বৃহস্পতিবার, ৩রা এপ্রিল, ২০২৫ খ্রিস্টাব্দ, ২০শে চৈত্র, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

English

হযরত ফাতেমা (সা.আ.) ইতিহাসে নারীকুলের জন্য সর্বোত্তম অনুসরণীয় আদর্শ

পোস্ট হয়েছে: মে ৯, ২০১৭ 

news-image

ইমাম খোমেইনী (রহ্.) ও আয়াতুল্লাহ্ খামেনেয়ীর মূল্যায়ন

ইরানের ইসলামি বিপ্লবের মহান নেতা হযরত ইমাম খোমেইনী (রহ্.) ও তাঁর উত্তরসূরি ইসলামি বিপ্লবের বর্তমান নেতা হযরত আয়াতুল্লাহ্ উযমা খামেনেয়ীর দৃষ্টিতে রাসূলে আকরাম হযরত মুহাম্মাদ (সা.)-এর কন্যা খাতুনে জান্নাত হযরত ফাতেমা যাহরা (সালামুল্লাহি ‘আলাইহা) মানবজাতির ইতিহাসে সমগ্র নারীকুলের জন্য সর্বোত্তম অনুসরণীয় আদর্শ।
হযরত ইমাম খোমেইনী (রহ্.) ও হযরত আয়াতুল্লাহ্ খামেনেয়ী বিভিন্ন সময় তাঁদের ভাষণ ও বাণীতে হযরত ফাতেমা যাহরা সম্পর্কে মূল্যায়ন করেছেন। এ মূল্যায়নে তাঁরা বলেন যে, মানবজাতির ইতিহাসে যে কোনো জনগোষ্ঠী ও যে কোনো সমাজেই বিভিন্ন পরিস্থিতিতে কোনো না কোনো ব্যক্তিত্বকে অনুসরণীয় আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করতে দেখা যায়- যিনি তাদেরকে মুক্তির আলো প্রদর্শন করেন ও পূর্ণতার দিকে পরিচালিত করে থাকেন। আর মহান আল্লাহ্ তাঁর রাসূলের (সা.) মাধ্যমে যাঁকে বিশ্বের সমগ্র নারীকুলের জন্য আদর্শ হিসেবে পেশ করেছেন তিনি হলেন হযরত ফাতেমা যাহরা (সা.আ.)।
হযরত ইমাম খোমেইনী (রহ্.) ও হযরত আয়াতুল্লাহ্ খামেনেয়ী বিভিন্ন সময় তাঁদের ভাষণ ও বাণীতে হযরত ফাতেমা যাহরা সম্পর্কে যেসব মূল্যায়ন করেছেন আমরা আমাদের এ নিবন্ধে তা থেকে কতক নির্বাচিত অংশ তুলে ধরে তার আলোকে হযরত ফাতেমা যাহরা পূতপবিত্র জীবনের শিক্ষণীয় দিক সমূহ সম্পর্কে অত্যন্ত সংক্ষেপে একটি পূর্ণাঙ্গ ধারণা প্রদানের চেষ্টা করব।
হযরত রাসূলে আকরাম (সা.) এরশাদ করেন : ‘ফাতেমা হচ্ছে বিশ্বের সমগ্র নারীকুলের নেত্রী (সাইয়্যেদাতু নিসায়ীল্ ‘আলামীন) এবং মুসলিম নারীদের জন্য অনুসরণীয় আদর্শ।’
হযরত ইমাম খোমেইনী (রহ্.) রাসূলুল্লাহ্ (সা.)-এর উক্ত হাদিসের উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন : ‘ইসলামের ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যে, হযরত রাসূলে আকরাম (সা.) হযরত যাহরা’ (সালামুল্লাহি ‘আলাইহা)-এর প্রতি খুবই সম্মান প্রদর্শন করতেন- যাতে সমাজে নারীর গুরুত্বও অত্যন্ত শক্তিশালীভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। এ থেকে বুঝা যায় যে, নারীদের মর্যাদা যদি পুরুষদের তুলনায় বেশি না-ও হয়, তো কম নয়।’
লোকেরা যখন তাদের কন্যা সন্তানকে জন্মের পর পরই জীবন্ত কবর দিত ঠিক এমনি এক সময় হযরত ফাতেমা যাহরা(সা.‘আ.)-র জন্ম হয় এবং তাঁর বরকতময় জন্ম উপলক্ষে সূরা আল্-কাওছার নাযিল হয়। এছাড়া হযরত রাসূলে আকরাম (সা.) হযরত ফাতেমার হস্ত চুম্বন করতেন এবং তাঁর ফযীলত বর্ণনা করতেন ও তাঁর প্রশংসা করতেন।
হযরত রাসূলে আকরাম (সা.) এভাবে ইসলামি সমাজে নারীর অবস্থান ও মর্যাদাকে দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠা করেন।
বস্তুত হযরত ফাতেমা যাহরা’ (সা.‘আ.) যে নারীকুলের জন্য অনুসরণীয় আদর্শ এটি কোনো স্থান বা কালবিশেষের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। হযরত রাসূলে আকরাম (সা.)-এর উক্তি থেকে প্রমাণিত হয় যে, হযরত ফাতেমা যাহরা (সা.‘আ.) হচ্ছেন মানব প্রজাতির সূচনাকাল থেকে শুরু করে অনাগত ভবিষ্যতে তার সমাপ্তি পর্যন্ত শ্রেষ্ঠতম নারী। এ বিষয়টির ওপর গুরুত্ব আরোপ করে হযরত আয়াতুল্লাহ্ খামেনেয়ী বলেন : ‘হযরত ফাতেমা (সা.‘আ.) হচ্ছেন গোটা ইতিহাসে এবং অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ কাল নির্বিশেষে সব সময়ের জন্য নারীকুলের অনুসরণীয় আদর্শ। বস্তুত মানুষের ঐশী ও পবিত্র দিকটি তাঁর মধ্যে পরিপূর্ণরূপে প্রকাশিত হয়েছে।’
আমরা যদি মানব প্রজাতির ইতিহাস পর্যালোচনা করি তাহলে দেখতে পাই যে, কতক লোককে কতোগুলো বিশেষ বিশেষ গুণের জন্য দৃষ্টান্ত হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছে- যেসব গুণ-বৈশিষ্ট্যের দিক থেকে তাঁরা পূর্ণতার অধিকারী ছিলেন। কিন্তু হযরত ফাতেমা যাহরা (সা.‘আ.) হচ্ছেন পূতপবিত্রতা, নৈতিকতা ও আধ্যাত্মিকতাসহ নির্বিশেষে মানব জীবনের যে কোনো সমুন্নত দিক থেকেই সকলের জন্যই অনুসরণীয় আদর্শ। তাঁর ‘ইল্মী ও নৈতিক-আধ্যাত্মিক স্তর ছিল খুবই উঁচু এবং তাঁর নিকট ফেরেশতা নাযিল হতেন। তাঁর উন্নত আত্মিক অবস্থা সম্পর্কে বলতে হয় যে, তা এতই সমুন্নত যে, তিনি ছিলেন যে কোনো ধরনের পার্থিব মোহ থেকে মুক্ত- যে কারণে স্বয়ং আল্লাহ্ তা‘আলা ও হযরত রাসূলে আকরাম (সা.) তাঁর প্রশংসা করেছেন। তিনি অনেক বেশি নামায আদায় করতেন এবং নামায আদায়কালে কম্পিত হতেন ও অশ্রুপাত করতেন।
হযরত ফাতেমা যাহরা’ (সা.‘আ.)-এর গুণাবলির কথা উল্লেখ করে হযরত আয়াতুল্লাহ্ খামেনেয়ী বলেন : ‘তিনি ছিলেন বহুমাত্রিক ব্যক্তিত্বের অধিকারী একজন মানুষ, ইসলামের পথে একজন সাহসী সংগ্রামী, একজন জ্ঞানী মহিলা- যিনি একই সময় একদিকে যেমন একজন গৃহিণীর ভূমিকা পালন করেন অন্যদিকে ছিলেন একজন মমতাময়ী স্ত্রী ও মাতা এবং পূর্ণতার অধিকারিণী; এমনটিই ছিলেন হযরত ফাতেমা যাহ্রা। তাঁর জীবন ছিল খুবই সাদাসিধা এবং তাঁর প্রয়োজন বা প্রত্যাশা ছিল খুবই নগণ্য।’
হযরত আয়াতুল্লাহ্ খামেনেয়ী বিশ্বের নারীকুলের উদ্দেশে বলেন : ‘হযরত ফাতেমা যাহরা (সা.আ.) ছিলেন সমস্ত নারীর জন্য সর্বোত্তম দৃষ্টান্ত এবং মুসলমানদের জন্য তাঁর কাছ থেকে শিক্ষণীয় রয়েছে। হযরত যাহরা (সা.আ.) প্রমাণ করে দিয়েছেন যে, পুরুষদের মতো একজন নারীও নৈতিকতার সমুন্নত পর্যায়ে উপনীত হতে এবং পরিপূর্ণ মনঃসংযোগ সহকারে ইবাদত করতে সক্ষম।’
হযরত আয়াতুল্লাহ্ খামেনেয়ী বলেন : ‘হযরত যাহরা (সা.আ.)-এর অস্তিত্ব এবং তাঁর বাগ্মিতা, তাঁর রাজনৈতিক ও সামাজিক দক্ষতা ও তাঁর অত্যন্ত শক্তিশালী দূরদৃষ্টি- এ সবকিছুই এটাই তুলে ধরে যে, কীভাবে একজন মুসলিম নারী তাঁর যৌবনকালেই সমুন্নত আত্মিক ও আধ্যাত্মিক অবস্থানে উন্নীত হতে পারেন।’
বস্তুত এ ধরনের একজন বিরাট ব্যক্তিত্ব অনুসরণীয় আদর্শ থাকা অবস্থায় মুসলিম নারীদের কখনোই নিজেদেরকে দুর্বল বা অসহায় বলে অনুভব করা উচিত নয়; বরং তাঁদের উচিত ইসলাম নারীদেরকে যে উচ্চ মর্যাদা দিয়েছে সে সম্বন্ধে আরো বেশি সচেতনতার অধিকারী হওয়া। এ মহীয়ষী মহিলার জীবন চরিত অধ্যয়ন ও পর্যালোচনা করলে তা আমাদের কাছে এটাই তুলে ধরবে যে, প্রতিটি নারীর জন্যই সমুন্নতির পথ পুরোপুরি উন্মুক্ত রয়েছে।
হযরত ফাতেমা যাহরা এ পথে চলে সমুন্নতির চরম শিখরে আরোহণ করেছেন এবং এ ক্ষেত্রে তিনি স্বয়ং পথনির্দেশ স্বরূপ- যে পথনির্দেশ অনুসরণ করে যে কোনো নারীর পক্ষেই সমুন্নতির সোপানে অনেক ঊর্ধ্বে আরোহণ করা সম্ভব।
এ বিষয়টি বিস্তারিতভাবে ব্যাখ্যা করে হযরত আয়াতুল্লাহ্ খামেনেয়ী বলেন : ‘হযরত রাসূলে আকরাম (সা.) ও হযরত ইমাম আলী (আ.)-এর জীবনেতিহাসে হযরত ফাতেমা (সা.আ.) ছিলেন একটি সমুজ্জ্বল আলোক বর্তিকাস্বরূপ। সুতরাং এটাই স্বাভাবিক যে, এ মহান অনুসরণীয় আদর্শের অনুসরণ করে মুসলিম নারীরা উপকৃত হতে পারবেন।’
আর হযরত ফাতেমা যাহরা (সা.আ.)-এর জন্মদিবস ২০শে জমাদিউস সানীকে ‘নারী দিবস’ হিসেবে ঘোষণা করে হযরত ইমাম খোমেইনী (রহ্.) বলেন : ‘এ দিনটি হচ্ছে প্রকৃত নারীত্বের পুনরুজ্জীবনস্বরূপ এবং নারীরা সমাজে যে গুরুত্বপূর্ণ ও সম্মানজনক ভূমিকা পালন করে থাকে তার ভিত্তি প্রতিষ্ঠার দিন।’
হযরত ইমাম খোমেইনী (রহ্.) একদল নারীর উদ্দেশে প্রদত্ত তাঁর ভাষণে অন্যত্র বলেন : ‘আপনারা যদি আত্মিক-আধ্যাত্মিক উন্নতি, নেক আমল, পূত চরিত্র ও অন্যান্য মূল্যবোধ সম্বন্ধে অধ্যয়ন না করে থাকেন তাহলে আপনারা এমনকি নারীত্বের প্রকৃত তাৎপর্যই অনুধাবন করতে পারেন নি।’
এ প্রসঙ্গে হযরত ফাতেমা যাহরা ‘ইল্মী ব্যক্তিত্বের কথা উল্লেখ করা যেতে পারে। তাঁর ‘ইল্মী ব্যক্তিত্ব ছিল অত্যন্ত উঁচু স্তরের- যা বন্ধু ও দুশমন নির্বিশেষে সকলেই স্বীকার করে থাকেন। বস্তুত লোকেরা বিভিন্ন কঠিন ও জটিল বিষয়ের ব্যাখ্যা বা এতদসংক্রান্ত প্রশ্নের উত্তর জানার জন্য যখন তাঁর কাছে যেত তখন তিনি তাদের সেসব বিষয়ের ব্যাখ্যা ও প্রশ্নের জবাব দিতেন। তাঁর ভাষণ, কবিতা সমূহ ও বাণী সমূহ বুদ্ধিবৃত্তিক যোগ্যতা, চরিত্রের দৃঢ়তা ও মনের উদারতার সাক্ষ্য বহন করে। তিনি ছিলেন একজন নারীর পক্ষে অর্জনীয় সমস্ত উত্তম গুণ-বৈশিষ্ট্যের মূর্ত প্রতীক। তিনি ছিলেন একজন আদর্শ কন্যা, প্রেমময়ী ও সহায়ক স্ত্রী, একজন স্নেহশীলা মাতা এবং সমাজের একজন শক্তিশালিনী ও সচেতন সদস্যা।
এসব নারীসুলভ গুণ-বৈশিষ্ট্যের মূর্ত প্রতীক হওয়া সত্ত্বেও হযরত ফাতেমা যাহরা (সা.আ.) একজন সাহসী নারীও ছিলেন যিনি তিরিশটি যুদ্ধে হযরত রাসূলে আকরাম (সা.)-এর সাথে ছিলেন। তেমনি তিনি তাঁর নিজের অধিকারর সমূহ সম্বন্ধেও সচেতন ছিলেন এবং যখনি প্রয়োজন হয়েছে তিনি যুলুম ও বঞ্চনার অসহায় শিকারের মতো অন্যায়কে সয়ে নেয়ার পরিবর্তে স্বীয় অধিকারের সপক্ষে রুখে দাঁড়িয়েছেন। আর তাঁর এ গুণাবলি তাঁর মহান সন্তান হযরত ইমাম হাসান (আ.), হযরত ইমাম হুসাইন (আ.), হযরত যায়নাব (সা.আ.) ও হযরত উম্মে কুলসুম (সা.আ.)-এর জীবনে প্রতিফলিত হয়েছে- যাঁরা তাঁদের পবিত্রতা, নেক আমল, সাহস ও বদান্যতার জন্য সুপরিচিত ছিলেন।
হযরত ফাতেমা যাহরা (সা.আ.) তাঁর মেধা-প্রতিভা, প্রজ্ঞা, চারিত্রিক দৃঢ়তা, অদম্য ইচ্ছাশক্তি, পবিত্রতা, ধৈর্য, জ্ঞান ও উদারতা-কথায় ও কাজে উভয় ক্ষেত্রেই- স্বীয় মহান পিতা হযরত রাসূলে আকরাম (সা.)-এর কাছ থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছিলেন। তাঁর বদান্যতা, মহানুভবতা ও দরিদ্রদের জন্য তাঁর মমতা এতই বেশি ছিল যে, কোনো অসহায় বা ভিক্ষুক কখনোই কিছু না পেয়ে তাঁর গৃহদ্বার থেকে খালি হাতে ফিরে যায় নি।
এতে আমরা দেখতে পাই যে, এ মহীয়ষী মহিলা তাঁর স্বল্পকালীন জীবনে এ বিষয়টি তুলে ধরেছেন যে, কীভাবে একজন নারী অত্যন্ত শক্তিশালীভাবে সমাজ জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে ভূমিকা পালন করতে পারেন এবং স্বীয় সামাজিক অবদানের সাহায্যে ইতিহাসের গতিধারায় ইতিবাচক প্রভাব বিস্তার করতে পারেন।
আমরা হযরত ইমাম খোমেইনী (রহ্.)-এর উক্তি উদ্ধৃত করে এই নিবন্ধের উপসংহার টানতে চাই। তিনি বলেন : ‘আমাদের সকলের জন্যই হযরত ফাতেমা যাহরা (সা.আ.)-এর পদাঙ্ক অনুসরণ করা এবং তাঁর নেক আমল, পূত চরিত্র ও জ্ঞান থেকে শিক্ষা গ্রহণের জন্য চেষ্টা করা অপরিহার্য, বিশেষ করে এ কারণে যে, আল্লাহ্ তা‘আলা জ্ঞানকে কেবল স্বল্পসংখ্যক ব্যক্তির জন্য অর্জনীয় হিসেবে সীমাবদ্ধ করে দেন নি; বরং সকল জ্ঞান সন্ধানীর জন্য উন্মুক্ত করে দিয়েছেন। তেমনি এ কারণেও যে, যে কোনো ব্যক্তির পক্ষেই নেক আমল ও পূতপবিত্রতার সুউচ্চ স্তর সমূহ অর্জন করা সম্ভব- যা হচ্ছে এমন গুণ-বৈশিষ্ট্য যা কেবল অভিজাত গোষ্ঠীর জন্য সীমাবদ্ধ নয়।’

সূত্র : ইন্টারনেট
ইংরেজি থেকে অনুবাদ ও সম্পাদনা : নূর হোসেন মজিদী