ইরানের সাংস্কৃতিক নীতির লক্ষ্য, মূলনীতি ও ভিত্তি
পোস্ট হয়েছে: সেপ্টেম্বর ১৬, ২০১৩

ইরানে সাংস্কৃতিক বিপ্লবের দায়িত্বে নিয়োজিত সুপ্রীম কাউন্সিল দ্ইু বছর ধরে আলাপ-আলোচনার পর ইরানের সাংস্কৃতিক নীতি প্রণয়ন ও সংকলন করেছে। সুপ্রীম কাউন্সিল এই বিধিমালাকে ‘লক্ষ্য’, ‘ভিত্তি’ ও ‘মূলনীতি’ এই তিনটি ভাগে বিভক্ত করে অনুমোদন করেছে। এই সাংস্কৃতিক নীতি প্রকাশ করার উদ্দেশ্যে সুপ্রীম কাউন্সিল একটি বিবৃতি প্রচার করে। নিচে তার সংক্ষিপ্তসার তুলে ধরা হলো :
বিবৃতিতে ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের রাহবার আয়াতুল্লাহ সাইয়্যেদ আলী খামেনেয়ীর একটি মন্তব্য উল্লেখ করা হয়। ১৯৯১ সালে সুপ্রীম কাউন্সিলের সদস্যদের সাথে এক বৈঠকে রাহবার খামেনেয়ী দেশের লোক সংস্কৃতির উন্নয়ন ও বিকাশের উপর গুরত্ব আরোপ করে বলেন, দেশের জন্যে একটি সাংস্কৃতিক নীতি প্রণয়ন ও অনুমোদন অত্যন্ত জরুরি।
সুপ্রীম কাউন্সিল অনুমোদিত নীতিমালা নিম্নোক্তভাবে বিভক্ত :
লক্ষ্য
ইসলামী প্রজাতন্ত্র যে সাধারণ সাংস্কৃতিক লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে এবং এ ধরনের বিধিমালা প্রণয়নের পশ্চাতে যে দৃষ্টিভঙ্গি কাজ করেছে তা হচ্ছে :
ক. ইসলামী প্রজাতন্ত্রের সাংস্কৃতিক লক্ষ্য
১. সমগ্র দেশ তথা বিশ্বব্যাপী মানবীয় ও ইসলামী সংস্কৃতির প্রচার এবং ইসলামী বিপ্লবের বাণী ও সংস্কৃতি ছড়িয়ে দেয়া।
২. সাংস্কৃতিক স্বাধীনতা অর্জন, অবক্ষয়ের চিহ্নসমূহ ও বিদেশী সংস্কৃতির ভিত্তিকে নির্মূল করা এবং বিচ্যুত রীতিনীতি ও কুসংস্কার থেকে সমাজকে মুক্ত করা।
৩. জীবনের সকল ক্ষেত্রে মানুষের উদ্ভাবনী শক্তিকে পরিশুদ্ধ করা এবং আল্লাহ তাআলা মানুষকে যে প্রতিভা ও জ্ঞান দান করেছেন তাকে কাজে লাগানো।
৪. পরিশুদ্ধি ও পবিত্রতা অর্জনের জন্য মানুষকে নৈতিক শক্তি ও খোদায়ী ঈমানে ভূষিত করা।
৫. প্রতিটি ব্যক্তি বিশেষ তথা সাধারণ জীবনে ইসলাম ও ইসলামী বিপ্লবের মূল্যবোধ বজায় রাখা এবং সেগুলোকে রক্ষার জন্য পরিপূর্ণভাবে সাংস্কৃতিক বিপ্লব সাধন এবং একটি পরিশুদ্ধ ও খাঁটি জীবনে সমাজ উপনীত না হওয়া পর্যন্ত সাংস্কৃতিক আন্দোলন অব্যাহত রাখা।
৬. সময়ের চাহিদা পূরণ ও অগ্রগতিকে এগিয়ে নেয়া, অন্যান্য মানব সমাজের সাংস্কৃতিক সাফল্যকে বিশ্লেষণ ও সংশোধন করা এবং সেগুলো থেকে ইসলামী মূল্যবোধ ও মৌলনীতির সাথে সামঞ্জস্যশীল দিকগুলোকে কাজে লাগানো।
খ. সাংস্কৃতিক নীতির লক্ষ্য
১. আদর্শগত বিশ্বাস ও মূল্যবোধ এবং দেশের অভ্যন্তর ও বিশ্বজগৎ থেকে আহরিত অভিজ্ঞতার উপর ভিত্তি করে দেশের সাংস্কৃতিক আন্দোলন পরিচালনার জন্য প্রধান প্রধান নীতি-নির্দেশনা ও অগ্রাধিকার নির্ধারণ ও তা সংকলন করা।
২. বিভিন্ন সরকারী সংস্থাকে তাদের সাংস্কৃতিক কর্মকা-ের মধ্যে সমন্বয় সাধন করতে বলা এবং সমাজের সাংস্কৃতিক চাহিদা পূরণের জন্য বিদ্যমান সকল সামর্থ্যকে সংগঠিত করা ও কাজে লাগানো।
৩. আধ্যাত্মিক চেতনা ও ইসলামী মূল্যবোধের উপর গুরুত্ব প্রদান, সময়ের চাহিদা মোতাবেক জাতীয় সংস্কৃতির প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন, সংহত ও শক্তিশালীকরণ এবং দুর্বলতা দূরীকরণ ইত্যাদির মাধ্যমে অগ্রগতির জন্য একটি পূর্ণ মাত্রার প্রস্তুতি গ্রহণ।
৪. দেশের সাংস্কৃতিক নীতির সাথে অর্থনৈতিক, সামাজিক ও অন্যান্য পরিকল্পনাকে সামঞ্জস্যপূর্ণ করার পদক্ষেপ গ্রহণ।
৫. সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের তত্ত্বাবধান ও পর্যবেক্ষণের জন্য সাংস্কৃতিক পরিকল্পনা গ্রহণ, জনসাধারণের সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে স্বাধীনতা ও সহায়তা দান, সরকারী-বেসরকারী খাতের মধ্যে সাংস্কৃতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা, জনসাধারণের মধ্যে জ্ঞানের বিস্তার ও সচেতনতা সৃষ্টির জন্য একটি সাংস্কৃতিক জিহাদ পরিচালনা এবং জনসাধারণকে গবেষণা ও উদ্ভাবনের দিকে উদ্বুদ্ধ করে তোলা।
ভিত্তি
ইসলামী প্রজাতন্ত্রের সাংস্কৃতিক নীতি বিশ্বজনীনতা ও মানব জীবনের সাথে সংশ্লিষ্ট ইসলামী আদর্শ থেকে উৎসারিত এবং সংবিধান সাংস্কৃতিক নীতির ভিত্তিতে প্রণীত। সাংস্কৃতিক নীতির ভিত্তিসমূহ হলো :
১. ব্যক্তি ও সামাজিক জীবনের সকল ক্ষেত্রে একত্ববাদ আদর্শের প্রাধান্য এবং ওহী, নবুওয়াত, ইমামত, ন্যায়বিচার ও আখেরাতের উপর চূড়ান্ত বিশ্বাস।
২. আত্মার অবিনাশিতা এবং আল্লাহর প্রতিনিধি হিসাবে মানুষের সম্মান ও মর্যাদা এবং পরিশুদ্ধির পথে মানুষের সহায়তার জন্য জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার চর্চা।
৩. মানব জীবনের বিকাশ ও সাফল্যের জন্য খোদায়ী প্রকৃতিকে লালন।
৪. সৃষ্টির বিবেচনায় সকল মানুষের মধ্যে সমতা, ইসলামের সর্বজনীনতার বাণী মোতাবেক ধর্ম ও বর্ণের মধ্যে কোনরকম পার্থক্য না করা এবং ইসলামের আহ্বান অনুসারে মানবীয় কার্যক্রমের মাধ্যমে সাধারণ্যে সহযোগিতার বিস্তার।
৫. মানুষের আধ্যাত্মিক ও বস্তুগত প্রকৃতি এবং তার জীবনের ব্যক্তিগত, সামাজিক, বৈষয়িক, আধ্যাত্মিক, দৈহিক, মানবিক ও আবেগ অনুভূতির বিকাশ ও উন্নতি।
৬. কল্যাণকামিতা ও আদর্শবাদিতার প্রতি মানুষের অনুরাগ বা আগ্রহ, লক্ষ্যের প্রতি নিষ্ঠা এবং জ্ঞান, পরিশুদ্ধি ও নৈতিকতার প্রতি গুরুত্ব প্রদান।
৭. আধ্যাত্মিক মূল্যবোধ ও নৈতিক শক্তি সৃষ্টি; মানুষের মধ্যে মুক্তি, স্বাধীনতা ও মর্যাদাবোধ জাগ্রত করা এবং সমাজ ও মানুষের মধ্যে সম্পর্ক গড়ে তোলার জন্য ঈমানী বলে বলীয়ান করা।
৮. ন্যায়বিচার, জিহাদ ও বাস্তবভিত্তিক একটি একত্ববাদী সমাজ প্রতিষ্ঠার জন্য মানুষের জানার সামর্থ্য এবং প্রতিভা ও উদ্ভাবনী মানসিকতাকে কাজে লাগানো। বৈজ্ঞানিক গবেষণা পরিচালনা ও ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতাও হবে সাংস্কৃতিক চর্চার ভিত্তি।
৯. মানুষের মর্যাদা ও মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠার জন্য ইসলামী সমাজে যথার্থ আধ্যাত্মিক শক্তি ও নৈতিক মূল্যবোধ জাগ্রত করার সর্বাত্মক প্রচেষ্টা।
১০. নিজের সামাজিক পরিবেশের প্রতি মানুষের নেতিবাচক ও ইতিবাচক দায়িত্বের আলোকে পরিবেশকে সুষ্ঠু ও ন্যায়বিচারভিত্তিক করা, জনসাধারণকে সকল ব্যাপারে একটি দিক-নির্দেশনায় পরিচালনা করা এবং অবমাননা, মুনাফেকী, দুর্নীতি, অত্যাচার-নির্যাতন, প্রভুত্ব ও দাম্ভিকতার মূলোৎপাটন করা।
মূলনীতি
সাংস্কৃতিক বিপ্লবের দায়িত্বে নিয়োজিত সুপ্রীম কাউন্সিল ইরানের সাংস্কৃতিক নীতির যেসব মূলনীতির প্রণয়ন ও অনুমোদন করে তা নিচে উল্লেখ করা হলো :
১. ইসলামী ও জাতীয় ঐতিহ্য রক্ষা এবং ইরানী ও ইসলামী সভ্যতার পুনরুজ্জীবন ও সংরক্ষণের লক্ষ্যে বিভিন্ন ধর্মীয়, বৈজ্ঞানিক সাহিত্য, লোক-সাহিত্য ও চিত্রকলার ক্ষেত্রে জাতীয় ও ঐতিহাসিক ঐতিহ্য ও উত্তরাধিকারের প্রতি স্বীকৃতি ও মূল্যায়ন।
২. ইসলামের সংস্কৃতি ও সভ্যতার উপর ব্যাপক জ্ঞান অর্জন, ইসলামী নৈতিকতা ও শিক্ষার বিকাশ এবং ইসলামী ও ইরানী ইতিহাসের মহান ব্যক্তিত্ববর্গের পরিচিতি উপস্থাপন।
৩. দেশ ও জাতিসমূহের সাথে গতিশীল সম্পর্ক এবং বিশ্বের মুসলমান ও অন্যান্য জাতির সাথে সম্পর্ক জোরদার করা।
৪. মানবীয় সংস্কৃতি ও অভিজ্ঞতা সম্পর্কে ধারণা অর্জন এবং যথাযথ ও সকল উপায় অবলম্বনে আন্তর্জাতিক বৈজ্ঞানিক ও সাংস্কৃতিক সাফল্য কাজে লাগানো।
৫. ধর্মীয় মতপার্থক্য ও জাতিগত বিরোধের প্রেক্ষাপটকে সামনে রেখে জাতীয় ও ধর্মীয় সংহতি সৃষ্টি এবং ঐক্যের পথে সকল প্রতিবন্ধকতা দূর করা।
৬. সমাজের বৈজ্ঞানিক, সাংস্কৃতিক ও কারিগরি মানকে উন্নত করতে এবং শিক্ষা ও সাক্ষরতা বিস্তারে নিরলস প্রচেষ্টা চালানো।
৭. ফারসি ভাষা ও সাহিত্যের উন্নয়ন ও বিকাশে আরো দৃষ্টি দান।
৮. নবতর আবিষ্কার-উদ্ভাবনে সমর্থন ও সহায়তার জন্য বুদ্ধিবৃত্তিক ও উদ্ভাবন উপযোগী ক্ষেত্র তৈরি করা।
৯. মানুষের সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক, বিচার সংক্রান্ত ও অর্থনৈতিক জীবনের সকল ক্ষেত্রে স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা বিধান করা।
১০. অধ্যয়ন ও গবেষণার জন্য পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধার ব্যবস্থা করা এবং বিভিন্ন উদ্দেশ্যে এর ফলাফলকে কাজে লাগানো।
১১. পরস্পর বিরোধী আদর্শসমূহের মধ্য থেকে একটিকে বাছাইয়ের জন্য মানুষের চিন্তা ও বিশ্লেষণ শক্তিকে জোরদার করা।
১২. কুসংস্কার, প্রতিক্রিয়াশীল ধারণা, গোঁড়ামি, বহু দর্শনে বিশ্বাসের প্রবণতা ও বিদেশীদের প্রতি আনুগত্যের বিরুদ্ধে সংগ্রাম।
১৩. সামাজিক ন্যায়বিচারের জন্য সংগ্রামের চেতনা বিস্তার।
১৪. মিতব্যয়িতার নীতি অনুসরণ এবং অপব্যয় ও অপচয়ের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে স্বাধীনতা ও স্বনির্ভরতা অর্জনের প্রচেষ্টার উপর গুরুত্ব আরোপ।
১৫. খেলাধুলার উপর সার্বিক গুরুত্ব প্রদানের জন্য শারীরিক ও মানসিক প্রশিক্ষণ দান এবং গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক আবশ্যকতা হিসাবে শরীরচর্চার ব্যবস্থা করা।
১৬. সকল ক্ষেত্রে ইসলামী শিক্ষা ও চেতনার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ যথার্থ ও গঠনমূলক চিত্রকলার উন্নয়ন, পুনরুজ্জীবন ও প্রবর্তন।
১৭. যুব সমাজকে রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক, শিল্পকর্ম ইত্যাদি কাজে আরো সক্রিয়ভাবে অংশ গ্রহণে উদ্বুদ্ধ করার জন্য তাদের ভূমিকা ও সামাজিক মর্যাদাকে স্বীকৃতি দান এবং তাদের অবস্থা পর্যালোচনা করা।
১৮. মহিলাদের অধিকার ও মর্যাদা সম্পর্কে গবেষণা-পর্যালোচনা করা এবং তাদের ইসলামী চরিত্রকে জোরদার করা। সেই সাথে ভুল রীতিনীতি ও বিশ্বাসের বিরুদ্ধে সংগ্রাম এবং মহিলাদেরকে সামাজিক, সাংস্কৃতিক, চিত্রকলা ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় অংশগ্রহণের সুযোগ সৃষ্টি করা।
১৯. সরকারী তদারকীর অধীনে সাংস্কৃতিক কার্যক্রম বিস্তার ও উন্নয়নের লক্ষ্যে সংস্কৃতি, চিত্রকলা, বিজ্ঞান ও সামাজিক কর্মকাণ্ডে জনসাধারণের অংশগ্রহণ ও মতামত গ্রহণের ক্ষেত্র তৈরি এবং সেই সাথে সকল বেসরকারী তৎপরতা ও কার্যব্যবস্থাকে সহায়তা দেয়া।
২০. সংস্কৃতি, চিত্রকলা ও সামাজিক বিষয়াদির জন্য ইতিবাচক নীতি গ্রহণ এবং ব্যক্তি তথা সমগ্র সমাজের জন্য সুযোগ-সুবিধা সৃষ্টি এবং মিতাচারিতা, কল্যাণকামিতা, একাগ্রতা, শিষ্টাচার ও সৎ চিন্তাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে উদ্যোগ গ্রহণ এবং বিশৃঙ্খলা, অস্থিরতা, গোঁড়ামি ও অহংকার পরিহার করে চলা।
২১. সামাজিক চেতনা তথা ব্যক্তিস্বার্থের উপরে সামষ্টিক স্বার্থকে স্থান দেয়ার মানসিকতা জোরদার করার উদ্দেশ্যে প্রশিক্ষণ ও উৎসাহ দান : আইন-শৃঙ্খলার প্রতি শ্রদ্ধাকে একটি সামাজিক ঐতিহ্য হিসাবে গড়ে তোলা এবং আইন-শৃঙ্খলা ও গণ-অধিকার রক্ষায় সরকারের উদ্যোগ গ্রহণ।
২২. যথার্থ জাতীয় ও ধর্মীয় পরিচয় জানা ও বাস্তবায়নের প্রচেষ্টা চালানো, সেগুলো সংরক্ষণ এবং সাংস্কৃতিক স্বাধীনতা নিশ্চিত করা।
২৩. গঠনমূলক সমালোচনার চেতনা বিস্তার, ব্যক্তি ও সামাজিক অধিকারের সমর্থনে সমালোচনার সুযোগ দান, আইনানুগ কাজের পরিবেশকে ব্যাপকতর করা এবং প্রচারে ও পরামর্শের মাধ্যমে পাপ কাজ থেকে বিরত রাখা।
২৪. নৈতিক গুণাবলির অগ্রগতি ও সংহতকরণে সাংস্কৃতিক প্রচার জোরদার করা।
(নিউজলেটার, ফেব্রুয়ারি ১৯৯২)