খেলাধুলায় ইরানের সাফল্য
পোস্ট হয়েছে: সেপ্টেম্বর ১১, ২০১৭

মো. সাইদুল ইসলাম: মানুষের সুস্থ বিনোদনের অন্যতম প্রধান মাধ্যম খেলাধুলা। শরীরচর্চা ও দেহ গঠনে এর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। সম্প্রতি বিশ্বের দেশে দেশে পারস্পরিক বন্ধুত্ব ও সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলার ক্ষেত্রে খেলাধুলার ভূমিকা অনস্বীকার্য হয়ে উঠেছে। সেজন্য খেলাধুলার আন্তর্জাতিক ভূমিকাও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়।
খেলাধুলা মনে স্বাচ্ছন্দ্য আনে, দেহে প্রশান্তি ঘটায়। পরিচ্ছন্ন বিনোদন ও খেলাধুলার মধ্য দিয়ে যে শিশু বেড়ে ওঠে তার পক্ষে সফল মানুষ হিসেবে গড়ে ওঠা সম্ভব। আবার অপরিচ্ছন্ন বা কুয়াশাচ্ছন্ন বিনোদনে বেড়ে ওঠা শিশুর জীবন ধ্বংস হতে বাধ্য। এ কারণে বলা হয়, শিশু বয়সে মানুষ যা গ্রহণ করে পরবর্তী জীবনে সে তা লালন করে। তাইতো ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান জ্ঞানচর্চার পাশাপাশি মানুষের সুস্থ বিনোদনের অন্যতম প্রধান মাধ্যম হিসেবে খেলাধুলাকে বিশেষভাবে গুরুত্ব দিয়ে থাকে। সরকারের পৃষ্ঠপোষকতার পাশাপাশি জনগণের ব্যাপক আগ্রহের কারণে খেলাধুলায় ইরানের খ্যাতি আজ বিশ্বজোড়া। ফুটবল থেকে শুরু করে খেলাধুলার প্রায় সকল ক্ষেত্রেই অসাধারণ নৈপুণ্য দেখিয়ে চলেছেন ইরানি খেলোয়াড়রা।

২০১৮ সালের ফুটবল বিশ্বকাপের চূড়ান্ত আসরে সম্প্রতি এশিয়ার প্রথম দেশ হিসেবে খেলা নিশ্চিত করেছে ইরান। বাছাই পর্বে ২ ম্যাচ হাতে রেখেই এবারের ফুটবল বিশ্বকাপে খেলা নিশ্চিত করে তারা। এশিয়া অঞ্চলের ‘এ’ গ্রুপের তৃতীয় রাউন্ডের লড়াইয়ে উজবেকিস্তানকে ২-০ গোলে হারিয়ে এশিয়ার প্রথম দেশ এবং বিশ্বের দ্বিতীয় দল হিসেবে রাশিয়ায় অনুষ্ঠেয় ফুটবল বিশ্বকাপে জায়গা করে নেয় মধ্যপ্রাচ্যের এ দেশটি। বাছাই পর্বের ৮ ম্যাচে খেলে একটিতেও গোল হজম করতে হয়নি ইরানিদের। দুই ম্যাচে গোলশূন্য ড্র এবং অন্য ৬ ম্যাচে প্রতিপক্ষের জালে বল প্রবেশ করিয়ে জয় ছিনিয়ে নিয়েছে তারা।

‘গ্রেটেস্ট শো অন দ্য আর্থ’ খ্যাত অলিম্পিকের সর্বশেষ আসরেও ইরানের সাফল্য চোখে পড়ার মতো। ব্রাজিলের রিও ডি জেনিরোতে অনুষ্ঠিত হয় অলিম্পিকের ৩১তম আসর। এতে ৩টি স্বর্ণসহ মোট ৮টি পদক জয় করেছে ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান। পদকগুলো আসে ভারোত্তোলন, কুস্তি ও তায়কোয়ান্দো থেকে। পুরুষদের ৭৪ কেজি ওজনশ্রেণিতে রাশিয়ার আনিউয়ার গেদুয়েভকে হারিয়ে কুস্তিতে ইরানকে প্রথম সোনা এনে দেন হাসান ইয়াজদানি। এই ইভেন্টে তিনবারের ইউরোপীয় চ্যাম্পিয়ন গেদুয়েভের সঙ্গে হাসানের লড়াইটা দারুণ জমে উঠেছিল।

প্রথম পর্বে ৬-০ পয়েন্টে পিছিয়ে ছিলেন ২১ বছর বয়সী এই ইরানি কুস্তিগীর। তবে ম্যাচ শেষের তিন সেকেন্ড বাকি থাকতে সমতায় ফেরা হাসানই শেষ পর্যন্ত সোনা জয়ের হাসি হাসেন। তিনি জেতেন ৩-১ পয়েন্ট ব্যবধানে। এর আগে ইরানের দুই অ্যাথলেট কিয়ানোশ রোস্তামি ও সোহরাব মোরাদি দু’টি স্বর্ণপদক পান।

এদিকে, রিও অলিম্পিকের ১৩তম দিনে তায়কোয়ান্দো প্রতিযোগিতায় মেয়েদের ৫৭ কেজি ওজনশ্রেণিতে ব্রোঞ্জপদক জেতেন ইরানি তরুণী কিমিয়া আলীজাদেহ জিনোরিন। এর মাধ্যমে তিনি অলিম্পিকে প্রথম কোনো ইরানি নারী হিসেবে পদক জেতার গৌরব অর্জন করেন।

ফ্রিস্টাইল কুস্তি বিশ্বকাপে এবারো শিরোপা জিতেছে ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের জাতীয় দল। ইরানি দল রাশিয়াকে ৫-৩ গেমে পরাজিত করে এ নিয়ে টানা পাঁচবার শিরোপা জয়ের গৌরব অর্জন করল। খেলাটি হয়েছে আমেরিকার লস অ্যাঞ্জেলেসে ২০১৬ সালে। নিশ্চয় সেটি ইরানিদের জন্য হোম গ্রাউন্ড ছিল না। কিন্তু ইরানি দর্শক-সমর্থকদের আনন্দ উল্লাস, ড্রাম আর বাঁশি বাজানোর শব্দে মনে হচ্ছিল ইরানের কুস্তিবিদরা সবাই হোম গ্রাউন্ডেই খেলছেন; এর বাইরে ভিন্ন কিছু চিন্তা করার উপায় ছিল না কারো পক্ষে। থাকবেই বা কেন? বিজয় যে আসছে একের পর এক!
ইরানি দল আগেই হারিয়েছে আজারবাইজান, ভারত ও আমেরিকান দলকে। সামনে ছিল রাশিয়া। চূড়ান্ত পর্বে রুশ দলকে ইরানের খেলোয়াড়রা হারিয়ে দেন ৫-৩ গেমে। এ বিজয়ের ফলে এবারো ইরান বিশ্ব র্যাঙ্কিংয়ে এক নম্বর দলের সম্মান অটুট রাখতে সমর্থ হলো।

এশিয়ান কারাতে চ্যাম্পিয়ন হয়েছে ইরান। দেশটির পুরুষ ও নারী সিনিয়র কারাতে টিম ১৪তম এশিয়ান কারাতে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব অর্জন করেছে। চূড়ান্ত ম্যাচে প্রতিপক্ষ সৌদি আরবকে ৩-০ ব্যবধানে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন হয় ইরান। দেশটির পুরুষ সিনিয়র কারাতে টিমে খেলেন বাহমান আসগারি ঘোনচেহ, আলি আসগত আসিয়াবারি, সাজ্জাদ গানজাদেহ, ইবরাহিম হাসানবেইগি, সামান হাইদারি, মেহদি খোদা বখশি ও জাবিহুল্লাহ পুরশাব।
এর আগে ইরানি কারাতে টিম ভারত, তাজিকিস্তান ও কাজাখস্তানকে পরাজিত করে চূড়ান্ত পর্বে ওঠে। এছাড়া ইরানি সিনিয়র নারী কারাতে টিম চূড়ান্ত ম্যাচে চীনা তাইপেকে ৩-২ ব্যবধানে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন হয়। ইরানি নারী কারাতে টিম মালয়েশিয়া, ভিয়েতনাম ও জাপানকে পরাজিত করে ফাইনাল ম্যাচে উঠে আসে। একেএফ সিনিয়র চ্যাম্পিয়শিপের এবারের আসর কাজাখস্তানের আস্তানায় অনুষ্ঠিত হয়।

কাবাডি বিশ্বকাপে টানা তৃতীয় বারের মতো রানার্স আপ হয় ইরান। ভারতের আহমেদাবাদে কাবাডি বিশ্বকাপের ফাইনাল খেলা অনুষ্ঠিত হয়।
বিশ্ব প্যারা অ্যাথলেটিক্স চ্যাম্পিয়নশিপে ১৪টি পদক জেতে ইরানি প্যারা অ্যাথলেটরা। ব্রিটেনের রাজধানী লন্ডনে অনুষ্ঠিত হয় এ টুর্নামেন্ট। সম্মানজনক লড়াইয়ে ইরানের ২০ সদস্যের শক্তিশালী স্কোয়াড দু’টি স্বর্ণসহ ১৪টি পদক জেতে। ইরানের ঘরে শেষ দু’টি পদক আসে পুরুষদের শট পুট এফ-৫৩ ইভেন্টে। ইরানের আলিরেযা মোখতারি ৮ মিটার ৩৫ সেন্টিমিটার দূরত্বে থ্রো করে স্বর্ণপদক জেতেন। প্রথম স্থান অর্জনের পাশাপাশি তিনি এশিয়ার রেকর্ড বিকাশে ভূমিকা রেখেছেন। অন্যদিকে, তাঁরই স্বদেশি অ্যাথলেট আসাদোল্লাহ আজিমি ৭ মিটার ৯৩ সেন্টিমিটার দূরত্বে থ্রো করে ব্রোঞ্জপদক জেতেন। এ টুর্নামেন্টে ইরানের পদক তালিকায় দু’টি স্বর্ণ, সাতটি রৌপ্য ও পাঁচটি ব্রোঞ্জসহ যোগ হয় মোট ১৪টি পদক। ২০১৭ ওয়ার্ল্ড প্যারা অ্যাথলেটিক্স চ্যাম্পিয়নশিপের ট্রাক অ্যান্ড ফিল্ডে প্রতিবন্ধী অ্যাথলেটরা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। ইন্টারন্যাশনাল প্যারালিম্পিক কমিটির আয়োজনে লন্ডনের অলিম্পিক স্টেডিয়ামে এ টুর্নামেন্ট ১৪ জুলাই শুরু হয়ে চলে ২৩ জুলাই পর্যন্ত।

ইরানের জাতীয় যুব কুস্তি দল এশীয় যুব-কুস্তি প্রতিযোগিতার গ্রেকো রোমান বিভাগে চ্যাম্পিয়ন হয়। ইরানি যুব কুস্তিগীররা ৩টি স্বর্ণপদক, ৫টি রৌপ্যপদক ও একটি ব্রোঞ্জপদক পেয়ে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব অর্জন করেন। এই প্রতিযোগিতায় যথাক্রমে দ্বিতীয়, তৃতীয়, চতুর্থ ও পঞ্চম হয়েছে কাজাখস্তান, কিরঘিজিস্তান, ভারত ও দক্ষিণ কোরিয়া।

এশীয় যুব-কুস্তি প্রতিযোগিতার ফ্রি-স্টাইল বিভাগেও চ্যাম্পিয়ন হয়েছে ইরানের জাতীয় যুব কুস্তি দল। থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে অনুষ্ঠিত এই প্রতিযোগিতায় ইরানি যুব কুস্তিগীররা ৪টি স্বর্ণপদক, ২টি রৌপ্যপদক এবং ২টি ব্রোঞ্জপদক পেয়ে এশিয়ার মধ্যে চ্যাম্পিয়ন হবার গৌরব অর্জন করে। এশীয় চ্যাম্পিয়নশিপ প্রতিযোগিতায় দ্বিতীয় স্থান লাভ করে ভারত। তৃতীয় স্থান অর্জন করে কাজাখস্তান।

পোল্যান্ডে অনুষ্ঠিত ‘২০১৭ ওয়ার্ল্ড গেমে’ একটি সোনার ও চারটি রুপার মেডেলসহ পাঁচটি পদক জেতে ইরানের পাঁচ সদস্যের কারাতে টিম। ইরানের জাবিহোল্লাহ পুরশাব জাপানের প্রতিপক্ষ রাইয়ুতারো অরগাকে পরাজিত করে সোনার পদক জয় করেন। টুর্নামেন্টের ৮৪ কেজি ওজন-শ্রেণিতে অংশ নিয়ে তাঁকে পরাজিত করেন তিনি। এ নিয়ে অরগাকে পরপর সাত ম্যাচে হারান তিনি। এর আগে পুরশাব ২০১০ এশিয়ান গেমসের ৮৪ কেজি ওজন-শ্রেণিতে সোনা জিতেছিলেন। এছাড়া ২০১৬ বিশ্ব কারাতে চ্যাম্পিয়নশিপেও ব্রোঞ্জপদক জয় করেন তিনি।

ভারতে অনুষ্ঠিত ২০১৭ এশিয়ান অ্যাথলেটিকস চ্যাম্পিয়নশিপ থেকে চারটি পদক সংগ্রহ করেন ইরানি অ্যাথলেটরা। চ্যাম্পিয়নশিপের এবারের ২২তম আসরে চারটি স্বর্ণ ও একটি ব্রোঞ্জপদক জিতে টুর্নামেন্টে চতুর্থ স্থান অধিকার করে ইরান। এই চ্যাম্পিয়নশিপে ১২টি স্বর্ণ, ৫টি রৌপ্য ও ১২টি ব্রোঞ্জ, সর্বমোট ২৯টি পদক জিতে প্রথম স্থান অধিকার করে স্বাগতিক ভারত। গত ৬ জুলাই ভারতের ভুবনেশ্বর রাজ্যের কলিঙ্গ স্টেডিয়ামে চ্যাম্পিয়নশিপের পর্দা ওঠে। চলে ৯ জুলাই পর্যন্ত। এতে ৪৫টি দেশের ৮০০ জন অ্যাথলেট অংশ নেন।
মর্যাদাপূর্ণ এ টুর্নামেন্টে ইরানের প্রতিনিধিত্ব করেন ১৪ জন অ্যাথলেট। এদের মধ্য থেকে এহসান হাদ্দাদি, আলী সামারি, হাসান তাফতিয়ান ও হোসেইন কেইহানি চাকতি ও হ্যামার নিক্ষেপ করে স্বর্ণপদক জেতেন। এছাড়া ইরানের মোহসেন নিয়াদুস্ত দেড় হাজার মিটার রেসে অংশ নিয়ে ব্রোঞ্জপদক ঘরে তোলেন। চূড়ান্ত পদক তালিকায় চতুর্থ স্থান অর্জন করেন ইরানি অ্যাথলেটরা। এশিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপে এ যাবতকালের সবচেয়ে ভালো পারফরমেন্স দেখিয়েছেন তাঁরা।
চীন আটটি স্বর্ণ, সাতটি রৌপ্য ও পাঁচটি ব্রোঞ্জপদক জিতে দ্বিতীয় অবস্থান অর্জন করে। অন্যদিকে, চারটি স্বর্ণ, দু’টি রৌপ্য ও দু’টি ব্রোঞ্জপদক জিতে টুর্নামেন্টের তৃতীয় স্থান অধিকার করে কাজাখস্তান।

দক্ষিণ কোরিয়ায় অনুষ্ঠিত ২০১৭ বিশ্ব তায়কোয়ান্দো চ্যাম্পিয়নশিপে তৃতীয় অবস্থান অর্জন করে ইরান। তায়কোয়ান্দো চ্যাম্পিয়নশিপের এবারের ২৩তম আসর থেকে চারটি মেডেল ছিনিয়ে নিয়েছে ইরানের পুরুষ তায়কোয়ান্দো টিম। অন্যদিকে, নারী দল একটি মাত্র পদক জিতে টুর্নামেন্টে ১১তম অবস্থান অর্জন করে। খেলায় ইরানের জাতীয় পুরুষ তায়কোয়ান্দো টিম তিনটি রৌপ্য ও একটি ব্রোঞ্জপদক জিতে তৃতীয় অবস্থান অর্জন করে। তাদের পয়েন্ট সংখ্যা দাঁড়ায় ৪৬। টুর্নামেন্টে তিনটি স্বর্ণপদক ও একটি ব্রোঞ্জপদক জিতে প্রথম স্থান অধিকার করে দক্ষিণ কোরিয়া। তাদের পয়েন্টের সংখ্যা দাঁড়ায় ৬৭। এছাড়া চ্যাম্পিয়নশিপে একটি স্বর্ণ, তিনটি রৌপ্য ও একটি ব্রোঞ্জ পদক (৬৩ পয়েন্ট) জিতে দ্বিতীয় অবস্থান অর্জন করে রাশিয়া।

এদিকে, ইরানের নারী তায়কোয়ান্দো টিম একটি রৌপ্যপদক জিতে ১১ তম অবস্থান অর্জন করেছে। পদকটি জেতেন ২০১৬ রিও অলিম্পিকে প্রথম কোনো ইরানি নারী হিসেবে পদক বিজয়ী কিমিয়া আলীযাদেহ। এই অ্যাথলেটের পদক জয়ের মধ্য দিয়ে বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপে প্রথম কোনো মেডেল জিতল ইরানি নারী তায়কোয়ান্দোরা।
বিশ্ব তায়কোয়ান্দো চ্যাম্পিয়নশিপের এবারের ২৩তম আসর ২৪ জুন দক্ষিণ কোরিয়ার মুজুতে শুরু হয়ে চলে ৩০ জুন পর্যন্ত। আন্তর্জাতিক এই টুর্নামেন্টে ১৮৩টি দেশের সর্বমোট ৯৭৩ জন অ্যাথলেট অংশ নেন।
উল্লেখ্য, ২৩তম বিশ্ব তায়কোয়ান্দো চ্যাম্পিয়নশিপের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে পতাকা বহন করেন রিও অলিম্পিকে পদক জয়ী ইরানের কিমিয়া আলীযাদেহ। ১৮ বছর বয়সি ইরানি তরুণী কিমিয়া আলীযাদেহ রিও অলিম্পিকে তায়কোয়ান্দো প্রতিযোগিতায় মেয়েদের ৫৭ কেজি ওজনশ্রেণিতে ব্রোঞ্জপদক জিতে ব্যাপক সাড়া ফেলেন। এর মাধ্যমে তিনি অলিম্পিকে প্রথম কোনো ইরানি নারী হিসেবে পদক জেতার গৌরব অর্জন করেন।

আজারবাইযানে অনুষ্ঠিত চতুর্থ ইসলামিক সলিডারিটি গেমসে তৃতীয় অবস্থান নিশ্চিত করে ইরান। গেমসের ৪টি আসরে ৫৫টি পদক জয় করে ইরান। এর মধ্যে রয়েছে ১৪টি স্বর্ণ, ১৭টি রৌপ্য ও ২৪টি ব্রোঞ্জপদক। গত ১২ মে আজারবাইযানের রাজধানী বাকুতে চতুর্থ ইসলামিক সলিডারিটি গেমস শুরু হয়। এবারের গেমসের প্রতিপাদ্য ছিল ‘ঐক্যই আমাদের শক্তি।’ গত ২২ মে এই গেমস শেষ হয়। এবারের আসরে ২১টি ইভেন্টে ৫৭টি মুসলিম দেশের প্রায় ৬ হাজার অ্যাথলেট প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে।

চতুর্থ ইসলামিক সলিডারিটি গেমসে ইরানি নারী ক্রীড়াবিদরা চমৎকার নৈপুণ্য প্রদর্শন করেন। ইরানি নারী শ্যুটার নারজেস এমামগোলিনেযাদ ও এলাহে আহমাদি তাঁদের ক্রীড়ানৈপুণ্য প্রদর্শন করে দর্শকদের অভিভূত করেন। নারীদের ১০ মিটার এয়ার পিস্তল ইভেন্টে তাঁরা দু’জন প্রথম ও দ্বিতীয় স্থান অধিকার করে স্বর্ণ ও রৌপ্যপদক জিতে নেন। এমামগোলিনেজাদ ২৪৯.৬ পয়েন্ট পেয়ে স্বর্ণপদক এবং আহমাদি ২৪৬.১ পয়েন্ট পেয়ে রৌপ্যপদক লাভ করেন।
এ ছাড়া, ইরানি পুরুষ সাঁতারু দল ৪০০ মিটার ফ্রি-স্টাইল রিলেতে ব্রোঞ্জপদক লাভ করে। এই দলের চার সদস্য হলেন সিনা গোলামপুর, মেহদি আনসারি, জামাল চাভুশি এবং নেনিয়ামিন গরেহাসানলু। এই ইভেন্টে তুর্কি সাঁতারু দল স্বর্ণপদক এবং ইন্দোনেশিয়া দল রৌপ্যপদক অর্জন করে। ইসলামিক সলিডারিটি গেমসের প্রথম দু’দিনে মোট আটটি পদক জেতেন ইরানি ক্রীড়াবিদরা।

চতুর্থ ইসলামি সলিডারিটি গেমসে ১৬টি ইভেন্টে ১৬০ জন ইরানি অ্যাথলেট অংশ নেন। ইরানের নারী শ্যুটার মাহলাঘা জামবোযর্গ ইরানি দলের পতাকা বহন করেন। এ গেমসের প্রথম পর্বে চতুর্থ এবং দ্বিতীয় পর্বে রানার আপ হয়েছিল ইরান। ২০০৫ সালে সৌদি আরবে ইসলামি সলিডারিটি গেমস শুরু হয়।
এশিয়ান ফুটবল কনফেডারেশনের বিচ সকারে চ্যাম্পিয়ন হয় ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান । সংযুক্ত আরব আমিরাতকে ৭-২ গোলে পরাজিত করে ইরান এ গৌরব অর্জন করে। মালয়েশিয়ার উত্তর-পূর্বে বাটু বুরুক বিচে ফাইনাল ম্যাচ অনুষ্ঠিত হয়।
ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের পুরুষ জাতীয় ফ্রি-স্টাইল কুস্তি দল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় দলকে পরাজিত করে ২০১৭ সালের বিশ্বকাপ জেতে। ইরানের পশ্চিমাঞ্চলীয় কেরমানশাহ শহরে এবারের বিশ্বকাপের আসর বসে।
কেরমানশাহ ইমাম খোমেইনী স্পোর্ট ভেন্যুতে অনুষ্ঠিত খেলায় ইরান প্রতিপক্ষ আমেরিকাকে ৫-৩ ব্যবধানে হারিয়ে শিরোপা নিশ্চিত করে। ইরানের ২৭ বছর বয়সী হাসান সাবজালি মার্কিন কুস্তিবিদ আন্থোনি রামোসকে ৫৭ কিলোগ্রাম ওজন শ্রেণির খেলায় ৬-০ পয়েন্টে পরাজিত করেন। ৬১ কেজি ওজন শ্রেণিতে মাসুদ ইসমাইলপুর জোবায়েরির কাছে আমেরিকার লোগান স্টিবার হেরে যান ২-৬ পয়েন্টে। ইরানের আরেক প্রতিদ্বন্দ্বী মেইসাম নাসিরি ৬৫ কেজি ওজন শ্রেণিতে ৫-৪ পয়েন্টে পরাজিত করেন আমেরিকার ফ্রাংক অ্যানিলো মোলিনারোকে। এছাড়া, ৭০ কেজি ওজন শ্রেণিতে মোস্তফা হোসেইনখনির কাছে ২-০ তে হেরে যান জেমস গ্রিন।
১২৫ কেজি ওজন শ্রেণিতে কোমেইল কাসেমি ৫-০ পয়েন্টে দৃষ্টিনন্দন বিজয় অর্জন করেন। তিনি মার্কিন কুস্তিবিদ নিক গুইয়াজডোস্কিকে পরাজিত করেন। এ নিয়ে ইরানের জাতীয় কুস্তিদল ২০১২ সাল থেকে টানা রেকর্ড সংখ্যক ছয়বার বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব অর্জন করল।

ক্যানোয়িং। বাংলায় যাকে সবাই চেনে নৌকা বাইচ হিসেবে। রোমানিয়ায় অনুষ্ঠিত হয় ‘২০১৭ আইসিএফ ক্যানোয়িং স্প্রিন্ট জুনিয়র এবং অনূর্ধ্ব-২৩ বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপ’।
নৌকা বাইচের এই বিশ্ব আসরে ইরানের ইতিহাসে প্রথম পদক জয় করলেন মোহাম্মাদ নাবি রেজায়ি। ইরানি এই অ্যাথলেট চ্যাম্পিয়নশিপের জুনিয়র বিভাগের ১ হাজার মিটার ব্যক্তিগত নৌকা বাইচ প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে তৃতীয় অবস্থান অর্জন করে ব্রোঞ্জপদক জেতেন। রেজায়ি নৌকা বাইচের আন্তর্জাতিক কোনো আসরের এই শ্রেণিতে ইরানের ইতিহাসে প্রথম মেডেলে জয় করেন। ফাইনাল ম্যাচে তিনি জার্মানি, লাটভিয়া, বেলারুস, স্পেন, কিউবা, ব্রাজিল, হাঙ্গেরি ও রাশিয়ার প্রতিপক্ষদের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে তৃতীয় অবস্থান অর্জন করেন।

বিশ্বের সেরা কুস্তিগীরের খেতাব পেয়েছেন ইরানের রাহিমি। ইউনাইটেড ওয়ার্ল্ড রেসলিং (ইউডব্লিউডব্লিউ) র্যাঙ্কিংয়ে শীর্ষ অবস্থান দখল করেন ইরানি ফ্রি-স্টাইল রেসলার হাসান রাহিমি। ইউডব্লিউডব্লিউ’র চলতি জুলাইয়ের আসরে ৫৭ কেজি ওজন-শ্রেণিতে সেরা অ্যাথলেটের খেতাব কুড়িয়েছেন তিনি। ২৭ বছর বয়সী এ কুস্তিগীর এবারের আসরে দারুণ খেলে শীর্ষ অবস্থান দখল করেন। তার পরেই র্যাঙ্কিংয়ে দ্বিতীয় অবস্থান অর্জন করেন ইউরোপের সবচেয়ে খ্যাতিমান রেসলার তারকা আজারবাইযানের জিওর্গি ইদিশেরাশভিলি। একই ওজন শ্রেণিতে তৃতীয় অবস্থান অর্জন করেন তুরস্কের ফ্রিস্টাইল রেসলার সুলেমান আতলি।

ভারোত্তোলনে বিশ্ব রেকর্ড করেন ইরানের প্রতিবন্ধী ভারোত্তোলক মজিদ ফারজিন। তিনি মাথার ওপর ২৩৮ কেজি ওজন তুলে বিশ্ব রেকর্ড ভেঙেছেন। ইরানের জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপের খেলায় মজিদ এই রেকর্ড ভঙ্গ করেন। চ্যাম্পিয়নশিপের ৮৮ কেজি ওজন-শ্রেণিতে সোনা জয় ছাড়াও ৮০ কেজি ওজন-শ্রেণিতেও রেকর্ড করেন এই প্রতিবন্ধী ভারোত্তোলক। তেহরানে ১৬ জুলাই ন্যাশনাল হ্যান্ডিক্যাপড ওয়েটলিফ্টিং চ্যাম্পিয়নশিপ শুরু হয়ে চলে ১৮ জুলাই পর্যন্ত। ইরানের ১৯ প্রদেশ থেকে এতে শতাধিক ভারোত্তোলক অংশ নেন।
এছাড়া খেলাধুলার আরও অনেক ক্ষেত্রেই দেশটি সাফল্যের স্বাক্ষর রেখে চলেছে যা এই সীমিত পরিসরে তুলে ধরা প্রায় অসম্ভব। তবে একথা বলা যায়, খেলাধুলায় ইরানের সফলতার এই ধারা অব্যাহত থাকলে দেশটি একদিন বিশ্ব ক্রীড়া জগতের শীর্ষস্থানীয় দেশগুলোর অন্যতম স্থান দখল করতে সক্ষম হবে তাতে কোনও সন্দেহ নেই।