ইসলামী বিপ্লবের সাফল্য
পোস্ট হয়েছে: আগস্ট ৬, ২০১৩

ইসলামের উত্থান ও দাম্ভিক শক্তির পতন
ইরানে আড়াই হাজার বছরের শাসনের সর্বশেষ যোগসূত্র একটি শক্তিশালী শাসককে উৎখাত করে সে স্থলে একটি জনপ্রিয় বিপ্লবের মাধ্যমে ইসলামী ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার কাহিনী তথা ইসলামী বিপ্লবের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে মুসলমান ও অমুসলমান সবাই সেখান থেকে মূল্যবান অনেক কিছু শিক্ষালাভ করতে পারবে।
এই নিবন্ধের উদ্দেশ্য হচ্ছে স্বেচ্ছাচারী শাহের আমলে ইরানের পরিস্থিতি সংক্ষেপে তুলে ধরা এবং ইসলামী বিপ্লব কিভাবে সফল হয়েছে তা ফুটিয়ে তোলা। ইসলামী বিপ্লবের বিরুদ্ধে বিশ্বের দাম্ভিক শক্তিসমূহের ষড়যন্ত্রের স্বরূপ প্রকাশ করাও এই নিবন্ধনের উদ্দেশ্য।
শাহ আমলের ইরানের সরকার পদ্ধতি সম্পর্কে বলতে গেলে আমরা সংক্ষেপে এ কথাই বলতে পারি যে, ঐ সময় যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সর্ববিষেয়ের উপর আধিপত্য বিস্তার করেছিল। শাহ পুরোপুরিভাবেই তাদের নিয়ন্ত্রণে ছিল এবং একটি পুতুলের মতো তাদের আদেশ-নির্দেশ অনুসরণ করত। সুতরাং ইরান ঐ সময় মারাত্মকভাবে ইসলামবিরোধী নীতি অনুসরণ করছিল। দেশের মোট জনসংখ্যার শতকরা ৯৯ ভাগ মুসলমান হওয়া সত্ত্বেও ঐ অন্ধকারাচ্ছন্ন বছরগুলোতে বিভিন্ন পন্থায় তাদেরকে অপমানজনক অবস্থায় ফেলা হয় এবং তাদের উপর নির্যাতন চালানো হয়। এই ধরনের পন্থায় ধর্মীয় নেতাদের উপর অত্যন্ত চাপ প্রয়োগ করা হয়। পাহলভী শাসকগোষ্ঠীর ইসলামবিরোধী কর্মকাণ্ডের বিরোধিতা করায় ইসলামী আন্দোলনের নেতারা প্রায়ই হামলার শিকার হতেন। অধিকাংশ ধর্মীয় নেতাকে হয় কারাগারে প্রেরণ করা হয় আর না হয় তাঁদের উপর তীক্ষè দৃষ্টি রাখা হয়। এসব ইসলামী নেতাকে স্তব্ধ করে দেয়ার উদ্দেশ্যে শাহের এজেন্টরা ধর্মীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, বিশেষ করে পবিত্র কোম নগরীতে প্রায়ই হামলা চালাত। একই কায়দায় তারা বিশ্ববিদ্যালয়সমূহেও থাবা বিস্তার করত। সত্যসন্ধানী ছাত্রদের বিক্ষোভ প্রতিবাদ দমন করাই ছিল এই হামলার লক্ষ্য। ছাত্ররা তাদের প্রিয় নেতা ইমাম খোমেইনী (রহ.)-কে বলপূর্বক নির্বাসনে পাঠানো এবং ইসরাইলের প্রতি শাহের সরকারের সমর্থনসহ বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের বিরোধিতা করে বিক্ষোভ প্রদর্শন করত।
ইসলামী বিপ্লবের লাল মশাল জ্বলে ওঠার পূর্বে শাহের শাসনের অন্তিমকালে শাসকগোষ্ঠী ইরানী জাতির মধ্য থেকে সকল ইসলামী প্রবণতা ধ্বংস করা, অন্যান্য মুসলিম দেশ থেকে তাদের বিচ্ছিন্ন করা এবং তাদের সমৃদ্ধ ইসলামী সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য থেকে সরিয়ে নেয়ার লক্ষ্যে ইরানের সাম্প্রতিক ইতিহাসে প্রভাব বিস্তারকারী কয়েকটি পদক্ষেপ নেয়ার চেষ্টা করে। স্বৈরাচারী শাহ এসব কৌশল গ্রহণ ছাড়াও হিজাব পরিধানকারী মহিলাদের বিশ্ববিদ্যালয়, স্কুল, এমনকি কতিপয় হোটেল ও রেস্তোরাঁয় প্রবেশ নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। শাহ যে যুক্তরাষ্ট্রের হাতের পুতুল এবং ইসলাম ও মুসলমানদের প্রকাশ্য শত্রু তা তার এসব প্রচেষ্টার মধ্য দিয়ে ফুটে ওঠে এবং এতে তার আসল চেহারা ধরা পড়ে যেত। এই সত্য রোগ-ব্যাধি জর্জরিত সমাজের বিরুদ্ধে সংগ্রামে মুসলমানদেরকে দৃঢ় সংকল্প করেছে। মুসলমান ও ধর্মীয় নেতাদের একশ’ বছরেরও অধিক সময়ের সংগ্রামের মধ্যে ইসলামী বিপ্লবের শিকড় প্রোথিত। ইমাম খোমেইনী (রহ.)-এর নেতৃত্বে ১৯৬৩ সাল থেকে এই বিপ্লব চলতে থাকে এবং ১৯৭৮ সালের পূর্ব পর্যন্ত তা ছিল অনেকটা সুপ্ত অবস্থায়। ঐ বছর ইমাম খোমেইনীর জ্যেষ্ঠ পুত্রের মৃত্যু এবং শাহের তল্পীবাহক একটি পত্রিকায় ইমামের প্রতি চরম অবমাননাকর একটি নিবন্ধ প্রকাশ বিপ্লবের স্ফুলিঙ্গে যেন ঘি ঢেলে দিল। এই বিপ্লবের আগুন দাউ দাউ করে জ্বলে উঠে চারদিকে এমনভাবে ছড়িয়ে পড়লো যে, পাহলভী বংশের ভিত্তিমূলকেই পুড়িয়ে ছারখার করে দিল। ইসলামী বিপ্লবের সাফল্যের পিছনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে উপাদানটি কাজ করেছে সেটি হচ্ছে জনগণ এবং ইমাম খোমেইনী (রহ.)-এর বিজ্ঞ নেতৃত্ব। যেসব জাতি নিজেদেরকে বিদেশীদের গোলামি হতে মুক্ত করতে চেষ্টা করছে এবং সত্যিকার স্বাধীনতা লাভ করতে চাইছে তাদের জন্য এটা খুবই ভাল শিক্ষা হতে পারে। তাদের এটা জানা উচিত যে, শত্রুদের বিরুদ্ধে বিজয় অর্জন করতে হলে এবং আল-কুদসকে ইহুদিবাদী জবর দখলকারীদের হাত থেকে মুক্ত করতে হলে তাদেরকে অবশ্যই ঐক্যবদ্ধ হতে হবে।
এটা প্রত্যক্ষ করা গেছে যে, ইসলামী বিপ্লবে সর্বস্তরের জনগণ অংশ নিয়েছে। বিপ্লবের প্রতি সমর্থন জ্ঞাপনে কোন কিছুই তাদেরকে বাধা দিতে সক্ষম হয়নি। সর্বস্তরের মানুষ ইসলামের পতাকাতলে সমবেত হয়েছে এবং ইমামের নির্দেশ অনুসরণ করেছে। এভাবেই তারা রেজা শাহ পাহলভীর ইসলামবিরোধী সরকারকে উৎখাতের সংগ্রামে জয়ী হয়েছে। এই লক্ষ্য অর্জনের জন্য তাদের অনেককেই শাহাদাত বরণ করতে হয়েছে। ইসলামী বিপ্লবকে সফল করে তোলার লক্ষ্যে তারা জীবন বিসর্জন দিতেও কুণ্ঠিত হয়নি। ১৭ শাহরিভার ১৩৫৭ (সেপ্টেম্বর ১৯৭৮) ‘কালো শুক্রবার’ শাহের সৈন্যদের গুলিতে কয়েক হাজার লোক শহীদ হন। এর মধ্যে শত শত সাহসী মহিলা এবং শিশুও ছিল। ঐ দিনের শহীদ এবং আহতদের রক্তের আখরে ইরানের মুসলমানদের সংগ্রামের ইতিহাসের আরেকটি অধ্যায় রচিত হলো।
ইমাম খোমেইনী (রহ.)-এর আস্থা এবং দৃঢ়তা ইসলামী বিপ্লবের বিজয়ের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ। ইমাম (রহ.)-এর সবচেয়ে অনুপ্রেরণাদায়ক বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, শাহকে উৎখাত করা সম্ভব- একথা যখন কেউ বিশ্বাসই করতে পারত না ঠিক সেই সময় তাঁর লক্ষ্য অর্জন এবং চূড়ান্তভাবে বিজয়ের ব্যাপারে তিনি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাসী ছিলেন। ইমামের এই বিশ্বাস ও দৃঢ়সঙ্কল্প আল্লাহ প্রদত্ত বিশেষ রহমতস্বরূপ। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, ধর্মের নামে যে কোন শক্তি বিজয় অর্জনের জন্য চেষ্টা করবে তিনি তাকে বিজয়ী করে দেবেন। আল্লাহ তাআলার রহমতের উপর ভিত্তি করে ইমাম খোমেইনী (রহ.) তাঁর দীর্ঘ নিঃসঙ্গ নির্বাসিত জীবনের পূর্ণ সময়টাতেই ইসলামী বিপ্লবের প্রতি সমর্থন যুগিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছেন এবং সংশয় ও বিপদ-আপদের সময়ও ইসলামের বিপ্লবী চেতনাকে ধরে রাখেন।
ইরানে ইসলামী প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠার ফলে যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বে তার সবচেয়ে বড় সামরিক ও অর্থনৈতিক ঘাঁটি হারিয়েছে। দীর্ঘ ৩০ বছরের মার্কিন আজ্ঞাবাহী রেজা শাহ দেশ ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয় এবং আরেক মার্কিন পুতুল ও আন্তর্জাতিক ইহুদিবাদী চক্রের দোসর মিসরের আনোয়ার সাদাতের আশ্রয় গ্রহণ করতে বাধ্য হয়।
ইরানের ইসলামী বিপ্লবের সাফল্য বিশ্বের বড় শয়তান (যুক্তরাষ্ট্র)-এর প্রতি মারাত্মক হুমকির সৃষ্টি করে। কারণ, বিশ্বের একশ’ কোটি মুসলমানের মধ্যে এই বিপ্লবের ঢেউ লেগেছে। বিশেষ করে মার্কিন অনুগত দেশগুলোর জনগণের মধ্যে এই বিপ্লবের প্রভাব ছড়িয়ে পড়ায় তাদের স্বার্থহানির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। বিশ্বের নির্যাতিত মুসলমানদের জাগিয়ে তোলার ক্ষেত্রে ইসলামী বিপ্লব একটি বিরাট ভূমিকা পালন করছে। এই বিপ্লবকে ধ্বংস করার জন বড় শয়তান নানা ধরনের ষড়যন্ত্র করে, কিন্তু আল্লাহর রহমতে সকল ষড়যন্ত্রই নস্যাৎ হয়ে যায়।
যখন যক্তরাষ্ট্র ইরানের উপর হামলা চালানোর জন্য সাদ্দামকে প্ররোচিত করেছিল তখন তাদের ধারণা ছিল ইসলামী প্রজাতন্ত্র ধ্বংস হয়ে যাবে। কিন্তু সে সময় তারা ইরানী মুসলমানদের আত্মবিসর্জনের দৃঢ় মনোভাব, বিপ্লবের প্রতি তাদের অঙ্গীকার এবং আল্লাহর রহমতের বিষয়টি হিসাবে আনতে ব্যর্থ হয়েছিল।
স্বল্পকালের মধ্যেই ইরানের সকল মানুষ বাথপন্থী শত্রুদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের জন্য প্রস্তুত হয়ে গেল। সাদ্দাম তার ভুল বুঝতে পেরে নিজের চাপিয়ে দেয়া এই যুদ্ধ বন্ধের জন্য চেষ্টা করে। কিন্তু বিশ্বের পরাশক্তিবর্গের প্ররোচনায় এবং অঞ্চলের শাসকদের সাহায্যে এই যুদ্ধ দীর্ঘ আট বছর স্থায়ী হয়। ইরান যখন নিশ্চিত জয়ের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল ঠিক সে সময়ই যুদ্ধ বন্ধ করা হয়।
আল্লাহর অসীম রহমতে ইসলামী বিপ্লবের শত্রুরা আজ বিপর্যস্ত। চারদিকে আজ ইসলামী বিপ্লবের জয় জয়কার। বিশ্বের নির্যাতিত-নিপীড়িত মানুষ আজ ইসলামী বিপ্লবের পক্ষে আশার আলো দেখতে পেয়েছে।
(নিউজলেটার, ফেব্রুয়ারি ১৯৯২)