শুক্রবার, ৪ঠা এপ্রিল, ২০২৫ খ্রিস্টাব্দ, ২১শে চৈত্র, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

English

সম্পাদকীয়

পোস্ট হয়েছে: নভেম্বর ১০, ২০১৬ 

সঠিক শিক্ষা ও উন্নয়নই মুসলিম উম্মাহর পথ
বর্তমানে বিশ্বে মুসলিম উম্মাহ্ বিরাট জনসংখ্যার এবং বিপুল প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ বিশাল ভূখ-ের অধিকারী। কিন্তু এতদসত্ত্বেও মুসলমানরা একদিকে যেমন দারিদ্র্য ও অশিক্ষায় জর্জরিত অন্যদিকে তারা রাজনৈতিক ও চিন্তাগত দিক থেকে অসংখ্য দল-উপদল ও গোষ্ঠীতে বিভক্ত। শুধু তা-ই নয়, আল্লাহ তা‘আলা যেখানে মুসলমানদেরকে পরস্পরের ভাই-ভাই হবার জন্য নির্দেশ দিয়েছেন সেখানে তাদের এ বিভক্তি অনেক ক্ষেত্রেই পারস্পরিক দুশমনিতে পর্যবসিত হয়েছে। এর পিছনে নিহিত মূল কারণ হচ্ছে সঠিক শিক্ষা ও দ্বীনী দৃষ্টিভঙ্গির অভাব। এর ফলেই একদিকে যেমন মুসলমানদের একাংশ দ্বীনের সাথে সম্পর্কহীন হয়ে পার্থিবতার কাছে আত্মসমর্পণ করেছে, আরেক অংশ পার্থিব শিক্ষা ও প্রয়োজনের প্রতি উদাসীন হয়ে পড়েছে, যদিও ইসলাম হচ্ছে এমন একটি দ্বীন যা মানুষের ইহকালীন ও পরকালীন উভয় জগতের প্রয়োজনের ওপর গুরুত্ব আরোপ করেছে।
হযরত ইমাম খোমেইনী (রহ্.)-এর নেতৃত্বে ইরানে ইসলামী বিপ্লবকে বিজয়ী করার পিছনে ইসলামের এ সঠিক শিক্ষা অনুযায়ী ইহ-পরকালীন সৌভাগ্য নিশ্চিত করার লক্ষ্যই ছিল চালিকাশক্তি। তাই ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরান শুরু থেকেই এ লক্ষ্যে স্বীয় অভিযাত্রা অব্যাহত রেখেছে, আর সারা দুনিয়ার ইসলামবিরোধী শক্তির দুশমনি ও তাদের সৃষ্ট বহুবিধ দুরূহ বাধা-বিঘœ সত্ত্বেও স্বীয় সঠিক লক্ষ্যের কারণে এতে যে বিরাট সাফল্যের অধিকারী হয়েছে তা সমগ্র বিশ্ববাসীর কাছে সুস্পষ্ট।
আল্লাহ্ তা‘আলা কেবল তাওহীদে ঈমানের অভিন্নতার ভিত্তিতে আহ্লে কিতাবের প্রতি শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের আহ্বান জনানোর জন্য নির্দেশ দিয়েছেন। এমতাবস্থায় তাওহীদ, আখেরাত, খাৎমে নবুওয়াত ও কোরআনে ঈমান, অভিন্ন কিবলা এবং ফরয ও হারাম সংক্রান্ত প্রায় সকল গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে অভিন্নতার অধিকারী মুসলমানদের বিভিন্ন মায্হাব ও ফিরকার জন্য স্বল্পসংখ্যক বিষয়ে মতপার্থক্য সত্ত্বেও কোরআন মজীদের নির্দেশে ঐক্যবদ্ধ হওয়া এবং বিভক্তি ও দুশমনি পরিহার করা যে কত বেশি অপরিহার্য তা ব্যাখ্যার অবকাশ রাখে না। এ কারণেই হযরত ইমাম খোমেইনী (রহ্.)-এর নেতৃত্বে ইসলামী ইরান শুরু থেকেই সমগ্র মুসলিম উম্মাহ্র প্রতি ঐক্যের আহ্বান জানিয়ে আসছে এবং এ জন্য সম্ভব সকল প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেÑ যে লক্ষ্যে গৃহীত অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হচ্ছে হযরত রাসূলে আকরাম (সা.)-এর জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে প্রতি বছর ইসলামী ঐক্য সপ্তাহ পালন। আর বর্তমান রাহ্বার হযরত আয়াতুল্লাহ্ খামেনেয়ী হযরত ইমাম খোমেইনী (রহ্.)-এর অনুসৃত পথে অভিযাত্রা অব্যাহত রেখেছেন।
অন্যদিকে ইসলাম চায় যে, মুসলমানরা পার্থিব দিক থেকেও সম্মানজনক জীবনের অধিকারী হোক, আর অনস্বীকার্য যে, অশিক্ষা ও ক্ষুধা-দারিদ্র্য দূরীকরণ এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে অগ্রগতি সাধন ব্যতীত কোনো জাতিই পার্থিব দিক থেকে সম্মানজনক জীবনের অধিকারী হতে পারে না। এ কারণেই ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরান এ লক্ষ্যে উপনীত হওয়ার জন্য সম্ভব সমস্ত শক্তি ও সামর্থ্য বিনিয়োগ করে এ ক্ষেত্রে মওজূদ শক্তি-সামর্থ্য অনুপাতে সারা বিশ্বের মধ্যে সর্বাধিক উন্নতি সাধন করেছে- যে সংক্রান্ত তথ্য ও পরিসংখ্যান সারা দুনিয়ার মানুষেরই কমবেশি জানা আছে।
কিন্তু ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরান কেবল ইরানী জাতিরই নয়, বরং অভিন্ন ইসলামী উম্মাহ্র অংশ হিসেবে সমগ্র মুসলিম উম্মাহ্র ইহ-পরকালীন উন্নতি ও সৌভাগ্য কামনা করে এবং সব সময়ই এ লক্ষ্যে সম্ভব সকল সহযোগিতা প্রদানের জন্য প্রস্তুত ছিল ও রয়েছে। বিশেষ করে হযরত আয়াতুল্লাহ্ খামেনেয়ী মুসলিম জাতিসমূহ এবং রাজনৈতিক ও ধর্মীয় গোষ্ঠীসমূহের প্রতি সঠিক দ্বীনী শিক্ষা এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে উন্নতির দিকে দৃষ্টি দেয়ার জন্য বার বার আহ্বান জানিয়ে আসছেন।
এ ব্যাপারে দ্বিমতের অবকাশ নেই যে, সঠিক দ্বীনী শিক্ষা ও ইসলামী ঐক্যের জন্যে মাযহাব ও র্ফিক্বাহ্ নির্বিশেষে মুসলিম উম্মাহ্র মধ্যকার অভিন্ন বিষয়গুলোকে ভিত্তি করতে হবে এবং বিতর্কিত ও গৌণ বিষয়াদির ক্ষেত্রে উন্মুক্ত ‘ইল্মী আলোচনার মাধ্যমে পারস্পরিক দূরত্ব হ্রাস করার চেষ্টা করতে হবে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক যে, কোরআন মজীদে যেখানে কেবল তাওহীদের ভিত্তিতে আহলে কিতাবের সাথে শান্তি ও সমঝোতার আহ্বান জানানো হয়েছে সেখানে মুসলিম উম্মাহ্র মধ্যকার কতক র্ফিক্বাহ্ ও গোষ্ঠী মুসলমানদের মধ্যে বিদ্যমান ইসলামী ঐক্যের মৌলিক ভিত্তিসমূহের প্রতি দৃষ্টি না দিয়ে কেবল বিতর্কিত বিষয়াদিতে ভিন্ন মতের কারণে অন্যদের বিরুদ্ধে কুফ্রী ফতওয়া জারি করছে, এমনকি হত্যাযোগ্য বলেও রায় দিচ্ছে, আর প্রকৃত দ্বীনী জ্ঞানহীন যুবকদেরকে উস্কে দিয়ে মুসলমানদের রক্তপাত ও তাদের ধনসম্পদের ধ্বংসসাধনের কাজে ব্যবহার করছে এবং কোরআন মজীদে লোকদের ওপর আধিপত্য চাপিয়ে দিতে নিষেধ করা সত্ত্বেও অস্ত্রের জোরে অনিচ্ছুক জনগোষ্ঠীর ওপর ইসলামের নামে স্বীয় শাসন-কর্তৃত্ব চাপিয়ে দেয়ার চেষ্টা করছে। আর কোনো কোনো মুসলিম সংখ্যাগুরু দেশের সরকার এ কাজে তাদেরকে সহায়তা দিচ্ছে।
আমরা আশা করবো, মুসলিম সংখ্যাগুরু দেশসমূহের সরকারগুলো এবং সকল মুসলিম গোষ্ঠী ও ফিরকা কোরআন মজীদের নির্দেশন অনুযায়ী সব ধরনের চরম ও প্রান্তিক পন্থা পরিহার করে সঠিক দ্বীনী ও পার্থিব শিক্ষা, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির উন্নয়ন, ক্ষুধা-দারিদ্র্য ও নিরক্ষরতা দূরীকরণ এবং উম্মাহ্র ঐক্য, সংহতি ও ভ্রাতৃত্বের লক্ষ্যে সম্ভাব্য সকল শক্তি-সামর্থ্য বিনিয়োগ করবে।