বৃহস্পতিবার, ৩রা এপ্রিল, ২০২৫ খ্রিস্টাব্দ, ২০শে চৈত্র, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

English

হযরত মুহাম্মাদ (সা.)-এর উত্তম শিক্ষামালা হতে

পোস্ট হয়েছে: মার্চ ৩১, ২০১৮ 

 

(পূর্ব প্রকাশিতের পর)
তিন বন্ধু :
একদিন রাসূলুল্লাহ হযরত মুহাম্মাদ (সা.) তাঁর সাহাবিদের সাথে মসজিদে বসে কথা বলছিলেন। এক পর্যায়ে মহানবী (সা.) বললেন যে, তিনি সাহাবিদের সামনে একটি গল্প বলবেন, যেটি থেকে তিনটি প্রশ্ন বের হবে আর সাহাবিদেরকে সেই তিনটি প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে। এই কথাটি সাহাবিদের দৃষ্টি আকর্ষণ করল এবং তাঁরা সকলেই মহানবীর কথা মনোযোগের সাথে শুনতে থাকলেন। মহানবী (সা.) বললেন : “একদা এক ব্যক্তি জানতে পারল যে, তার মৃত্যুক্ষণ ঘনিয়ে এসেছে এবং খুব শীঘ্রই সে মারা যাবে। এটি জানার পর সে কবরে তার একাকীত্ব নিয়ে ভয় পেল এবং সত্যিকারের বন্ধুর সন্ধানে বের হলো- যে বন্ধু তাকে সাহায্য করবে এবং কবরে তার সাথি হবে। সে তার প্রথম বন্ধুর বাড়িতে গিয়ে তার দরজায় টোকা দিল এবং জিজ্ঞেস করল যে, সে তাকে (একটি বিষয়ে) সাহায্য করবে কিনা। জবাবে বন্ধুটি বলল : ‘অবশ্যই, তা না হলে আমরা কিসের জন্য রয়েছি?’ কিন্তু যখন লোকটি বলতে থাকল যে, তার জীবনের অল্প কয়েকটি দিনই কেবল বাকি আছে আর এরপরেই তার সাহায্যের প্রয়োজন, তখন তার প্রথম বন্ধু বলল : ‘আমি দুঃখিত; যখন মৃত্যু আমাদেরকে পৃথক করে দেবে, তখন তোমাকে কবর দেয়ার জন্য জায়গা এবং কিছু কাপড় যা দ্বারা তোমার শরীরকে ঢাকা যাবে তা কিনে দেয়া ছাড়া আমাদের আর কিছুই করার নেই।’ মনঃক্ষুণœ অবস্থায়, কিন্তু আশা নিয়ে লোকটি তার পরবর্তী বন্ধুর নিকট গেল।
দ্বিতীয় দরজায় যখন সে তার দ্বিতীয় বন্ধুর মুখোমুখি হলো এবং তার আসন্ন মৃত্যু ও মৃত্যুর পর সাহায্য চাওয়ার ব্যাপারটি বলল তখন সে একই জবাব পেল। দ্বিতীয় বন্ধুটি বলল : ‘আমি তোমার জীবনে সবসময়ই তোমার সাথে ছিলাম এবং এখানে তোমাকে সাহায্য করতে পারব। কিন্তু তোমার মৃত্যুর পর তোমার মরদেহ কবরস্থানে নিয়ে যাওয়া ও দাফন করা ছাড়া আমি তোমার জন্য কিছুই করতে পারব না।’
হতাশা এবং মনে কষ্ট নিয়ে সে তার তৃতীয় বন্ধুর নিকট গেল। সে খুবই নিশ্চিত ছিল যে, একই রকম জবাব পাবে, কিন্তু সেখানেও কিঞ্চিত পরিমাণ আশা ছিল। সে যখন তার তৃতীয় বন্ধুর মুখোমুখি হলো এবং বলল যে, তার সাহায্যের প্রয়োজন তখন সেই বন্ধু নিজ আগ্রহে তাকে সাহায্যের জন্য এগিয়ে এল। কিন্তু লোকটি বলতে লাগল : ‘আমার মৃত্যুর পর সাহায্যের প্রয়োজন।’ তৃতীয় বন্ধু জবাব দিল : ‘তুমি চিন্তা করো না, আমার প্রিয় বন্ধু! আমি তোমার সাথে কবরে যাব এবং যখন ফেরেশতারা (মুনকার এবং নাকির) তোমাকে প্রশ্ন করার জন্য উপস্থিত হবেন তখন তোমার সাথে থাকব। এরপর তোমাকে পুলসিরাত (সেতু) পার হতে সাহায্য করব এবং তোমাকে জান্নাতের দিকে নিয়ে যাব।’ এই জবাবে সেই ব্যক্তি স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল এবং শান্তিতে মৃত্যুবরণ করল।
এরপর মহানবী হযরত মুহাম্মাদ (সা.) তাঁর সাহাবিদের দিকে ফিরলেন এবং জিজ্ঞেস করলেন : ‘কেউ কি এই তিন বন্ধুকে এবং এই লোকটিকে চিনতে পারছ?’ সকলেই নিশ্চুপ থাকলে মহানবী (সা.) বলতে শুরু করলেন : ‘এই গল্পের ব্যক্তিটি হচ্ছে মানুষ। প্রথম বন্ধুটি হচ্ছে অর্থ বা সম্পদ- যেসব জিনিস শুধু আমাদেরকে ইহজীবনেই সাহায্য করে, কিন্তু মৃত্যুর পর নয়। দ্বিতীয় বন্ধুটি হচ্ছে আমাদের পরিবার, সন্তান-সন্ততি- ছেলে ও মেয়েরা; আমরা তাদের জন্য সারা জীবন কষ্ট করি এবং তারা শুধু আমাদেরকে কবর পর্যন্ত নিয়ে যায়। আর তৃতীয় ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বন্ধুটি হলো ‘আমল’ (কর্ম)- যে আমাদেরকে সমস্ত পথে সঙ্গ দিয়ে থাকে।’
গল্পের শিক্ষণীয় বিষয় : জড়বাদী বস্তুর জন্য সংগ্রাম করো না যা তোমাকে কিছুই দেবে না এবং কোনোভাবেই তোমার অনন্তকালীন জীবনে সাহায্য করবে না। কিন্তু কঠোর পরিশ্রম কর, নামায পড় এবং আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা কর। সৎকর্ম মানুষকে সাহায্য করে যেখানে অন্য সকল কিছু এ জগতের পর মূল্য হারিয়ে ফেলে।
অনুবাদ : সরকার ওয়াসি আহম্মেদ