শনিবার, ৫ই এপ্রিল, ২০২৫ খ্রিস্টাব্দ, ২২শে চৈত্র, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

English

হযরত ইমাম খোমেইনী (রহ.)-এর সংক্ষিপ্ত জীবনালেখ্য

পোস্ট হয়েছে: জানুয়ারি ২৮, ২০১৪ 

news-image

ইসলামী বিপ্লবের পথিকৃত ও ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের প্রতিষ্ঠাতা ইমামে উম্মত আয়াতুল্লাহ আল-উজমা খোমেইনী (রহ.) ১৯০০ খ্রিস্টাব্দে ইরানের খোমেইন শহরে এক প্রসিদ্ধ ধর্মীয় পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা আয়াতুল্লাহ সাইয়্যেদ মোস্তফা মুসাভী একজন ধর্মীয় নেতা ছিলেন। তাঁর মাতাও ছিলেন একজন ধর্মীয় নেতার সন্তান। মহান ইমামের পূর্ব পুরুষগণ কাশ্মীরের অধিবাসী ছিলেন।

হযরত ইমাম (রহ.)-এর আসল নাম রুহুল্লাহ এবং পারিবারিক উপাধি মোস্তফাভী। কিন্তু ধর্মীয় নেতা হিসাবে খ্যাতিলাভের সাথে সাথে তৎকালীন প্রথা অনুযায়ী খোমেইন শহরের অধিবাসী হিসাবে তিনি খোমেইনী হিসাবে সমধিক পরিচিত লাভ করেন। এছাড়া তাঁর নামের দ্বিতীয় অংশ মুসাভীএকথাই নির্দেশ করে যে, তিনি আহলে বাইতের সপ্তম ইমাম হযরত মূসা ইবনে জাফর (আ.)-এর বংশধর। উক্ত ইমামের ডাক নাম ছিল হযরত ইমাম মূসা কাজিম (আ.)। মহান ইমামের পিতামাতা তিন ছেলে এবং তিন মেয়ের অধিকারী ছিলেন। ইমামের বড় ভাইয়ের নাম আয়াতুল্লাহ পাছান্দিদেহ। তিনি একজন মুজতাহিদ ফকীহ। তিনি এখনো জীবিত আছেন। তাঁর ছোট ভাই আয়াতুল্লাহ হিন্দিও একজন মুজতাহিদ ফকীহ।

প্রাথমিক জীবন

শৈশবকালেই ইমামের পিতা দুষ্কৃতকারীদের হাতে শাহাদাত বরণ করেন এবং পনের বছর বয়সে তাঁর মাতাও তাঁকে রেখে ইন্তেকাল করেন। হযরত ইমাম খোমেইনী (রহ.) তাঁর বড় ভাইয়ের নিকট প্রাথমিক শিক্ষাগ্রহণ করেন। অতঃপর তিনি আরাক শহরের দীনী শিক্ষাকেন্দ্রে ভর্তি হন। তারপর ধর্মীয় নগরী কোম-এ এসে তিনি জ্ঞানচর্চা অব্যাহত রাখেন। মাত্র ২৭ বছর বয়সে তিনি স্বীকৃতি মুজতাহিদ পর্যায়ে উন্নীত হতে সক্ষম হন। আরবি, ব্যাকরণ, আরবি সাহিত্য, দর্শন, উসূল, হাদীস, ফিকাহ, জ্যোতির্বিদ্যা এবং তাসাউফে তিনি বিশেষ পারদর্শিতা অর্জন করেছিলেন। অতঃপর তিনি কোমের দীনী শিক্ষাকেন্দ্রে অধ্যাপনা শুরু করেন। ১৯৬৪ সনে দেশ থেকে নির্বাসিত হবার পূর্ব পর্যন্ত তিনি সেখানে অধ্যাপনা অব্যাহত রেখেছিলেন।

হযরত ইমাম খোমেইনী ২৭ বছর বয়সে বিবাহ করেন। তাঁর স্ত্রী বেগম বাতুল সাকাফীও এক ধর্মীয় পরিবারের কন্যা। তাঁরা দুই পুত্র এবং তিন কন্যা মোট পাঁচ সন্তানের অধিকারী হন। ইমামের প্রথম পুত্র আয়াতুল্লাহ মোস্তফা খোমেইনী বিপ্লবের প্রায় দেড় বছর পূর্বে সাভাক এজেণ্টদের হাতে ইরাকে শহীদ হন। তাঁর দ্বিতীয় পুত্র হুজ্জাতুল ইসলাম ওয়াল মুসলেমিন সাইয়্যেদ আহমদ খোমেইনী ইরানে এবং বিশ্বের মাঝে একজন সুপরিচিত ব্যক্তিত্ব। ইমামের প্রথমা কন্যা বেগম যাহরা মোস্তাফাভী ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের মহিলা সমিতির সভানেত্রী।

আন্দোলন ও নেতৃত্ব

ইরানের ওলামায়ে কেরামগণের সংগ্রামী ঐতিহ্য বহুদিনের পুরানো। বিশেষ করে ইরানে দীনী শিক্ষাকেন্দ্রগুলো সর্বদা সহকারী নিয়ন্ত্রণ থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত থাকায় এবং ইসলাম সম্পর্কে ওলামাদের ব্যাপক ও পূর্ণাঙ্গ জ্ঞান থাকায় আলেম সমাজের এক বিরাট অংশ সবসময়েই স্বৈরাচারী রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে সংগ্রামমুখর ছিলেন। হযরত ইমাম খোমেইনী (রহ.) নিজেও জ্ঞানচর্চা ও জ্ঞানসাধনার পাশাপাশি দেশে সামাজিক এবং রাজনৈতিক পরিস্থিতির ওপর দৃষ্টি রাখতেন এবং প্রয়োজনীয় ভূমিকা পালন করতেন।

এ সময় ইরানের ব্রিটিশ এজেন্ট রেযা খানের স্বৈরশাসন চলছিল। রেযা খান দেশ থেকে ইসলামী মূল্যবোধ অপসারণ করতে এবং পশ্চিমা ভাবধারা চালু করার জন্য সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালাতে থাকে। এ কাজে একদল পশ্চিমা এবং তথাকথিত বুদ্ধিজীবী এগিয়ে আসে। এরা আদর্শিক, সাংস্কৃতিক এবং চিন্তাগত দিক থেকে ইসলামের বিরুদ্ধে আক্রমণ শুরু করে। বিশেষ করে ওয়াহাবী চিন্তাধারার আশ্রয় নিয়ে তারা ইসলামের বহু মৌলিক বিষয়ে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করতে থাকে। ইসলামের বিরুদ্ধে এরূপ আদর্শিক আক্রমণ প্রতিহত করার জন্য হযরত ইমাম (রহ.) কাশফুল আসরার’ (গোপন রহস্যের ফাঁস) নামে একখানি গ্রন্থ রচনা করেন। বইটি ১৯৭৪ সালে প্রকাশিত হয়। এ গ্রন্থ প্রকাশের ফলে পাশ্চাত্যপন্থী বুদ্ধিজীবীদের আদর্শিক, সাংস্কৃতিক আক্রমণ সম্পূর্ণরূপে ব্যর্থ হয়ে যায়। এর ফলে জনগণ যে তাদের বক্তব্য প্রত্যাখ্যান করেছিল শুধু তাই নয়; বরং জনগণের কাছে এরা ইসলাম ও দেশের দুশমন এবং বহিঃশক্তির তাঁবেদাররূপে চিহ্নিত হয়ে যায়।

ইতিমধ্যে দেশের অভ্যন্তরে কিছু গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা সংঘটিত হয়ে যায়। যেমন : ইংরেজরা রেযা খানকে সরিয়ে তার পুত্র মোহাম্মদ রেযাকে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত করে এবং মোহাম্মদ রেযাকে শাহউপাধিতে ভূষিত করে। এরপর ১৯৫৩ সালে ইরানে শাসনতান্ত্রিক বিপ্লব সংঘটিত হয়। ঐ সময়ে পার্লামেণ্টের স্পীকার ছিলেন আয়াতুল্লাহ কাশানী। তখন দেশে তেল সম্পদের ওপর ব্রিটিশ আধিপত্যের বিরুদ্ধে গণ অসন্তোষ সৃষ্টি হয়েছিল এবং প্রধানমন্ত্রী মোসাদ্দেক তেল জাতীয়করণের জন্য পার্লামেন্টে বিল উত্থাপন করেন। পার্লামেন্ট কর্তৃক এ বিল গৃহীত হয়। পরিস্থিতির জটিলতায় ভীত হয়ে শাহ দেশ থেকে পলায়ন করেন। এমতাবস্থায় ইংরেজরা ইরানের ওপর নিয়ন্ত্রণ পুনঃপ্রতিষ্ঠার আর কোন সম্ভাবনা না দেখে ইরানকে আমেরিকার কাছে হস্তান্তর করে। এর ফলে সি.আই.এ দ্বারা পরিচালিত এক সামরিক অভ্যুথানে মোসাদ্দেক সরকার উৎখাত হয় এবং শাহ আবার দেশে ফিরে আসেন। তখন থেকে মধ্যপ্রাচ্যে ইরান মার্কিন স্বার্থের পাহারাদারে পরিণত হয়। শুধু তাই নয়, আমেরিকা ইরানের তেল সম্পদ আত্মসাতের পাশাপাশি দেশটিকে মার্কিন ভোগ্যপণ্যের বাজারে পরিণত করে। আর এ লক্ষ্যে আমেরিকা শাহের সরকারের প্রশাসনকে নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে গ্রাম্য জনগণকে শহরে টেনে আনতে শুরু করে। ফলে ইরানের কৃষি ব্যবস্থা প্রায় সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যায়। এ সময়ে ইরানের ধর্মীয় নেতৃবৃন্দ এবং ওলামায়ে কেরাম এসব অশুভ ষড়যন্ত্র এবং পাশ্চাত্যের আদর্শিক সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের বিরুদ্ধে জনগণকে সতর্ককরণের দায়িত্ব পালন করে যেতে থাকেন। হযরত ইমাম খোমেইনী (রহ.) তাঁদের অন্যতম ছিলেন।

এ সময়ে হযরত আয়াতুল্লাহ বুরুজেরদী (রহ.) ছিলেন কোমের জ্ঞানচর্চা কেন্দ্রের প্রধান। তিনি তখন সারা দেশের ওলামায়ে কেরামেরও নেতা ছিলেন। ১৯৬২ সালে তিনি ইন্তেকাল করলে ওলামায়ে কেরাম হযরত ইমাম খোমেইনী (রহ.)-কে তাঁর স্থলাভিষিক্তরূপে বরণ করে নেন। তখন থেকেই ইমাম খোমেইনী (রহ.) জাতীয় দীনী নেতৃত্বের ভূমিকায় অবতীর্ণ হন।

ঐ একই বছর মন্ত্রিসভা প্রাদেশিক ও নগর কাউন্সিল বিলনামে একটি বিল তৈরি করে। এতে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের জন্য সংবিধানে উল্লিখিত পবিত্র কোরআন নিয়ে শপথ করার শর্ত তুলে দেওয়া হয়। আর তার পরিবর্তে যে কোন ধর্মগ্রন্থ নিয়ে শপথ করার প্রস্তাব করা হয়। এটি ছিল পরিপূর্ণ ধর্মহীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে একটি চাতুর্যপূর্ণ পদক্ষেপ। কোমের আলেমগণ সমস্বরে এ বিলের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানালেন। হযরত ইমাম খোমেইনী প্রধানমন্ত্রীর কাছে প্রেরিত এক তারবার্তায় এহেন বিলের বিরুদ্ধে কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন এবং সেই সাথে জনগণকে এ বিলের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে আহ্বান জানান। এ ব্যাপারে সাধারণ ধর্মঘটের কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়। প্রধানমন্ত্রী অন্য কোন উপায় না দেখে বিলটি প্রত্যাহার করে নেন।

ইরানকে মার্কিন ভোগ্যপণ্যের বাজারে পরিণত করা এবং সে লক্ষ্যে কৃষি ব্যবস্থাকে ধ্বংস করার উদ্দেশ্যে সরকার একটি শহরমুখী সংস্কার পরিকল্পনা প্রণয়ন করে। এর নাম দেয়া হয়েছিল শ্বেত বিপ্লব’, ‘শাহ এবং জনগণের বিপ্লব। কিন্তু সারাদেশের আলেমগণ এর বিরোধিতা করেন। এ রকম অবস্থায় শাহ এক প্রতারণামূলক ভোটের আয়োজন করে। ১৯৬৩ সালের ২৬ জানুয়ারি গণভোটের দিন ধার্য করা হয়েছিল। ইমাম খোমেইনী এ গণভোট বর্জন করার জন্য জনগণের প্রতি আহ্বান জানান। ফলে নির্ধারিত দিনে দেখা গেল শাহের গুপ্ত পুলিশ সাভাকের লোকজন এবং সেনাবাহিনী ও পুলিশের সদস্য ব্যতীত সাধারণ জনগণের আর কেউ ভোটকেন্দ্রে যায়নি। ফলে শাহের এ ষড়যন্ত্র ভণ্ডুল হয়ে যায়। কিন্তু তা সত্ত্বেও সরকারি প্রচারমাধ্যমসমূহ সংস্কার পরিকল্পনার সপক্ষে জনগণ কর্তৃক বিপুল ভোটদানের কথা প্রচার করে। এর কয়েকদিন পর ইমাম খোমেইনী (রহ.) ঈদুল ফিতর উপলক্ষে প্রদত্ত এক ভাষণে শাহ সরকারের পাশ্চাত্যের তাঁবেদারি, মার্কিন ও ইসরাইলের প্রতি নতজানু এবং গণবিরোধী নীতির কঠোর সমালোচনা করেন। তিনি সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার জন্য জনগণের কাছে আহ্বান জানান। শাহের আমলে বল্গাহারা আমোদ-প্রমোদের মধ্য দিয়ে তের দিনব্যাপী ইরানী নববর্ষের উৎসব পালন করা হতো। কিন্তু ঘটনাক্রমে ঐ বছর নববর্ষ উৎসবের দ্বিতীয় দিন ছিল ২৫ শাওয়াল। ২৫ শাওয়াল হযরত ইমাম জাফর সাদিক (আ.)-এর শাহাদাত লাভের দিন। এ উপলক্ষে ইমাম খোমেইনী (রহ.) নববর্ষ উৎসব বন্ধ রাখার জন্য জনগণের প্রতি আহ্বান জানান।

জনগণ ইমামের এ আহ্বানে স্বতঃস্ফূর্তভাবে সাড়া দিল। এর ফলে শাহের ক্রোধ ভীষণ বেড়ে গেল। উপরন্তু নববর্ষের দিনে (২২ মার্চ, ১৯৬৩) ইমামের আহ্বানে হযরত ইমাম জাফর সাদিক (আ.)-এর শাহাদাত বার্ষিকী উপলক্ষে কোমে এক বিশাল জনসমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। এ সমাবেশকে ভণ্ডুল করার লক্ষ্যে শাহের সাভাক এবং সেনাবাহিনীর লোকেরা কোমের সর্বোচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান মাদ্রাসা-ই-ফয়াজিয়াতে আলেমদের এবং জনতার ওপর হামলা চালিয়ে বহুসংখ্যক লোককে শহীদ ও আহত করে। ইমাম খোমেইনী তাঁর ভাষণে এ ঘটনার তীব্র সমালোচনা করেন। তিনি আমেরিকার প্রতি শাহের নতজানু নীতির স্বরূপ ফাঁস করে দেন এবং সরকারবিরোধী আন্দোলনের জন্য জনগণকে ডাক দেন। এছাড়া এ ব্যাপারে জনমত গঠনের জন্য সকল আলেমের প্রতি আহ্বান জানান।

৫ই জুনের গণঅভ্যুত্থান

ইমাম খোমেইনীর আহ্বানে আলেমগণ তাঁদের বক্তৃতা, ভাষণ ও খুতবায় শাহী শাসনের ইসলাম ও জাতীয় স্বার্থবিরোধী চেহারা জনগণের সামনে তুলে ধরতে শুরু করেন। সেই সাথে ইসলামের বিরুদ্ধে ইসরাইলের ষড়যন্ত্র তুলে ধরলেন তাঁরা। এমতাবস্থায় শাহের সরকার মাদ্রাসা-ই-ফয়জিয়াতে ইমাম খোমেইনীর জন্য বক্তৃতা প্রদান নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। কিন্তু ইমাম এ ঘোষণার প্রতি কর্ণপাত করলেন না। তিনি আশুরার দিন বিকালে মাদ্রাসা-ই-ফয়জিয়াতে এক বিশাল জনসমাবেশ ভাষণ দেন। সে ভাষণে তিনি শাহের ইসলামবিরোধী সরকারকে প্রতিরোধ করার জন্য জনগণের প্রতি আহ্বান করেন। সেই রাতেই ইমামকে গ্রেফতার করা হয় এবং কোমে নিয়ে আসা হয়। পরদিন ৫ই জুন শাহী সরকারের বিরুদ্ধে এবং ইমামের মুক্তির দাবিতে কোমে এবং তেহরানে এক গণঅভ্যুত্থান হয়। শাহের সরকার এ ঘটনা মোকাবিলার জন্য সামরিক আইন জারি করে এবং সেনাবাহিনীর সাহায্যে এ বিক্ষোভ দমনের পদক্ষেপ নেয়। কিন্তু জনগণ সামরিক আইনকে উপেক্ষা করে রাস্তায় নেমে আসে। সারাদেশে সাধারণ ধর্মঘট পালিত হয়। সেনাবাহিনীর গুলিতে সেদিন কোম ও তেহরানে প্রায় সাড়ে পনের হাজার লোক শহীদ হয়।

শাহী সরকার নিষ্ঠুর পন্থায় গণঅভ্যুত্থানের মোকাবিলায় আপাতত সফল হলেও সর্বত্র বিচ্ছিন্ন, বিক্ষিপ্ত বিক্ষোভ এবং চাপা গণ-অসন্তোষ অব্যাহত থাকে। তাই পরিস্থিতি শান্ত করার জন্য সরকার কয়েক মাসের মধ্যেই ইমামকে মুক্তি দিতে বাধ্য হয়। ইমাম খোমেইনী আবার কোমে ফিরে আসেন। ইতিমধ্যে ফয়জিয়া মাদ্রাসার হত্যাকা-ের বার্ষিকী উপস্থিত হয়। ইমাম খোমেইনী মাদ্রাসা-ই-ফয়জিয়াতে গণসমাবেশ এক জ্বালাময়ী ভাষণ দিয়ে শাহের ইসলামবিরোধী নীতি, আমেরিকার নিকট তার তাঁবেদারিত্ব এবং ইসরাইল-প্রীতির বিরুদ্ধে জনগণকে সতর্ক করে দেন।

এরই মধ্যে সরকার মার্কিন নাগরিকদেরকে কতকগুলো বিশেষ সুবিধা প্রদান করে আইন প্রণয়ন করে। এসব দেয় সুবিধার মধ্যে সর্বাধিক ক্ষতিকারক বিষয় ছিল এটা যে, ইরানে বসবাসকারী কোন মার্কিন নাগরিক ইরানের মাটিতে কোন অপরাধ করলে ইরানী আদালতে তার বিচার করা যাবে না। ইমাম খোমেইনী এ আইনের বিরুদ্ধে একটি বিবৃতি প্রদান করেন। অল্প সময়ের মধ্যেই প্রচারপত্র আকারে বিবৃতিটির হাজার হাজার কপি সারাদেশে বিতরণ করা হয়। ফলে জনগণ এ আইনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদমুখর হয়ে উঠল।

তুরস্কে নির্বাসন

শাহের সরকার এ সকল ঘটনাপ্রবাহ থেকে এ উপসংহারে উপনীত হলো যে, ইমাম খোমেইনী (রহ.) যতদিন দেশে থাকবেন ততদিন জনগণের মধ্য থেকে সরকারবিরোধী মনোভাব দূর করা সম্ভব হবে না। তাই ১৯৬৪ সালের ৪ঠা নভেম্বর কোম থেকে ইমামকে গ্রেফতার করে সরাসরি তেহরানের মেহেরাবাদ বিমানবন্দরে নিয়ে যাওয়া হয়। একই সময়ে অন্য নেতৃবৃন্দকেও গ্রেফতার অথবা গৃহবন্দি করা হয়। ইমাম খোমেইনী (রহ.)-এর জ্যেষ্ঠ পুত্র মোস্তফা খোমেইনীকে দুই মাস কারাগারে রাখার পর তাঁকেও তুরস্কে নির্বাসন দেয়া হয়।

কিন্তু ইমাম খোমেইনীকে নির্বাসিত করার পরও ইরানী জনগণের আন্দোলনে মোটেই ভাটা পড়েনি। ইতিমধ্যে ইসলামী আন্দোলনের জনৈক কর্মী প্রধানমন্ত্রী হাসান আলী মনসুরকে হত্যা করেন। অন্যদিকে ধর্মীয় নেতৃবৃন্দের পক্ষ থেকে জাতিসংঘ মানবাধিকার কমিশনের নিকট চিঠি পাঠিয়ে শাহী সরকারের মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং ইমামকে বেআইনিভাবে নির্বাসিতকরণের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়। এছাড়া তুরস্ক সরকার ইমামের গতিবিধি নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করলে তাঁরা এ কাজেরও প্রতিবাদ জানান। অতঃপর ইরান ও তুরস্কের সরকারদ্বয়ের পারস্পরিক সম্মতিতে ইমামকে ইরাকে পাঠিয়ে দেয়া হয়। ঐ সময় ইরাক সরকার এবং ইরান সরকারের মধ্যে সম্পর্ক ভালো ছিল না। তাই ইরাক এ শর্তে তাঁকে গ্রহণ করতে রাজি হয় যে, তিনি ইরাকে অবস্থানকালে তাঁর মর্যাদা ও তৎপরতা সম্পর্কে ইরান সরকারের  কোন বক্তব্য থাকবে না। ইরাকের কারবালা, নাজাফ, সামেরা, কাজেমিন, ও কুফা এ চারটি শহর দীনী জ্ঞানচর্চার গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। এছাড়া এ শহরগুলো শিয়া মাজহাবের লোকদের কাছে ধর্মীয় গুরুত্বের অধিকারী। আর তাই ইরাকই ছিল ইমাম খোমেইনীর জন্য সর্বোত্তম জায়গা।

ইরাকে ইমাম খোমেইনী (রহ.)

হযরত ইমাম খোমেইনী (রহ.) তুরস্কে বছরখানেক ছিলেন। সেখান থেকে ইরাকে এসে তিনি ইরাকের সবচেয়ে বড় দীনী জ্ঞানকেন্দ্র ধর্মীয় নগরী নাজাফে অবস্থান গ্রহণ করলেন। এখানে থেকেই তিনি জ্ঞানচর্চা, জ্ঞান বিতরণ ও গ্রন্থ রচনা করলেন এবং ইরানী জনগণের আন্দোলনের পথনির্দেশনা প্রদানের কাজ অব্যাহত রাখলেন। নাজাফে অবস্থানকালেই তিনি তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ বিলায়াতে ফকিহ’ (ফকিহদের শাসন) রচনা করেন। এ গ্রন্থই ইরানের ইসলামী বিপ্লবের তাত্ত্বিক ভিত্তি রচনা করে। কারণ, বিলায়াতে ফকিহ বা মুজতাহিদ ফকিহর শাসনের অপরিহার্যতার অর্থই হচ্ছে ফকিহ নয় এমন শাসকের শাসনব্যবস্থা অবৈধ এবং অগ্রহণযোগ্য- তা রাজতন্ত্রই হোক অথবা অন্য যে কোন সরকারই হোক।

ইমাম খোমেইনী (রহ.) বাণীবদ্ধ ক্যাসেট প্রেরণের মাধ্যমে ইরানী জনগণকে পথনির্দেশ প্রদান করতেন। বিদেশে অবস্থানরত ইরানী জনগণও একই পদ্ধতিতে পথনির্দেশনা লাভ করতেন। এতে তিনি ইসলামী হুকুমতের প্রয়োজনীয়তার ওপর বিশেষভাবে গুরুত্ব আরোপ করেন। এ বিষয়টিকে তিনি অপরিহার্য দীনী দায়িত্ব হিসাবে উপস্থাপন করেন। ইমাম খোমেইনীর এসব মহান বাণী গোপনে হাজারো কপি হয়ে অল্প সময়ের মধ্যেই সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ত। এছাড়া ইমামের অনুসারী আলেমগণও দ্বীনী অনুষ্ঠানাদিতে বেলায়েত ফকিহ বা ইসলামী হুকুমত সম্পর্কে আলোচনা করতে থাকেন।

ইমাম খোমেইনী ইসলামী আন্দোলনের সাধারণ পথনির্দেশন প্রদান করা ছাড়াও গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় ইস্যুতেও জনগণের উদ্দেশ্যে বাণী পাঠাতেন। উদাহরণস্বরূপ উল্লেখ করা যায় ইরানী রাজতন্ত্রের আড়াই হাজার বার্ষিকী উপলক্ষে শাহ এক বিরাট ব্যয়বহুল অনুষ্ঠানের আয়োজন করেন। এ উপলক্ষে শুধু তেহরানেই ৮০ কোটি রিয়াল (তৎকালীন হারে প্রায় তিন কোটি ডলার) ব্যয় করা হয়। জনগণের সম্পদের এহেন অপচয় অপব্যবহারের বিরোধিতায় কঠোর সমালোচনা করে ইমাম এক বাণী প্রেরণ করেন। এছাড়া শাহ তথাকথিত আধুনিক গণতন্ত্রের সাইবোর্ড লাগাবার উদ্দেশ্যে রাজনৈতিক সুবিধাবাদীদের দ্বারা রাস্তখিজ’ (গণজাগরণ বা পুনরুত্থান) নামে একটি রাজনৈতিক দল গঠন করলে ইমাম তাঁর বাণীতে গণবিরোধী এ দলে যোগদান করতে তাদেরকে নিষেধ করেন।

বিপ্লব

শাহের সরকার আন্দোলনের অবসান ঘটাবার লক্ষ্যে তার গুপ্ত পুলিশ বাহিনী সাভাকের মাধ্যমে ইমাম খোমেইনীকে হত্যা করার পরিকল্পনা নেয়। কিন্তু এ পরিকল্পনা কার্যকর করতে শাহ ব্যর্থ হন। তবে  ১৯৭৭ সালের ২৩ অক্টোবর সাভাকের এজেণ্টদের হাতে ইমামের জ্যেষ্ঠ পুত্র আয়াতুল্লাহ মোস্তফা খোমেইনী শাহাদাত বরণ করেন। এতে ইরানী জনগণের মধ্যে ক্ষোভের মাত্রা আরো ধুমায়িত হয়ে উঠল। এর কিছুদিন পর এমন একটি ঘটনা ঘটল যা বারুদের গুদামে জ্বলন্ত দিয়াশলাই নিক্ষেপের সমান ছিল।

১৯৭৮ সালের ৭ জানুয়ারি তেহরানের একটি দৈনিক পত্রিকায় ইমাম খোমেইনী (রহ.)-এর অবমাননা করে প্রবন্ধ প্রকাশিত হলে সারা ইরান বিক্ষোভ ফেটে পড়ে। বিশেষ করে কোম এবং তাবরীজে প্রচ- গণবিক্ষোভ হয়। এসব বিক্ষোভের বিরুদ্ধে দমনমূলক পদক্ষেপ নেওয়া হলে পরিস্থিতির উত্তপ্ততা স্থায়ীরূপ ধারণ করে। অর্থাৎ বিক্ষোভে পুলিশের গুলিতে নিহতদের জন্য শোক মিছিল হয় এবং মৃত্যুর চল্লিশতম দিনেও প্রথা অনুযায়ী শোকানুষ্ঠান হয়। এসব শোক মিছিল ও শোকানুষ্ঠান সহজেই সরকারবিরোধী বিক্ষোভ-সমাবেশ ও বিক্ষোভ-মিছিলে পরিণত হয়। এর জন্য নতুন দমনমূলক পদক্ষেপ নিলে আবারো নতুন হত্যাকা- হয়। এর ফলে আবারো শোক-বিক্ষোভ হয়। এভাবে একটার পর একটা চলতে থাকে। ১৯৭৮ সালের ৪ সেপ্টেম্বরে তেহরানের জালেহ স্কয়ারে (বর্তমানে শুহাদা স্কয়ার) এক গণবিক্ষোভে সেনাবাহিনীর গুলিতে প্রায় পাঁচ হাজার লোক শহীদ হয়।

ইরানের রাজনৈতিক পরিস্থিতির মারাত্মক অবনতি হলে শাহের সরকার ইমাম খোমেইনী (রহ.)-কে অবাধ তৎপরতার সুযোগ না দেয়ার জন্য ইরাক সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করে। ইতিমধ্যে ১৯৭৫ সালে ইরানের শাহী সরকার এবং ইরাকের বাথপন্থী সরকারের মধ্যে সমঝোতা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। আর তাই ইরাক সরকার ইরানকে খুশি করার জন্য নাজাফে হযরত ইমাম খোমেইনীকে গৃহবন্দি করে। এর ফলে ইরানী জনগণ ও ধর্মীয় নেতৃবৃন্দ ইরাকী সরকারের এ পদক্ষেপের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন। এছাড়া আন্তর্জাতিক অঙ্গন থেকেও আপত্তি ওঠে। অগত্যা ইরাক সরকার ইমামের নজরবন্দির আদেশ তুলে নেয়, কিন্তু নানাভাবে তাঁর তৎপরতায় বাঁধা সৃষ্টি অব্যাহত রাখে। ইরানী জনগণ ইমামকে দেশে ফিরিয়ে আনার দাবি জানাতে থাকে। কিন্তু শাহ সরকার এতে রাজী হয়নি। অগত্যা ইমাম তৃতীয় কোন দেশে যাবার সিদ্ধান্ত নিলেন। তিনি ১৯৭৮ সালের ৪ অক্টোবর নাজাফ থেকে কুয়েত রওয়ানা হলেন, কিন্তু কুয়েত সরকার তাঁকে সেদেশে প্রবেশের অনুমতি না দিলে তিনি পুনরায় নাজাফ প্রত্যাবর্তন করেন। দুদিন পর তিনি প্যারিস যাত্রা করেন।

ইমামের প্যারিস আগমনের ফলে একদিকে যেমন ইরানী জনগণের আন্দোলনের খবরাখবর আগের চেয়ে অনেক বেশি পরিমাণে ছড়িয়ে পড়তে থাকে, অন্যদিকে বিদেশে বসবাসকারী ইরানীরা ইমামের নিকট আসা-যাওয়া করতে থাকে। আর এদিকে ইরানে শাহের স্বৈরতান্ত্রিক শাসনের অবসান ও ইমামকে ফিরিয়ে আনার দাবিতে উপর্যুপরি বিক্ষোভ অব্যাহত থাকে।

জনগণকে শান্ত করার লক্ষ্যে শাহ একের পর এক রাজনৈতিক চালবাজির আশ্রয় নিতে থাকেন। তিনি দমননীতি, বহিঃশক্তির তাঁবেদারি এবং ইসলামবিরোধী কার্যকলাপের দায়িত্ব এড়াবার লক্ষ্যে প্রধানমন্ত্রী হোভেইদাকে পদচ্যুত ও কারাগারে নিক্ষেপ করেন। রাস্তখিজ দল ভেঙে দেন এবং নিষিদ্ধ ঘোষিত রাজনৈতিক দলসমূহের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেন। রাজবন্দিদের মুক্তি দেন, মিছিল-সমাবেশের অনুমতি দেন। সাইরাস ক্যালেন্ডার বাতিল করেন এবং বাতিলকৃত হিজরি সৌর-ক্যালেন্ডার পুনঃপ্রবর্তন করেন। শাহ এরকম আরো অনেক চালবাজি করেন। কিন্তু ইমাম খোমেইনী এসব রাজনৈতিক চালবাজিতে না ভুলে শাহের পতন ও ইসলামী হুকুমত প্রতিষ্ঠা না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাবার জন্য জনগণের প্রতি আহ্বান জানান। ফলে বিক্ষোভ অব্যাহত থাকে।

নবনিযুক্ত প্রধানমন্ত্রী জাফর শরীফ ইমামী পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হওয়ায় শাহ তাঁকে সরিয়ে সেনাবাহিনী প্রধান আজহারীকে প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ করেন। আজহারী সামরিক শাসন জারি করেও ব্যর্থ হলে শাহ তাঁকে সরিয়ে আমেরিকাপন্থী শাপুর বখতিয়ারকে প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ করেন। বখতিয়ারও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হন। এমতাবস্থায় ১৬ জানুয়ারি ১৯৭৯ তারিখে শাহ দেশত্যাগ করেন। দেশত্যাগের সময় তিনি সংবিধান অনুযায়ী প্রধানমন্ত্রী, সেনাবাহিনী প্রধান ও প্রধান বিচারপতি সমন্বয়ে একটি রাজ পরিষদ গঠন করে যান। কিন্তু পরিষদের সভাপতি, প্রধান বিচারপতি প্যারিস গিয়ে ইমামের নিকট আনুগত্য ঘোষণা করেন।

ইমামকে দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য জনগণের বিক্ষোভ অব্যাহত থাকে, কিন্তু বখতিয়ার এ দাবিকে উপেক্ষা করেন। এমতাবস্থায় বখতিয়ারের অনুমতি ছাড়াই ইমাম দেশে ফিরে আসার সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেন। অতঃপর ১৯৭৯ সালের ১লা ফেব্রুয়ারি তিনি দেশে প্রত্যাবর্তন করেন। এ উপলক্ষে মেহেরাবাদ বিমানবন্দর থেকে শহীদদের গোরস্তান বেহেশতে যাহরা পর্যন্ত লোকে লোকারণ্য হয়ে যায়। অন্তত পঞ্চাশ লাখ নারী-পুরুষ ইমামকে অভ্যর্থনা জানায়। বিশ্বের ইতিহাসে ইতিপূর্বে অন্য কোন নেতা এতবড় অভ্যর্থনা পাননি।

বেহেশতে যাহরায় জনগণের উদ্দেশ্যে প্রদত্ত ভাষণে তিনি ঘোষণা করেন যে, তিনি সরকার গঠন করবেন। কয়েকদিন পর তিনি বজারগানকে প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ করেন। বজারগান মন্ত্রিসভা গঠন করেন। এর পাশাপাশি ইমাম একটি বিপ্লবী পরিষদও গঠন করেন। ফলত দেশে দুটি সরকার হলো। বখতিয়ার সরকারের কার্যত দেশের ওপর কোনই নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা ছিল না। তবু তিনি সেনাবাহিনীর সহায়তায় ক্ষমতায় টিকে থাকার চেষ্টা করলেন, সামরিক আইন জারি করলেন। ইমাম জনগণের ওপর সামরিক আইন অমান্য করার নির্দেশ দিলেন। ফলে দশই ফেব্রুয়ারি সেনাবাহিনী ও জনগণের মধ্যে সংঘর্ষ শুরু হলো। বিমানবাহিনী আগেই ইমামের প্রতি আনুগত্য ঘোষণা করেছিল, এবার সেনাবাহিনীও বিভক্ত হয়ে পড়ল। ফলে সেনাবাহিনীর অফিসাররা শীঘ্রই সৈন্যদেরকে ব্যারাকে ফিরে যাওয়ার নির্দেশ দিলেন। এভাবে ১১ই ফেব্রুয়ারির প্রভাতে শাহ নিয়োজিত বখতিয়ার সরকারের পতন ঘটল। ইসলামী বিপ্লব বিজয়ী হলো।

বিপ্লবোত্তর কালে : ইরানের ইসলামী বিপ্লব বিজয়ের পর থেকে একটি মুহূর্তের জন্যও ভিতর ও বাইরের ইসলামবিরোধী শক্তির ষড়যন্ত্র ও নাশকতা থেকে মুক্ত থাকেনি। বিপ্লবকে ধ্বংস বা এর গতি পরিবর্তনের লক্ষ্যে আমেরিকা এবং তার এজেন্টরা বহুমুখী ষড়যন্ত্রমূলক তৎপরতা অব্যাহত রাখে। বহু শীর্ষস্থানীয় দীনী ব্যক্তিত্বকে তারা হত্যা করে। সুকৌশলে নিজেদের এজেন্টকে প্রেসিডেন্ট পদে পর্যন্ত বসাতে সক্ষম হয়। মহান ইসলামী চিন্তাবিদ আয়াতুল্লাহ মোতাহহারীকে শহীদ করে, ইমামের পরে প্রভাবশালী ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ তালেকানীকে বিষ প্রয়োগে শহীদ করে। বিস্ফোরণ ঘটিয়ে ইমামের প্রিয় শিষ্য প্রধান বিচারপতি আয়াতুল্লাহ বেহেশতীসহ দেশের ৭৩ জন শ্রেষ্ঠ সন্তানকে শহীদ করে। আরেক বিস্ফোরণের মাধ্যমে প্রেসিডেন্ট রাজায়ী ও প্রধানমন্ত্রী বাহোনারকে শহীদ করে। বর্তমান নেতা আয়াতুল্লাহ খামেনেয়ীকে হত্যার ব্যর্থ প্রয়াস পায়। সাম্রাজ্যবাদী আমেরিকা ইরানের বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপ করে এবং আমেরিকার ব্যাংকসমূহে গচ্ছিত ইরানী সম্পদরাশি আটক করে, ইরাকের মাধ্যমে ইরানের ওপর যুদ্ধ চাপিয়ে দেয়, কুর্দিস্তানে বিদ্রোহের সৃষ্টি করে, মাদকদ্রব্য বিস্তারের ষড়যন্ত্রমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করে। এ রকম অসংখ্য সমস্যার মোকাবিলা করতে হয় সদ্যপ্রতিষ্ঠিত ইসলামী প্রজাতন্ত্রকে।

চির বিদায়

ইসলামী বিপ্লবের পর অনেক বছর অতিক্রান্ত হয়েছে। বিপ্লবের ভাগ্য নির্ধারণী প্রতিটি সমস্যার মোকাবিলা করে এবং সমস্ত ষড়যন্ত্র ব্যর্থ করে দিয়ে এ বিপ্লব টিকে গেছে। বিপ্লবের নেতা-কর্মীদের যথেষ্ট অভিজ্ঞতাও হয়েছে। এখন আর এ ভয় নেই যে, এ বিপ্লবকে কেউ ধ্বংস বা পথচ্যুত করতে পারবে। তাই এবার ইমামের জন্য সেই মুর্হূতটি এসে হাজির হলো যে মুহূর্তটির জন্য তিনি দীর্ঘ দিন যাবৎ প্রহর গুণছিলেন। এবার তাঁর প্রিয় সন্নিধান থেকে ডাক এলো। ৩রা জুন ১৯৮৯, রাত দশটা বিশ মিনিটের সময় তিনি এ ধূলির ধরণী ছেড়ে আলমে মালাকুত পানে উড্ডয়ন করেন। (ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)।

ইমামের ইন্তেকাল ইরানী জনগণ এবং সারাবিশ্বের ইসলামী বিপ্লবকামী ও মুস্তাযআফ (নির্যাতিত) জনগণ শোকে ভেঙে পড়ে। শুধু তেহরানেই এক কোটি মানুষ ইমামের নামাযে জানাযা ও দাফন অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করে। বিশ্বের ইতিহাসে কোনদিন কোন ব্যক্তির ইন্তেকালে এত মানুষের অশ্রু ঝরেনি। মহান আরেফ হযরত ইমাম খোমেইনীর মাযার এখন দেশ-বিদেশের মুসলমানদের যিয়ারতগাহ। জীবদ্দশায় তিনি ছিলেন বিশ্বের বিপ্লবী মুসলমান ও মুস্তাযআফ জনতার জন্য প্রেরণার উৎস, মৃত্যুর পরে কবরে শায়িত থেকেও তিনি সে ভূমিকা পালন করে যাচ্ছেন- তাঁর মাযারে গিয়ে ইরানের ও বিশ্বের বিপ্লবীরা ইসলামী বিশ্ববিপ্লবের শপথ নিয়ে শয়তানি পরাশক্তিবর্গ ও তাদের তাঁবেদারদের বিরুদ্ধে নবতর উদ্যমে আপোষহীন সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়ছে।

(নিউজলেটার, ডিসেম্বর ১৯৯১)