বৃহস্পতিবার, ৩রা এপ্রিল, ২০২৫ খ্রিস্টাব্দ, ২০শে চৈত্র, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

English

ইরান সাংস্কৃতিক কেন্দ্রে কবি হাফিজের স্মরণে সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান

পোস্ট হয়েছে: অক্টোবর ১৪, ২০১৯ 

news-image

বিশ্বখ্যাত ইরানি কবি হাফিজ শিরাজির স্মরণে সোমবার বিকেলে ঢাকাস্থ ইরান সাংস্কৃতিক কেন্দ্র মিলনায়তনে এক আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশে নিযুক্ত ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের রাষ্ট্রদূত জনাব মুহাম্মাদ রেজা নাফার। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিশিষ্ট সংগীত পরিচালক ও বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির সাবেক মহাপরিচালক আজাদ রহমান।ঢাকাস্থ ইরান সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের কালচারাল কাউন্সেলর সাইয়্যেদ হাসান সেহাতের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে প্রধান আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফারসি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগের ইরানি ভিজিটিং প্রফেসর ড. কাযেম কাহদুয়ী। অনুষ্ঠানে গজলশিল্পীদের সাথে সুরের মূর্ছনায় মঞ্চ মাতান বিশিষ্ট বংশীবাদক আরিফুর রহমান।অনুষ্ঠানে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ফারসি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগের  শিক্ষক ও ছাত্রছাত্রীদের পাশাপাশি সাহিত্য ও সংগীত অনুরাগীরা উপস্থিত ছিলেন।

অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রদূত মোহাম্মদ রেজা নাফার বলেন, হাফেজ প্রায় ৭০০ বছর আগে ভারতবর্ষে মিষ্টিখণ্ড পাঠিয়েছিলেন। সেই মিষ্টিখণ্ড পেয়ে উপমহাদেশের অনেক মানুষ মিষ্টি মানুষে পরিণত হয়েছেন। আনন্দের বিষয় যে, ইরান ও  বাংলাদেশ দুই দেশের মানুষ পাশাপাশি বসেছেন এবং হাফিজের ব্যাপারে আলোচনায় অংশগ্রহণ করেছেন।

তিনি বলেন, হাফিজ একজন আরেফ ছিলেন, একজন আশেক ছিলেন। তিনি যে হাফিজ হয়েছিলেন তার পেছনে কিছু রহস্য ছিল। হাফিজ কোরআনকে হেফজ করেছিলেন। পবিত্র কোরআনের আয়াতে বলা হয়েছে, কোন পবিত্র ব্যক্তি ছাড়া একে কেউ স্পর্শ করতে পারে না। হাফিজ ছিলেন তেমন পবিত্র ব্যক্তি।

বক্তব্য রাখছেন ঢাকাস্থ ইরান সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের কালচারাল কাউন্সেলর সাইয়্যেদ হাসান সেহাত

আরেকটি রহস্য ছিল রাসূলুল্লাহ (সা.) ও তাঁর পরিবার তথা আহলে বাইতের সাথে সম্পর্ক। তিনি ছিলেন রাসূলুল্লাহ (সা.) ও আহলে বাইতের প্রেমিক। হাফিজের মতো এত পাণ্ডিত্যপূর্ণ মানুষ খুঁজে পাওয়া যায় না। তিনি ছিলেন পরিপূর্ণ মানুষ। বিশ্বের সকল মানুষ হাফিজকে ভালোবাসে।

বাংলার ব্যাপারে হাফিজের বিশেষ ভালোবাসা ছিল। সেই ভালোবাসা থেকেই তিনি মিষ্টিখণ্ড প্রেরণ করেছিলেন। সেই মিষ্টিখণ্ডের রং কখনই হারিয়ে যায় নি। আমরা গর্ববোধ করছি যে, বাংলাদেশের অনেক মানুষের সাথে ফারসি সম্পর্ক রয়েছে, তাঁরা সীনায় সীনায় ফারসিকে সংরক্ষণ করেছেন।

তিনি আরো বলেন, আমরা গর্ববোধ করি আরো একটি কারণে যে, বাংলাদেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রায় ২০০০ ছাত্রছাত্রী ফারসি ভাষায় শিক্ষালাভ করছেন।

 

অনুষ্ঠানে ঢাকাস্থ ইরান সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের কালচারাল কাউন্সেলর সাইয়্যেদ হাসান সেহাত বলেন, কবি হাফিজ শিরাজি ছিলেন মহব্বত ও ভালোবাসার কবি। তিনি তার দিওয়ানে ৩৫০ বার প্রেম বা এশ্ক শব্দটি ব্যবহার করেছেন।তবে কবি কিভাবে ও কি উদ্দেশ্যে তার দিওয়ানে  প্রেম বা এশ্ক শব্দটি ব্যবহার করেছেন তা জানতে হলে তার সাহিত্যের গভীরে প্রবেশ করতে হবে। আর এক্ষেত্রে সহযোগিতায় আপনাদের জন্য কালচারাল সেন্টোরের দরজা সবসময় খোলা রয়েছে। তিনি  বলেন, ইরান সাংস্কৃতিক কেন্দ্রে ফারসি ভাষা কোর্স পরিচালনা করা হচ্ছে। আপনারা এ কোর্সে অংশগ্রহণ করতে পারেন। এতে আপনারা মহাকবি হাফিজ, সাদী, মাওলানা রুমির কবিতার রস আস্বাদন করতে পারবেন। আমরা হাফিজ বা রুমির কবিতার ব্যাখ্যার ক্লাসের আয়োজন করতে পারি।

তিনি আরো বলেন, ইরান সাংস্কৃতিক কেন্দ্রে ফারসি ভাষা শিক্ষা কোর্সের পাশাপাশি ক্যালিগ্রাফি, ফটোগ্রাফি, সিনেমানোগ্রাফির কোর্স চালু রয়েছে। এখানে আপনাদের আগমন আমাদেরকে আনন্দিত করবে।

 

বক্তব্য রাখছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফারসি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগের ইরানি ভিজিটিং প্রফেসর ড. কাযেম কাহদুয়ী

অনুষ্ঠানে ড. কাযেম কাহদুয়ী বলেন, আমরা ফারসি ভাষাভাষীরা এ কারণে গর্ববোধ করি যে, হাফিজ, সাদী, রুমির মতো মহাকবিরা আামদের মধ্যে এসেছিলেন। আমরা সরাসরি তাঁদের কবিতার রস আস্বাদন করতে পারি। তিনি ছিলেন এমন একজন কবি যাঁর কবিতার বই ইরানের প্রায় প্রতিটি ঘরে পবিত্র কোরআনের পাশাপাশি রাখা হয়। হাফিজ ১৪টি রেওয়ায়াত থেকে কোরআনকে হেফজ করেছিলেন। তিনি তাঁর কবিতায় বার বার কোরআনকে ব্যবহার করেছেন। যে গুপ্তধন তিনি ব্যবহার করেছেন তা হলো রাত বা ভোরের সময়ে দোয়া করা। এজন্য হাফিজকে জানতে কোরআন, হাদিস ও ইরানের পৌরাণিক কাহিনী সম্পর্কে যথেষ্ট ধারণা থাকতে হবে।

তিনি বলেন, খাইয়্যামের কবিতার সাথে হাফিজের কবিতার মিল পাওয়া যায়। ফেরদৌসি সম্পর্কেও তিনি অনেক কিছু বলেছেন।

অনুষ্ঠানে আজাদ রহমান বলেন, হাফিজের জন্ম ১৩১৫ সালে। আর তিনি ইন্তেকাল করেন ১৩৯০ সালে। অর্থাৎ প্রায় ৭০০ বছর ধরে তাঁর রচনা আমাদের মধ্যে রয়েছে। তিনি অসাধারণ গযল রচনা করেছেন। সাদীর হাত ধরে গযল এসেছে। আর হাফিজ প্রচুর মিষ্টি গযল রচনা করেছেন। গযল সংগীতে মধ্যপ্রাচ্য ও ইরানের গযলের ব্যাপক প্রভাব ছিল। কিন্তু বর্তমানে গযল রেওয়াজ কম হচ্ছে।

তিনি বলেন, কেবল বাংলা বা উপমহাদেশের জন্য নয়, বরং সারা বিশ্বের জন্য হাফিজের প্রয়োজন। তিনি প্রেমের বাণী শুনিয়েছেন। প্রেমই স্নেহ, প্রেমই মমতা, প্রেমই মানবতা। মহান আল্লাহ ভালোবাসার কারণে আমাদের সৃষ্টি করেছেন। ভালোবাসা ছাড়া মানুষ পশুতে পরিণত হয়।

যদি ইরান সাংস্কৃতিক কেন্দ্র হাফিযের গযলের ব্যাপারে উদ্যোগ নেয় তাহলে তিনি এ ব্যাপারে সহযোগিতা করতে সবসময় প্রস্তুত আছেন বলে জানান।

অনুষ্ঠানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফারসি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগের শিক্ষক প্রফেসর ড. আবদুস সবুর খান বলেন, হাফেজ ছিলেন মানবপ্রেমের কণ্ঠস্বর। তিনি বলেন, বর্তমান বিশ্বকে বলা হয় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির বিশ্ব। কিন্তু এই বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি আমাদের মধ্য থেকে আবেগ-অনুভূতি কেড়ে নিয়েছে। এমনকি আমাদের বিবেককেও কেড়ে নিয়েছে। আর তাই সারা বিশ্বের আমরা রাহাজানি, হানাহানি, অত্যাচার দেখতে পাচ্ছি। অথচ আমরা নিশ্চুপ। আমরা কেউ অনুভব করি না যে, এগুলো মানবীয় নয়। হাফিজ মানুষকে বিশ্বমানবতার দিকে আহ্বান জানিয়েছিলেন। আমরা সৌভাগ্যবান যে, ফারসি ভাষা যেমন অপরিচিত নয়, মানবতার প্রতীক রুমি, জামি, ফেরদৌসি, হাফিযও অপরিচিত নন। আমরা আবারও সেই মানবতার চেতনায় জেগে উঠলে দুনিয়া বেহেশতে রূপান্তরিত হবে।

অনুষ্ঠানে আঞ্জুমানে ফারসি বাংলাদেশের সভাপতি ড. মাওলানা ঈসা শাহেদী বলেন, হাজার বছরের বাঙালির ঐতিহাসিক পরিচয় জানতে হলেও হাফিজের প্রয়োজন। ভারতবর্ষের কবিদের মিষ্টিমুখ করানোর বিষয় এসেছে বাংলার মাধ্যমে। তিনি বলেন, ইরানের প্রায় সব কবির কবিতার মধ্যে প্রেম, ইশ্‌ক ও ভালোবাসার কথা এসেছে। আসলে এসব কথার অর্থ কী? তিনি বলেন, বাতাসে ইথারের মতোই সৃষ্টিজগতেও স্রষ্টা ও সৃষ্টির মাঝে এ ধরনের বিষয় রয়েছে যেটাকে এশ্‌ক বলা হয়েছে। এর সাথে সম্পর্ক শেষ হয়ে গেলে সবকিছুই শেষ হয়ে যাবে। আর স্রষ্টার সাথে সম্পর্কের জন্য প্রয়োজন রাত্রি জাগরণ ও ক্রন্দন।

অনুষ্ঠানে ইন্টারন্যাশনাল লিটারেরি সোসাইটির প্রেসিডেন্ট  এমদাদুল হক, ইরান এমন দেশ যেখানে গোলাপের চাষ হয়, সুগন্ধির চাষ হয়। ইরানিরা সারা বিশ্বে এই সুবাস ছড়িয়ে দিয়েছে। বাংলার সাথে ইরানের ঐতিহাসিক সম্পর্ক রয়েছে। হাফিজের সাথে বাংলাদেশে জাতীয় কবি নজরুলের মিল রয়েছে। দুজনই অভাব-অনটনের মধ্যে বেড়ে উঠেছিলেন। তাঁরা উভয়েই ধর্মান্ধতার বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন। তাঁদের মানবতাবাদী চরিত্রের কারণেই তাঁদের বিরুদ্ধ শক্তি তাঁদের বিপক্ষে দাঁড়িয়ে গিয়েছিল। তিনি আরো বলেন, নজরুল শক্তি পেয়েছিলেন হাফিজ থেকে। তিনি ছিলেন তাঁর দর্শনের গুরু।আর হাফিজ কেবল ইরানের সম্পদ নয়, তিনি সারা বিশ্বের সম্পদ।