ইতিহাসের সাক্ষী তাখতে জামশীদ
পোস্ট হয়েছে: এপ্রিল ২৩, ২০১৬

ইরানের দর্শনীয় ঐতিহাসিক স্থানগুলোর অন্যতম হলো ‘তাখতে জামশীদ’। পাশ্চাত্যে একে ‘পার্সেপোলিশ’ নামেও অভিহিত করা হয়।
‘তাখতে জামশীদ’ একটি প্রাচীন রাজপ্রাসাদ। ইরানের হাখামানশী বংশের বাদশাদের এই নগরী প্রাচ্য সভ্যতার এক উজ্জ্বল নিদর্শন হিসাবে আজো টিকে রয়েছে। কালের বিবর্তনে এই নগরীর জৌলুশ আর নেই। তবে এর অবশিষ্ট ধ্বংসাবশেষ আজো বিশ্ববাসীকে প্রাচীন পারস্য সভ্যতার শৌর্যের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। প্রতি বছর বিশ্বের বিভিন্ন দেশের হাজার হাজার পর্যটক এই তাখতে জামশীদের ধ্বংসাবশেষ দেখার জন্য ইরানে এসে ভীড় করে থাকেন।
ইরানের শিরাজ নগরীর উত্তর-পূর্বে ৭৫ কিলোমিটার দূরে বিশাল এক সমভূমির মাঝে প্রায় আড়াই হাজার বছরের প্রাচীন ইতিহাসের সাক্ষ্য হয়ে দাঁড়িয়ে আছে তাখতে জামশীদের স্তম্ভশ্রেণি। ইসফাহান সড়কের পাশেই এটি অবস্থিত।
প্রাচীন ইরানের হাখামানশী রাজবংশ ছিল খুবই বিখ্যাত। এই বংশের বিখ্যাত রাজা ছিলেন প্রথম দারিয়ুস। রাজা প্রথম দারিয়ুসের আমলে হাখামানশী সাম্রাজ্য সমৃদ্ধির সর্বোচ্চ শিখরে আরোহণ করে। তিনি ৫২২ খ্রিস্টপূর্বাব্দ থেকে ৪৮৬ খ্রিস্টপূর্বাব্দ পর্যন্ত শাসন করেন। দারিয়ুসই প্রথম তাখতে জামশীদ নির্মাণ শুরু করেন।
রাজা দারিয়ুস তাঁর প্রাসাদের জন্য প্রথমে একটি বিশাল সোপান শ্রেণি তৈরি করেন। তাঁর রাজধানীর পূর্বাঞ্চলের বিভিন্ন পাহাড় কেটে এনে এটি তৈরি করা হয়। তাঁর প্রাসাদের চারপাশে পাথরের উঁচু প্রাচীরও গড়ে তোলা হয়। ৫০ ফুট উঁচু এই প্রাচীর এত বেশি মজবুত ছিল যে, তাখতে জামশীদ একটি দুর্ভেদ্য দুর্গে পরিণত হয়। প্রাসাদের সিঁড়ির পশ্চিম পাশে দারিয়ুস তাঁর রাজধানী শহর গড়ে তোলেন।
তাখতে জামশীদের নির্মাণ কাজ সম্রাট দারিয়ুসের দ্বারা শুরু হলেও তাঁর আমলে এর কাজ শেষ হয়নি। পরবর্তী সম্রাটদের আমলেও এর নির্মাণ কাজ অব্যাহত থাকে। দারিয়ুস এই নগরীর নির্মাণ কাজ শুরু করলেও এর নাম হয়েছে ‘তাখতে জামশীদ’ বা ‘জামশীদের তাখত’। জামশীদ ছিলেন পৌরাণিক কাহিনীর কল্পনায়ক। বিভিন্ন রাজার আমলে নির্মিত হওয়ায় হয়তো এ নগরী তাখতে জামশীদ হিসাবে পরিচিতি পেয়েছে। গ্রীকরা এ নগরীর নাম দিয়েছিল পার্সেপোলিশ। আধুনিক ইংরেজি ভাষাতেও এ নামটিই রয়ে গেছে।
৫১৭ খ্রিস্টপূর্বাব্দে দারিয়ুস তাখতে জামশীদ নির্মাণ শুরু করেন। তাঁর পরে তাঁর পুত্র প্রথম খোশিয়ার শাহ (৪৮৬-৪৬৫ খ্রিস্টপূর্বাব্দ) সিংহাসনে আরোহণ করেন। তিনি পাশ্চাত্যে জেরেক্সস নামে পরিচিত। খোশিয়ার শাহ এর আমলে এই রাজধানীর নির্মাণ কাজ চলে এবং তাঁর পরে তাঁর পুত্র প্রথম আরদেশির (৪৬৬-৪২৪ খ্রিস্টপূর্বাব্দ) এর আমলে নির্মাণ কাজ অব্যাহত থাকে। আরদেশির পাশ্চাত্যে আরটাজেরেক্স নামে পরিচিত। এসব আসলে গ্রীকদের দেয়া নাম। প্রাচীন পারস্য সভ্যতার সাথে গ্রীক সভ্যতার ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ছিল।
প্রথম আরদেশিরের আমলে তাখতে জামশীদের নির্মাণ কাজ সম্পূর্ণ হয়। এই শহর ছিল প্রাচীনকালের বিখ্যাত রাজধানী শহরগুলোর অন্যতম। বিভিন্ন সম্রাটের রাজত্বকালে দীর্ঘ প্রায় ১০০ বছর ধরে এ নগরীর নির্মাণ কাজ চলে। হাখামানশী সম্রাটরা নিজেদের সাম্রাজ্যের কেন্দ্রবিন্দু এবং নিজেদের রাজকীয় বাসস্থান হিসাবে তাখতে জামশীদকে মনের মতো করে গড়ে তোলেন।
তাখতে জামশীদের গোটা আঙ্গিনার মোট দৈর্ঘ্য ৪৫০ মিটার, প্রস্থ ৩০০ মিটার এবং উচ্চতা ১৮ মিটার। এর চারপাশ দুর্ভেদ্য প্রাচীর দিয়ে ঘেরা।
তাখতে জামশীদের উত্তর-পশ্চিম কোনে দাঁড়ালে চোখে পড়বে সুবিশাল সোপান শ্রেণি। ১১০টি ধাপ রয়েছে এতে। জেরেক্সেস (খোশিয়ার শাহ) তোরণ দিয়ে এই সোপানে আরোহণ করতে হয়। এই তোরণে তিনটি প্রবেশদ্বার। প্রতিটি ১১ মিটার উঁচু। এই তিনটি প্রবেশদ্বার যথাক্রমে পূর্ব, পশ্চিম এবং দক্ষিণমুখী। দক্ষিণদ্বার দিয়ে গেলে আপনি আপাদানা হল ঘরে পৌঁছবেন। এটি একটি বিশাল হল ঘর। আয়তাকার এই হল ঘরকে সিংহাসন মহলও বলা হতো। এখানে সিংহাসনে বসে রাজার প্রজাদের সাক্ষাৎ দান করতেন। এ ঘরের ছাদ ছিল অনেক উঁচু। প্রায় ৬০ ফুট উঁচু স্তম্ভ শ্রেণি হলঘরের গৌরব ও মহিমা প্রকাশ করত। মোট ৩৬টি স্তম্ভ সুদৃশ্য কারুকাজে শোভিত বিশাল ছাদকে ধরে রাখত। এই হলঘরের ধ্বংসাবশেষের ওপর দাঁড়িয়ে চারিদিকে চোখ বুলালেই কল্পনায় ভেসে উঠে প্রাচীন ইরানী সভ্যতার গৌরব ও মর্যাদা। এই প্রাসাদ এক সময় আলোকোজ্জ্বল ও কোলাহলমুখর ছিল। বাদশাহি জাঁকজমক এর শোভা বর্ধন করত। হাখামানশী সাম্রাজ্যের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে প্রজারা দলে দলে এসে এখানে ভীড় করত। বাদশাকে সম্মান জানাতে, উপহার দিতে এবং খাজনা পরিশোধ করতে ওরা আসত। সুউচ্চ আসনে বসে বাদশা প্রজাদের দর্শন দিতেন।
আপাদানা প্রাসাদের দক্ষিণ-পূর্ব পাশে রয়েছে আরেকটি হলঘর। এর নাম ‘তালারে শোরা’। এর সোপান শ্রেণি সুন্দর সুন্দর নকশা ও কারুকাজ শোভিত।
তাখতে জামশীদের আরেকটি আকর্ষণীয় অংশ হলো বাদশাহ দারিয়ুসের প্রাসাদ। এর নাম তাসার। এই প্রাসাদে অপরূপ কারুকাজমণ্ডিত সুদৃশ্য প্রবেশদ্বার সম্বলিত অনেকগুলো কামরা রয়েছে। এগুলোর মধ্যে ‘আয়না ঘর’ অন্যতম।
শাহ আরদেশিরের প্রাসাদ তাখতে জামশীদের দক্ষিণ পাশে। এটি দেখতে তাসার প্রাসাদের অনুরূপ। এই প্রাসাদে ছিল সুদৃশ্য ব্যালকনি, যেখান থেকে দূরে সমভূমির দৃশ্য অবলোকন করা যেত। তাছাড়া একটি বৃহৎ জেনানা মহলও (হারাম) এর শোভা বর্ধন করত।
তাখতে জামশীদের উত্তর-পূর্ব পাশে অবস্থিত খোশিয়ার শাহ এর ‘সাদ সতুন’ (১০০ স্তম্ভ) প্রাসাদ। ১০০টি সুদৃশ্য স্তম্ভ দ্বারা নির্মিত হয়েছিল এই প্রাসাদ। এখানেও ছিল অনেক কারুকাজ ও নকশা। কিন্তু কালের করালগ্রাসে সেই জৌলুশ লোপ পেয়েছে। এখন কিছু স্তম্ভসহ সেই প্রাসাদের ধ্বংসাবশেষ অবশিষ্ট আছে। তাখতে জামশীদের দক্ষিণ পাশেই রয়েছে সম্রাট তৃতীয় দারিয়ুসের সমাধি।
৩৩০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে গ্রীক সম্রাট আলেকজান্ডার পারস্যে এক অভিযান চালাবার সময় তাখতে জামশীদ ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়। কথিত আছে, তাঁর রাণী থায়িস এর প্ররোচনায় আলেকজান্ডার তাখতে জামশীদে অগ্নিসংযোগ করেন।
তারপরেও তাখতে জামশীদ কালের সাক্ষী হয়ে আজো দাঁড়িয়ে আছে। তাখতে জামশীদের প্রতিটি কোনায় কোনায় দৃষ্টি বুলালে আপনি দেখতে পাবেন বিভিন্ন প্রকার উৎকীর্ণ শিলালিপি। প্রাচীন পারসিক, ব্যাবিলনীয় এবং ইসলামী ভাষায় এসব শিলালিপি উৎকীর্ণ করা হয়েছে।
এসব লেখায় যরথুস্ত্র ধর্মের আহুর মাজদার প্রতি প্রশংসা, সৃষ্টিতত্ত্ব, পৃথিবী, স্বর্গ, নরক, মানুষ, যশঃ, খ্যাতি, হাখামানশী রাজা-বাদশাদের গৌরবগাথা প্রভৃতির বর্ণনা আছে। বিভিন্ন ভাষার ব্যবহার দেখে মনে হয় তখন ইরানের সাথে আন্তর্জাতিক সভ্যতাসমূহের যোগাযোগ ছিল।