ইরান পরিচিতি : কেরমানশাহ
পোস্ট হয়েছে: আগস্ট ৩১, ২০১৬
-কামাল মাহমুদ
অবস্থান ও জনসংখ্যা : মধ্য ইরানের পশ্চিমাংশে ইরানের প্রাচীন শহর কেরমান শাহ। এর আয়তন ২৪৫০০ বর্গ কিলোমিটার। ২০১১ সালের হিসেব অনুযায়ী কেরমান শাহ প্রদেশের জনসংখ্যা ১৯,৪৫,২২৭ জন। জনসংখ্যার দিক থেকে এটি ইরানের নবম শহর। এখানকার জমি ফসলের জন্য খুবই উর্বর। এটি মূলত ‘সেফিদে কুহ’ বা সাদা পাহাড়ের ঢালে অবস্থিত। যা পরবর্তীকালে দক্ষিণ দিকে বিস্তৃত হয়েছে সারাব ও ভেলী নদী পর্যন্ত। এ শহর সমুদ্র উপকূল থেকে প্রায় ২০০০ থেকে ৩০০০ মিটার উঁচুতে অবস্থিত। তেহরান থেকে কেরমানশাহের দূরত্ব ৫২৫ কিলোমিটার। এটি মূলত ইরানের কৃষি ও শিল্পপ্রধান এলাকার অন্যতম।
ইতিহাস : এটি প্রস্তর যুগীয় ঐতিহ্যের অধিকারী শহর। তৃতীয় শতাব্দীর অনেক শিলালিপি রয়েছে এখানে এবং এগুলোর ঐতিহাসিক গুরুত্ব অনেক। কেরমানশাহের দক্ষিণাঞ্চলে এর প্রচুর নিদর্শন রয়েছে। বলা হয়ে থাকে প্রায় ৮০০০ থেকে ১০০০০ বছর পূর্বে এখানে লোকালয় বিরাজমান ছিল। বাখতারান, কাহরেমান শহর, কারমিসিন, কারমিনশান, আলিপী, কামবদান নামেও এটি পরিচিত। ১৯৭৯ সালে ইরানে ইসলামি বিপ্লবের পরে স্বল্প সময়ের জন্য এর নামকরণ হয় কেরমান শহর। এর নামকরণ নিয়ে নানা মত প্রচলিত রয়েছে। সবচেয়ে প্রসিদ্ধ মত হচ্ছে চতুর্থ বাহরাম তৃতীয় শতাব্দীতে এ শহর নির্মাণ করে এর নাম দেন কেরমান শাহ।
ইরানের সবচেয়ে বড় কুর্দিপ্রধান এলাকা এটি। কেরমান শাহের দো-আসকাফ্ট, কোবে, ওয়ারওয়ানি, আত-তারিক প্রাচীন যুগের ঐতিহ্য বহন করে চলেছে। এখানে নিকট অতীতের অনেক শিলালিপিও রয়েছে। গাঞ্জ দারেহ, সারাব এবং আসিবাব প্রভৃতি এলাকায় এর নিদর্শনাবলি রয়েছে। ২০০৯ সালে হামাদান বিশ্ববিদ্যালয় এ বিষয়ের ওপর একটি গবেষণা কার্যক্রম গ্রহণ করে। এই বিশ্ববিদ্যালয় এবং ইরান কালচারাল হেরিটেজ অ্যান্ড টুরিজম অর্গানাইজেশন এর মতে এ শহরের সূচনা হয় খ্রিস্টপূর্ব ৯৮০০ বছর আগে। প্রথম প্রস্তর যুগীয় শহর সাহেহ পশ্চিম কেরমান শাহে অবস্থিত।
কেরমান শাহের মনুমেন্টগুলো হাখামানেশি ও সাসানি যুগের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। পৌরাণিক শাসক পিসদারীয়ানকে এ শহরের প্রতিষ্ঠাতা বলে ধারণা করা হয়ে থাকে। চতুর্থ বাহরাম চতুর্থ শতাব্দীতে এ শহরের উন্নয়নে ব্যাপক ভূমিকা পালন করেন। চতুর্থ হরমুজ ও সাসানি যুগে প্রথম খসরুর সময়কালে এ শহরের অভূতপূর্ব উন্নয়ন সাধিত হয়। ৬৪০ খ্রিস্টাব্দে আরবরা এবং ১১ শতকে সেলজুকরা এ অঞ্চল শাসন করত। ফতেহ আলী শাহের শাসনামলে (১৭৯৭-১৮৩৪ খ্রি.) অটোমানদের দ্বারা এ শহর আক্রান্ত হয়। ১৯১৫ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময়কালে অটোমানদের দ্বারা পুনরায় এ শহরে হামলা হয়। আরব ও অটোমান আক্রমণকালে এ শহর ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তবে সাফাভি আমলে এ শহরের অনেক উন্নতি ঘটে। ইরাক আক্রমণে এ শহর ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়। সাব-ই-পোলে জাহাব ও কাস্রে শিরীন এলাকা প্রায় সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত হয় যা আজো সম্পূর্ণরূপে পুনঃনির্মাণ সম্ভব হয়নি। ইরানের সাংবিধানিক আন্দোলনে এ শহরের ভূমিকা অবিস্মরণীয়।
আবহাওয়া : কেরমান শাহের আবহওয়া মূলত নাতিশীতোষ্ণ। এখানে গ্রীষ্মকালে খরতাপ এবং শীতকালে বৃষ্টিপাত হয়। বার্ষিক গড় বৃষ্টিপাত ৪৭৮.৭ মি.মি.। গড় তাপমাত্রা ২২ ডিগ্রি সেলসিয়াস।
ভাষা : কেরমান শাহের প্রধান ভাষা কুর্দি, দ্বিতীয় ভাষা ফারসি। এছাড়া এখানে আজেরি ভাষাভাষীও রয়েছে।
যাতায়াত : যাতায়াতের জন্য রয়েছে সাধারণ রেলপথ, সড়কপথ ও আকাশপথ। এখানে রয়েছে একটি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর যার নাম আসরাফি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর। এখান থেকে সরাসরি দুবাই, জেদ্দা, দামেশ্ক, ইস্তাম্বুল প্রভৃতি শহরে যাতায়াত করা যায়। ২০০৮ সালে কেরমান শাহে মেট্রোরেল চালু হয়। শহরের মধ্যে এর ১১টি স্টেশন রয়েছে। চলাচলের জন্য বাস, মিনিবাস, টেক্সি প্রভৃতি রয়েছে। তেহরান থেকে হামাদান হয়ে কেরমান শাহ আসতে সময় লাগে ৯ ঘণ্টা, মালায়ার হয়ে ৭ ঘণ্টা।
হোটেল ও বাজার : কেরমান শাহে থাকার জন্য সবচেয়ে ভালো আবাসিক হোটলের নাম জামশীদ। কেনাকাটার জন্য রয়েছে ইসলামি বাজার। এটি কেরমান শাহের তথা ইরানের অন্যতম প্রাচীন বাজার। কাজার আমলে এর গোড়াপত্তন ঘটে। ১৭৪৫ সাল থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত এটি সগৌরবে বিদ্যমান। এ বাজার কুর্দিদের ঐতিহ্যবাহী পোশাকের জন্য বিখ্যাত। এছাড়া এ বাজারে বিভিন্ন প্রকার মসলা, হস্তনির্মিত চামড়াজাত দ্রব্য, ফুল প্রভৃতি রয়েছে। অন্যান্য বাজারের মধ্যে রয়েছে কুর্দি বাজার যা জুয়েলারি, নানা প্রকার রুটি ও বিস্কুটের জন্য বিখ্যাত।
খাবার : বিখ্যাত খাবারের মধ্যে রয়েছে বাযী, নানে রওগ¦ানী, নানে শোকরী, নানে বেরেঞ্জি, নানে খোরমায়ী, তারখীনে, খোরেশ খালাল বাদাম, দানদে কাবাবে কেরমানশাহী, সীবে পালু, অশে আব্বাস আলী, অবগুশতে কেরমানশাহী, অনারে পাবে, আসালে শাহু, আনজিরে রেইজাব প্রভৃতি।
কৃষি ও শিল্প : কেরমান শাহের অর্থনীতি মূলত কৃষি ও শিল্পনির্ভর। এখানে প্রায় ২৫৬টি বিভিন্ন প্রকার কারখানা রয়েছে। এটি ইরানের একটি অর্থনৈতিক জোন। এখানে উৎপাদিত পণ্যের মধ্যে রয়েছে কার্পেট, চাল দিয়ে তৈরি মিষ্টিÑ যার স্থানীয় নাম ‘নানে বেরেঞ্জি’। এখানকার তেল খুব বিখ্যাতÑ যার স্থানীয় নাম ‘রুনেদান’, আন্তর্জাতিক নাম ‘রোগানে কেরমানশাহী’। ‘কালাম’ নামক এক প্রকার বস্ত্রের বিশ্বব্যাপী খ্যাতি রয়েছে। এছাড়া রয়েছে জাজীম, বিভিন্ন প্রকার বাদ্যযন্ত্র, চামড়াজাত দ্রব্য প্রভৃতি। এখানে উৎপাদিত অন্যান্য কৃষি পণ্যের মধ্যে রয়েছে চাল, সবজি, ফল প্রভৃতি। উৎপাদিত শিল্পপণ্যের মধ্যে রয়েছে চিনি, সিমেন্ট, টেক্সটাইল, আটা, ময়দা প্রভৃতি। এছাড়া পেট্রোলিয়াম শোধনাগার, ফুড প্রসেসিং কারখানা, সুগার রিফাইনারি, ইলেক্ট্রিক উপকরণ প্রভৃতি। ১৯৩২ সালে ব্রিটিশদের সহয়তায় এখানে নির্মিত হয়েছে কেরমান শাহ অয়েল রিফাইনারি কোম্পানি (কেওআরসি)। সাম্প্রতিককালে কেরমান শাহ ইরানের আমদানি-রপ্তানির অন্যতম ট্রানজিট।
দর্শনীয় স্থান : প্রাক-ইসলামি যুগ থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত প্রতœতত্ত্ববিদ ও পর্যটকদের কাছে ইরানের অন্যতম দর্শনীয় স্থান হচ্ছে কেরমান শাহ। দারীয়ূশ যুগের পাহাড়ের গাত্রে লিখিত শিলালিপি বিস্তুুন (সময়কাল ৫২২ খ্রিস্টপূর্ব)। এগুলো পাহাড়ের গায়ে প্রায় ১৩০০ মিটার উঁচুতে লিখিত। প্রাচ্যের প্রতœতত্ত্বের এটি অন্যতম নিদর্শন। এটি ইউনেস্কো হেরিটেজ সাইট এর অন্তর্ভুক্ত। কেরমান শাহ থেকে ৪ কিলোমিটার উত্তর দিকে এর অবস্থান। সাসানি স¤্রাট দ্বিতীয় খসরুর সময়কালে (৫৯১-৬২৮ খ্রি.) এগুলোর পুনর্বিন্যাস করা হয়। কানাগাভার আর্কিওলজিক্যাল কমপ্লেক্স কেরমান শাহের অন্যতম দর্শনীয় স্থান। এখানকার নিদর্শনগুলো সাসানি বা তার পূর্বের সময়কার। ১৯৬৮ সালে এটি নির্মাণ করা হয়। পার্সেপোলিসের আদলে এটি গড়ে তোলা হয়েছে।
অন্যান্য দর্শনীয় স্থানের মধ্যে রয়েছে দালাহো, গিলানে র্গাব, ইসলামাবাদে র্গাব, জাভানরুদ, রাভানসার, সোলসে বাবাজানী, সারপুলে যাহাব, কাসরে শিরীন, কোন ব্রীজ, মালেক মাযার, দারবাদ সাহনে, হারকিউলিসের ভাস্কর্য, ইমামুদ্দৌলা মসজিদ, মাসজিদে শাহবাজখান, কেলিসেহায়ে আরামানে, খানকায়ে খাকসার, মাদারাসায়ে কাজ্জাজী, কাভারসারায়ে ফয়েজ আবাদ, তাকীয়ে বেগলবাগী, হার্ন্টাস গুহা, গারে দো আশকাফত, গারে কোবা, গারে কোল দাউদ, গারে অরঅসি, গারে কুলিয়ান, গারে অজমে, তাপ্পে সারাপ, তাপ্পে অসিয়াব, তাপ্পে ভেরগার, কেরমান শাহ জামে মসজিদ, মসজিদে হাজ শাহবাজ খান, মসজিদে আয়াতুল্লাহ বোরুজারদী, মসজিদে চেহেল সেতুন, মাসজিদে শাফেয়ী, মাসজিদে দৌলতশাহ, মাসজিদে শাহজাদে, মাসজিদে নোয়াব, কাজার শাসনামলে (১৭৯৪-১৯২৫ খ্রি.) নির্মিত কেরমান শাহ বাজার মসজিদ, খাজা বুখারী হাউজ প্রভৃতি দৃষ্টিনন্দন স্থাপত্য নিদর্শন। কাজার আমলে প্রতিষ্ঠিত এনথ্রোপলোজি মিউজিয়াম, জাগরেস পালিওলেথিক মিউজিয়াম এবং এপিগ্রাফি মিউজিয়াম, মোয়াভেনাল মূল্ক মসজিদ, কোহেস্তা পার্ক, পার্কে শারফি, পার্কে গারবি, পার্কে কুহেস্তান, পার্কে শাহেদ, পার্কে লব অলু, পার্কে লালে, পার্কে শার, পার্কে শিরিন, পার্কে ফানফার, পার্কে মোয়াল্লেম প্রভৃতি। এছাড়া ব্যতিক্রমী পাখি মিউজিয়াম রয়েছে যেখানে প্রায় দুই শতাধিক পাখির প্রজাতি রয়েছে। এটি কেরমান শাহ থেকে ৩২ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান : উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে কেরমান শাহ ইউনিভার্সিটি অব মেডিকেল সাইন্স, রাযী ইউনিভার্সিটি, ইসলামিক আযাদ ইউনিভার্সিটি অব কেরমান শাহ, কেরমান শাহ ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজি, পায়ামে নূর ইউনিভার্সিটি, আর্ট্স ইউনিভাসিটি অব কেরমান শাহ, অমুযেশে আলী জেহাদ দানেশগাহে কেরমান শাহী প্রভৃতি। ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে মাদরাসায়ে এসলামিয়া, মাদরাসায়ে মোহতাশেমিয়া, মাদরাসায়ে আকাবের, মাদরাসায়ে দেখতারান প্রভৃতি। ১৯৬৫ সালে কেরমান শাহে কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগার প্রতিষ্ঠিত হয়। এ শহরে ৫টি পাবলিক লাইব্রেরি রয়েছে।
খেলাধুলা : এখানকার খেলাধুলার মধ্যে রয়েছে কুস্তি, ভারত্তোলন, ফুটবল, ভলিবল, তায়াকান্দো, তীর নিক্ষেপ, হকি, হ্যান্ডবল, বাস্কেটবল, কুংফু, রাগবি, কাবাডি, সাঁতার প্রভৃতি। এখানকার বিখ্যাত ফুটবল দলের নাম ‘শিরীন ফারাজ’।
পৃথিবীর প্রাচীনতম শহরের অন্যতম কেরমান শাহ। এখানে একদিকে যেমন রয়েছে কৃষিজাত পণ্য, অন্যদিকে রয়েছে দুই শতাধিক কল-কারখানা। এছাড়া হস্তশিল্প তো রয়েছেই। ইরানের অর্থনৈতিক অন্যতম জোন হচ্ছে কেরমানশাহ। প্রায় দশ হাজার বছর পূর্ব থেকে এখানে লোকালয় গড়ে ওঠে। তবে কেরমান শাহের সবচেয়ে বড় পরিচয় এখানকার ঐতিহাসিক নিদর্শনাবলি। আজো পৃথিবীর ভ্রমণপিপাসু, নৃ-তত্ত্ববিদ ও প্রতœতত্ত্ববিদদের জ্ঞানের খোরাক বিলিয়ে থাকে এই কেরমান শাহ শহরের প্রাচীন স্থাপত্য ও ঐতিহাসিক নিদর্শনাবলি।