বুধবার, ২৬শে ফেব্রুয়ারি, ২০২৫ খ্রিস্টাব্দ, ১৩ই ফাল্গুন, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

English

ঢাকায় ‘আশুরার বার্তা বহনে কবিদের ভূমিকা’ শীর্ষক সাহিত্য সভা

পোস্ট হয়েছে: অক্টোবর ৬, ২০১৭ 

news-image

রাজধানী ঢাকার ইরান সাংস্কৃতিক কেন্দ্র মিলনায়তনে ‘আশুরার বার্তা বহনে কবিদের ভূমিকা’ শীর্ষক সাহিত্য সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। প্রবীণ সাংবাদিক ও কবি এরশাদ মজুমদারের সভাপতিত্বে শুক্রবার সকালে জাতীয় কবিতা মঞ্চ ও ইরান সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ঢাকাস্থ ইরানি দূতাবাসের রাষ্ট্রদূত ড. আব্বাস ভায়েজি দেহনাভী। জাতীয় কবিতা মঞ্চের সভাপতি কবি মাহমুদুল হাসান নিজামীর সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের কালচারাল কাউন্সেলর জনাব সাইয়্যেদ মূসা হোসেইনী, ব্রিগেডিয়ার (অবসরপ্রাপ্ত) নাসিমুল গণি, বাংলাদেশের প্রথম নারী হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ কবি অধ্যাপক ডা. হাসিনা বানু, বিশিষ্ট ইসলামি চিন্তাবিদ কবি ড. ঈসা শাহেদী, প্রখ্যাত ছড়াকার কবি আবু সালেহ, কবি ও গবেষক আবদুল মুকীত চৌধুরী, উদিচি শিল্পী গোষ্ঠীর প্রতিষ্ঠাতা সদস্য আবৃত্তিকার বদরুল হাসান খান, নজরুল ইনস্টিটিউটের ডেপুটি ডিরেক্টর কবি রেজাউদ্দীন স্টালিন, ইরানি রাষ্ট্রদূতের পত্নী মিসেস যেইনাব ভায়েজী দেহনাভী ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. নাজিব ওয়াদুদ।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে ঢাকাস্থ ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের রাষ্ট্রদূত আব্বাস ভায়েজী দেহনাভী বলেন, ‘ন্যায় প্রতিষ্ঠায় কবিতা একটি শক্তিশালী মাধ্যম। আর আদর্শ বিকাশে শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতির গুরুত্ব অপরিসীম।’

তিনি বলেন, মানুষ তার চিন্তা-চেতনা, আদর্শ, দর্শন ও অভিব্যক্তিকে বিভিন্ন মাধ্যমে প্রকাশ করে থাকে। যেমন, পেইন্টিং, চলচ্চিত্র, কবিতা ইত্যাদি। যখন কোন ঘটনাকে শৈল্পিক শব্দমালায় প্রকাশ করা হয় তখন তা হয় কবিতা। কবিরা যখন ইতিহাসকে বিশ্লেষণ করেন তখন তাঁরা এর আবেগকে ধারণ করেন এবং কবিতা রচনা করেন। কবিরাই পারেন মহান ঘটনাকে ও এর তাৎপর্যকে শৈল্পিক শব্দমালা ও যথার্থ বাক্যাবলির মাধ্যমে হৃদয়ে গেঁথে দিতে। আশুরায় ইমাম হোসাইন (আ)-এর আত্মত্যাগের ঘটনাকে ন্যায় প্রতিষ্ঠার উজ্জ্বল পথরেখা সৃষ্টির উদাহরণ হিসেবে কবিরা তাঁদের কাব্যভাষার ভেতর দিয়ে ফুটিয়ে তুলতে পারেন। যখন কবিরা ইমাম হোসাইনের কথা চিন্তা করেন তখন যেন এটি সেই চৌদ্দ শত বছর আগের বিষয় মনে না করেন, এবং তাঁরা তা করেনও না। যেমন আজকের কবিতাগুলোতে নির্যাতিত রোহিঙ্গাদের প্রসঙ্গ এসেছে। প্রকৃতপক্ষে কারবালার বাণীই এটা যে, অত্যাচারিতকে সাহায্য করতে হবে এবং অত্যাচারীর বিরোধীতা করতে হবে। নিজেদেরকে ভুলে যাবেন না, নিজেদের সক্ষমতাকে ভুলে যাবেন না; বরং সেই সক্ষমতা নিয়েই অত্যাচারিতের পক্ষে কথা বলতে হবে। এর কোন বিকল্প নেই।

অনুষ্ঠানে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল নাসিমুল গণি বলেন, কবিতা হলো এমন একটি বিষয় যা মানুষের চিন্তা, চেতনা ও মননকে প্রকাশ করে। কবিকে জ্ঞানী হতে হয়। ইতিহাসকে ধারণ করতে গেলে সেই বিষয় সম্পর্কে পূর্ণ ধারণা থাকতে হয়। অতীতের মহান ব্যক্তিরা কবি ছিলেন। তাঁরা কবিতার মাধ্যমে তাঁদের অভ্যন্তরীণ শক্তিকে তুলে প্রকাশ করেছেন। কবি নজরুল ছিলেন তেমনই এক ব্যক্তিত্ব। যিনি প্রকৃতপক্ষে ছিলেন মানবতার কবি। কাজী নজরুল ইসলাম ও অন্য কবিরা আশুরা ও কারবালাকে এই উপমহাদেশের মানুষের কাছে পরিচিত করিয়েছেন।
তিনি আরো বলেন, কারবালার মহান ঘটনা নিয়ে আমরা এক সময় পুঁথি পাঠ শুনতাম, রেডিও-টিভিতে অনুষ্ঠান হতো। এখন আর তেমন একটা শোনা যায় না। এটা আমাদের দৈন দশা। একটা আত্মত্যগের মহান দর্শনকে আমরা ভুলে যেতে বসেছি। এ অবস্থা থেকে আমাদেরকে বের হয়ে আসতে হবে।

অনুষ্ঠানের স্বাগত ভাষণে ঢাকাস্থ ইরান সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের কালচারাল কাউন্সেলর সাইয়্যেদ মূসা হোসেইনী বলেন, ইমাম হোসাইন ও তাঁর সঙ্গীদের শাহাদাত এবং আশুরার হৃদয়বিদারক ঘটনা মানব ইতিহাসের অন্যতম করুণ ঘটনা। যে ঘটনার ১৪ শত বছর অতিবাহিত হলেও এই শোকাবহ স্মৃতি এখনও মানুষের অন্তরে জাগরুক রয়েছে এবং প্রতিবছর এই দিনটির গুরুত্ব মানুষের কছে আরো বৃদ্ধি পাচ্ছে। প্রতি বছর কারবালার শহীদদের স্মরণ এবং অন্যায়-অত্যাচারের বিরুদ্ধে নিন্দা ও প্রতিবাদ জানানোর পাশাপাশি ইমাম হোসাইনের দেখানো পথ স¤পর্কে মানুষকে আরো বেশি করে অবহিত করতে বিভিন্ন অনুষ্ঠান যেমন, শোকানুষ্ঠান, শোক মিছিল, কবিতা ও মর্সিয়া পাঠ ও আলোচনার আয়োজন করা হয়। আর এসব আয়োজন কেবল মুসলমানদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয় বরং অমুসলিমদের মধ্যেও কারবালার শহীদদের পথ অনুসরণ এবং জুলুম ও অত্যাচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে একই কণ্ঠ ধ্বনিত হয়।


তিনি আরো বলেন, দীর্ঘ ইতিহাসে বিশিষ্ট কবি ও নবি পরিবার ভক্তরা কারবালায় ইমাম হোসানের বিপ্লবের লক্ষ্য ও আশুরার ঘটনা কবিতার মাধ্যমে বর্ণনা করে একে চির জাগরুক করে রাখার পাশাপাশি পরবর্তী প্রজন্মের কাছে এর বার্তা পৌঁছে দেয়ার ক্ষেত্রেও মহান অবদান রেখে চলেছেন। এই অবদান কেবল ইরান ও আরবের আরবি ও ফারসি ভাষাভাষি ও এমনকি বাংলা, উর্দু ও হিন্দি ভাষাভাষী মুসলিম কবিদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয় বরং অনেক অমুসলিম কবিও কারবালার ঘটনা ও আশুরার বার্তা পৌঁছে দিতে অনেক মূল্যবান কবিতা রচনা করেছেন। সুতরাং কবি, সাহিত্যিকরা তাদের আবেগ-অনুভূতি ও এর বিপ্লবী ও মানবিক বর্ণনা দিয়ে আশুরার ঐতিহাসিক ঘটনা জাগ্রত রাখার ক্ষেত্রে যে অবদান রেখে যাচ্ছেন তা ইতিহাসে চিরভাস্বর হয়ে থাকবে এতে কোন সন্দেহ নেই।
তিনি মাওলানা মুহাম্মদ আলী জওহর, প্রখ্যাত কবি ও দরবেশ খাজা মাইনুদ্দিন চিশতির কবিতা থেকে উদ্ধৃতি পেশ করেন এবং বলেন যে, জালিম ইয়াযিদের নৈতিক পরাজয় ঘটেছে এবং সে গণধীকৃত, নিন্দিত, লানতপ্রাপ্ত হয়েছে। পক্ষান্তরে ইমাম হোসাইন যুগযুগান্তর ধরে মানুষের হৃদয়ে নৈতিকতার আলো জ্বেলে দিয়েছেন।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. নাজিব ওয়াদুদ বলেন, দশই মুহররমের ঘটনা অত্যন্ত হৃদয়বিদারক। আশুরা বা মুহররম বিষয়ক কবিতায় দশই মুহররমের মর্মন্তুদ ঘটনার বর্ণনা থাকবে এটাই স্বাভাবিক। তবে এর সাথে বর্তমান প্রেক্ষাপটকে সম্পৃক্ত করতে হবে। আর কেবল শোক প্রকাশ বা প্রচার নয়; বরং ইমাম হোসাইন (রা.) কেন শহীদ হলেন, কোন্ লক্ষ্য নিয়ে তিনি আন্দোলন করেছিলেন তা জানতে হবে ও সেই বাণী প্রচার করতে হবে। সেসবের সাথে আমাদের জীবনের সংশ্লিষ্টতা খুঁজে বের করে করণীয় উপস্থাপন করতে হবে। এখানেই কবিতার সার্থকতা।

ছড়াকার আবু সালেহ বলেন, ইরান সাংস্কৃতিক কেন্দ্র যে কবিতা পাঠের অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে এটি আমার জীবনের একটি স্মরণীয় ঘটনা হয়ে থাকবে। কারণ, মুহররমকে নিয়ে এধরনের কোন অনুষ্ঠানে আমি কখনই অংশগ্রহণ করি নি। তিনি কবিতাচর্চায় ইরানি দূতাবাস ও ইরান সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের সহযোগিতা অব্যাহত রাখার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, কারবালার মহাবিয়োগান্ত ঘটনায় কেবল ইমাম হোসাইন (রা.) শহীদ হন নি, হত্যা করা হয়েছে পিতৃ স্নেহকে, ন্যায়কে, সর্বোপরি আল্লাহর প্রেমকে খুন করা হয়েছে। তাই মুহররমের বিষয়টি আমাদের মাঝে নতুন করে আলোচিত হওয়া প্রয়োজন।

কবি আবদুল মুকীত চৌধুরী মুহররম বিষয়ে বাংলাদেশের কবিদের লেখনি সম্পর্কে ‘পবিত্র আশুরার চেতনা’ শিরোনামে একটি সংক্ষিপ্ত সংকলন উপস্থাপন করেন।
সভাপতির ভাষণে জনাব এরশাদ মজুমদার কারবালার আত্মত্যাগকে ইতিহাসের এক করুণ ঘটনা হিসেবে উল্লেখ করেন এবং অনুষ্ঠানে আগত কবি-সাহিত্যিক ও মেহমানবৃন্দকে ধন্যবাদ জানান।

অনুষ্ঠানে কবিতা পাঠে ও আবৃত্তিতে অংশ নেন কথা সাহিত্যিক কাসেম বিন আবু বাকার, ‘নুতন মাত্রা’ সম্পাদক ড. ফজলুল হক তুহিন, কবি কে এম মাহফুজুল করিম, কবি এমরান খন্দকার, কবি আরিফ খান, ছড়াকার কবি জগলুল হায়দার, কবি আমিন আল আসাদ, কবি মামুন সরোয়ার, কবি আবদুল হাই ইদ্রিসী, কবি মৃধা নুরুন নবী নূর, কবি হিজারুল ইসলাম, ড. সালমা, এডভোকেট শামীমা আকতার শিউলি, এডভোকেট সাজেদা বানু হেলেন প্রমুখ। সভায় আরো উপস্থিত ছিলেন শিশু-কিশোর মাসিক ‘ফুলকুঁড়ি সম্পাদক কথাশিল্পী মাহবুবুল হক, নিউজলেটারের সম্পাদকম-লীর সদস্য ড. জহির উদ্দিন মাহমুদ, আল-কুদস কমিটি বাংলাদেশের সেক্রেটারি জেনারেল জনাব মোস্তফা তারেকুল হাসান প্রমুখ। এছাড়া বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলা থেকে আগত জাতীয় কবিতা মঞ্চের জেলা কমিটি সদস্যরা কবিতা পাঠে অংশ নেন। অনুষ্ঠানে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ‘মোহররম’ কবিতা থেকে নির্বাচিত অংশ আবৃত্তি করেন বিশিষ্ট আবৃত্তিকার সীমা ইসলাম, গযল পরিবেশন করেন জনাব এম এ মোন্নাফ, জনাব আবীদ আজম, শাহ নওয়াজ তাবীব, মর্সিয়া পাঠ করেন ড. সালমা এবং সংক্ষিপ্ত জারি পরিবেশন করেন মিসেস তাহেরা মোন্নাফ।

অনুষ্ঠানে দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে কবিরা অংশ নেন। আশুরা ও মুহররমের চেতনা নিয়ে শোহাদায়ে কারবালা স্মরণে উক্ত অনুষ্ঠানটি ছিল এ সময়ের একটি যুগান্তকারী ঘটনা। কেননা, সাহিত্য সাংস্কৃতিক মহলের অভিমত যে, কারবালার ঘটনা নিয়ে জারি গান, পুঁথিপাঠ ও মর্সিয়া পাঠের অনুষ্ঠান হলেও অমর আশুরা উপলক্ষে নিবেদিত কবিতা পাঠের বিষয়টি আধুনিক বাংলা কবিতার ইতিহাসে এটিই সূচনা ও একটি তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা। এ ধারাকে অব্যহত রাখার পরামর্শ দেয়া হয়েছে।