ইরানী নওরোয ও বাংলা নববর্ষ : শাশ্বত ঐতিহ্যের ধারা
পোস্ট হয়েছে: অক্টোবর ২৭, ২০১৬
অধ্যাপক সিরাজুল হক
নওরোয সম্বন্ধে আলোচনা করতে গেলেই ইরানের কথা আসে। কারণ, নওরোয হচ্ছে শাশ্বত ইরানী সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের অন্যতম নিদর্শন। নওরোয মানে ‘নতুন দিন’। বাংলাদেশে ও বাংলা ভাষায় এটা এখন আর অপ্রচলিত ও অপরিচিত নয়। ‘রোযা’ ফারসি শব্দ হলেও তা বাংলা ভাষায় মিশে গিয়েছে, আর ‘নও’ কথাটিও বাংলা ভাষার সাথে সম্পৃক্ত হয়েছে। যেমন বাংলাদেশের একটি পত্রিকার নাম ছিল ‘নওবেলাল’। আরেকটি পত্রিকার নাম ছিল ‘জাহানে নও।’ বর্তমানে ‘নওরোয’ নামে একটি দৈনিক পত্রিকা প্রকাশিত হচ্ছে ঢাকা থেকে। এছাড়া বহু যুগ আগ থেকে দিনাজপুরে ‘নওরোয সাহিত্য মজলিস’ নামে একটি সংগঠনও রয়েছে। ‘নওরোয’ কথাটির সাথে আভিধানিক ও পারিভাষিক তাৎপর্য উভয় দিক দিয়েই আমাদের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে।
‘নওরোয’ একটি সুপ্রাচীন ও শাশ্বত ইরানী ঐতিহ্য হলেও এক অর্থে তা ইরান বা পারস্য ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক রূপ পরিগ্রহ করেছে। ভারত উপমহাদেশে বিশেষ করে মোগল যুগে জাঁকজমকের সাথে নওরোয উৎসব পালিত হতো। এখনও বিক্ষিপ্তভাবে পাকিস্তান, ভারত ও বাংলাদেশে তা কমবেশি পালিত হচ্ছে। এছাড়া আফগানিস্তান, তাজিকিস্তান, তুর্কমেনিস্তান, উজবেকিস্তান, তুরস্ক, আযারবাইজান, কুর্দিস্তান এবং কোন কোন আরব ও ইউরোপীয় দেশেও নওরোয উৎসব পালিত হয়ে থাকে।
সম্রাট হুমায়ুন ভারতের উত্তরাঞ্চলে এ উৎসবের প্রচলন ঘটান। এরপর সম্রাট আকবরের রাজত্বের (১৫৫৬-১৬০৫ খ্রি.) প্রথম থেকেই নওরোয উৎসব উদ্যাপিত হতে থাকে। এ উপলক্ষে হেরেমবাসিনী মহিলারাও শখের বশে দোকান সাজিয়ে মীনা বাজার বসাতেন।
ইরানী সৌরবর্ষের প্রথম মাসের নাম হচ্ছে ‘ফারভারদিন’। আর ফারভারদিনের প্রথম দিনকেই বলা হয় ‘নওরোয’। সকল যুগে পৃথিবীর সকল জাতি-গোষ্ঠীর বর্ষপঞ্জিতে নতুন বছরের প্রথম মাসের প্রথম দিনটি উৎসবের দিন হিসাবে পরিগণিত ও পালিত হয়ে এসেছে। সূর্যের চতুর্দিকে পৃথিবীর ঘূর্ণন, রাত ও দিনের আবর্তন, বিভিন্ন ঋতুর পরিক্রমা, পৃথিবীর চারদিকে চাঁদের পরিক্রমণ প্রভৃতি মানুষকে দিনক্ষণ, মাস ও বছরের হিসাবনিকাশে উদ্বুদ্ধ করেছে, প্রকারান্তরে, বাধ্যও করেছে। আর এভাবেই বর্ষপঞ্জির জন্ম দিয়েছে। বছরের শেষ দিনগুলো যেমন মানব জীবনে অন্তিমের সুর তোলে এবং তা কিছুটা হলেও বেদনাকর, তেমনি বছরের শুরুটা মূলত এক নতুনত্বের সূচনাÑ যা মানুষকে নতুন অনুভূতি, নতুন আশা-আকাক্সক্ষা ও প্রেরণায় উদ্বুদ্ধ করে তোলে। প্রাগৈতিহাসিক কালে ইরানীরা নৈসর্গিক জীবনের সমাপ্তি উপলক্ষে ফারসি সনের শেষ ১১ দিন অর্থাৎ খ্রিস্টীয় হিসাবে ১০ থেকে ২০ মার্চ শোক পালন করতো বলে জানা যায়। নওরোয বা নববর্ষ উপলক্ষে বিশ্বপ্রকৃতিতে নতুন করে জীবনের উপস্থিতিতে এ শোকের সমাপ্তি হতো এবং এ উপলক্ষে আনন্দ-উৎসব হতো। ইরানী সমাজে নওরোয এমনই একটি উৎসব যে, তা অন্যান্য দেশ ও সংস্কৃতির তুলনায় ব্যতিক্রমধর্মী বলা চলে। আর এ কারণেই এর এতটা প্রসিদ্ধি ও হৃদয়গ্রাহিতা রয়েছে।
নওরোয উৎসবের প্রচলনের সঠিক সন-তারিখ অদ্যাবধি যদিও জানা যায়নি, তবে এটি যে অত্যন্ত প্রাচীন উৎসব তা বলার অপেক্ষা রাখে না। এর নিদর্শনগুলো হাখামানশী (অপযধবসরহরধহ) রাজবংশের শাসনামলের (খ্রিস্টপূর্ব ৭০০-৩০০ অব্দ) সাথে সঙ্গতিপূর্ণ। হাখামানশী সম্রাটদের যুগে নওরোয উৎসব বিশেষ আরম্বরের সাথেই পালিত হতো বলে প্রচুর তথ্য-প্রমাণ পাওয়া গেছে। এছাড়া তাখ্তে জামশীদে রক্ষিত একটি শিলালিপি থেকে জানা যায় যে, হাখামানশী পূর্ব যুগে মা’দ রাজাদের শাসন আমলেও নওরোয উৎসব পালিত হতো।
ইরানী সৌরবর্ষপঞ্জির ফারভারদিন মাসের প্রথম দিনকে ফারসি ভাষায় ‘নওরোয’ বলা হয় যা শুধু নতুন দিনই নয়, উৎসবের দিন হিসাবেও অভিহিত। হিজরি ৪৬৭ অথবা ৪৭১ সালে জালালী বর্ষপঞ্জির উৎপত্তির পূর্ব পর্যন্ত সৌর বৎসরের হিসাবটা হতো এভাবে : বছরকে ভাগ করা হতো ৩০ দিনের বারো (১২) মাসে যার ফলে মোট ৩৬০ দিন হিসাব হতো। বাকি ৫ দিনকে অন্য একটি মাসের সাথে যুক্ত করা হতো। এভাবে মোট ৩৬৫ দিন পাওয়া যেত। কিন্তু এ সত্ত্বেও ৫ ঘণ্টা ৪৮ মিনিট ৫১.৪৫ সেকেন্ড অবশিষ্ট থেকে যেত। এ কারণে প্রতি চার বছরে এক দিন পার্থক্য হতো। এর ফলে ক্রমান্বয়ে ফারভারদিনের প্রথম দিনটি এগিয়ে আসতে থাকে। অর্থাৎ বসন্তের সূচনাদিবসের ওপর নওরোয স্থির ছিল না। ইরানের সর্বশেষ সাসানী রাজা (সম্রাট) ইয়াযদেগার্দ ৬৩২ খ্রিস্টাব্দে সিংহাসনে আরোহণ করেন। সে দিনটি ছিল ফারভারদিন মাসের প্রথম দিবস মোতাবেক ১৬ জুন। এরপর নওরোয প্রতি চার (৪) বছরে এক দিন এগিয়ে আসে। ৪৭৬ হিজরি সালে নওরোয ছিল মার্চ মাসের ৩ তারিখ। ঠিক এ বছরই মালিক শাহ সালজুকি জ্যোতির্বিদদের একটি দলকে একত্র করে সৌর বৎসরের একটি চূড়ান্ত ও সূক্ষ্ম হিসাব তৈরি করে ফারভারদিন মাসের প্রথম দিনটি নির্ধারণের আদেশ জারি করেন। এ ব্যাপারে ইতিহাসে উল্লিখিত আরেকটি অভিমত হলো এই যে, প্রখ্যাত মুসলিম বিজ্ঞানী ও কবি ওমর খৈয়াম (১০৪৮-১১২৩) তুর্কী সালজুকী শাসক মালিক শাহের নির্দেশনায় সৌর বা শামসী হিজরি ক্যালেন্ডার প্রণয়ন করেন এবং ফারভারদিন মাসের ১ তারিখকে (যা সাধারণত ২১ মার্চ; কখনো কখনো ২০ মার্চ) নওরোয হিসাবে চিহ্নিত ও নির্র্ধারণ করেন। মার্ভের জ্যোতির্বিদ খাজা আবদুর রহমান খাযেনীর নিরীক্ষার ভিত্তিতে তখন খ্রিস্টীয় বর্ষপঞ্জির হিসাবে প্রথম বারের মতো ফারভারদিন মাসের প্রথম দিবসটি ১৬ দিন পিছিয়ে যায়। আর এভাবেই নওরোয বসন্তের সূচনালগ্নে স্থিরিকৃত হয়। নতুন হিসাব অনুসারে বছরে কোন এক মাসে ৫ দিন যোগ করে পর পর চার বছরকে ৩৬৫ দিন করে হিসাব করা হয়, আর পঞ্চম বছরকে ৩৬৬ দিন ধরা হয়। এ হিসাবের মধ্যে ৫ ঘণ্টা এবং আরও কিছু সময়ও অন্তর্ভুক্ত করা হয়। আর এভাবেই সেই বৎসর থেকে নওরোয বসন্তের প্রথম দিনে নির্ধারিত হয়ে যায়।
১৩০৪ ফারসি সালে (১৯২৫ খ্র্রিস্টাব্দ মোতাবেক ১৩৪৩ হিজরি) সৌরবর্ষপঞ্জি সরকারি বর্ষপঞ্জি হিসাবে গৃহীত হয় যাতে উল্লিখিত হিসাব বিবেচনাধীন রাখা হয়। শুধু বছরে ৫ দিন বৃদ্ধি করার পরিবর্তে বছরের প্রথম ছয় মাসকে ৩১ দিন হিসাবে, পরবর্তী পাঁচ মাসকে ৩০ দিন হিসাবে ও দ্বাদশ মাসকে ২৯ দিন হিসাবে ধার্য করা হয় এবং প্রতি চতুর্থ বছরে দ্বাদশ মাসকে ৩০ দিনে গণনা করা হয়। আর উক্ত বছরকে ফারসি ভাষায় বলা হয় কাবিসা সাল অর্থাৎ লিপ ইয়ার। উল্লেখ্য, ইরানের সর্বজনীন ও সরকারি বৎসর গণনার মানদ- হচ্ছে সৌরবর্ষপঞ্জি। এছাড়া চান্দ্রবর্ষকেও এর পাশাপাশি ধর্মীয় বর্ষপঞ্জি হিসাবে গুরুত্ব দেওয়া হয়।
নওরোয উৎসবের ইতিহাস যে অতিশয় প্রাচীন এ ব্যাপারে ইতিহাসবিদগণ ঐকমত্য পোষণ করেন। তবে এর পটভূমি সম্পর্কে বিভিন্ন অভিমত রয়েছে। যেমন ঐতিহাসিক মাসউদী প্রণীত ‘মুরুজুয যাহাব’ গ্রন্থে উল্লিখিত হয়েছে যে, কিংবদন্তীর ইরানী সম্রাট জামশীদের সময় তিন বছরব্যাপী স্থায়ী একটি টাইফুন ঝড় ইরানের ভূমিতে আঘাত হানে এবং দেশ ও জনগণের ব্যাপক ক্ষতি সাধন করে। এরপর বসন্ত কালের শুরুতে টাইফুন স্তিমিত ও শান্ত হয়ে আসে। ভয়াবহ ও বিপদসংকুল টাইফুন অবসানের পর জনগণ স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে এবং ‘নওরোয’ বা নতুন দিনের উৎসব পালন করে। দীর্ঘ শীতকাল ও শৈত্য প্রবাহের পর মানুষ গুহা, কুঠুরি ও অন্যান্য আশ্রয়স্থল থেকে বের হয়ে এসে বসন্ত উৎসব পালন করে।
প্রাচীনকালে ইরানীরা প্রধানত দুটি উৎসব জাঁকজমকের সাথে পালন করত বলে জানা যায়। এ সম্পর্কে ‘লোগাতনামেয়ে দেহখোদা’য় (আলী আকবার দেহখোদা প্রণীত অভিধান) উল্লেখ করা হয়েছে। নওরোয বলতে সাত মাসব্যাপী গ্রীষ্মকালের শুরু বোঝাতো, আর মেহেরবান উৎসব শরৎকালের প্রথমভাগে হতো যা বর্তমানেও ইরানের যরথুস্ত্রী ধর্মাবলম্বীরা পালন করে থাকে। হাখামানশী রাজবংশের শাসনামলের অর্থাৎ ২৫০০ বৎসর পূর্বের নওরোয উৎসবের ব্যাপারে প্রতœতাত্ত্বিক নিদর্শন ও রেকর্ড পাওয়া যায়।
ইরানে বারো মাসে ৪টি ঋতু বা মওসুম গণনা করা হয় : বাহার (বসন্ত), তাবেস্তান (গ্রীষ্ম), পয়িয (শরৎ) ও যামেস্তান (শীতকাল)। এ চার ঋতুর জন্য হাখামানশীদের চারটি ভিন্ন ভিন্ন আবাসিক এলাকা গড়ে উঠেছিল। পারসেপোলিস ছিল তাদের বাহার বা বসন্তকালীন আবাসস্থল ও নববর্ষ উদ্যাপনের কেন্দ্র।
প্রাচীন কালে নওরোযকে দুই ভাগে বিভক্ত করে পালন করা হতো। পাঁচদিনব্যাপী পালিত নওরোযÑ যাতে সর্বস্তরের জনসাধারণ অংশগ্রহণ করত। এ উৎসব বৎসরের প্রথম দিন ১ ফারভারদিন থেকে শুরু হয়ে ৫ ফারভারদিন পর্যন্ত বিরামহীন চলতে থাকত। এ পাঁচ দিন রাজা-বাদশাগণ জনসাধারণকে রাজপ্রাসাদে সাক্ষাৎ দিতেন। তাদের আপ্যায়ন করাতেন, কারাগারের দরজাগুলো খুলে দিয়ে বন্দিদের মুক্তি দিতেন এবং অভাবী লোকদের অভাব-অনটন দূর করার জন্য চেষ্টা করতেন। এ পাঁচ দিনকে ইরানীরা নওরোযে ছগীর (ছোট নওরোয) বলত। এ নামটি বর্তমানে প্রচলিত নেই। তবে অতীত কালের অনেক নিয়ম এখনও বিদ্যমান এবং জনগণ অতীতের মতোই উৎসব-আনন্দে মেতে থাকে।
এছাড়া উপর্যুক্ত পাঁচ দিনের পরেও একটি বিশেষ শ্রেণি ফারভারদিন মাসের ১৩ তারিখ পর্যন্ত আনন্দ-উৎসবের আয়োজন করত। ইরানীরা ফারভারদিনের ১৩ তারিখকে বিশেষ গুরুত্ব দেয় এবং এ দিন সবাই পার্ক, মাঠ, ময়দান বা অনুরূপ বিশেষ স্থানে বেড়াতে যায় ও সন্ধ্যার পর ঘরে ফিরে আসে। এ দিনটি সর্বজনীন ছুটির দিন।
বসন্ত উৎসব
পৃথিবীর সব জাতির মধ্যেই ঋতুরাজ বসন্তের একটি আবেদন রয়েছে। সব দেশেই বসন্ত ঋতুর আগমন একই সময়ে অথবা বছরের শুরুতে ঘটে না। যেমন বাংলাদেশেও নববর্ষ বা ১ বৈশাখ বসন্তকালে শুরু হয় না; বরং ষড়ঋতুর দেশ বাংলাদেশে ফাল্গুন-চৈত্র এই দু’মাস হলো বসন্তকাল, আর গ্রীষ্মের দাবদাহ নিয়ে শুরু হয় ১ বৈশাখ বা নবর্বষ। এভাবে অন্যান্য জাতির কথাও বলা যেতে পারে। খিস্টবর্ষ শুরু হয় ১ জানুয়ারি, যখন উত্তর গোলার্ধের সর্বত্রই শীত মওসুম।
ইরানের দ্বাদশ মাস বাহমানের শেষ দিন এবং নববর্ষের প্রথম মাস ফারভারদিনের প্রথম দিনের মধ্যে একটি চমৎকার পার্থক্য পরিদৃষ্ট হয় প্রকৃতিতেÑ গাছ-গাছালি, লতাগুল্ম ও বন-বনানীতে। নওরোয উৎসব হলো প্রকৃতির পুনর্জন্ম উৎসব। এতে চিন্তাশীল মানুষের জন্য অফুরন্ত খোরাকও রয়েছে। ইরানের প্রসিদ্ধ কবি যাকারিয়া আখলাকী বসন্ত ঋতু থেকে শিক্ষা নেওয়ার জন্য বলেছেন :
‘(এ বসন্তে) ফুলকলি আল্লাহর রহস্যের দফতর খুলে দিয়েছে
মরুভূমি ও বনবনানী উপদেশের নতুন নতুন পত্রপল্লব উন্মুক্ত করে দিয়েছে।’
ইরানী জনগণ, বিশেষ করে কবি-সাহিত্যিকদের দৃষ্টিতে বসন্ত ঋতু হচ্ছে ন্যায়-ইনসাফ ও ভারসাম্যের মওসুম। ইরানে বসন্ত নাতিশীতোষ্ণ। শীতের প্রকোপ যেমন থাকে না, তেমনি থাকে না গ্রীষ্মের দাবদাহ। তাই এই ফারভারদিন মাসটাকে তারা দেখে অন্য দৃষ্টিকোণ থেকে।
কবি নাসের খসরু কুবাদিয়ানী বলেন :
‘হ্যাঁ, যখন দিন ও রাত একটি ভারসাম্যের ওপর দ-ায়মান হয়,
জরাজীর্ণ এ পৃথিবীর জীবনটা তখন যৌবনে পূর্ণ হয়।
দেই (ডিসেম্বর) মাসের নিষ্পেষণে নার্গিস ও ফুলকলি অন্ধ হয়ে গিয়েছিল বটে,
কিন্তু দেখ! ফারভারদিনের ইনসাফে তা দৃষ্টিমান হয়ে উঠল।’
ফেরদৌসীর ভাষায় :
‘বসন্তের মেঘমালা থেকে নেমে আসে বৃষ্টির ফোঁটা
মাটির বুক থেকে ধুয়ে ফেলে যতসব দুশ্চিন্তা
পৃথিবী পূর্ণ হয় সবুজের সমারোহে এবং পানিতে নদী
দুঃখীর জীবনে এখন থাকে না কোন উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা।
ধরাতল সজ্জিত হয় যেন এক বেহেশ্ত রূপে
ইনসাফ ও দানের মহিমায় পৃথিবী পূর্ণ হয়
আর কল্যাণ ও নিরাপত্তায়, আর
দুষ্ট ও দুরাচারের হাত হয় অবরুদ্ধ।
নওরোযের সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় দিক
ইরানীরা ‘নওরোয’-কে ‘ঈদে নওরোয’ বলে। ‘ঈদ’ মানে খুশি বা আনন্দ। মুসলিম ইরানে ইসলাম প্রবর্তিত দু’টি ঈদ উৎসব ঈদুল ফিত্র ও ঈদুল আজহা পালিত হওয়ার সাথে সাথে তাদের জাতীয় উৎসব ঈদে নওরোযও পালিত হয়ে আসছে। ইরানে ইসলামের আগমনের পর উমাইয়্যা ও আব্বাসী শাসকরা নওরোয উৎসবের প্রতি গুরুত্ব প্রদান করতেন বলে জানা যায়। বিশেষ করে প্রাচ্য অঞ্চলে শাসকরা নওরোযে প্রজাদের কাছ থেকে উপহার উপঢৌকনও গ্রহণ করতেন।
রাসূল জাফারিয়ান তাঁর ‘শিয়া সংস্কৃতিতে নওরোয’ শীর্ষক প্রবন্ধে বলেন : ‘হিজরি ষষ্ঠ শতকের প্রথমার্ধে রচিত দো’আ কবুল সংক্রান্ত ‘যাখীরাতুল আখেরা’ গ্রন্থে পারস্যবাসীর নওরোয দিবসের আমল সম্পর্কে একটি অধ্যায় রয়েছে। এর ব্যাখ্যায় মু‘আল্লা ইবনে খুনবাইস-এর হাদীসটি এভাবে উল্লিখিত হয়েছে : হযরত ইমাম (জাফর) সাদেক (আ.) বলেন : ‘নওরোযে তোমরা রোযা রাখ, গোসল কর, সবচেয়ে পরিষ্কার জামা পরিধান কর, খুশবু ব্যবহার কর; যদি পূর্বের নামায ও সুন্নাতগুলো আদায় করে থাক, তাহলে দু’টি সালামের সাথে চার রাকাত (নফল) নামায পড়…।’
এছাড়া নওরোযের সূচনাপর্বে তথা এ দিনের শুরুতে আল্লাহর দরবারে দোআ করা হয় এভাবে : ‘ইয়া মুকাল্লিবাল কুলূব ওয়াল আবসার, ইয়া মুদাব্বিরাল লাইলি ওয়া ন্নাহার, ইয়া মুহাভভিলাল হালি ওয়াল আহওয়াল, হাভভিল হালানা ইলা আহসানিল হাল।’ অর্থাৎ হে অন্তরসমূহ ও দৃষ্টিসমূহের বিবর্তনকারী! হে রাত ও দিবসের পরিচালনাকারী! হে বৎসর ও অবস্থানসমূহের পরিবর্তনকারী! আমাদের অবস্থাকে উত্তম অবস্থায় পরিবর্তন করুন।
এ থেকে নওরোযের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক তাৎপর্য উপলব্ধি করা যায়।
নওরোযে বিশেষ সাংস্কৃতিক আয়োজন
প্রাচীন ইরানের র্ফাস এলাকায় যরথুস্ত্রীরা নববর্ষের সূচনায় বিভিন্ন প্রতীকী বস্তু দ্বারা সাতটি ট্রে পূর্ণ করে আহুরমাযদা (আল্লাহ তা‘আলা) এর উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করত। এই সাতটি ট্রে ছিল সততা, ন্যায়পরায়ণতা, ঈমান, সদুপদেশ, সৎকর্ম, সৌভাগ্য এবং ক্ষমা ও অমরত্বের প্রতীক। অতীতের এসব আনুষ্ঠানিকতা বর্তমানে যে পরিবর্তিত রূপ নিয়েছে তা হচ্ছে এই যে, এ উপলক্ষে বিশেষ ধরনের দস্তরখানা বিছানো হয় এবং তার ওপর বিভিন্ন ধরনের প্রতীকী জিনিস সুন্দরভাবে সাজিয়ে রাখা হয়। এ উপকরণসমূহ হতে হবে বিভিন্ন ধরনের সাতটি উপকরণ যেগুলোর নাম ফারসি বর্ণমালার ‘সীন’ (সাত সীন) নামে বিখ্যাত। হাফ্ত সীন সাধারণত নিম্নোক্ত উপকরণগুলোর মধ্য থেকে বেছে নেওয়া হয়। যথা : সাবযেহ (সবুজাভ) : গম বা ডালের কচি চারার গুচ্ছ, যা নওরোযের অব্যবহিত পূর্বে গজিয়েছে, তা একটি ট্রে বা প্লেটের ওপর বসিয়ে হাফ্ত সীন দস্তরখানায় রাখা হয় যা নব জীবনের প্রতীক: সামানু : কচি গম, বার্লি বা অন্যান্য শস্যদানার আটা দিয়ে তৈরি বিশেষ ধরনের হালুয়া যা প্রাচুর্য ও নে’আমতের প্রতীক; সেনজাদ : এক প্রকার শুষ্ক ফল যা ভালোবাসা ও প্রেমের প্রতীক; সীর (রসুন) : সৌন্দর্য ও সুস্বাস্থ্যের প্রতীক; সোম্মাগ : মশুরের ডালের চেয়ে সামান্য বড় লাল রঙের টক ফলবিশেষ, যা উদীয়মান সূর্যের প্রতীক; সিরকা : দীর্ঘায়ু ও ধৈর্যের প্রতীক; সোমবোল : ছোট আকারের পুষ্পবৎ উদ্ভিদবিশেষ যা বসন্তের আগমনবার্তা বহন করে নিয়ে আসে; সেক্কেহ (মুদ্রা) : সম্পদ ও সমৃদ্ধির প্রতীক।
এখনও ইরানের অধিকাংশ লোকই পুরাতন বছরের বিদায় ও নতুন বছরের আগমন ক্ষণে নতুন পোশাক পরিধান করে মিষ্টিমধুর আচরণ সহকারে পবিত্র স্থানে বা পরিবারের মুরুব্বিদের সাথে কাটাতে পছন্দ করে। সে মুহূর্তে তারা কুরআন তেলাওয়াত করে ও দু’হাত তুলে মহান আল্লাহর কাছে নিজেদের ও পরিবারবর্গের জন্য সুস্থতা ও সমৃদ্ধিপূর্ণ একটি সুন্দর বছর কামনা করে। নওরোযের পছন্দনীয় অন্যান্য রীতির মধ্যে রয়েছে পরস্পরের সাথে দেখা-সাক্ষাৎ ও কুশল বিনিময়, কারও প্রতি রাগ বা ক্ষোভ থাকলে পরস্পরকে ক্ষমা করে দেওয়া এবং নববর্ষের শুভেচ্ছা জ্ঞাপন। এছাড়া এ দিনে তারা এমন সব ব্যক্তির সাথে দেখা করতে যায় যারা পুরাতন বছরে কোন প্রিয়জনকে হারিয়ে শোকে মুহ্যমান হয়ে আছে।
নওরোযের আন্তর্জাতিকতা
ইরান ছাড়াও বেশ কয়েকটি দেশে নওরোয উদ্যাপিত হয়ে থাকে। এটা স্ব স্ব জাতিগোষ্ঠীর অভিরুচি ও সাংস্কৃতিক বিনিময়ের অংশবিশেষ, তবে ভাষাও এখানে একটি বড় কারণ বটে। ১ ফারভারদিন তথা ইরানী নববর্ষের প্রথম দিন নওরোয ‘মিরাছে জাহানী’ টহরাবৎংধষ ঐবৎরঃধমব দিবস হিসাবে ২০০৯ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর ইউনিসেফ কর্তৃক অনুমোদিত হয়েছে। ইউনিসেফ কর্তৃক এ ঘোষণার বা অনুমোদনের পর ইরান সরকারের আতিথ্যে বর্তমানে আন্তর্জাতিকভাবে ‘নওরোয’ উৎসব পালিত হচ্ছে।
নওরোয ও পহেলা বৈশাখ
নওরোয ও পহেলা বৈশাখের মধ্যে অনেক ক্ষেত্রে বিশেষ সাযুজ্য রয়েছে। বেশ কাছাকাছি সময়ের ব্যবধানে ইরান ও বাংলাদেশে বসন্তকালের আগমন ঘটে থাকে। ইরানে বসন্ত শুরু হয় হিজরি শামসী সাল বা সৌরবর্ষের প্রথম মাস ফারভারদিনের প্রথম দিন (২১ মার্চ) থেকে, আর বাংলাদেশে বাংলা সনের একাদশ মাস ফাল্গুনের প্রথম দিন (১৩ ফেব্রুয়ারি) থেকে শুরু হয়। বসন্ত কাল শুরু হওয়ার পর ২৩/২৪ দিন পর্যন্ত বাংলাদেশ অন্তত কিছুদিনের জন্য হলেও একই সঙ্গে ঋতুরাজ বসন্তের স্বাদ ও গন্ধ অনুভব করে। অন্যদিকে ইরানী নববর্ষ ও বাংলা নববর্ষের মধ্যে ব্যবধান এই ২৩/২৪ দিন; ইরানে নওরোয ২১ মার্চ, আর বাংলাদেশে ১ বৈশাখ ১৪ এপ্রিল।
ষড়ঋতুর দেশ বাংলাদেশে পূর্বে কৃষিকাজ ছিল পুরোপুরি ঋতুনির্ভর। আর ফসল উৎপাদনের সাথে সরকার বা মনিবের খাজনা আদায়ের বিশেষ সম্পর্ক ছিল। তাই বাদশা আকবর খাজনা আদায়ের জন্য পরিবর্তনশীল হিজরি চান্দ্রবর্ষকে ভিত্তিবছর ধরে নতুন সৌরবর্ষপঞ্জি প্রবর্তন করেনÑ বর্তমানে যা বাংলা বর্ষপঞ্জি নামে পরিচিত এবং খাজনা আদায়ের জন্য এর অনুসরণের নির্দেশ দেন। এ বর্ষপঞ্জি কার্যকরী হয় ১৫৫৬ খ্রিস্টাব্দ অন্য মতে ১৫৫৭ খ্রিস্টাব্দ থেকে।
ইরানে ফারসি সৌরবর্ষের সাথে বিশেষত ধর্মীয় হিসাব-নিকাশে হিজরি চান্দ্র বৎসরও ব্যবহৃত হয়। অনুরূপভাবে আমাদের দেশেও বাংলা সনের সাথে সাথে ধর্মীয় কাজ-কর্ম ও হিসাব-নিকাশে হিজরি সনের ব্যবহার রয়েছে। তবে আমাদের দেশে দাফতরিক কাজে ঈসায়ী সাল ব্যবহার হলেও ইরানে তা হয় না।
নওরোযের আদলে বাংলা নববর্ষ পালনের শুরুও হয় মূলত মোগল সম্রাট আকবরের আমলে। অতীতকালে এবং ইংরেজ আমলেও এর পরে বিশেষত জমিদারি প্রথা বিলুপ্ত হওয়ার (১৯৫৬) পূর্ব পর্যন্ত বাংলার কৃষকরা চৈত্র মাসের শেষ দিন পর্যন্ত মনিবের খাজনা পরিশোধ করত এবং জমিদার ও ভূ-স্বামীদের জন্য উপহার উপঢৌকন নিয়ে যেত। ইরানেও এ ধরনের প্রথা ছিল।
অতীতে বাংলা নববর্ষের মূল উৎসব ছিল হালখাতা। অর্থাৎ মহাজনী ও ব্যবসায়িক হিসাব-নিকাশের নবায়ন যা সীমিত আকারে হলেও বর্তমানেও চালু আছে। ইরানের মতো বাংলাদেশেও পহেলা বৈশাখের অনেক আগে থেকেই ঘরবাড়ি, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, এমনকি অফিস-আদালত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নকরণ ও ধোয়ামোছার কাজ শুরু হয়ে যেত। পহেলা বৈশাখের এ অনুষ্ঠান এখনও যেমন তখনও তেমনি সর্বজনীন ছিল। মুসলিম রাজা-বাদশা কর্তৃক এর প্রবর্তন হলেও হিন্দু-মুসলিম-খ্রিস্টান-বৌদ্ধ ও উপজাতীয় জনগোষ্ঠী সকলেই একযোগে এ বাংলা নববর্ষ পালন করে এসেছে শুরু থেকেই। পহেলা বৈশাখ উদ্যাপনের সাথে ধর্মীয় অনুভূতিও কাজ করত। বিশেষ করে মুসলমানদের ঘরে ঘরে এবং দোকান-পাটে মিলাদ ও দো’আর অনুষ্ঠান হতো, মিষ্টি বিতরণ করা হতো। এখানেও ইরানের মতো নববর্ষের সূচনাতে আল্লাহর দরবারে চাওয়া-পাওয়ার বিষয়টি সমভাবে কাজ করত। ইরানের মতোই এ দিনে সামাজিকভাবে জাতিধর্ম নির্বিশেষে একে অন্যের প্রতি সম্ভাষণ জানানোর রীতি রয়েছে।
পহেলা বৈশাখ তথা নববর্ষ নিয়ে ইরানের মতোই আমাদের কবি-সাহিত্যিকরা প্রচুর লেখালেখি করেছেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৬১-১৯৪১), কাজী নজরুল ইসলাম (১৮৯৯-১৯৭৬), ফররুখ আহমদ (১৯১৮-১৯৭৪) প্রমুখের অবদান এ ব্যাপারে উজ্জ্বল হয়ে আছে।
নববর্ষ উদ্যাপন অতীতকালের তুলনায় বর্তমানে ব্যাপকতর হয়েছে। অতীতে এ উপলক্ষে মেলা বসত। বর্তমানেও বৈশাখী মেলা বসে থাকে। নববর্ষ বা পহেলা বৈশাখ উদ্যাপনে জনতার ঢল নামে। তবে পূর্বের সে শালীন পরিবেশ এখন ক্ষুণœ হয়েছে বিদেশি সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের ছোঁয়ায়।
বর্তমানে বিশেষত ইসলামী বিপ্লবোত্তর ইরানে নওরোয উদ্যাপনের কোন প্রকার প্রগলভতা নেই। নওরোয পালনে যেমন ইসলামী বিপ্লব বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি, তেমনি এর অনুষ্ঠানমালায় শালীনতা বিবর্জিত হওয়ার সুযোগ নেই। নির্দোষ এসব মানবীয় আনন্দ-উৎসব মার্জিত ও পরিশীলিত অনুষ্ঠানাদি উদ্যাপনের মাধ্যমে অনুষ্ঠিত হলেই তা হবে সমাজ ও মানবতার জন্য কল্যাণকর।
* লেখক : সাবেক সম্পাদক, নিউজলেটার, সাবেক নির্বাহী সম্পাদক, দৈনিক জনপদ এবং জাতীয় প্রেসক্লাবের স্থায়ী সদস্য।