শুক্রবার, ৭ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৫ খ্রিস্টাব্দ, ২৪শে মাঘ, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

English

লোভনীয় ১৯ ইরানি খাবার

পোস্ট হয়েছে: জানুয়ারি ৩১, ২০১৯ 

news-image

ভোজনবিলাসীদের জন্য সবসময়ই কোনো না কোনো বিস্ময়কর খাবার নিয়ে হাজির হয়েছে ইরানি বা পারস্য রন্ধনশিল্প। পরিচয় করিয়ে দিয়েছে সুস্বাদু ও লোভনীয় সব খাবারকে। খাদ্যরসিকদের মনোরঞ্জনে ভাত, শাকসবজি ও ফলমূলের পাশাপাশি জাফরান, মহলেব, এলাচ ও সবুজ শাকের মতো মশলা সর্বদা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। সুগন্ধিযুক্ত আকর্ষণীয় এসব খাবার যেমন মশলাদার, খেতেও তেমন সুস্বাদু। এক্ষেত্রে যথাযথই প্রভাব রাখতে সক্ষম হয়েছে তুরস্ক, রাশিয়া, ও মধ্য এশিয়ার রন্ধনশিল্প।

নিম্নে অবিশ্বাস্য স্বাদ ও গন্ধের লোভনীয় ১৯ টি ইরানি খাবারের বর্ণনা দেওয়া হলো-

১। ঐতিহ্যবাহী ফারসি স্যুপ ‘আশ-ই আনার’

ঐতিহ্যবাহী ফারসি স্যুপ ‘আশ-ই আনার’

এটা কী : মিটবল ও ডালিমের দানা দিয়ে এই স্যুপ তৈরি করা হয়। আনার বলতে ডালিম দানাকে বোঝায় আর আশ বলতে বোঝায় ঘন স্যুপকে।

স্বাদে যেমন : এই স্যুপ গরম গরম পরিবেশন করা হয়। ফলে শীতকালে অতিশয় সুস্বাদু খাবার হিসেবে এটি বিবেচিত হয়। ভেগান বা নিরামিষাশী মানুষ মিটবলের সংমিশ্রণ ছাড়াই এই স্যুপ ভোগ করতে পারে।

২। আবগুশ্ট

আবগুশ্ট

এটা কী : মূলত গোশতের ঝোলকে আবগুশ্ট বলা হয়। ভেড়ার বাচ্চার গোশতের সাথে মশলার মিশ্রণে সুস্বাদু এই খাবারটি তৈরি করা হয়।

স্বাদে যেমন : ছোলা, মেষশাবকের গোশত, আলু, সাদা মটরশুটি ও মশলার সমন্বয়ে তৈরি এই খাবার অত্যন্ত সুস্বাদু। এটি সাধারণত রুটি দিয়ে খাওয়া হয়। একদিকে যেমন এর গোশতের স্বাদ রয়েছে অন্যদিকে এতে রয়েছে অত্যন্ত পুষ্টিসমৃদ্ধ শাকসবজি যা আপনার সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করবে।

৩। ঐতিহ্যবাহী ইরানি খাবার ‘ইরানি আলুর সালাদ’

ঐতিহ্যবাহী ইরানি খাবার ‘ইরানি আলুর সালাদ’

এটা কী : এটা মূলত আলু, ডিম ও মুরগির রকমারি মিশ্রণ। যে কোনো ধরনের প্রথাগত ইরানি অনুষ্ঠানে এটা অবশ্যই পরিবেশন করা হয়।

স্বাদে যেমন : নরম চিকেন পিস ও ডিম আর মেয়নেজ দিয়ে এটি প্রস্তুত করা হয়। টাটকা স্বাদের পটেটো সালাদ বিশেষ পরিবেশনের জন্য উপযুক্ত।

৪। ফারসি উৎসবীয় খাদ্য ‘সবজি পোলো বা মাহি’

ফারসি উৎসবীয় খাদ্য ‘সবজি পোলো বা মাহি’

এটা কী : সাদা মাছের সাথে হার্বড রাইস পিলাফের সংমিশ্রণে এটি তৈরি করা হয়। ‘সবজি’ মানে শাকসবজি। পোলো অর্থ সিদ্ধ চাল। আর মাহি বলতে মাছকে বোঝায়। ফারসি নববর্ষ তথা নওরুজে ইরানিরা এই খাবারটি পরিবেশন করে থাকে।

স্বাদে যেমন:  রুচিকর সবুজ রাইস আপনাকে এনে দেবে আজব সমৃদ্ধ এক স্বাদ। স্বাদ ও গন্ধে পরিপূর্ণ খাবারটিতে পাবেন পরিপূর্ণ তৃপ্তি। সবজি পোলো দেখলে হয়তো আপনার জিহ্বায় পানি চলে আসবে।

৫। উত্তর ইরানের রুচিকর খাবার ‘ফেসেনজান’

উত্তর ইরানের রুচিকর খাবার ‘ফেসেনজান’

এটা কী : এটি ব্যাপকভাবে ‘খোরেশ-ই ফেসেনজান’ হিসেবে পরিচিত। এটা তৈরি করা হয় মিট স্ট্যু ও ডালিমের রস দিয়ে। এই খাবারটিতে রন্ধন দক্ষতা সম্পর্কে ইরানিদের নৈপুণ্য ফুটে উঠতে দেখা যায়।

স্বাদে যেমন : ভাপা সিদ্ধ হৃদয়গ্রাহী এই খাবারটি মুরগি বা হাঁসের স্বাদে সমৃদ্ধ। সাথে চূর্ণ আখরোট এতে দিয়েছে অন্য রকম মজা। প্রায়ই এটা যে কোনো ধরনের রাইস খাবারের সাথে সৌজন্যসূচক খাবার হিসেবে পরিবেশন করা হয়।

৬। কেইমেহ

কেইমেহ

এটা কী : সবার কাছে এটি কেইমেহ নামে পরিচিত। স্ট্যু জাতীয় খাবারটি দুই ধরনের হয়ে থাকে। কেইমেহ সিবজামিনি ও কেইমেহ বাদেমজান। এটা ফ্রেঞ্চ ফ্রাই দিয়ে গতানুগতিকভাবে সাজানো হয় এবং সুগন্ধি রাইসের সাথে পরিবেশন করা হয়।

স্বাদে যেমন : ভাঙা মটরশুটি, টমেটো, শুকনো লেবু ও পেঁয়াজের সাথে ফ্রেঞ্চ ফ্রাই ও বেগুনের সংমিশ্রণে এই খাবারটি প্রস্তুত করা হয়। স্বাদ ও গন্ধে যেন স্বর্গীয় খাবার এটি।

৭।  ‘কোরমেহ সবজি’

‘কোরমেহ সবজি’

এটা কী : এটা কোরমেহ সবজি নামে পরিচিত। সুগন্ধিযুক্ত এই স্ট্যু খাবারটি ইরানের জাতীয় খাবার হিসেবে বিবেচিত হয়। প্রতি বছর নভেম্বরের শেষ শনিবার আন্তর্জাতিক কোরমেহ সবজি দিবস হিসেবে পালিত হয়।

স্বাদে যেমন : দুম্বার গোস্ত, ধনে ও মেথির পাতা, বরবটির বিচি এবং লেবুর রসের সংমিশ্রনে তৈরি খাবার আপনাকে করে দেবে নির্বাক।

৮। সুইট ক্যান্ডি গাজ

সুইট ক্যান্ডি গাজ

এটা কী : এটা চিনি, বাদাম ও ডিম দিয়ে প্রস্তুত করা হয়। ইরানের নববর্ষের মতো ঐতিহ্যবাহী অনুষ্ঠানে এই ক্যান্ডি পরিবেশন করা হয়।

স্বাদে যেমন : এটা মূলত গোলাপজলের স্বাদে পরিপূর্ণ এক ধরনের মিষ্টি খাবার। যার প্রতিটি কামড়ে অতিরিক্ত মিষ্টি অনুভব করবেন।

৯। বেগুনি স্ট্যু ‘খোরেশ বাদেমজান’

বেগুনি স্ট্যু ‘খোরেশ বাদেমজান’

এটা কী : যখনই ইরানে অবতরণ করবেন তখনই টমেটো-ভিত্তিক এই স্ট্যু অন্তত একবার হলেও খেয়ে নেওয়া উচিত।

স্বাদে যেমন : মাশলার সাথে বেগুন ও গোশতের যুতসই সংমিশ্রণ আপনাকে দিতে পারে অন্য রকম আমোদ্।

১০। জনপ্রিয় ইরানি খাবার ‘খোরেশ কারাফস’

জনপ্রিয় ইরানি খাবার ‘খোরেশ কারাফস’

এটা কী : এটা মূলত স্ট্যু প্রস্তুতপ্রাণালী। এর প্রধান উপকরণ সেলারি (শাকবিশেষ) ও গোশত।

স্বাদে যেমন : স্বাস্থ্যকর সবুজ স্ট্যু এতটাই সুস্বাদু যে আপনি একবার খাওয়ার পর বারবার খেতে চাইবেন। সুন্দরভাবে রান্না করা খাবারের টাটকা স্বাদ আপনার হৃদয় চুরি করে নেবে। গোশত, সেলারি ও পার্সলে (শাকবিশেষ) লেবুর রসের সাথে পরিবেশন করা হয়।

১১। ক্ষুধাবর্ধক ‘কুকু’

ক্ষুধাবর্ধক ‘কুকু’

এটা কী : এটা গাছড়া-ভিত্তিক অমলেট (ভাজা ডিম)। এটাকে কেকের মতো করে প্রস্তুত করা হয়। প্রস্তুতের পর এটা টুকরো টুকরো করে পরিবেশন করা হয়। দুটি ভিন্ন ধরনের কুকু রয়েছে। উপাদানের ওপর ভিত্তি করে কুকু সিব জামিনি ও কুকু সবজি নামে অভিহিত করা হয়।

স্বাদে যেমন : পালংশাক, ধনে, স্ক্যালনস (এক প্রকার পেঁয়াজ) ও গাছড়ার সাথে ডিমের এক সুন্দর সংমিশ্রণ এই খাবারটিকে দিয়েছে অনন্য স্বাদ। 

১২। বিখ্যাত ইরানি খাবার ‘মির্জা কাশেমি’

বিখ্যাত ইরানি খাবার ‘মির্জা কাশেমি’

এটা কী : কাবাব করা বেগুন মশলা দিয়ে প্রস্তুত করা হয়। কখনও কখনও এটা মিরজা কাশেমি হিসেবে পরিচিতি পায়। ক্ষুধাবর্ধক সুস্বাদু এই খাবারটির ইরানের গিলান অঞ্চল থেকে প্রচলন ঘটে।

স্বাদে যেমন : মশলা, টমেটো ও ডিমের সাথে বেগুনের যথাযথ সমন্বয়ে এটি প্রস্তুত করা হয়। রাইস অথবা রুটি যে কোনোটির সাথে ভালো ভাবেই খাওয়া যায়।

১৩। তাহচিন রাইস কেক

তাহচিন রাইস কেক

এটা কী : মুরগি, দই ও ডিম দিয়ে এই রাইস কেক বানানো হয়।

স্বাদে যেমন : এই খাঁটি ইরানি খাবারটিতে জাফরানের দারুণ সুগন্ধি রয়েছে। চিকেন দিয়ে বানানো খাবারটি তাহদিগ হিসেবে পরিচিত। তবে কোনো কোনো সময় এতে মাছ ও অন্যান্য শাকসবজিও ব্যবহার করা হয়। খাবারটির নিচের অংশ সাদা রাইস দিয়ে নিখুঁত ভাবে তৈরি করা হয়।

১৪। জেরেশক পোলো

জেরেশক পোলো

এটা কী : কাঁটাওয়ালা লতা আর রাইস দিয়ে খাবারটি প্রস্তুত করা হয়। গতানুগতিক ভাবে এটি চিকেন পিস দিয়ে পরিবেশন করা হয়। লতা দিয়ে সুসজ্জিত করা হয় বলে এটাকে অলঙ্কৃত রাইস হিসেবেও অভিহিত করা হয়। আপনি যদি কোনো ইরানি বিয়ের অনুষ্ঠানে যোগ দেন তাহলে নিশ্চিত ভাবেই বলা যায় আপনি এই আইটেমের খাবার পাবেন।

স্বাদে যেমন : জাফরান, লেবুর রস ও অন্যান্য মশলা দিয়ে এটি প্রস্তুত করা হয়। সঙ্গে কাজুবাদাম ও পোস্তাবাদামের উপস্থিতি যেন এনে দেয় নিগুঢ় স্বাদ।

১৫। রাইস পুডিং ‘শোল জারড’

রাইস পুডিং ‘শোল জারড’

এটা কী : এই কোমল পুডিং পুরোপুরিভাবে রাইস, জাফরান ও সাদা চিনি দিয়ে তৈরি করা হয়। স্থানীয় লোকজন এটাকে সুশোভিত করাতে বেশ গুরুত্ব দিয়ে থাকেন। প্রায়ই খাবারটির ওপর পোস্তা বাদাম ও দারুচিনি দিয়ে ফুলের মতো করে নকশা করে দৃষ্টিনন্দন ভাবে পরিবেশন করা হয়।

স্বাদে যেমন :  খাবারটি ঠাণ্ডা বা গরম উভয়ই হয়ে থাকে। এই দুই ধরনের মসৃণ পুডিং স্বাদ গ্রহণের জন্য আপনাকে আকৃষ্ট করবে।

১৬। খাঁটি ইরানি হালিম

খাঁটি ইরানি হালিম

এটা কী : এই রন্ধনপ্রণালীতে ধীরস্থির ভাবে রান্না করে গোশতকে প্রস্তুত করা হয়। প্রায়ই এটি টার্কি বা ভেড়ার গোশত দিয়ে তৈরি করা হয়।

স্বাদে যেমন : সকালের স্বাস্থ্যকর নাস্তার জন্য এই খাবারটিকে বিবেচনা করা হয়। পাকানো গোশত সবশেষে দুধে চোবানো হয়। এই হালিম গরম গরম পরিবেশন করলে এটার ওপর গলিত মাখন ও দারুচিনি ব্যবহার করা হয়ে থাকে।

১৭। উপকারী রাইস বল ‘কুফতেহ বেরেনজি’

উপকারী রাইস বল ‘কুফতেহ বেরেনজি’

এটা কী : মিটবলকে চূড়ান্তভাবে রান্না করা রাইসের সাথে যুক্ত করা হয়।

স্বাদে যেমন : এটা রাইস, গোশত, স্ক্যালিয়নস ও পার্সলের (শাকবিশেষ) এক অপ্রতিরোধ্য সমন্বয়। এই মিটবলগুলো কুড়মুড়ে। আচার দিয়ে খেতে লাগে দারুণ সুস্বাদু।

১৮। ঐতিহ্যবাহী কাটলেট ‘কোটলেট’

ঐতিহ্যবাহী কাটলেট ‘কোটলেট’

এটা কী : গরুর ফ্রায়েড পিস

স্বাদে যেমন : খোলসযুক্ত কোটলেটে আলু, পিঁয়াজ, ডিম ও জাফরানের বিস্ময়কর মিশ্র স্বাদ পাওয়া যায়।

১৯। কাবাব কুবিদেহ

কাবাব কুবিদেহ

এটা কী : ভেড়া বা গরুর মাংসের তৈরি ঐতিহ্যবাহী ইরানি কাবাব।ইরানের রাস্তা থেকে সেরা রেস্টুরেন্ট পর্যন্ত এই কাবাবটি অত্যন্ত জনপ্রিয়। এটি বর্তমানে ইরানের ইরানির জাতীয় খাবারে পরিণত হয়েছে যার অপর নাম চেলু কাবাব।

স্বাদে যেমন : জাফরান, গোশত, মাখন ও টমেটো ফ্রাইয়ের সমন্বয়ে প্রস্তুতকৃত কাবাব কুবিদেহ ও রাইস খেতে দারুণ সুস্বাদু। ইরানের বিখ্যাত কিছু কাবাবের মধ্যে রয়েছে, কুবিদেহ, বার্গ, শেনজে এবং বাখতিয়ারি।

পরিশেষে সংক্ষেপে বলা যায়, ইরানি রন্ধনশিল্পের মধুরতা সহজ বিষয় নয়। তাই আপনার জন্য ভালো হবে অন্যান্য প্রস্তুতিগুলিও নিয়ে রাখা। আমরা নিশ্চিত এই রন্ধনশালার প্রতি অবশেষে আপনার ভালো লাগা তৈরি হবেই।

সূত্র: ফ্লেভরভারস ডটকম, দি ডেলিশাস ক্রিসেন্ট ডট কম ।