মরুভূমির বুকে স্থাপত্যের রত্ন দাওলাতাবাদ গার্ডেন
পোস্ট হয়েছে: ডিসেম্বর ৪, ২০১৯

মরুর বুকে সবুজ শ্যামল দৃষ্টিনন্দন বাগান কার না মন কাড়ে! কল্পনায় নিয়ে যেন যায় স্বপ্নময় জগতে। তেমনই একটি বিস্ময়কর বাগানের দেখা মিলবে ইরানের ইয়াজদে। প্রদেশটির দর্শনীয় স্থানগুলোর মধ্যে উজ্জ্বল নক্ষত্র হয়ে জ্বলজ্বল করছে বাগানটি। এছাড়া ইরানের বিখ্যাত বাগানগুলোর অন্যতম এটি। অনন্য স্থাপত্যের দাওলাতাবাদ গার্ডেন যেন মরুভূমির বুকে তৈরি করেছে সবুজের রত্ন।
ইয়াজদ অবস্থিত স্পাইস অ্যান্ড সিল্ক রোডের কাছে ইরানের মরুভূমিতে। শহরটি ‘সিটি অব উইন্ড ক্যাচার্স’ হিসেবেও পরিচিত। এছাড়া পানির চানেলের বড় একটি নেটওয়ার্কের জন্যও ইয়াজদ পরিচিত। মজার বিষয় হলো, ভূগর্ভস্থ এই চ্যানেলগুলোর মাধ্যমে একটি কূয়া থেকে উপরিভাগে পানি সরবরাহ করা হয়।
গ্রীষ্মকালে এখানে তাপমাত্রা থাকে সর্বোচ্চ। সূর্যের প্রচণ্ড প্রখরতা মোকাবেলায় ইয়াজদের বহু ভবনের সাথে উইন্ড-ক্যাচার নির্মাণ করা হয়। যা উপর দিয়ে বয়ে যাওয়া বায়ুকে টেনে নিচের দিকে প্রবাহিত করে ভবনকে করে রাখে শীতল। স্বাভাবিক ভাবে ইয়াজদ বলতে গেলেই শিল্পকর্মের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। পারস্য স্থাপত্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র এটি।
ইয়াজদে আকর্ষণীয় ও দেখার মতো বহু পর্যটন কেন্দ্র রয়েছে। এগুলোর মধ্যে আমির চাখমাক কমপ্লেক্স, জামেহ মস্কো অব ইয়াজদ, আতাশকাদেহ-ই ইয়াজদ, দাওয়ালাতাবাদ গার্ডেনের নাম উল্লেখ্যযোগ্য। এছাড়া ইরানে রয়েছে অনেক নামকরা গার্ডেন। যেগুলো এখন বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ। জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি সংস্থা ইউনেসকোর বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকায় ইরানের এমন নয়টি বাগান স্থান পেয়েছে। যার মধ্যে দাওলাতাবাদ গার্ডেন অন্যতম।
ঐতিহাসিক এই ফারসি গার্ডেনটি ইয়াজদের শাসক মোহাম্মাদ তাকি খান বাফকির নির্দেশে নির্মাণ করা হয়। এটি নির্মাণ করা হয় আফশারিদ যুগের শেষ দিকে। গার্ডেনটি ভেতরে অসাধারণ একটি কমপ্লেক্স আছে। আফশারিদ ও জান্দ রাজবংশের মূল্যহীন স্মৃতিস্তম্ভ এটি। আবাসিক ও সরকারি কাজে ব্যবহারের উদ্দেশ্যে ২৬০ বছর আগে দাওলাতাবাদ গার্ডেন নির্মাণ করা হয়। বাগানটি বছরে এখন হাজার হাজার দেশি-বিদেশি পর্যটককে আকৃষ্ট করে।
দাওলাতাবাদ গার্ডেনে ৩৩ দশমিক ৮ মিটার উচ্চতার একটি উইন্ড-ক্যাচার রয়েছে। আটকোনার এই স্থাপত্যটি ইরানের সর্বোচ্চ উইন্ড-ক্যাচার হিসেবে পরিচিত। কাঠামোটি টাওয়ারের মতো এমনভাবে নির্মাণ করা হয়েছে যেটি উপর দিয়ে বয়ে যাওয়া বাতাস খুব সহজ ও দ্রুত নিচের দিকে প্রবাহিত করতে পারে। এমনকি যে কোনো দিক থেকে বয়ে আসা বাতাসকে নিচের দিকে প্রবাহিত করে ভবন শীতল রাখে।
গার্ডেনের গোটা এলাকার আয়তন ৪০ হাজার বর্গমিটারের কাছাকাছি। ইয়াজদের একটি দীর্ঘতম পানির চ্যানেল থেকে খাল কেটে বাগানে পানি সরবরাহ করা হয়। মেহরিজের চ্যানেল থেকে আসা এই খালের দূরত্ব ৬৫ কিলোমিটার। পানির চ্যানেলটি বাগানের গাছপালা টিকিয়ে রাখতে প্রধান ভূমিকা রাখে।
বাগানটি মূলত দুটি আয়তক্ষেত্রাকার সেকশনের সমন্বয়ে গঠিত। একটি অভ্যন্তরীণ অংশ অপরটি বাহ্যিক অংশ। গার্ডেনের অভ্যন্তরীণ অংশে রাজা ও গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের বাসা ছিল। আর বাহ্যিক অংশে ছিল সরকারি অনুষ্ঠান ও খেলাধুলার ইভেন্টের ভেন্যু।
গার্ডেনের মূল গেট থেকে ভেতরের দিকে সারিবদ্ধভাবে লম্বা লম্বা সাইপ্রেস গাছ দাঁড়িয়ে আছে। গাছগুলোর ছায়ায় রয়েছে একটি দীর্ঘ পুল। পুলের চারপাশ দিয়ে রয়েছে লম্বা লম্বা পাইন গাছের সারি। মূল গেটের সামনে থেকে শুরু হয়ে পুল গিয়ে ঠেকেছে অসাধারণ স্থাপত্যের মূল ম্যানশনে। পুল পাড়ি দিয়ে দর্শনার্থীদের কাছে প্রথমেই আকর্ষণীয় যে জিনিসটি চোখে পড়বে সেটি হলো এখানকার লম্বা উইন্ড-ক্যাচার।
বাগানের অভ্যন্তরে থাকা ম্যানসনটি চারকোনাবিশিষ্ট, স্থাপত্যের দিক দিয়ে এটি অদ্বিতীয়। রঙিন স্টেন গ্লাসের জানালা অন্যরকম দৃশ্য তৈরি করেছে। ভবনের সম্মুখে একটি দীর্ঘ পুল তো রয়েছেই। পাশাপাশি ভেতরেও ছোট ছোট কয়েকটি পুল রয়েছে। ম্যানসনের অভ্যন্তরীণ নকশার বিশেষ বৈশিষ্ট্য রয়েছে। ভবনরে কাঠের দরজা ও কক্ষের রঙিন ঝাঁজরা জানালাগুলো অভ্যন্তরে মনোরম দৃশ্য তৈরি করেছে, যা মন কেড়ে নেয় পর্যটকদের।
দৃষ্টিনন্দন বাগান ঘিরে ডালিম, আঙ্গুর, পাইন এবং সাইপ্রেসসহ নানা ফলমূল ও গোলাপের মতো বিভিন্ন ফুলগাছ রয়েছে। গার্ডেনের অরেকটি সৌন্দর্য হচ্ছে এর প্রতিটি অংশ দেখতে একই রকমের। বাগানের সমস্ত নকশা একটি বিশেষ দক্ষতার সাথে মিল রেখে করা। কাশানের ফিন গার্ডেন ও কেরমানের শাজদেহ গার্ডেনের মতো দাওলাতাবাদ গার্ডেনের রয়েছে একই খ্যাতি।
ফার্স প্রদেশের পাশারগাদ ও ইরাম, ইয়াজদ প্রদেশের পাহলেবানপুর ও দাওলাতাবাদ, ইসফাহান প্রদেশের ফিন ও চেহেল সোতুন, দক্ষিণ খোরাসান প্রদেশের আকবরীহ, মাজানদারান প্রদেশের আব্বাসাবাদ, কেরমান প্রদেশের শাহজাদেহ মাহান (শাজদেহ নামেও পরিচিত) ইত্যাদি ফারসি গার্ডেন ইউনেসকোর বিশ্ব ঐতিহ্য তালিকায় ২০১১ সালের ১৯ জুন নিবন্ধিত হয়।
দাওলাতাবাদ গার্ডেন ভ্রমণের উপযুক্ত সময় বসন্তকাল। পুরো প্রাসাদটি পরিদর্শন করতে সময় লাগবে এক ঘণ্টা। সূত্র: মেহর নিউজ এজেন্সি।