রবিবার, ৬ই এপ্রিল, ২০২৫ খ্রিস্টাব্দ, ২৩শে চৈত্র, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

English

প্রবাদ: ভিক্ষুক অলস হলে বাড়িওয়ালার কী দোষ

পোস্ট হয়েছে: আগস্ট ২১, ২০২৩ 

news-image

‘ভিক্ষুক অলস হলে বাড়িওয়ালার কী দোষ’? এই প্রবাদ সৃষ্টির পেছনে যে গল্পটি লুকিয়ে আছে সেটি এরকম: এক ভদ্রলোক ভালো টাকা-পয়সার মালিক ছিলেন, যাকে বলা যায় ধনী বা সম্পদশালী। বড়লোক হয়ে গেলে মানুষ অনেক সময় কৃপণ হয়ে যায়। কিন্তু আমাদের গল্পের ধনী ভদ্রলোক ছিলেন বেশ উদার এবং মহানুভব। সেজন্য সমাজে তার খ্যাতি ছিলো।

তার বাড়ির দরোজা সবার জন্য উন্মক্ত ছিল। অভাবী, গরীব, দুখি, ক্ষুধার্ত মানুষেরা তার বাড়ি চিনতো এবং সময়ে-অসময়ে বাড়িতে আসা-যাওয়া করে টাকা-পয়সা সাহায্য নিয়ে নিজেদের ক্ষুধা নিবারণ করতো। একদিন এক গরীব মুসাফির ওই শহরে ঢুকলো যে শহরে বাস করতো সেই ধনী ভদ্রলোক। মুসাফির একটু খাবারের সন্ধানে এদিক-ওদিক ঘোরাঘুরি করছিলেন। চলতে চলতে ওই ধনী ভদ্রলোকের কথা তার কানে পৌঁছলো। মুসাফির,ভদ্রলোকের বাসার ঠিকানা সংগ্রহ করে তার বাসায় চলে গেল।

ঘরের দরোজা খোলাই ছিল। মানুষের যাওয়া-আসা থেকে বোঝাই যাচ্ছিলো অতিথি আপ্যায়নের পাতিল গরম আছে এখনও। দয়া এবং মেহেরবানির বাতিও জ্বলন্ত আছে। গরিব মুসাফির অন্যান্যদের মতোই ঘরে প্রবেশ করলো এবং এক কোণে গিয়ে দাঁড়ালো। না পা নাড়িয়ে একটু এদিক ওদিক গেল, আর না একুট মুখ নাড়ালো। কেবল দেখছিল ক্ষুধিত লোকজন ধনী ভদ্রলোকের বাড়ির রান্নাঘরের দিকে যাচ্ছে, খাবার নিচ্ছে এবং ফিরে আসছে। কিন্তু মুসাফির ঠায় দাঁড়িয়েই থাকলো, একটুও নড়লো না তার জায়গা থেকে। সময়টা দুপুরই ছিল। দুপুর বেলার খাবারের সময়ও প্রায় দু’এক ঘণ্টা চলে গেছে। দেখলো, লোকজনের আসা-যাওয়ায় ঘর ভর্তি হয়ে যাচ্ছে আবার খালিও হয়ে যাচ্ছে। যে-ই আসতো সালাম দিয়ে খাবারের প্লেটে খাবার নিয়ে চলে যেত।

আস্তে আস্তে লোকজনের আসা-যাওয়া শেষ হলো এবং আর কেউ খাবার নিতে ধনী ভদ্রলোকের বাড়িতে এলো না। খাবার পরিবেশনকারীদের সহযোগিতা করতে এসে ধনী ভদ্রলোক মুসাফিরকে দেখতে পেল। সামনে এগিয়ে গিয়ে মুসাফিরকে সালাম করে বললো: এখানে দাঁড়িয়ে আছো কেন? গরীব মুসাফির বললো: আমি একজন মুসাফির। গরীব এবং বেশ ক্ষুধার্ত। এই শহরের লোকজন আমাকে বললো যে আপনার বাসায় এলে খালি হাতে ফিরবো না। অবশ্যই আমাকে একটু খাবার দেওয়া হবে। আমি এখানে দুই ঘণ্টা ধরে দাঁড়িয়ে আছি কিন্তু কেউ তো আমাকে কিছু জিজ্ঞেসও করলো না, কে আমি, কোত্থেকে এসেছি, কিছুই জানতে চাইলো না, খাবারও দিলো না।

ধনী ভদ্রলোক ফকির মুসাফিরের কথা শুনে কষ্টই পেল। সেবকদের ডেকে এনে জানতে চাইলো: এই মুসাফিরের খোজ কেউ নিলো না কেন? কেনইবা তাকে খাবার দেওয়া হলো না? খাবার পরিবেশনকারী সেবকরা মুসাফিরের দিকে তাকালো এবং বললো: আমরা তো কেউই তাকে দেখি নি। দেখতে পেলে তো কোনো কথাই ছিলো না। তার সাথে অন্যদের তো কোনো পার্থক্য আমাদের কাছে নেই। তাকেও আমরা এক প্লেট খাবার দিয়ে দিতাম, সমস্যা তো ছিল না। ও মনে হয় আদৌ রান্নাঘরেই আসে নি খাবার নিতে। ধনী ভদ্রলোক আদেশ দিলো গরীব মুসাফিরের জন্য খাবার তৈরি করতে।

কী আর করা। উঠেপড়ে লেগে গেল সবাই আবার রান্না করতে। দ্রুত রান্না তৈরিও হয়ে গেল। ধনী ভদ্রলোক ফ্লোরে একটা দস্তরখান বিছালো এবং সকল কর্মচারীকে সঙ্গে নিয়ে মুসাফিরসহ একসঙ্গে খাবার খেতে শুরু করে দিল। খাবারের মাঝখানে ধনী ভদ্রলোক মুসাফিরের কাছে ক্ষমা চেয়ে বললো: আপনার প্রতি যে যথাযথ মনোযোগ দেওয়া হয়ে ওঠে নি, সেজন্য মাফ করবেন। কাজের লোকদেরকে আবারও শাসিয়ে বললো: কেন তোমরা এই ভুলটা করলে, কেন একজন মুসাফিরের প্রতি তোমরা খেয়াল রাখো নি। এতো সময় ধরে দাঁড়িয়ে আছে অথচ তোমরা তাকে খাবার দাও নি। এটা মোটেই ঠিক কাজ করো নি।
ধনী ভদ্রলোকের কথা শুনে কর্মচারীদের একজন একটু অধৈর্য হয়ে গেল। সে বিনয়ের সঙ্গে বাড়িওয়ালাকে বললো: আপনি আমাদেরকে কেন জিজ্ঞেস করছেন, কেন ওই মুসাফিরকে আমরা খাবার দেই নি? দয়া করে আপনি তাকেই তো জিজ্ঞেস করতে পারেন-কেন সে কোনো কথা বললো না? কেন অন্যদের সঙ্গে রান্নাঘরে গিয়ে খাবার নিলো না? সে-ই তো অলসতা করেছে, কোনো কথা বলে নি কিংবা এক পা-ও সামনে বাড়ায় নি। তাহলে আমাদের অপরাধটা কোথায়?

কর্মচারীর কথায় মৃদু ক্ষোভের ছোঁয়া থাকলেও বাড়িওয়ালা তেমন একটা রাগ দেখালন না। তিনি বরং কর্মচারীর কথায় সায় দিয়ে বললেন: হ্যাঁ! ঠিকই বলেছো! ওরও উচিত ছিল সামনে এগিয়ে গিয়ে কিছু বলা। তাহলে আর ক্ষুধার কষ্ট ভোগ করতে হতো না। এই ঘটনার পর থেকেই যখনই কেউ হাতের নাগালে থাকা কোনো সুযোগ-সুবিধাকে কাজে না লাগিয়ে বঞ্চিত হতো, বলা হতো: ভিক্ষুক অলস হলে বাড়িওয়ালার কী দোষ?
/পার্সটুডে/

মূল ফার্সি গল্পের রূপান্তর: নাসির মাহমুদ