে রুয়ে মাহে খোদাভান্দরা বেবুস-এর অনুবাদ পাঠকদের প্রতিক্রিয়া বিষয়ে উল্লেখ করে বললাম, পাঠকদের মধ্যে আমি দুই ধরণের প্রতিক্রিয়া দেখেছি। বিশেষ করে রক্ষণশীল পাঠকদের কেউ কেউ বইয়ের শিরোনাম দেখেই নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে বলেছেন, এটিতো শিরকি শিরোনাম। খোদার আবার মুখ হতে পারে নাকি?
জবাবে আমি বিনয়ের সাথে তাদের বলেছি, এটি আক্ষরিক অর্থে নয়। রূপক অর্থে, কুদরতি মুখ। আপানারা দয়া করে বইটি পড়ুন। তারপর যদি মনে হয় এটি র্শেক-এর পর্যায়ে পড়ে তাহলে আপনাদের বক্তব্যের সাথে আমিও সহমত পোষণ করবো। বইটি পড়ার পর তাদের দৃষ্টিভঙ্গি সম্পূর্ণ পাল্টে যেতে দেখেছি আমি। বরং তাঁরা বলেছেন, উপন্যাসের বিষয়বস্তু এমনই হওয়া উচিত। আমাদের দেশের বেশিরভাগ উপন্যাসের বিষয়বস্তুই তো হালকা, চটুল।
পরদিন ৭মে সোমবার বিকেল ৪টায় বুক সিটিতে (শাহরে কেতাব) ‘সমকালীন বাংলাদেশ ও ইরানের সাহিত্যের তূলনামূলক পর্যালোচনা এবং বাংলাদেশে ফারসি ভাষা ও সাহিত্যের বিকাশে নারী শিক্ষকদের ভূমিকা শীর্ষক’ সাহিত্য সভা। আমার আর ড. তাহমিনা বেগমের দুজনেরই এই সভায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করার কথা। আমি বলবো সমকালীন বাংলাদেশ ও ইরানের সাহিত্য বিষয়ে আর ড. তাহমিনা বলবেন বাংলাদেশে ফারসি ভাষা ও সাহিত্যের বিকাশে নারী শিক্ষকদের ভূমিকা। আমরা দুজনই সেভাবে প্রবন্ধ লিখে নিয়ে এসেছি। ড. দরুদগারিয়ান ও ড. এলহাম হাদ্দাদিও এতে বক্তব্য রাখবেন। জনাব মুস্তাফা মাস্তুরও উপস্থিত হবেন বক্তা হিসেবে।
মধ্যাহ্ন ভোজ সেড়ে আড়াইটার দিকে আমরা রওনা হলাম বুকসিটির উদ্দেশ্যে। বুক সিটি দক্ষিণ তেহরানে। তাই আমাদের পৌঁছতে একটু সময় লাগলো। প্রবেশ মুখে বোর্ডে টাঙ্গানো অনুষ্ঠানের পোস্টারে আমাদের নাম দেখে ভালই লাগলো। দোতলায় বুক সিটির অফিসে ঢুকতেই দেখা হলো বুকসিটির প্রধান মোহাম্মদখানীর সাথে। আমার বহুদিনের পরিচিত তিনি। একটু পরই এলো শাহ হোসাইনি, যিনি ২০০২ থেকে ২০০৫ পর্যন্ত ঢাকাস্থ ইরানি সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের ডেপুটি কালচারাল কাউন্সেলরের দায়িত্ব পালন করেছেন। খুবই ভাল মানুষ। আরও একটু পরে এলো লেখক মুস্তাফা মাস্তুর। চা-চকলেটের আপ্যায়নের পর আমরা মূল মিলনায়তনে প্রবেশ করলাম। অনুষ্ঠান শুরু হলো। যথারীতি মোহাম্মদখানী সভাপতি। আমি আমার প্রবন্ধের আলোকে বক্তব্য উপস্থাপন করলাম। বাংলাদেশে সাম্প্রতিক ইরানি সাহিত্যের অনুবাদ, সাম্প্রতিক বাংলাসাহিত্যের ফারসি অনুবাদ, বাংলাদেশে সমকালীন ফারসি সাহিত্যের পিএইচটি ও এমফিল পর্যায়ে গবেষণা, বিভিন্ন গবেষক ও শিক্ষকদের সাম্প্রডুশ ফারসি সাহিত্য সম্পর্কে গবেষণা প্রবন্ধ ও গ্রন্থ প্রকাশ, বাংলাদেশে সমকালীন ফারসি সাহিত্যের প্রচার ও বিকাশে বাংলাদেশে নিযুক্ত ইরানি ভিজিটিং প্রফেসরবৃন্দের ভূমিকা, ঢাকাস্থ ইরানি সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের ভূমিকা, ইত্যাকার নানা বিষয়। ড. তাহমিনা বেগম তাঁর প্রবন্ধে বাংলাদেশে ফারসি ভাষা ও সাহিত্যের বিকাশে নারী শিক্ষকগণের ভূমিকা বিষয়ে নানা তথ্য উপাত্য উপস্থাপন করলেন। ড. দরুদগারিয়ান বাংলাসাহিত্যের সংক্ষিপ্ত পরিচিতি এবং বাংলাসাহিত্যে ফারসি সাহিত্যের প্রভাব, সমকালীন বাংলা সাহিত্যের সাথে সমকালীন ফারসি সাহিত্যের সাদৃশ্য ও দূরত্ব ইত্যাকার বিষয়ে আলোকপাত করলেন। তাঁর বক্তব্যে হুমায়ূন আহমাদ ও তাঁর সাহিত্যের বৈশিষ্ট্য ও বিষয় খুব গুরুত্বের সাথে স্থান পেল। মুস্তাফা মাস্তুর তাঁর বক্তৃতায় সাম্প্রতিককালের ফারসি সাহিত্যের বিশেষ করে কবিতায় কায়সার আমিনপুর এবং কথাসাহিত্যে সিমিন দানেশভার, গুলি তারাক্বি প্রমুখের শ্রেষ্ঠকর্মসমূহ আরও অধিক অনুবাদ হওয়া উচিৎ বলে উল্লেখ করলেন। জনাব মোহাম্মদখানী তাঁর বক্তব্যে ঘোষণা করলেন, শাহরে কেতাব হুমায়ূন আহমেদের গৌরিপুর জংশন সম্পাদনা করে ইরান থেকে প্রকাশ করবে এবং এখন থেকে প্রতিবছর শাহরে কেতাব একটি করে ফারসি সাহিত্যের কোনো গ্রন্থ বাংলা ভাষায় এবং বাংলা সাহিত্যের কোনো একটি গ্রন্থ ফারসি ভাষায় অনুবাদ করে প্রকাশ করবে। তিনি ইরান-বাংলাদেশ সাহিত্য সংসদ-এরও ঘোষণা করলেন। সভাশেষে আনুষ্ঠানিকভাবে আমি রুয়ে মাহে খোদাভান্দ রা বেবুস-এর বাংলা অনুবাদের একটি কপি মূল লেখককে উপহার দিলাম।
বুকসিটির অনুষ্ঠান শেষ করে সবাই চলে গেলেও আমরা যেতে পারলাম না। আমাদের বসে থাকতে হলো, রেডিও তেহরান থেকে সাংবাদিক মুসা রেজা আসছেন আমাদের সাক্ষাৎকার নিতে। বিকেলেই পরিচালক ইব্রাহিমী ফোন করেছিল, আমরা কবে ফ্রি আছি। আমি বলেছি, আজ ছাড়া আর আমাদের অবসর নেই। আগামীকাল এবং পরশু আমাদের সারাদিন ব্যস্ততা। তাই এখানেই সময় নিয়েছেন আমাদের।
আমরা মোহাম্মদখানীর অফিসে অপেক্ষা করতে লাগলাম। প্রায় ঘণ্টাখানিক পর মুসা রেজা এসে পৌঁছলেন। সাক্ষাৎকারে বাংলাদেশ ও ইরানের নানা বিষয় উঠে এলো আলাপক্রমে। সাক্ষাৎকার শেষ করে বুক সিটি থেকে আমরা বের হলাম রাত আটটার দিকে। মুসা রেজা আমাদের ভেলেঞ্জাকে গেস্ট হাউজের কাছাকাছি কোনো এক জায়গায় নামিয়ে দিয়ে চলে গেলেন।
৮ তারিখ বেলা এগারোটায় আমাদের ইসলামি সম্পর্ক ও সংস্কৃতি সংস্থা (সাজেমানে ফারহাঙ্গ ভা এরতেবাতাতে ইসলামি)-এর এশিয়া মহাসাগরীয় অঞ্চল প্রধানের সাথে সৌজন্য সাক্ষাৎ ছিল। মূলত এই সংস্থাই পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ইরানি সাংস্কৃতিক কেন্দ্রগুলো পরিচালনা করে। ঢাকাস্থ ইরানি সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের সাবেক ডেপুটি জনাব আসগর খসরুআবাদি বর্তমানে এই দপ্তরের ডেস্কপ্রধান। তাঁর আমন্ত্রণেই মূলত এই সাক্ষাৎ। ওদিকে ড. এলহাম অপেক্ষা করছেন হওজে হুনারিতে। হওজে হুনারি প্রধান আলী রেজা ক্বাজভে আমাদের মধ্যাহ্ন ভোজের আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। দু জায়গাতেই আমরা বাংলাদেশ ইরানের নানা সম্পর্ক, বাংলাদেশে ফারসি ভাষা ও সাহিত্যের বিকাশে আরও কী কী করণীয়, বাংলাদেশের ফারসি গ্র্যাজুয়েটদের কর্মসংস্থানে কার্যকর কী কী পদক্ষেপ নেওয়া উচিত, ইত্যাকার বিষয়ে আলোচনা হলো।
৯ মে সকালেই আমাদের কেনাকাটায় যাবার কথা ছিল। রাতে মাননীয় রাষ্ট্রদূত আমাদের জন্য নৈশভোজের আয়োজন করেছেন। তাই অন্য কোনো প্রগ্রাম আর রাখিনি। কিন্তু সকাল নয়টার দিকে ড. এলহাম ফোন করে তাঁর অফিসে যাবার জন্য অনুরোধ করলেন। বললেন, সাদি ফাউন্ডেশনের শিক্ষা ও গবেষণা বিষয়ক প্রধান ড. সাহরায়ী তোমাদের সাথে সৌজন্য সাক্ষাৎ করতে চাচ্ছেন।
আমি বললাম, আমরাতো আজ কেনাকাটা করতে যাবার কথা।
তিনি অনুরোধ করে বললেন, বিষয়টা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তোমরা ঘণ্টাখানিক সময় দিয়ে তারপর কেনাকাটায় চলে যাও।
আমি রাজি হয়ে গেলাম। তৈরি হয়ে এলহামের দপ্তর হয়ে ড. সাহরায়ীর সাথে আমাদের বসতে বসতে দশটা বেজে গেল। আসলেই বৈঠকটা ছিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ। মূলত ইরানের বাইরে ফারসি ভাষা ও সাহিত্যের প্রচার ও বিকাশ নিয়ে কাজ করে সাদি ফাউন্ডেশন। জার্মানির গ্যাটে ফাউন্ডেশন এবং ফ্রান্সের আঁলিয়াস ফ্রাঁসোর মতো। তাই শিক্ষা ও গবেষণাই এই প্রতিষ্ঠানের মূল কাজ। ড. সাহরায়ী ভাষাতত্ত্বের এবং ফারসি ভাষা শিক্ষার বিশেষজ্ঞ। সম্প্রতি তাঁর নেতৃত্বে আইএলটিএস-এর আদলে অইরানিদের জন্য ফারসি ভাষা শিক্ষাপদ্ধতি প্রবর্তিত হয়েছে এবং তাঁর আলোকে এই প্রতিষ্ঠান বেশ কটি পাঠ্যপুস্তক প্রবর্তন করেছে। এগুলো হচ্ছে প্রাথমিক ফারসি ভাষা শিক্ষা বিষয়ক গ্রন্থ গামে আওয়াল, দ্রুত পঠন এবং আনন্দ পাঠ গ্রন্থ মিনা এবং ইরান পরিচিতি বিষয়ক গ্রন্থ ইরান শেনাসি। ড. সাহরায়ী এই বইগুলোর বৈশিষ্ট্য এবং সুবিধা অসুবিধা নিয়ে কথা বলছিলেন। এই পদ্ধতি এবং বইগুলো আমারকাছে খুবই কার্যকরী বলে মনে হলো। আমি বললাম, সবই ঠিক আছে, তবে এই পদ্ধতি কার্যকর ও ফলপ্রসূ করতে হলে আমরা যারা বিভিন্নি বিশ্ববিদ্যালয়ে অইরানিদের ফারসি ভাষা শিক্ষাদিচ্ছি সেসব বিশ্ববিদ্যালয়ে ভাষা শিক্ষার জন্য অভিন্ন পাঠ্যপুস্তক সিলেবাস ভুক্ত করতে হবে। এবং যারা এগুলো পাঠ দান করবেন তাদেরও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে।
ড. সাহরায়ী আমার বক্তব্যের সাথে একমত পোষণ করলেন। সাহরায়ীর দপ্তর থেকে বের হতে হতে সাড়ে বারটার মতো বেজে গেলো। বের হয়েই সোজা ট্যাক্সি নিয়ে তাজরিশ। সেখান থেকে ম্যাট্রোতে বড় বাজার। বড় বাজারে কেনাকাটা সেরে ফিরতে ফিরতে সন্ধ্যা। দৌড়ে রুমে গিয়ে কোনো রকমে পোশাক পরিবর্তন করে রাষ্ট্রদূত মহোদয়ের নৈশভোজে রওনা হলাম। সেখান থেকে ফিরতে ফিরতে রাত সাড়ে বারটা বেজে গেল। পরদিন ১০মে বেশকিছু সুন্দর স্মৃতি সাথে নিয়ে স্বদেশের উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম।
* অধ্যাপক, ফারসি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়