‘জেনারেল কাসেম সোলায়মানি ছিলেন ইহুদি-মার্কিন সা¤্রাজ্যবাদবিরোধী অকুতোভয় সিপাহসালার’
পোস্ট হয়েছে: জুন ১৩, ২০২০
কবি আবদুল হাই শিকদার
আমেরিকার কাপুরেুষোচিত হামলায় জেনারেল কাসেম সোলাইমানির শাহাদাত এবং মুসলিম বিশে^ ইহুদি-মার্কিন সা¤্রাজ্যবাদ, সন্ত্রাসবাদ ও আধিপত্যবাদবিরোধী প্রতিবাদী কবিতা পাঠ ও আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে কবি আবদুল হাই শিকদার বলেন, জেনারেল কাসেম সোলায়মানি ছিলেন ইহুদি-মার্কিন সা¤্রাজ্যবাদবিরোধী অকুতোভয় সিপাহসালার।’
গত ১১ জানুয়ারি ২০২০ মিরপুর লালকুঠি দরবার শরীফ পাঠাগার মিলনায়তনে লালকুঠি সাহিত্য পরিষদ-এর উদ্যোগে পরিষদ সভাপতি, ঢাকা বিশ^াবিদ্যালয়ের ফারসি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ও লালকুঠি দরবার শরীফের পীর আহসানুল হাদীর সভাপতিত্বে আমেরিকার কাপুরুষোচিত ড্রোন হামলায় ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের আল-কুদস ব্রিগেড-এর প্রধান জেনারেল কাসেম সোলায়মানির শাহাদাত এবং মুসলিম বিশে^ ইহুদি-মার্কিন সা¤্রাজ্যবাদ, সন্ত্রাসবাদ ও আধিপত্যবাদবিরোধী কবিতা পাঠ ও আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়।
এতে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন নজরুল গবেষক কবি আবদুল হাই শিকদার। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের ইরানি ভিজিটিং প্রফেসর ড. কাজেম কাহদূয়ী, আল-কুদস কমিটি বাংলাদেশ-এর সেক্রেটারি জেনারেল জনাব মোস্তফা তারেকুল হাসান, নজরুল-ফররুখ গবেষণা ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি লেখক, গবেষক এমদাদুল হক চৌধুরী। আলোচনায় অংশ নেন কবি ও আবৃত্তিশিল্পী আহমদ বাসির, ছড়াশিল্পী কবি আতিক হেলাল, কবি আমিন আল আসাদ, মাওলানা আসাদুজ্জামান, ক্বারী আলমগীর হোসেন মোল্লা।
ইহুদি-মার্কিন সা¤্রাজ্যবাদবিরোধী কবিতা পাঠ করেন যথাক্রমে কবি আবদুল হাই শিকদার, কবি আতিক হেলাল, কবি আমিন আল আসাদ, কবি আহমদ বাসির, কবি রবিউল মাশরাফি, কবি ইবনে আবদুর রহমান, কবি জাকারিয়া খান সৌরভ, কবি শাহনওয়াজ তাবীব, কবি মুহাম্মদ ওবায়দুল্লাহ, মুক্তিযোদ্ধা কবি রফিক মিয়া, কবি মুহাম্মদ ইসমাইল, কবি নাসিমা আক্তার নিঝুম, কবি মৌ মাহমুদা, কবি আলমগীর হোসেন জোয়ার্দার, কবি জয়নাল আবেদিন, কবি হাবিবুর রহমান প্রমুখ।
ক্বারী হাবিবুর রহমানের কণ্ঠে পবিত্র কালামের ‘আল্লাহর পথে যারা শহীদ হয়েছে তাদের মৃত বলো না’ এই আয়াতাংশ সহ তেলাওয়াতের মাধ্যমে অনুষ্ঠান আরম্ভ হয়।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে কবি আবদুল হাই শিকদার বলেন, শহীদ জেনারেল কাসেম সোলায়মানিকে নিয়ে আমরা গর্বিত। কারণ, তিনি মারা যাননি। তিনি পৃথিবীর ইতিহাসে সা¤্রাজ্যবাদবিরোধী অকুতোভয় সিপাহসালার হিসেবে অমরত্ব লাভ করেছেন। কাসেম সোলায়মানি এক ক্ষণজন্ম বুদ্ধিদীপ্ত সমরবিদ ছিলেন যিনি মধ্যপ্রাচ্যে সা¤্রাজ্যবাদের বিষ দাঁত সমূলে উপড়ে ফেলতে সক্ষম হয়েছিলেন। সা¤্রাজ্যবাদবিরোধী সংগ্রামের ইতিহাসে বিশে^র মানুষ এতদিন চে গুয়েভারার কথা শুনে এসেছে। নিঃসন্দেহে চে গুয়েভারা সংগ্রামী। কিন্ত কাসেম সোলায়মানি চে গুয়োভারার চেয়েও বড় বিপ্লবী এবং ইতিহাস সৃষ্টিকারী। একথা আমার নয়। স্বয়ং বাংলাদেশের সা¤্রাজ্যবাদবিরোধী সমাজতান্ত্রিক চিন্তাবিদ বদর উদ্দিন ওমর স্বীকার করেছেন।
কবি আবদুল হাই শিকদার বলেন, আদর্শের জন্য কীভাবে জীবন দিতে হয় তা জাতি হিসেবে ইসলামি ইরান আমাদেরকে অর্ধ শতাব্দী কাল জুড়ে দেখিয়ে দিয়ে যাচ্ছে। যে জাতি জীবন দিতে শেখে সে জাতির মৃত্যু বা ধ্বংস নাই। ইরানের ইসলামি বিপ্লবের শুরু থেকে এ পর্যন্ত বহু প্রাণ আর রক্ত দিয়ে তারা অজেয় হয়েছে। মার্কিন আধিপত্যবাদ আর আরবের ভোগবাদী রাজাবাদশাদের সীমাহীন ষড়যন্ত্র সহ দুনিয়ার তাবৎ অশুভ শক্তির সম্মিলিত আক্রমণ প্রতিরোধ করে ইরান এগিয়ে এসেছে। ইরানের ইসলামি বিপ্লবের ইতিহাস বিশ^বাসী জানে। ইরাকের সাদ্দামের মাধ্যমে আট বছরব্যাপী এক যুদ্ধ চাপিয়ে দেয়া হয়। ইরানের কেবিনেটে বোমা হামলা করে প্রেসিডেন্ট প্রধনমন্ত্রী সহ শতাধিক সংসদ সদস্যকে হত্যা করা হয়। হত্যা করা হয় বিপ্লবের বুদ্বিবৃত্তিক অগ্রনায়ক ইরানি বুদ্ধিজীবীদের। ড. আয়াতুল্লাহ বেহেশতী, শহীদ আয়াতুল্লাহ মুর্তাজা মোতাহহারী সহ অনেককে শহীদ করা হয়। বিগত কয়েক বছরে ইরানের বেশ কয়েকজন বিজ্ঞানীকেও হত্যা করা হয়েছে।
ইরান কারবালার জাতি। তারা কারবালা থেকে শিক্ষা গ্রহণ করেছে। সা¤্রাজ্যবাদী শক্তি একথা জানে না যে, তাদেরকে পরাস্ত করা যাবে না। কারণ, ইরান সঠিক পথে আছেÑ যে পথ আল্লাহর পথ।
তিনি বলেন, ইরানের সমৃদ্ধ সাহিত্য সম্পর্কে আমরা ওয়াকেফহাল। যে দেশে জন্ম নিয়েছিলেন ইমাম খোমেইনী (র)-এর মতো ক্ষণজন্মা মহাপুরুষ। জন্মেছিলেন আলী শরিয়তির মতো বিংশ শতকের শক্তিমান চিন্তাবিদ। ফেরদৌসী, শেখ সাদী, রুমী, হাফিজ, ওমর খৈয়াম, ফরিদুদ্দিন আত্তার, আল ফারাবী, আল কিন্দি, ইমাম গাজ্জালী প্রমুখ তো আছেনই।
তিনি বলেন, আমরা ইরানের সাথে আছি এবং থাকব। কারণ, আমাদের সংস্কৃতির সাথে মিশে আছে ইরানি ঐতিহ্য। আমরা ইসলাম পেয়েছি ইরানের ভেতর দিয়ে। এদেশে আগত সুফিদের থেকে। বাংলা ভাষায় সাত হাজার শব্দ আছে ফারসিÑ যা সরাসরি প্রবেশ করেছে।
ইরানে যেমন ইসলামের বৈপ্লবিক উত্থান ঘটেছে এবং বিশ^ব্যাপী এর আলো ছড়িয়েছে এর আগে ইরানের সভ্যতার আরো দার্শনিক বিপ্লব বিশ^কে প্রভাবিত করেছে। এই প্রভাবকে কখনো বিচ্ছিন্ন করা সম্ভব নয়। ইরানের জনগণ যে নবীবংশ বা আহলে বাইতকে অনুসরণ করে ও ভালোবাসে আমরাও সেই আহলে বাইতকে ভালবাসি। বাংলাদেশের মুসলমানদের মাঝে হাজারো আলী, হাসান, হোসাইন, ফাতেমা রয়েছেন। তাদের নামের সাথে যুক্ত রয়েছে এই পবিত্র নামগুলো। কাজেই কোনো চক্রান্ত বা ষড়যন্ত্রই আমাদেরকে ইরান থেকে বিচ্ছিন্ন করতে পারবে না। ইরানি জাতির আত্মার স্পন্দনের সাথে আমাদের আত্মার স্পন্দন অবিচ্ছেদ্য থাকবে।
তিনি বলেন, ইরানের অপরাধ ইরান নিজের পায়ে দাঁড়িয়েছে; নিজস্ব বোধ, বিশ^াস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির ওপর। আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার অর্জন করেছে। পরাশক্তি আমেরিকার প্রভুত্ব ইরান মেনে নেয় নি। মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকা ইসরাইলের স্বার্থে বাধা সৃষ্টি করেছে। কাসেম সোলায়মানি তো সে কারণেই শাহাদাত বরণ করেছেন।
তিনি বলেন, ইরান মজলুম। ইরান নিজে কোনো দেশকে আক্রমণ করেনি। ইরান নিজে আক্রান্ত হয়েছে। ইয়েমেনে কে আক্রমণ করেছে? সিরিয়া, ইরাকসহ মধ্য এশিয়াকে কে অস্থির করেছে? ইসরাইলের সাথে কে বন্ধুত্ব করেছে?
আমরা ইরানি জেনারেল সোলায়মানি এবং ইরাকি বাহিনীর জেনারেল আবু মাহদী আল মুহাদ্দিসসহ যাঁরা শহীদ হয়েছেন তাঁদের হত্যার নিন্দা জ্ঞাপন করছি।
সভাপতির বক্তব্যে জনাব আহসানুল হাদী বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরানি জাতি সম্পর্কে ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন যে, ঈমান যদি আকাশের সুরাইয়া তারকাতেও ঝুলে থাকে তবে সালমান ফারসি (রা)-এর জাতি তা পাবে। কাজেই ইরান হকের পথে আছে এবং ইরান হকের পথেই থাকবে ইনশাআল্লাহ। আপনারা লক্ষ্য করে থাকবেন ইরানি জাতি আশুরা উপলক্ষে একটি স্লোগান দেয়Ñ ‘মুহররম তরবারির ওপর রক্তের বিজয়ের মাস’। এছাড়া ইরান বিপ্লব চলাকালীন একটি স্লোগান দিতÑ ‘হার রুয আশুরা, হার যামিন কারবালা’ অর্থাৎ প্রতিটি দিন আশুরা, প্রতিটি যমিন কারবালা। এই সেøাগান ও চেতনাই তাদের আত্মবিশ^াস। তারা দশকের পর দশক যাবত রক্ত দিয়ে আগ্রাসী অস্ত্রকে পরাভূত করে চলেছে। ইনশাআল্লাহ ইরান অজেয় থাকবে মাহদী (আ.)-এর আগমন পর্যন্ত।
প্রফেসর ড. কাজেম কাহদূয়ী বলেন, পবিত্র কোরআনে রয়েছে, আল্লাহর পথে যারা শহীদ তাদেরকে তোমরা মৃত বলো না; বরং তারা জীবিত।’ তিনি হাদিসে কুদসী থেকে পাঠ করে বলেন, ‘যারা আল্লাহর পথে এগিয়ে যায় আল্লাহও তার দিকে এগিয়ে আসেন। যে আল্লাহকে ভালোবাসে আল্লাহও তাকে ভালোবাসেন। যে আল্লাহর পথে এক পা অগ্রসর হয়, আল্লাহ তার দিকে দুই পা অগ্রসর হন। যারা আল্লাহর পথে হেঁটে যায় আল্লাহ তার দিকে দৌড়ে আসেন। যে আল্লার হয়ে যায়, আল্লাহও তার হয়ে যান। যে আল্লাহর জন্য নিজেকে উৎসর্গ করে আল্লাহ তাকে তাঁর নিকটে তুলে নেন।’ জেনারেল কাসেম সোলায়মানি আল্লার রাহে নিজের জীবনকে বিলিয়ে দিয়েছেন। তাঁর জনপ্রিয়তা এত ছিল যে, তাঁকে প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী হতে বলায় তিনি বলেছিলেন, ‘আমি তো শহীদ হতে চাই।’ আল্লাহ তাঁর মনের ইচ্ছা পূরণ করেছেন।
জনাব মোস্তফা তারেকুল হাসান বলেন, আপনারা কারবালার ইতিহাস জানেন। শহীদে কারবালা ইমাম হোসাইন (আ.) সম্পর্কে বিখ্যাত উর্দু কবি শওকত আলী জওহর লিখেছেন, ‘ক্বাতলে হোসাইন আসল যে মারগে ইয়াযীদ হায়/ ইসলাম জিন্দা হোতা হায় হার কারবালা কি বাদ’ অর্থাৎ ‘হোসাইনের শাহাদাত সেতো ইয়াযীদের মৃত্যু/ ইসলাম কারবালার মাধ্যয়ে বিজয় লাভ করেছে।’ খ্বুই তাৎপর্যপূণ একটি কথা। ইমাম হোসাইন মুমিন হৃদয়ে ইসলামের ইতিহাসে অমর হয়ে রয়েছেন। কারবালার ইতিহাস কালবালার তাৎপর্য দিনে দিনে বিকশিত হচ্ছে, উজ্জ্বল হচ্ছে, আলোকিত হচ্ছে, আলোচিত হচ্ছে যুগের পর যুগ। আর ইয়াযীদ ঘৃণিত হচ্ছে। আমাদের জাতীয় ইতিহাসে যেমন পলাশীর যুদ্ধের খলনায়ক মীরজাফর, জগৎ শেঠ প্রমুখ ঘৃণিত ও বর্জিত নাম তেমনি ইয়াযীদ একটি ঘৃণিত নাম। হোসাইন এক আলোকিত নাম। তেমনি আজ কাসেম সোলায়মানি এক আলোকিত নাম। খোদ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ট্রাম্পের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ হয়েছে।
এই হত্যাকা-ের পর ব্রিটেন, ফ্রান্স, ইউরোপের বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন সংগঠন এর নিন্দা করেছে। মুসলিম বিশে^ কাসেম সোলায়মানির নাম জানা লোক ছিল খুবই কম। কিন্তু তাঁর শাহাদাতের ঘটনার পর সারা দুুনিয়ায় ছড়িয়ে পড়েছে তাঁর নাম। কাসেম সোলায়মানি মুসলিম ইতিহসের একবিংশ শতকের হিরো হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন। কাসেম সোলায়মানি কতটা জনপ্রিয় ছিলেন মুসলমানদের কাছে তা তাঁর শাহাদাতের পর পৃথিবীর মানুষ জানতে পারে। ইরাকের বাগদাদে লক্ষ লক্ষ লোক নেমে আসে তাঁর কফিনের পাশে। ইরানে তাঁর জানাজায় ৭০ লক্ষ লোক জড়ো হয়েছে। ইমাম খোমেইনী (র.)-এর জানাজার পর কারো জানাজায় এতো বিশাল জলপ্লাবন দেখেনি বিশ^। সোলায়মানির কন্যা যে অগ্নিঝরা ভাষণ দিয়েছেন এতে মুক্তিকামী মুসলমানরা আরো উদ্দীপ্ত হয়েছে। ট্রাম্প পরাজিত হয়েছেন। ইরাকের পার্লামেন্টে সর্বসম্মতভাবে ইরাকে মার্কিন সেনা উপস্থিতিকে অবৈধ ঘোষণা করা হয়েছে।
ইরান ক্ষেপণাস্ত্র হামলা করেছে ইরাকের মার্কিন সেনা ঘাঁটিতে। ৮০ জন মার্কিন সেনা সদস্য নিহত হয়েছে। তিন শতাধিক আহত হয়েছে। ইসরাইলের পত্রিকা বলেছে, ইসরাইলের হাসপাতালে আড়াই শ মার্কিন সেনার চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে। মিসাইলগুলো আঘাত করেছে মাকির্নি গোয়েন্দা রাডারকে ফাঁকি দিয়ে। এভাবেই কারবালায় ইমাম হোসাইনের শাহাদাত যেমন মুসলমানদের বিজয় এনে দিয়েছে তেমনি সোলায়মানির শাহাদাত মুসলমানদের মনোবল বাড়িয়ে দিয়েছে। সত্যের জয় হবেই ইনশাআল্লাহ্। কারণ, জেতা শুধু জেতা নয়, হারা নয় হারা; সময় বলে দেয় বিজয়ী কারা।
আল কুদস কমিটি বাংলাদেশ-এর সেক্রেটারি জেনারেল গর্বের সাথে বলেন যে, সোলায়মানি কুদস ব্রিগেডের প্রধান ছিলেন। আমরাও আল কুদস কমিটির সৈনিক। আমি মনে করি যে, আমার নেতা শহীদ হয়েছেন। মহান আল্লাহ যেন তাঁকে জান্নাতের সবচেয়ে উঁচু মাকাম দান করেন।
জনাব এমদাদুল হক চৌধুরী বলেন, সা¤্রাজ্যবাদীরা মুসলমানদেরকে বিভক্ত করে, ভাইয়ে ভাইয়ে দ্বন্দ্ব বাঁধিয়ে দিয়ে মুসলিম দেশগুলোকে শোষণ করে খাচ্ছে। শিয়া ও সুন্নি দুই ভাই। সবাই মুসলমান। আমাদের আল্লাহ এক, রাসূল এক, কালেমা এক, কিতাব এক, কিবলা এক, আমরা পাচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ি, ৩০ দিন রোজা রাখি; মাসলা মাসায়েলগত, মাজহাবি ভিন্নতা তো থাকতেই পারে। তাহলে কি জন্য আমরা কাউকে অমুসলিম কাফের মনে করব? একে অপরের বিরুদ্ধাচরণ করব। ইহুদি-মার্কিন বাতিল শক্তিগুলো আমাদেরকে এক হতে দিচ্ছে না বলেই আজকে এতো সমস্যা তৈরি হয়েছে মুসলিম বিশে^।
কবি ও আবৃত্তি শিল্পী আহমদ বাসির বলেন, আমি শিয়াও নই, সুন্নিও নই, আমি মুসলমান। আমাদের বিভিন্ন পরিচয় থাকতেই পারে এবং থাকবে। কিন্তু পরিচয়কে পরিচয়ের জায়গায় রেখে ইতিহাসকে ইতিহাসের জায়গায় রেখে আমরা আদর্শের প্রশ্নে এক থাকব সা¤্রাজ্যবাদ ও আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে। জেনারেল কাসেম সোলায়মানি ছিলেন ঐক্যের প্রতীক। তিনি সুন্নি হামাস ও শিয়া হিজবুলœাহ উভয়ের সামরিক প্রশিক্ষক ছিলেন। তাঁর শাহাদাতের পর হামাস ও হিজবুল্লাহ একই সাথে প্রতিশোধের হুমকি দিয়েছে। হামাস নেতা গিয়েছেন ইরানে তাঁর পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানাতে।
কবি আতিক হেলাল বলেন, মুসলমাদেরকে এখনি ঐক্যবদ্ধ হওয়া দরকার যাতে আমরা আর কোনো কাসেম সোলায়মানিকে না হারাই। তিনি বলেন, যত মতপার্থক্যই থাকুক সেগুলোকে না বাড়িয়ে মৌলিক শর্তে সবাইকে এক হতে হবে।
অনুষ্ঠানের সঞ্চালক কবি আমিন আল আসাদ তাঁর স্বাগত বক্তব্যে বলেন, ফররুখ আহমদ বলেছেন, ‘জীবনের চেয়ে দীপ্ত মৃত্যু তখনি জানি/ শহিদী রক্তে হেসে উঠে যবে জিন্দেগান’ এমনি এক দীপ্ত জীবন পেয়েছেন সোলায়মানি। শহীদে কারবালা ইমাম হোসাইনকে যেমন শহীদ করে নিঃশেষ করা যায়নি তেমনি কাসেম সোলায়মানিদেরকেও শহীদ করে শেষ করে দেয়া যাবে না। বাংলাদেশের কবিরা সব সময় অন্যায়, আধিপত্যবাদ ও সা¤্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে কবিতা লিখেছেন। আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম, ফররুখ আহমদ, আল মাহমুদ, ফজল শাহাবুদ্দিন, রফিক আজাদ, হেলাল হাফিজ, আবিদ আজাদ সহ অনেকেই সা¤্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে কবিতা লিখেছেন। কাজেই আমরা কবিতার সৈনিক, শব্দই হচ্ছে আমাদের হাতিয়ার। জেনারেল কাসেম সোলায়মানির শাহাদাত সহ সকল অন্যায়, অত্যাচার, আধিপত্যবাদ, সা¤্রাজ্যাবাদের বিরুদ্ধে আমরা সাংস্কৃতিকভাবে প্রতিবাদ জানাচ্ছি। তীব্র নিন্দা জ্ঞাপন করছি। আর ঐক্য চাচ্ছি মনুষ্যত্ব ও মানবতার। ঐক্য চাচ্ছি বিবেকের ও নৈতিকতার। সুবিচারের জন্য। শান্তিময় পৃথিবীর জন্য। নিপীড়িত-নির্যাতিত, অধিকারবঞ্চিত মানুষের অধিকারের জন্য আজকে আমাদের এই অবস্থান।
মাওলানা আসাদুজ্জামান বলেন, পবিত্র কোরআনে আল্লাহ পাক আমাদেরকে যেখানে বলেছেন, ‘তোমরা আল্লাহর রজ্জুকে ঐক্যবদ্ধ ভাবে আঁকড়ে থাকো, কখানো বিচ্ছিন্ন হয়ো না’, কিন্তু আমরা আল্লাহর আদেশ মানছি না আর সঠিক রজ্জু চিনতে পারছি না বলেই আমরা বিভক্তি-রেখা বাড়িয়ে তুলছি। বাড়াচ্ছি আমাদের দুর্যোগ।
ক্বারী আলমগীর হোসেন মোল্লাহ বলেন, কাসেম সোলায়মানির শাহাদাতের জাগতিক মূল্য ও মোজেজা তো আমরা সপ্তাহ না ঘুরতেই দেখলাম। কিন্তু এর আধ্যাত্মিক মূল্য আরো গভীর ও সুদূরপ্রসারী।
Ñআখলাকুল আম্বিয়া
ইরান সাংস্কৃতিক কেন্দ্রে বই প্রকাশনা উৎসব ও সনদ প্রদান অনুষ্ঠান
ঢাকাস্থ ইরান সাংস্কৃতিক কেন্দ্রে গত ২০ জানুয়ারি ‘ফারসি শিক্ষার প্রথম পদক্ষেপ’ বইয়ের মোড়ক উন্মোচন এবং ফারসি ভাষা, ফটোগ্রাফি ও ক্যালিগ্রাফি কোর্সের সনদ প্রদান অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। অনুষ্ঠানে আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চার”কলা অনুষদের শিক্ষক ড. আব্দুস সাত্তার, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফারসি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগের ইরানি ভিজিটিং প্রফেসর ড. কাজেম কাহদূয়ী ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফারসি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগের শিক্ষক ড. কে এম সাইফুল ইসলাম খান।
অনুষ্ঠানে ঢাকাস্থ ইরান সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের কালচারাল কাউন্সেলর সাইয়্যেদ হাসান সেহাত সবাইকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, যেকোন সামাজিক কর্মকা- মানুষের অন্তর, বিবেক ও ভাষার উপর নির্ভরশীল। আজ যে গ্রন্থের মোড়ক উন্মোচন করা হবে তার নাম হলো ‘ফারসি শিক্ষার প্রথম পদক্ষেপ’। বইটি ফারসি ভাষা শিক্ষার পাশাপাশি ইরানি জাতির সাহিত্য ও সভ্যতা স¤পর্কে জানতে সহায়ক হবে বলে আমার বিশ্বাস। বাংলদেশে ফারসি ভাষা চর্চার জন্য এমন একটি গ্রন্থের প্রয়োজনীয়তার উপলব্ধি থেকেই আমি বইটি ছাপানোর উদ্যোগ গ্রহণ করেছি। আমি চাই ভাষা ও সাহিত্যের ভালো যা আছে তা সকলের কাছে ছড়িয়ে দিতে। মূল বইটি প্রকাশ করেছে ইরানের সাদী ফাউন্ডেশন। আর এটি অনুবাদ করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফারসি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. আবুল কালাম সরকার। আমি তাঁকে এজন্য আন্তরিকভাবে ধন্যবাদ জানাচ্ছি।
প্রফেসর ড. কাযেম কাহদূয়ী বলেন, যে কোনো শিক্ষা-প্রশিক্ষণের বিষয় বই ছাড়া সম্ভব নয়। বই থাকতে হবে এবং ক্লাসে
লিখতে হবে। ফারসি শিক্ষার জন্য যেমন পাঠ্যবই প্রকাশ করতে হবে তেমনি সকল শিক্ষার্থীকে বই কিনতে হবে। তবেই যথাযথ শিক্ষা নিশ্চিত হবে।
বইটির অনুবাদক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফারসি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগের চেয়ারম্যান ড. আবুল কালাম সরকার বলেন, ইরানের বুনিয়াদে সাদী ‘গামে আউয়াল’ বা ‘ফারসি শিক্ষার প্রথম পদক্ষেপ’ গ্রন্থটি প্রকাশ করেছে। তবে ঢাকাস্থ ইরান সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের কালচারাল কাউন্সেলর সহযোগিতা না করলে বাংলাদেশে এ গ্রন্থটি ছাপানো সম্ভব হতো না। সেজন্য তিনি কালচারাল কাউন্সেলর সাইয়্যেদ হাসান সেহাতকে ধন্যবাদ জানান। তিনি একই সাথে বইটি প্রকাশের ব্যাপারে সর্বাত্মক সহযোগিতার জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফারসি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগের অধ্যাপক ড. আবদুস সবুর খান ও ড. আবুল বাশারকেও আন্তরিক ধন্যবাদ জানান।
অধ্যাপক ড. সাইফুল ইসলাম খান বলেন, ড. আবুল কালাম সরকার বইটি অনুবাদে যথেষ্ট কষ্ট করেছেন। আর তাঁর সাথে
ড. আবদুস সবুর খান ও ড. আবুল বাশারও অনেক সহযোগিতা করেছেন। তিনি বইটি প্রকাশে সংশ্লিষ্ট সবাইকে ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, বাংলাদেশে ফারসি চর্চার পেছনে ইরান সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের অতুলনীয় অবদান রয়েছে। আর ইমাম খোমেইনী (রহ.)-এর নেতৃত্বে ইরানে বিপ্লব সাধিত না হলে বাংলদেশে ফারসি চর্চার ক্ষেত্রও প্রস্তুত হতো না। বিপ্লবের পর এদেশে ইরান সাংস্কৃতিক কেন্দ্র ফারসি ভাষা শিক্ষা কোর্স চালু করে। সেসময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ফারসি ভাষার কয়েকজন মাত্র শিক্ষার্থী ছিল। কিন্তু ইরান সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের ভূমিকার কারণে বাংলাদেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ফারসি ভাষা শিক্ষার্থীর সংখ্যা হাজার ছাড়িয়ে গেছে। তিনি ফারসি ভাষা শিক্ষার অন্যান্য পাঠ্যবইগুলো অনুবাদের ব্যাপারে উদ্যোগ নেয়ার আহ্বান জানান।
ড. আব্দুস সাত্তার বলেন, এরকম একটি অনুষ্ঠানে উপস্থিত হতে পেরে নিজেকে গৌরবান্বিত মনে করছি। শুরুতেই বলতে চাই যে, জেনারেল সোলাইমানির শাহাদাতের ঘটনায় কষ্ট অনুভব করছি। প্রকৃতপক্ষে আমেরিকার মানুষের মধ্যে মানবিকতার বিষয়গুলোর বড়ই অভাব পরিলক্ষিত হয়। তাদের মধ্যে আন্তরিকতা দেখা যায় না। তিনি বলেন, শিল্পকলার ইতিহাসের আলোচনা ইরানকে বাদ দিয়ে হয় না। ইরান শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে সমৃদ্ধ একটি দেশ। ইরান সাংস্কৃতিক কেন্দ্র যে ক্যালিগ্রাফি কোর্স চালু করেছে তা নিঃসন্দেহে একটি প্রশংসনীয় পদক্ষেপ। আমি আশা করছি এ ধরনের পদক্ষেপ বাংলাদেশে ক্যালিগ্রাফি শিল্পের প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
আলোচনা শেষে ‘ফারসি শিক্ষার প্রথম পদক্ষেপ’ বইয়ের মোড়ক উন্মোচন এবং ফারসি ভাষা, ফটোগ্রাফি ও ক্যালিগ্রাফি কোর্সের সনদ প্রদান করা হয়।