বিশ্বসাহিত্যের শিরোমণি `রূমী, সা’দী, হাফেয, ফেরদৌসী, খাইয়াম’
পোস্ট হয়েছে: অক্টোবর ২১, ২০১৫

বিশ্বের বুকে কোনো ভাষায়ই সম্ভবতঃ এমন কোনো সাহিত্য পাঠক নেই যিনি ফারসি কবি মাওলানা রূমী, শেখ সা‘দী, হাফেয শীরাযী, ফেরদৌসী ও ওমর খাইয়ামের নাম শোনেন নি বা তাঁদের লেখার অন্ততঃ দু’-একটি উদ্ধৃতি পাঠ করেন নি। কারণ, তাঁরা শুধু ফারসি সাহিত্যের বা ইরানের শ্রেষ্ঠতম কবি ছিলেন না, বরং তাঁরা ছিলেন সারা বিশ্বের সাহিত্য গগনের শ্রেষ্ঠতম নক্ষত্র। আর তাঁরা কোনো যুগ বিশেষের জন্য বিশ্ব সাহিত্যের শিরোমণি ছিলেন না, বরং তাঁদের সাহিত্য কালোত্তীর্ণ- যে কারণে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে তা বিশ্বের সর্বত্র সমভাবে সমাদৃত হয়ে রয়েছে এবং থাকবে। কিন্তু ফারসি সাহিত্য কেবল তাঁদের অবদানের মধ্যেই সীমিত নয়, বরং তাঁদের পরেও সকল যুগেই ফারসি ভাষাভাষীদের মধ্যে বহু প্রতিভাধর কবি ও সাহিত্যিকের জন্ম হয়েছে যাঁরা এ ভাষাকে একটি চির জীবন্ত ও প্রাণময় ভাষা হিসেবে ধরে রেখেছেন ও রাখছেন।
বস্তুতঃ বিশ্ব সাহিত্যের শীর্ষতম পদগুলো যে ফারসি কবিগণ দখল করে রেখেছেন এটাই স্বাভাবিক। কারণ, ফারসি ভাষা একটি অত্যন্ত সুমিষ্ট, সুললিত ও প্রাঞ্জল ভাষা এবং একই সাথে তা বীরত্বব্যঞ্জক ভাব প্রকাশের উপযোগী অত্যন্ত বলিষ্ঠ ভাষা। এ কারণে ফারসি ভাষা ইতিহাসের সকল অধ্যায়ে কেবল আজকের ইরান ভূখণ্ডের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং এ ভাষা ইরানের ভৌগোলিক সীমান্ত অতিক্রম করে আশেপাশের বিশাল ভূখণ্ডে ছড়িয়ে পড়েছিল- যাতে শামিল ছিল আজকের মধ্য এশিয়ান দেশগুলো, আফগানিস্তান ও ভারত উপমহাদেশ।
এ প্রসঙ্গে আমরা স্মরণ করতে পারি যে, বাংলার তৎকালীন সুলতান গিয়াসুদ্দীন আযম শাহের দাওয়াতের জবাবে কবি হাফেয শীরাযী তাঁকে একটি গযল লিখে পাঠিয়েছিলেন যার একটি দ্বিপদী ছিল এরূপ :
শের্কা- শেকান্ শাভান্দ্ হামে তুতিয়ানে হেন্দ্
যিন্ ক্বান্দ্ ের্পসী কে বে বাঙ্গালে মি রাভাদ্
(এই যে ফারসি মিছরি বাংলায় যাচ্ছে ভারতের সকল তোতাপাখি তা থেকে মিষ্টিমুখ করুক।)
এতে হাফেয বলতে চেয়েছেন যে, ফারসি ভাষা মিছরিতুল্য সুমিষ্ট যা সমগ্র ভারত উপমহাদেশের কবি- সাহিত্যিকগণের ভাষাকে সুমিষ্টতা দানে সক্ষম হবে এবং বাস্তবেও ফারসি ভাষার শব্দাবলি ও ফারসি সাহিত্য ভারত উপমহাদেশের শীর্ষস্থানীয় ভাষাসমূহে ও এসব ভাষার সাহিত্যে পরম যতেœ সমাদৃত হয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে রেখেছে। ভারত উপমহাদেশে ফারসি ভাষার কাব্য ও গদ্য সাহিত্য উভয়ই ব্যাপকভাবে সমাদৃত হয়েছে, শুধু তা-ই নয়, এখানে এ ভাষার কবিতা ও গদ্য সাহিত্যের ব্যাপক চর্চা হয়েছিল, এমনকি ঔপনিবেশিক যুগেও যার ধারাবাহিকতা অব্যাহত ছিল।
বাংলা ও ভারত উপমহাদেশের ভাষা ও সাহিত্যের ইতিহাসের প্রতি দৃষ্টি দিলে আমরা দেখতে পাই যে, ফারসি ভাষা ও সাহিত্য শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এ ভূখণ্ডের ভাষাসমূহের ও এসব ভাষার সাহিত্যের জন্য অভিভাবক এবং লালনকারী ও পরিবৃদ্ধিকারীর ভূমিকা পালন করেছে।
বাংলা ও ভারত উপমহাদেশে ফারসি ভাষা ও সাহিত্যের চর্চা এতোই ব্যাপক ছিল যে, এখানে এ ভাষায় কবিতায় ও গদ্যে প্রচুর উন্নত মানের গ্রন্থ প্রণীত হয়েছিল। শুধু তা-ই নয়, এখানে ফারসি ভাষার বেশ কয়েকটি অভিধান রচিত হয়েছিল। তাছাড়া বাংলা ভূখণ্ডে প্রকাশিত সর্বপ্রথম পত্রিকাও ছিল ফারসি ভাষায়। অন্যদিকে বাংলা ও ভারত উপমহাদেশে বহু শতাব্দী যাবৎ ফারসি ছিল সরকারী ভাষা ও শিক্ষার মাধ্যম।
এছাড়া ওসমানী শাসনামলে সমগ্র তুর্কী খেলাফতে ফারসি রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা লাভ করে। সে যুগে রূমী ও হাফেযের কবিতা ও গযলের ওপরে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ ভাষ্য রচিত হয়েছিল। তৎকালীন তুর্কী ওসমানী খেলাফতভুক্ত বর্তমান ইউরোপীয় দেশ বসনিয়ার কবিগণ ফারসিতে কবিতা রচনা করতেন। আর শেখ সা‘দীর ইন্তেকালের মাত্র চল্লিশ-পঞ্চাশ বছর পরে চীনের নৌকার মাঝিদেরকে সা‘দীর গযল গেয়ে গেয়ে নদীর বুকে নৌকা বাইতে দেখা যায়। তাদের গাইতে শোনা যায় :
যবে আমি তোমাতে হারালাম হৃদয়খানি মোর
হলাম আমি নিমজ্জিত সুগভীর চিন্তার সায়রে
যখনি ও যেখানে দাঁড়াই আমি নামাযের তরে
মনে হয় যেন তুমিই মেহরাব আমার সমুখে
শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে ফারসি ভাষা সভ্য দুনিয়ায় রূপকথার জগতের ন্যায় এক বর্ণাঢ্য স্বপ্নিল জগতরূপে পরিগণিত হয়ে এসেছে। বস্তুতঃ কবিতা ও গদ্য সাহিত্য নির্বিশেষে ফারসি সাহিত্য নিয়ে যদি গভীরভাবে অধ্যয়ন ও চিন্তা-গবেষণা করা হয় তাহলে তাতে ইরানের রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক, সামাজিক, এমনকি অর্থনৈতিক ইতিহাসের প্রচুর উপাদান পাওয়া যাবে। সুতরাং কেউ যদি ইরানকে ভালোভাবে জানতে চান তাহলে তাঁকে বিগত হাজার বছরে ইরানের কবি ও লেখকগণের রচিত ফারসি সাহিত্য গভীর অভিনিবেশ সহকারে অধ্যয়ন করতে হবে।
ইরান ভূখণ্ড কেবল কালোত্তীর্ণ কাব্য ও সাহিত্যের জন্মদাতা কবি ও সাহিত্যিকেরই জন্ম দেয় নি, বরং এখানে জন্মগ্রহণ করেছেন বিপুলসংখ্যক ইসলামী মনীষী ও বিজ্ঞানী। বস্তুতঃ এটা এক সর্বজনবিদিত বিষয় যে, ইসলামের ইতিহাসের শ্রেষ্ঠতম মনীষী, দার্শনিক ও বিজ্ঞানীদের বেশির ভাগই ইরানে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁরা সমগ্র মুসলিম জাহানের বিপুলসংখ্যক পাঠকদের বিষয়টি সামনে রেখে তাঁদের গ্রন্থাবলি প্রধানতঃ আরবি ভাষায় প্রণয়ন করলেও তাঁরা ফারসি ভাষায় গ্রন্থ প্রণয়ন ও এ ভাষার প্রচার- প্রসারের বিষয়টিকেও উপেক্ষা করেন নি।
বিশ্ববিশ্রুত চিকিৎসা বিজ্ঞানী আবূ ‘আলী ইবনে সীনা স্বয়ং বলেন যে, ‘সকলে যাতে বুঝতে পারে’ সে লক্ষ্যে তিনি তাঁর দনেশ্নমেহ্ আ‘লা গ্রন্থটি ফারসি ভাষায় প্রণয়ন করেন।
মহাকবি আবুল কাসেম ফেরদৌসীর আগে আবূ মান্সূরী তূসী শহ্নমেহ্ (শাহ্নামা) নামে একটি গ্রন্থ রচনা করেন যাতে তিনি ইরানের রাজা-বাদশাহ্দের ইতিহাস বর্ণনা করেন; গ্রন্থটির কিছু অংশ এখনো অবশিষ্ট আছে, বেশির ভাগই হারিয়ে গিয়েছে। দৃশ্যতঃ মহাকবি ফেরদৌসী অভিন্ন শিরোনামে লিখিত তাঁর মহাকাব্যের জন্য এ গ্রন্থটিকে তথ্যসূত্র হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন। আবূ মান্সূরীর শহ্নমেহ্র অবশিষ্টাংশটি ফারসি গদ্যের প্রাচীনতম নিদর্শন হিসেবে পরিগণিত হয়ে থাকে।
ইসলাম গ্রহণকারী বহু অনারব জাতি অচিরেই আরবি ভাষাকে তাদের সরকারী ভাষা হিসেবে গ্রহণ করে এবং এরপর খুব শীঘ্রই তাদের স্থানীয় ভাষা বিলুপ্ত হয়ে যায়। কিন্তু ইরানে ইসলামী যুগের প্রথম দুই-তিন শতাব্দী কালে তৎকালীন ইরানে প্রচলিত দেশী ভাষা পাহ্লাভী অবক্ষয়ের শিকার হলেও অচিরেই ফারসি দারী তার স্থলাভিষিক্ত হয়Ñ প্রকৃতপক্ষে যা পাহ্লাভী ভাষার গর্ভ থেকেই জন্মলাভ করে। আর এ ভাষা জন্মলাভের পর বেশি দিন না যেতেই কবি ও সাহিত্যিকগণ এ নতুন ভাষায় গ্রন্থ রচনা করতে শুরু করেন এবং বিশেষ করে হিজরি ৯ম ও ১০ম সালে (খ্রিস্টীয় পঞ্চদশ ও ষোড়শ শতাব্দীতে) এ ভাষায় বেশ কিছু সংখ্যক ব্যতিক্রমী প্রতিভাধর কবি ও সাহিত্যিকের জন্ম হয়; তাঁরা তাঁদের রচনাবলি দ্বারা এ ভাষাকে সমুন্নত মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত করেন। এ সময় ফারসি ভাষায় এমন কিছু সংখ্যক কাব্যগ্রন্থ রচিত হয় যা বিশ্ব সাহিত্যের অঙ্গনে অমর ও চির অমøান হয়ে রয়েছে।
ফারসি সাহিত্যের এতো জনপ্রিয় হওয়ার কারণ এই যে, ইরানী কবি ও সাহিত্যিকগণ তাঁদের পূর্বসূরিদের রেখে যাওয়া সাহিত্যিক রচনাবলির প্রতি যথাযথ দৃষ্টি প্রদান করেছিলেন; তাঁরা সুদীর্ঘ কাল ধরে অনবরত তাঁদের পূর্বসূরিদের রচনাবলি নিয়ে অধ্যয়ন ও গবেষণা করেন। বস্তুতঃ সাসানী রাজবংশের শাসনামলের পাহ্লাভী সাহিত্য তাঁদেরকে একটি সমৃদ্ধ তথ্যসূত্র ও সাহিত্যের বিভিন্ন কলাকৌশল উপহার দিয়েছিল- যা পরবর্তী কালে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে ব্যবহৃত হয়েছে ও হচ্ছে এবং অত্যুন্নত সাহিত্য উপহার দিতে ফারসি কবি ও সাহিত্যিকগণকে সহায়তা করে আসছে।
ইরানী কবি, সাহিত্যিক ও মনীষিগণ তাঁদের রচনাবলির মাধ্যমে একটি টেকসই ঐতিহ্য বিনির্মাণ করেন এবং তাঁদের উত্তরসূরিরা তার হেফাযত করেন। কারণ, তাঁরা জানতেন যে, তাঁরা জনগণের জন্য লিখছেন এবং এ কারণে তাঁরা সাধারণ মানুষের জন্য সহজবোধ্য রীতিতে লিখেছেন। তাঁরা এ ব্যাপারেও সচেতন ছিলেন যে, তাঁদেরকে তাঁদের কাব্যিক, সাহিত্যিক ও শৈল্পিক সৃৃষ্টিগুলোতে ব্যাপক জনগণের চিন্তাচেতনা ও আদর্শকে প্রতিফলিত করতে হবে যাতে তারা তাদের সুপ্রাচীনতম স্মৃতিগুলোকে সব সময় স্মরণে রাখতে পারে।
মহাকবি ফেরদৌসী তাঁর মহাকাব্য শহ্নমেহ্ রচনার সময় ঠিক এ কাজটিই করেছিলেন। তাঁর চূড়ান্ত লক্ষ্য ছিল ইরানকে ও দেশপ্রেমিক ইরানীদেরকে পুনরুজ্জীবিতকরণ। তাই তিনি তাঁর যৌবন কাল সহ পরবর্তী পুরো জীবনকালটাই এ কাজে ব্যয় করেন। এর ফল হয়েছিল এই যে, তাঁর পক্ষে বিশ্ব সাহিত্যে অমর এক অবদান রেখে যাওয়া সম্ভব হয়।
ফারসি সংস্কৃতি ও সাহিত্যের এ মহানায়ক- যিনি ছিলেন আবেগ, উচ্ছ্বাস ও বীর্যবত্তার এক অনুসরণীয় দৃষ্টান্ত- জানতেন যে, পুনরুজ্জীবিত, পরিমার্জিত ও সুসংস্কৃত ফারসি ভাষা ইরানী জনগণের চেতনা পুনরুজ্জীবনের জন্য এক প্রাণ সঞ্জীবনী সুধার ন্যায় কাজ করবে এবং এ জাতিকে নতুন করে সুদীর্ঘ জীবনের অধিকারী করবে। তিনি এ-ও জানতেন যে, এ ভাষা তখনি সর্বোত্তমভাবে এ কাজ করতে সক্ষম হবে যদি তা জনপ্রিয় রীতিতে রচিত এক সাহিত্য সৃষ্টির মোড়কে উপস্থাপন করা যায় এবং তাতে যদি তাদের দেশের প্রাচীনকালীন উপাখ্যান ও গল্পগাথা পুনরায় তুলে ধরা হয়।
আবুল কাসেম ফেরদৌসী ও আরো কয়েক জন কবি এবং আবুল ফায্ল বেইগীর ন্যায় লেখকগণ তাঁদের রচনাবলিতে ফারসি ভাষার এমন এক মডেল রেখে গেছেন যা প্রাঞ্জলতা, মাধুর্য ও বীর্যবত্তার দিক থেকে আজো অনুসরণীয় দৃষ্টান্ত হয়ে রয়েছে। এ ভাষা পরবর্তী প্রজন্মসমূহের ফারসি কবিদের জন্য অনুসরণীয় মডেল ও মানদণ্ড হিসেবে পরিগণিত হয়ে আসছে।
বস্তুতঃ এসব ইরানী কবি, সাহিত্যিক ও মনীষীর ভাষা ও রচনাবলি ফারসি ভাষাকে ইসলামের দ্বিতীয় ভাষার মর্যাদায় উন্নীত করেছে- যার ফলে ইরানীরা বিশ্বের যে কোনো স্থানেই থাকুক না কেন, কেবল এ ভাষায় কথা বলা ও ইরানী হওয়ার কারণে, তাদেরকে বিশেষ সম্ভ্রমের দৃষ্টিতে দেখা হয়।
বস্তুতঃ ফারসিভাষী হওয়া এবং বিশ্বব্যাপী ফারসি ভাষা ও সাহিত্যের ক্রমবর্ধমান জনপ্রিয়তার কারণে যে কোনো ইরানীর জন্যই নিজেকে ধন্য মনে করার কারণ রয়েছে। আর এটা ইরানের নতুন প্রজন্মের জন্য একটি মযবুত ভিত্তি তৈরি করে দিয়েছে- যার ওপরে ভিত্তি করে তারা অব্যাহতভাবে ইরানী সংস্কৃতিকে অধিকতর পরিমার্জিত ও সুসংস্কৃত করতে থাকবে।
যেহেতু ফারসি ভাষা ও সাহিত্যের এ কালোত্তীর্ণ ও বৈশ্বিক পর্যায়ের উন্নয়নের কাজটি ফেরদৌসীর মাধ্যমে সূচিত হয়েছিল সেহেতু ফেরদৌসী ফারসি কবিতারূপ প্রাসাদের স্থপতি হিসেবে সুবিখ্যাত হয়েছেন। আর এ ভাষার পুনরুজ্জীবনের ক্ষেত্রে তিনি শুধু সূচনাকারীই নন, বরং এ কাজে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনকারীদের মধ্যে সর্বাধিক বিখ্যাতও বটে। তবে বিভিন্ন অসাধারণ প্রতিভাধর কবি, সাহিত্যিক ও লেখক ভাষা ও সাহিত্যের বিভিন্ন আঙ্গিকের ক্ষেত্রে এ দিগন্তকে পরিপূর্ণ করেন।
রূদাকীকে ফারসি কবিতার পিতা বলা হয়। র্ফারোখী সিস্তানী ছিলেন অত্যন্ত সূক্ষ্ম বিশ্লেষণকারী এবং বর্ণনা ক্ষমতার ক্ষেত্রে অপ্রতিদ্বন্দ্বী। মানূচেহ্রী ছিলেন প্রকৃতির লেখনী চিত্র অঙ্কনের দক্ষতায় অনন্য। নাসের খোসরূ ছিলেন ‘ফারসি ভাষার মুক্তা’র বিরাট ভক্ত। মাস্‘উদে সা‘দ্ তাঁর অনুপম সৌন্দর্য সৃষ্টিকারী কবিতার জন্য বেঁচে ছিলেন। ওমর খাইয়াম ছিলেন বহু প্রশ্ন উত্থাপনের কবি- যাঁর নাম বিশ্বের সর্বত্র প্রায় প্রতিটি শিক্ষিত মানুষেরই জানা। আর ছানাঈ ছিলেন ছিলেন একমাত্র এক ও অদ্বিতীয় আল্লাহ্ তা‘আলার মুখলিস ইবাদতকারী। আমরা আন্ওয়ারীর মধ্যে একজন সুদক্ষ উস্তাদ কবিকে দেখতে পাই। আর খাকানী ছিলেন এমন একজন বর্ণনাকারী- যিনি ছিলেন এক ব্যতিক্রমী হৃদয়ের অধিকারী ‘যে হৃদয় যা কিছু দর্শন ও পর্যবেক্ষণ করে তা থেকেই শিক্ষা গ্রহণ করে’।
অনুরূপভাবে আমরা নিযামীর মধ্যে এমন একজন দুনিয়াত্যাগী যাহেদ সাধককে দেখতে পাই যিনি তাঁর কবিতায় জাদুময় শব্দাবলির সমাহার ঘটিয়েছেন। ফারীদুদ্দীন ‘আত্তার হচ্ছেন সূর্যের পরিধিকে ছাড়িয়ে যাওয়া একটি অদৃশ্য ছায়া। আর মাওলানা রূমী হচ্ছেন ‘মিলন দিবসের’ সন্ধানী। শেখ সা‘দী হচ্ছেন ফারসি গদ্যের এমন এক উস্তাদ যাঁর গদ্য ও কবিতা সম্বন্ধে কারো পক্ষেই প্রশ্ন তোলা সম্ভব নয়- যাঁর সুনাম ও সুখ্যাতি এ ধরণীর প্রতিটি প্রত্যন্ত অঞ্চলে পৌঁছে গেছে। আর হাফেয শীরাযী হচ্ছেন ‘অদৃশ্য লোকের কণ্ঠস্বর’ (লিসানুল গায়ব্্)।
খাজূ হচ্ছেন কাব্যরীতির স্রষ্টা ও উস্তাদ। সালমান সাবোযী ও কামাল খোযান্দীÑ উভয়ই বিখ্যাত কবি। ‘আবদুর রাহমান জামী বিখ্যাত কবিদের বৃত্তের পরিধির চূড়ান্ত সংযোজক। মোহতাশাম কাশানী এমন একজন অনন্যসাধারণ প্রতিভা- শোকগাথা রচনার ক্ষেত্রে যাঁকে ছাড়িয়ে যাওয়া কারো পক্ষেই সম্ভব নয়। আর সাএব্ তাঁর ‘নিরাপদ আশ্রয়ের’ এক কোণে বসে থাকেন। সবশেষে, হাতেফ ইসফাহানী হচ্ছেন সত্যের প্রত্যক্ষকারী- যিনি দেখতে পান :
তিনি হচ্ছেন এক ও একমাত্র; নাই কিছু কেবল তিনি ছাড়া
তিনি হচ্ছেন অনন্য; নাই কোনো খোদা কেবল তিনি ছাড়া
ফারসি সূফী সাহিত্য
ফারসি সূফী সাহিত্য কেবল সকল ইরানীর মহামূল্য উত্তরাধিকার নয়, বরং সমগ্র বিশ্ববাসীর জন্য স্থায়ী মূল্যমানের অধিকারী এক অনন্য উত্তরাধিকার। এ সাহিত্য অন্যান্য সংস্কৃতিতে যা কিছু বিশ্বজনীন ও সর্বজনীন মূল্যবোধ হিসেবে পরিগণিত হয়ে থাকে তার সাথে ফারসি সংস্কৃতির সংযোগ সাধন করে থাকে এবং এ সাহিত্য হচ্ছে মানুষের নিষ্কলুষ সমুন্নত চেতনার সত্যিকারের প্রতিফলন।
যেসব বিষয় মানুষের পার্থিব আশা-আকাক্সক্ষার সাথে সম্পর্কিত সেসবের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে এবং যেসব বিষয় মানুষকে আত্মিক উন্নতি ও পরমানন্দের দিকে এগিয়ে দেয় সেদিকে এগিয়ে দিয়ে ফারসি গযল কোমলতা, মিষ্টতা ও চৈন্তিক সূক্ষ্মতার সমুন্নততম স্তরে উপনীত হয়েছে। এ অনবদ্য সাহিত্যিক হাতিয়ারের মাধ্যমে মানুষের হৃদয়ের অন্তঃস্থলে লুক্কায়িত রহস্যগুলোকে সমুদ্ভাসিত করা হয়েছে।
ফারসি ভাষার সূফী সাহিত্য এমন এক ধারায় অগ্রসর হয়েছে যে ধারার লক্ষ্য হচ্ছে সকল মানুষকে সে ধরনের সমস্ত বিষয় থেকে মুক্ত করাÑ যা তাকে মালিকানা ও সংশ্লিষ্টতার বন্ধনে বন্দি করে, তার জীবনকে বস্তুগত জীবনের মধ্যে সীমাবদ্ধ করে দেয় এবং তাকে অনুকরণপ্রিয়তা ও কৃত্রিমতায় প্রলুব্ধ করে। এ সাহিত্য সেই সাথে তাকে মুক্ত করে আত্মপূজা ও অহংবোধ থেকে, তাকে রক্ষা করে অন্যায় ও অবৈধ দাসত্ব থেকে ও শয়তানের ফাঁদ থেকে। এ বিশেষ ধরনের শৈলীর সাহিত্যের একটি মূল্যবান সংকলন মানবিক অস্তিত্বের প্রিয়তম মূল্যবোধের দ্বারা পরিপূর্ণ এবং তা ইসলামের সমুন্নত বাণীসমূহকে অলঙ্কৃত করে উপস্থাপন করে।
এখানে একটি লক্ষণীয় চমকপ্রদ বিষয় হচ্ছে এই যে, এ ধরনের সাহিত্যে আমরা সাধারণ মানুষকে মহিমান্বিত রূপে উপস্থিত দেখতে পাই। এ ধরনের সাহিত্য সামাজিক বাস্তবতার এবং বিশ্বজনীন ও সর্বজনীন সত্যের কথা বলে। এ সাহিত্য সেই সব মানুষের কথা বলে যারা তাদের গোটা জীবনকে কতক স্বৈরাচারের স্বেচ্ছাচারিতার জোয়াল কাঁধে বহন করে অথবা অন্য কারো বা কতক লোকের দাসত্বের শৃঙ্খলে আবদ্ধ থেকে কাটিয়েছে এবং এ কারণে বিভিন্নভাবে দুঃখকষ্ট ও যাতনা সহ্য করতে বাধ্য হয়েছে, কিন্তু এখন এ সাহিত্যের পাতায়- যা ভ্রাতৃত্ব ও বন্ধুত্বের কথা বলে এবং ঐক্য, একনিষ্ঠতা ও আন্তরিকতার প্রশংসা করেÑনিজেদেরকে মুক্ত ও স্বাধীন রূপে দেখতে পাচ্ছে।
কী করে চাহ তুমি পুড়ে যাক সমগ্র শহর
কিন্তু টিকে থাক গৃহ তব অক্ষত নিরাপদ?
কী করে ধনী ব্যক্তি সুখাদ্য ভক্ষণ করে
জানে যবে দরিদ্রের কোনো খাদ্য নেই?
কাফেলা আসে যবে কারো প্রিয় জন সহ
মেহেরবান হয় না’ক কভু আনন্দিত
সেই ম্রিয়মানের কথা অন্তরে ভেবে
স্বজন যার পড়ে আছে বিদেশ-বিভূঁইয়ে
যবে তুমি দেখো বসে আছে এক কোণে
বেচারা ইয়াতীম কোনো নত করে শির
চুমো না নিজ সন্তানে পাছে ব্যথা পায় সে
আসমান-যমীন সব কেঁপে কেঁপে ওঠে
যবে কোনো ইয়াতীম কাঁদে মনোদুখে
(শেখ সা‘দী)
এই সূফী সাহিত্য আমাদেরকে স্বীয় প্রবৃত্তির কামনা-বাসনা ও ইন্দ্রিয়জ ভোগ-বিলাসিতা থেকে নিজেদেরকে মুক্ত করার জন্য অনুপ্রাণিত করে এবং আমাদেরকে জানিয়ে দেয় যে, মানুষের প্রকৃত উন্নতি ও অগ্রগতি কেবল সত্যের পথেই নিহিত রয়েছে। এ সাহিত্য বলে : ‘আমি আমার স্বীয় আমিত্বকে আহ্বান করলাম আল্লাহ্র আনুগত্য করার জন্য, কিন্তু সে অস্বীকার করল। তখন আমি আমার আমিত্বকে পরিত্যাগ করলাম এবং চলে গেলাম পরম ক্ষমতাবানের সমীপে।’
প্রকৃতপক্ষে সকল ধরনের ও রূপের সূফী সাহিত্যই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে অভিন্ন বিশ্বজনীন সত্যের কথা বলে আর তা হচ্ছে আল্লাহ্ তা‘আলার তাজাল্লীতে ব্যক্তিসত্তার বিলয়।
অনুবাদ : নূর হোসেন মজিদী