বৃহস্পতিবার, ৩রা এপ্রিল, ২০২৫ খ্রিস্টাব্দ, ২০শে চৈত্র, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

English

ইসলাম ও ইমাম খোমেইনী (র.)

পোস্ট হয়েছে: সেপ্টেম্বর ৮, ২০১৫ 

news-image

আলী আভারসাজী

মহানবী হযরত মুহাম্মাদ (সা.)-এর অস্তিত্ব না থাকলে এই পৃথিবী সৃষ্টি হতো না। যাঁর উসিলায় আমরা সকল কিছু পেয়েছি তাঁর প্রতি ভালোবাসা রাখা, তাঁর আকর্ষণে ক্রন্দন করা আমাদের জন্য বড়ই সৌভাগ্যের বিষয়। ইসলামকে বোঝার জন্য, কুরআনকে বোঝার জন্য ইসলামী সম্মেলন খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আলেমগণ এই ধরনের অনুষ্ঠানে কুরআন ও হাদীসের আলোকে ইসলামী জীবনাদর্শ জনগণের সামনে তুলে ধরেন।

আল্লাহর রাসূল (সা.) ও তাঁর আহলে বাইতের প্রতি ভালোবাসা রাখলেই একজন মানুষ ঈমানদার হতে পারে, তার হৃদয় জীবন্ত হয়ে ওঠে। মহানবী (সা.) যদিও আমাদের সাথে জীবিত নেই তবুও তাঁর রুহ মোবারক আমাদের মাঝে জাগ্রত। তাঁর প্রতি আমাদের শ্রদ্ধা, ভালোবাসা জানাতে হবে, তবেই আমাদের মুক্তি। আল্লাহ পাক কুরআনে ঘোষণা করেছেন, ‘হে রাসূল! আপনি বলে দিন, তোমরা যদি আল্লাহকে ভালোবাসতে চাও তাহলে আমাকে অনুসরণ কর।’ তাই আল্লাহর ভালোবাসা আমাদের পেতে হলে আমাদের অবশ্যই আশেকে রাসূল হতে হবে।

মহানবী দীর্ঘ ২৩ বছরের সংগ্রামবহুল জীবনে ইসলাম প্রচার করতে গিয়ে যে দুঃখ-কষ্ট সহ্য করেছেন তার বিনিময়ে আল্লাহর কাছে তিনি কী পুরস্কার চান এই প্রশ্ন করা হলে মহানবী বলেছিলেন, তাঁর আদর্শ এবং তাঁর আহলে বাইতকে যেন ভালোবাসা হয়, তাঁদেরকে যেন অনুসরণ করা হয়।

একটি চিরন্তন সত্য ধর্ম হিসেবে ইসলাম এসেছে। ইসলামকে যারা সেকেলে বলে উড়িয়ে দিতে চায় তারা আসলে ভুল ধারাণায় ডুবে আছে। সকল ধর্মের ওর প্রাধান্য দিয়ে আল্লাহ তাআলা এই দীন ইসলামকে কিয়ামত পর্যন্ত প্রতিষ্ঠিত করেছেন। যারা বলে আধুনিক বিজ্ঞানের যুগে ইসলাম চলতে পারে না তাদের উচিত ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের দিকে লক্ষ্য করা। আধুনিক ইরানে সম্পূর্ণ কুরআনভিত্তিক শাসনব্যবস্থা চালু হয়েছে। সেখানে জনগণের সমর্থনেই আল্লাহর আইন চালু হয়েছে, কুরআন ও সুন্নাহর আদর্শে সবকিছু চলছে।

রাসূলুল্লাহ (সা.) ও খোলাফায়ে রাশেদীনের পর মুসলিম সাম্রাজ্য যুলুম-নির্যাতন ও অত্যাচারে ভরে যায়। ইসলামের নামে রাজতন্ত্র চালু করা হয়, মানুষকে বিভ্রান্তিতে ফেলে দেয়া হয়। ইসলামী বিপ্লবের আগে ইরানের শাসনক্ষমতায় ছিল স্বৈরাচারী ও ইহুদি মার্কিনপন্থী রেযা শাহ পাহলভী। তখন রাষ্ট্রীয় কোনো পর্যায়েই কুরআন-সুন্নাহভিত্তিক শাসন চালু ছিল না। রেযা শাহ ও তার দোসররা ইরানের বুক থেকে ইসলামী মূল্যবোধকে ধ্বংস করে দেয়ার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত ছিল। দেশব্যাপী মদ, জুয়া ও অশ্লীলতার প্রকোপ মারাত্মকভাবে বেড়ে গিয়েছিল। ইসলামের কথা যারা বলত তাদেরকে অমানুষিক নির্যাতন করা হতো। দেশের আলেমগণ কারাভোগ করেছেন, অসহ্য নির্যাতন ভোগ করেছেন, তবু স্বৈরাচারের কাছে মাথা নত করেননি।

ইরানকে আমেরিকানরা মধ্যপ্রাচ্যে তাদের অন্যতম ঘাঁটি মনে করত। তাদের ধারণা ছিল ইরান থেকেই তারা গোটা মধ্যপ্রাচ্যকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে। এই করুণ পরিস্থিতিতে ইমাম খোমেইনী (র.) একজন মুজাহিদ আলেম হিসেবে আত্মপ্রকাশ করলেন। তিনি শাহী শাসনের বিরুদ্ধে উচ্চকণ্ঠে বললেন, আল্লাহর আইন ছাড়া কোনো আইনই চলতে পারে না। তিনি আল্লাহর শাসন কায়েম করার জন্য মানুষকে উতসাহিত করলেন এবং স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবার জন্য সকলের প্রতি আহ্বান জানালেন। তাঁর সেই আন্দোলনের চাপে শাহের তখত ভেঙে খান খান হয়ে গেল। এক লক্ষ সত্তর হাজার শহীদের আত্মত্যাগের বিনিময়ে ইরানে ইসলামী বিপ্লব বিজয় লাভ করল। ইমাম খোমেইনীর বলিষ্ঠ নেতৃত্বে ইরানের বুকে প্রতিষ্ঠিত হলো ইসলামী হুকুমত। আত্মপ্রকাশ করল ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরান। ইরানে প্রতিষ্ঠিত হলো কুরআনের হুকুমত। শাহের আমলের যে সংবিধান ছিল তা ইমাম খোমেইনী পুড়িয়ে দিয়েছেন। এখন কুরআন ও সুন্নাহভিত্তিক সংবিধান ইরানে চালু হয়েছে। ইরানে মদ বা জুয়ার আড্ডা চালু নেই। কোনো বেপর্দা বেহায়া নারীকে ইরানে এখন দেখা যায় না। সকল নারী ইসলামী পর্দা মেনে চলছে। ইসলামবিরোধী কোনো কিছু ইরানে দেখা যায় না।

ইসলাম আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিরোধী নয়। ইসলামই আসলে জ্ঞান-বিজ্ঞানের পথ দেখিয়েছে। ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায় মুসলমানরাই ইউরোপকে জ্ঞান-বিজ্ঞান শিখিয়েছে। ইসলামী ইরানে সিনেমা বন্ধ করা হয়নি। সেখানে সিনেমার খারাপ দিকগুলো শুধু বাদ দেয়া হয়েছে। ইরানে চরিত্র গঠনমূলক সিনেমা তৈরি হচ্ছে, সিনেমায় ইসলামী সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য, মুসলমানদের বীরত্ব ও গৌরব ফুটিয়ে তোলা হচ্ছে। এমন গজল ও সংগীত পরিবেশিত হচ্ছে যাতে ইসলামী চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য ফুটে ওঠে। বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে, রয়েছে জ্ঞান-বিজ্ঞানের আধুনিক কেন্দ্রসমূহ। নারী-পুরুষ সকলেই আধুনিক জীবন যাপন করছে। মেয়েরা পর্দার মাধ্যমে পুরুষের পাশাপাশি সমাজ গঠনে কাজে আত্মনিয়োগ করেছে। ইসলামী বিপ্লবের সাফল্যের পেছনে যে জিনিসটি কাজ করেছিল সেটি হলো জনগণের ঐক্য। জনগণ ঐক্যবদ্ধভাবে একজন নেতাকেই মেনে নিয়েছিল। সেই নেতা ছিলেন ইমাম খোমেইনী, যিনি আল্লাহর হুকুম বাস্তবায়নে রাসূলের প্রতিনিধি স্বরূপ ছিলেন। শিয়া-সুন্নি নির্বিশেষে সকলে তাঁকে মেনে নিয়েছিল বলে বিপ্লব সফল হয়েছে। ইমাম খোমেইনীর ইন্তেকালের পরও জনগণ তাঁর প্রতিনিধি রাহবার আয়াতুল্লাহ সাইয়্যেদ আলী খামেনেয়ীর একক নেতৃত্ব মেনে নিয়েছে। মুসলমানদের মাঝে একক নেতৃত্ব না থাকলে ঐক্য বজায় রাখা সম্ভবপর হয় না।

মহানবীর আমলে মক্কা ও মদীনার মসজিদকেন্দ্রিক জুমআর নামাযের বড় জামাআত হতো। ইরানের রাজধানী তেহরান প্রায় ১ কোটির অধিক লোকসংখ্যার একটি শহর। সেখানে একটি মাত্র জুমআর জামাআত অনুষ্ঠিত হয়। লক্ষ লক্ষ মানুষ ঐক্যবদ্ধভাবে এই নামাযে শরীক হন। ইরানের বিভিন্ন বড় বড় শহরে একই দিনে এই জুমআর নামায অনুষ্ঠিত হয়। জুমআর আগের দিন ইমামদের কাছে দেশের ও বিদেশের গুরুত্বপূর্ণ খবরাখবর পৌঁছে যায়। জুমআর দিন ইমামগণ খুতবার মাধ্যমে দেশবিদেশের পরিস্থিতি জনগণের সামনে তুলে ধরেন, মুসলমানদের করণীয় কী তা বুঝিয়ে দেন এবং সকল মুসলমানকে ভেদাভেদ ভুলে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান। মুসলমানদের সমস্যাগুলো তুলে ধরে তার সমাধানের পথনির্দেশ দান করেন। এই অবস্থা সৃষ্টির পেছনে কাজ করেছে ইমাম খোমেইনীর সাহস ও নেতৃত্ব এবং কুরআনের ভিত্তিতে জনগণের ঐক্য। আমেরিকা-ইউরোপ আজ ভয় পাচ্ছে যে, মুসলমানরা যদি ঐক্যবদ্ধ হয়েই যায় তাহলে ফিলিস্তিন ও অন্যান্য নির্যাতিত জাতিকে ধরে রাখা যাবে না, ইসরাইলের যায়নবাদী আধিপত্য আর টিকিয়ে রাখা যাবে না। ওরা স্বাধীন হয়ে যাবে।

ইমাম খোমেইনী (রহ.) বলেছেন, মুসলমানরা যারা ইসলামকে মেনে নিয়েছে তারা ঐক্যবদ্ধ থাকবে। শিয়া-সুন্নি নির্বিশেষে সকলের উচিত আজকের বিশ্ব পরিস্থিতিতে কুরআনের ভিত্তিতে ঐক্যবদ্ধ থাকা। এটা সকলের জন্য ওয়াজিব। বর্তমানে ইরানের রাহবারেরও একই আহ্বান। সকল মুসলমানকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। সকলকে পরস্পরের ভাই ও বন্ধু হতে হবে। আমেরিকা-ইউরোপের বাতিল শক্তির সাথে যেন আমাদের আপোস না হয়। তাদের প্রচারমাধ্যমগুলো ইসলামের বিরুদ্ধে প্রচারণা চালায়। তা থেকে সতর্ক থাকতে হবে। সকল মুসলমানকে ভাই ভাই হয়ে ঐক্যবদ্ধভাবে বাতিলের মোকাবিলায় এগিয়ে যেতে হবে।