ঢাকায় ইরানি নওরোজ উৎসব উদযাপিত
পোস্ট হয়েছে: মার্চ ২৩, ২০২৩

ইরানি নববর্ষ ‘নওরোজ’ এবং বাংলা নববর্ষ ‘পহেলা বৈশাখ’ উদযাপন উপলক্ষ্যে রাজধানী ঢাকায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। মঙ্গলবার বিকালে বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মুজাফফর আহমেদ চৌধুরী মিলনায়তনে ফারসি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগ এবং ঢাকাস্থ ইরান সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী কে এম খালিদ।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন বাংলাদেশে নিযুক্ত ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের রাষ্ট্রদূত মানসুর চাভোশি এবং বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর (প্রশাসন) অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ সামাদ।
ফারসি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ বাহাউদ্দিনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য রাখেন ইরানি কালচারাল কাউন্সেলর সাইয়েদ রেজা মির মোহাম্মাদি। এসময় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, শিক্ষার্থী এবং ইরান দূতাবাসের কালাচারাল সেন্টারের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে সংস্কৃতি বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী কে এম খালিদ বলেন, ইরানি নববর্ষ ‘নওরোজ’ ও বাংলা নববর্ষ ‘পহেলা বৈশাখ’ এর মধ্যে বেশ সাদৃশ্য ও সাযুজ্য রয়েছে। নওরোজ উদযাপিত হয় বসন্তের প্রথম দিন ২১ মার্চ আর পহেলা বৈশাখ (বাংলা নববর্ষ) উদযাপিত হয় ১৪ এপ্রিল। দু’টিই বড় ঐতিহ্যবাহী উৎসব। মানুষে মানুষে সম্প্রীতি, মানবিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠা, হিংসা-বিদ্বেষ দূরীকরণ নওরোজ বা ইরানি নববর্ষের প্রধান বার্তা। একইভাবে সম্প্রীতি ও মানবিক মূল্যবোধের ওপর প্রতিষ্ঠিত বাঙালির সবচেয়ে বড় উৎসব পহেলা বৈশাখও আমাদের একই বার্তা দেয়।
সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী বলেন, মূলতঃ কৃষিকাজ ও খাজনা বা রাজস্ব আদায়ের সুবিধার্থে সম্রাট আকবর বাংলা নববর্ষ চালু করেন। ১৫৫৬ খ্রিষ্টাব্দে তাঁর শাসনামলে ইরানি গবেষক ফতেহউল্লাহ সিরাজী বাংলা সনের রূপরেখা প্রদান করেন যা রাষ্ট্রীয়ভাবে চালু হয়। পরবর্তীকালে ১৯৬৬ খ্রিষ্টাব্দে ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহর নেতৃত্বে বাংলা একাডেমির উদ্যোগে এর কিছু হিসাব সংস্কার করে প্রতি বছর ১৪ এপ্রিল বাংলা নববর্ষ উদযাপন করা হয়।
কে এম খালিদ আরো বলেন, ভ্রাতৃপ্রতিম ইরান ও বাংলাদেশের মধ্যকার সম্পর্ক অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ও গভীর। দেশ দু’টির মধ্যে দ্বিপাক্ষিক রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক যোগাযোগ অতীতের মতো বর্তমানেও বজায় রয়েছে। তিনি বলেন, ১৯৯৫ সালে ইরানের প্রেসিডেন্ট হাশেমী রাফসানজানী বাংলাদেশ সফরে এসেছিলেন। আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ১৯৯৭ সালে ওআইসি সম্মেলন ও ২০১২ সালে ন্যাম সম্মেলনে যোগ দিতে ইরান সফর করেছেন। এর ধারাবাহিকতায় প্রায় প্রতি বছরই দুই দেশের মধ্যে মন্ত্রী ও উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তা এবং শিক্ষা-সাংস্কৃতিক প্রতিনিধি দলের সফর বিনিময় হচ্ছে। ইরান-বাংলাদেশ মৈত্রী ও সাংস্কৃতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে এক শক্তিশালী ভিত রচিত হয়েছে। প্রতিমন্ত্রী এসময় দু’দেশের মধ্যকার এ বন্ধুত্বপূর্ণ ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক আগামী দিনগুলোতে উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
অনুষ্ঠানের বাংলাদেশে নিযুক্ত ইরানের রাষ্ট্রদূত জনাব মানসুর চাভোশি বলেন, নওরোয শুধু ইরানেই সীমাবদ্ধ থাকে নি। ইন্দো-পারস্য সভ্যতা ও সংস্কৃতির প্রভাবে এটি ইরানের বাইরে দক্ষিণ এশিয়াসহ বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়েছে। ২০০১ সালে জাতিসংঘে বসন্তের প্রথম দিন ২১ মার্চ বিশ্ব নওরোয দিবস হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে এবং ২০০৯ সালে এটি মানবতার সাংস্কৃতিক ও আধ্যাত্মিক নিদর্শন হিসেবে ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।
অনুষ্ঠানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ সামাদ ইরানি নওরোজের সাথে বাংলা নববর্ষের সাযুজ্যতার বিভিন্ন দিক তুলে ধরে বলেন, বাংলা নববর্ষ ও ইরানি নওরোজ দুটি উৎসবই আনন্দ, হাসি ও ভালোবাসাপূর্ণ একটি সম্প্রীতির উৎসব। এই উৎসবগুলো ধর্ম-বর্ণ-জাতি-গোত্র নির্বিশেষে সবাইকে একত্রিত করে সম্প্রীতি ও ভালোবাসার বন্ধনে। তিনি বলেন, ইরানের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ঈর্ষণীয়; নওরোজ বা নববর্ষ পারস্যের বা ইরানের সবচাইতে বড় উৎসবের নাম।সমগ্র জাতি বিশেষ উদ্দীপনায়, ব্যাপক আগ্রহভরে নওরোজ পালন করে থাকে এবং নওরোজের অনুষ্ঠানমালা হৃদয় দিয়ে উপভোগ করে থাকে।
অনুষ্ঠানের স্বাগত বক্তব্যে ঢাকাস্থ ইরান সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের কালচারাল কাউন্সেলর সাইয়্যেদ রেজা মীর মোহাম্মদী বলেন, ঈদে নওরোজ ইরানি সংস্কৃতির একটি প্রাচীন ঐতিহ্য ও আচার অনুষ্ঠান যা কয়েক হাজার বছরের পুরনো। এটি আনন্দ, নতুনত্ব ও পুনরুজ্জীবনের বার্তাবাহক। সতেজতা ও নতুনত্বের প্রতি মানুষের যেহেতু একটি স্বাভাবিক আকর্ষণ রয়েছে তাই বসন্ত ও প্রকৃতির সতেজতা মানুষের অস্তিত্বে সতেজতা ও পুনরুজ্জীবনের প্রেরণা যোগায়। নওরোজ হলো ঋতুরাজ বসন্তের প্রথম দিন। বসন্ত ও প্রকৃতির নতুন প্রাণের সঞ্চারকে তিনি আল্লাহর প্রদত্ত উল্লেখ করেন এবং নওরোজকে একটি শুভ ও বরকতময় দিন হিসেবে মানুষের জীবনের প্রতিটি দিনের সমৃদ্ধি কামনা করেন।
অনুষ্ঠানে সভাপতির বক্তব্যে ড. মোহাম্মদ বাহাউদ্দিন বলেন, প্রাচীন সভ্যতার লীলাভূমি ইরানের ভাষা হলো ফারসি। মানবিকতা, মূল্যবোধ ও ভালোবসাপূর্ণ এই ভাষা বিশ্বের অন্যতম সাংস্কৃতিক সম্পদ। ভাষা ও সাহিত্যের পাশাপাশি দেশটি অনন্য ও নিজস্ব সাংস্কৃতিক উৎসবের জন্যও বিশ্বখ্যাত। নওরোজ তেমনি একটি ইরানি উৎসব। বর্তমানে বিশ্বের অনেক দেশেই এই উৎসবটি অত্যন্ত জাঁকজমকপূর্ণভাবে উদযাপন করা হয়। বাংলাদেশও তার ব্যতিক্রম নয়। এই বছর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফারসি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগ এবং ঢাকাস্থ ইরান সাংস্কৃতিক কেন্দ্র যৌথভাবে এই উৎসবের আয়োজন করে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ফারসি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগের শিক্ষার্থীরা অনুষ্ঠানে নওরোজের বিশেষ সাংস্কৃতিক পরিবেশনা তুলে ধরেন; যা সবার কাছে উপভোগ্য হয়ে ওঠে। সাংস্কৃতিক পরিবেশনার মধ্যে ছিল নওরোজ পরিচিতি, ফারসি ও বাংলা সংগীত, নাটিকা, হাফত্ সিন, কবিতা আবৃত্তি, ছোটগল্প ও শাহনামেখানি ইত্যাদি।