সম্পাদকীয়
পোস্ট হয়েছে: নভেম্বর ১৪, ২০১৬
হযরত ইমাম হুসাইন (আ.)-এর শাহাদাত স্মরণে
বছর ঘুরে আবার বিশ্ব মুসলিমের দ্বারে এসেছে দশই মুর্হারাম বা আশুরা- সাইয়্যেদুশ শুহাদা হযরত ইমাম হুসাইন (আ.)-এর শাহাদাতের তথা মানবজাতির ইতিহাসের সর্বাধিক হৃদয়বিদারক ঘটনার বার্ষিকী। এখন থেকে প্রায় চৌদ্দ শতাব্দী কাল পূর্বে কারবালার মরু প্রান্তরে তিনি তাঁর ৭২ জন সঙ্গী-সাথিসহ ইয়াযীদী বাহিনীর হাতে শাহাদাত বরণ করেন।
হযরত ইমাম হুসাইন (আ.) হচ্ছেন হযরত রাসূলে আকরাম (সা.)-এর দৌহিত্র ও খাতুনে জান্নাত হযরত ফাতেমা যাহ্রা (সালামুল্লাহি আলাইহা)-এর পুত্র এবং আহ্লে বাইতের সদস্য পূতপবিত্রতম ব্যক্তিত্ববর্গের অন্যতম। এছাড়া সর্বসম্মত মত অনুযায়ী হযরত ইমাম হাসান ও হযরত ইমাম হুসাইন (আলাইহিমাস সালাম) হবেন বেহেশতে যুবকদের নেতা।
আমীরুল মুমিনীন হযরত আলী (আ.)-এর শাহাদাতের পর হযরত ইমাম হাসান (আ.) তাঁর স্থলাভিষিক্ত হিসেবে ইসলামী খেলাফতের দায়িত্ব গ্রহণ করেন, কিন্তু আমীরে মুআবিয়া খেলাফত দখলের চেষ্টা থেকে বিরত না হওয়ায় রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে মুসলিম উম্মাহ্র ধ্বংস অনিবার্য হয়ে উঠলে উম্মাহ্কে ধ্বংসের কবল থেকে রক্ষার উদ্দেশ্যে তিনি খেলাফতের দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়ান। মুআবিয়া তাঁর মৃত্যুর পরে হযরত ইমাম হুসাইন (আ.) খলীফা হবেন এ শর্তে সন্ধি করে খেলাফতের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। কিন্তু তিনি তাঁর ওয়াদা ভঙ্গ করে স্বীয় পাপাচারী পুত্র ইয়াযীদকে খলীফার দায়িত্ব দিয়ে যান। আর হযরত ইমাম হুসাইন (আ.) পাপাচারী শাসকের বিরুদ্ধে জনগণকে সতর্ককরণরূপ আম্র্ বিল-মারূফ ওয়া নাহি আনিল মুন্কার-এর দায়িত্ব পালনের লক্ষ্যে উত্থান করেন, ক্ষমতা দখলের লক্ষ্যে নয়। কিন্তু বর্তমান যুগে বিশ্বের অনেক অমুসলিম শাসিত দেশেও মত প্রকাশের এবং শাসকের দুর্নীতি ও অনাচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাবার যে স্বাধীনতা রয়েছে মুসলিম উম্মাহ্র খলীফা হওয়ার দাবিদার স্বৈরশাসক ইয়াযীদের শাসনে সে ন্যূনতম অধিকারটুকুও স্বীকৃত ছিল না। এ কারণেই সৃষ্টিকুলের অন্যতম শ্রেষ্ঠ মানুষ হযরত ইমাম হুসাইন (আ.)-কে সঙ্গীসাথিসহ প্রায় নিরস্ত্র অবস্থায় নির্মমভাবে শহীদ হতে হয়।
হযরত ইমাম হুসাইন (আ.) আম্র্ বিল-মারূফ ওয়া নাহি আনিল মুর্ন্কা-এর দায়িত্ব পালন তথা জনগণকে তাগূতী শাসনের অশুভ পরিণাম সম্পর্কে সতর্ক করতে গিয়ে যে কোনো ধরনের রক্তপাত এড়িয়ে চলার চেষ্টা করেন। এ কারণেই ইয়াযীদ খেলাফতের আসনে অধিষ্ঠিত হওয়ার পর হযরত ইমাম হুসাইন (আ.)-এর কাছ থেকে জোর করে বাইআত আদায়ের জন্য মদীনার উমাইয়্যা প্রশাসককে নির্দেশ দিলে হযরত ইমাম (আ.) রক্তপাত এড়ানোর লক্ষ্যে রাতের বেলা মদীনা ত্যাগ করেন এবং মক্কায় এসে আল্লাহ্র গৃহের পাশে মসজিদুল হারামে অবস্থান করে জনগণের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টির কার্যক্রম অব্যাহত রাখেন। কিন্তু ইয়াযীদ তাঁকে হজের মওসুমে তাওয়াফ্কারীদের ভীড়ের মধ্যে হত্যা করার জন্য গুপ্তঘাতক পাঠায় এবং এটা জানতে পেরে ইমাম হুসাইন (আ.) মসজিদুল হারামে রক্তপাত এড়ানোর লক্ষ্যে মক্কা ত্যাগের সিদ্ধান্ত নেন। ইতিমধ্যে কুফার জনগণ সেখানে গিয়ে জনগণকে নেতৃত্ব দেয়ার জন্য আহ্বান জানিয়ে ইমামের কাছে শত শত পত্র পাঠালে জনগণের ডাকে সাড়া দেয়ার লক্ষ্যে তিনি হজের আগের দিন আটই জিলহজ মক্কা ত্যাগ করে কুফার পথে রওয়ানা হন। কিন্তু তিনি কারবালা পৌঁছলে ইয়াযীদের অনুগত বাহিনী তাঁকে অবরুদ্ধ করে ফেলে। ইতিমধ্যে কুফায় ইয়াযিদের নিয়োজিত গভর্নর ওবায়দুল্লাহ ইবনে যিয়াদ নৃশংসপন্থায় জন রেশকে স্তব্ধ করে, ইমাম হোসাইনের ২ জন ক্বায়েস ইবনে মুসাহহার ও মুসলিম বিন আকিল ও কতিপয় বিশ্বস্ত অনুসারীদের নির্মমভাবে হত্যা করে। আর কুফার বিরাট অংশ জনগণ ইবনে যিয়াদের ভয়ে ইমামের প্রতি তাদের অঙ্গীকার থেকে সরে যায়। ইয়াযীদের নির্দেশে তার বাহিনী ইমাম হোসাইনকে ইয়াযীদের অনুকূলে বাইআত্ বা মৃত্যুকে বরণ করে নেয়া এই দু’টি পথের যে কোনো একটিকে বেছে নিতে বলে এবং তৃতীয় কোনো প্রস্তাব মেনে নিতে অস্বীকার করে। কিন্তু যেহেতু ইমাম হুসাইনের মতো ব্যক্তি ইয়াযীদের ন্যায় যালেম ও পাপাচারী শাসকের অনুকূলে বাইআত করতে পাবেন না। ইয়াযিদের উদ্দেশ্য ছিল ইমাম হোসাইনকে বাইয়াতে বাধ্য করে মুসলিম উম্মাহকে তার জুলুমবাজ ও পাপচারী সরকারের বৈধতার দাবী করে অনুকুলে রাখা। ইমাম হোসাইন ইয়াজিদের অনুকূলে বাইআতের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন এবং প্রায় নিরস্ত্র অবস্থায় অসম যুদ্ধে স্বীয় সঙ্গী-সাথিদের সহ শাহাদাত বরণ করেন। এভাবে তিনি কিয়ামত পর্যন্ত সকল মানুষের জন্য সত্য ও ন্যায় প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে প্রয়োজনে চূড়ান্ত আত্মত্যাগের অনুপ্রেরণাদায়ক দৃষ্টান্ত প্রতিষ্ঠা করে যান।
আল্লাহ্ তাআলা আমাদেরকে হযরত ইমাম হুসাইন (আ.)-এর শাহাদাত থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে সত্যের পতাকা বুলন্দ রাখার জন্য প্রয়োজনে সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকারের তাওফীক দিন। আমীন।