বৃহস্পতিবার, ৩রা এপ্রিল, ২০২৫ খ্রিস্টাব্দ, ২০শে চৈত্র, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

English

ইরানের প্রত্নতাত্ত্বিক রত্ন শাহর-ই সুখতেহ

পোস্ট হয়েছে: অক্টোবর ৩, ২০১৯ 

news-image

ইরানের একটি হারানো রত্ন শাহর-ই সুখতেহ। প্রত্নতাত্ত্বিকরা শহুরে গঠন-বিন্যাস, জনসংখ্যা ও পরিকল্পনার দিক দিয়ে এই অঞ্চলটিকে বিশ্বের প্রথম শহর হিসেবে বিবেচনা করে থাকেন। ব্রোঞ্জযুগের এই প্রাচীন ও প্রত্নতাত্ত্বিক শহরটি অবস্থিত দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় ইরানে।

বিশ্বের অন্যতম প্রাচীনতম দেশ ইরানে রয়েছে অসংখ্য প্রাচীন, রহস্যময় ও অদ্ভূত সভ্যতার অবাসস্থল। দেশটির একটি প্রাচীন প্রদেশ সিস্তান ও বালুচিস্তান। যেখানে রয়েছে শাহর-ই সুখতেহ সহ বহু স্মৃতিস্তম্ভ।

প্রাচীন বিশ্বের অন্যতম বিস্ময় হচ্ছে এই শাহর-ই সুখতেহ। এই এলাকায় প্রত্নতাত্ত্বিক অনুসন্ধান চালিয়ে দেখা গেছে, এটিই হচ্ছে পূর্ব ইরানের প্রথম মানব বসতি। ‘শাহর-ই সুখতেহ’ অর্থ হচ্ছে পোড়া শহর। ৫ হাজার বছরেরও আগে শহরটি গড়ে ওঠে। যেটি এখন অন্যতম ঐতিহ্যবাহী স্থান। শাহর-ই সুখতেহ দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় ইরানের সিস্তান ও বালুচিস্তান প্রদেশে জাহেদানের পথে জাবলের নিকটে অবস্থিত। খ্রিস্টপূর্ব ৩২০০ সালে প্রাচীন এই নগরটি নির্মাণ করা হয়। খ্রিস্টপূর্ব ৩২০০ থেকে ১৮০০ সালের মধ্যে চারটি যুগে মানুষজন এখানে বসবাস করে বলে জানা যায়।

মোট ২৮০ হেক্টর এলাকাজুড়ে অবস্থিত শাহর-ই সুখতেহকে আবাসিক, কেন্দ্রীয় ও শিল্প অঞ্চল এবং সেই সাথে সমাধিস্থল ও স্মৃতিস্তম্ভ- এই কটি ভাগে বিভক্ত করা হয়। শহরের আবাসিক এলাকাটি ৮০ হেক্টর এলাকা জুড়ে অবস্থিত, সেসময় শহরের এই অংশে মানুষজন বসবাস করতো।

শাহর-ই সুখতেহ সম্পূর্ণ ভূমিকম্পহীন জোনে গড়ে ওঠা একটি নগর। ১৮০০ খ্রিস্টপূর্ব সালে পরিত্যক্ত হওয়ার আগে ইতিহাসে এটি তিনবার সম্পূর্ণ ভস্মীভূত হয়। শহরটি গড়ে ওঠার প্রাথমিক পর্যায়ে একবার ভস্মীভূত হয়। এরপর পরবর্তীকালে আরও দুবার আগুনে ধ্বংস হয়। ২১০০ সালে কোনো চিহ্ন ছাড়াই শহরটি হঠাৎ স্থানান্তর করা হয়।

১৯ শতকের শুরুর দিকে এলাকাটি আবিষ্কার করেন অরেল স্টেইন, শুরু করেন প্রত্নতাত্ত্বিক অনুসন্ধান। ১৯৬৭ সালে এটি খনন করা হয়। ইতালি ও ইরানের প্রত্নতাত্ত্বিকরা ১৯৭০ সাল অবধি অবিরতভাবে এই অনুসন্ধান চালান। আবিষ্কারের আগে প্রায় ৪ হাজার বছর শাহর-ই সুখতেহ ২০ সেন্টিমিটার ছাই ও ধুলার স্তরের নিচে ঢাকা ছিল। এই অঞ্চলের শুষ্ক আবহাওয়া সভ্যতাটির সংরক্ষণে সহায়ক হয়েছে বলে জানান প্রত্নতত্ত্ববিদরা।

কেবল আয়তনের দিক দিয়ে নয়, ইরান ও মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম বৃহত্তম প্রাচীন শহর এটি। ধ্বংসবাশেষে অনুসন্ধানে এই সভ্যতার উন্নয়ন ও অগ্রগতিগুলো বেশ ভালোভাবেই উঠে এসেছে। যা আসলেই অবিশ্বাস্য।

শাহর-ই সুখতেহে টেক্সটাইল, স্থাপত্য, অলংকার ইত্যাদি বিভিন্ন শিল্প গড়ে ওঠে। যেসব কারণে বিশ্বের অন্যতম আধুনিক শহর হিসেবে খ্যাতি কুড়ায় এলাকাটি। শহরটির ধ্বংসাবশেষে ১২ ধরনের কাপড় পাওয়া যায়। যা প্রমাণ করে এখানকার টেক্সটাইল শিল্প কতটা সমৃদ্ধ ছিল!

শাহর-ই সুখতেহর এক নারীর কঙ্কাল থেকে বিশ্বের প্রথম কৃত্রিম চোখের বল উদ্ধার করা হয়। যার দুপাশে রয়েছে দুটি গর্ত এবং এটি স্বর্ণের সুতা দিয়ে প্রতিস্থাপন করা হয়। শহরটিতে ব্রেন সার্জারির প্রাচীনতম নিদর্শন আবিষ্কার করা হয় যা এখানকার অন্যতম বিস্ময়কর আবিষ্কার বলে জানা যায়। কবরস্থান থেকে ১৪ বছর বয়সী এক মেয়ের কঙ্কাল আবিষ্কার করা হয়। ৪৮০০ বছর আগে চিকিৎসকরা তার ব্রেনে অস্ত্রোপচার করেছিল, যার আলামত উদ্ধার করা হয়েছে।

এছাড়া শহরটিতে ১০ সেন্টিমিটার দৈর্ঘে্যর একটি স্কেল পাওয়া গেছে যা প্রমাণ করে এখানকার অধিবাসীদের গণিতে ব্যাপক পারদর্শিতা ছিল। পানি সরবরাহ ও নিষ্কাষণের জন্য এখানে দক্ষভাবে পরিচালিত মৃৎশিল্প পদ্ধতি ছিল। মজার বিষয় হলো তখনকার সময়ও শাহর-ই সুখতেহর বাসিন্দারা ব্যাকগ্যামন (পাশা-দাবার ন্যায় ক্রীড়াবিশেষ) খেলতো।

শহরের পশ্চিম ও দক্ষিণ অংশে প্রায় ২১ হাজার সমাধি পাওয়া গেছে। মৃতদেহগুলোর দেহবাশেষ বিশ্লেষণে অনন্য ও চিত্রাকর্ষক ফলাফল উঠে এসেছে। বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম কঙ্কালও এখান থেকে উদ্ধার করা হয়েছে যার উচ্চতা ৫ মিটার ২১ সেন্টিমিটার। তার বয়স ৩৫ থেকে ৪০ এর মধ্যে হবে।

১৯৭০ সালে প্রত্নতাত্ত্বিক খনন কাজ পরিচালনার সময় এখানে একটি মাটির বদনা পাওয়া যায়। এটির গঠন দেখতে ছাগলের মতো। জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি সংস্থা ইউনেসকোর বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থানসমূহের অন্যতম এটি। হেলমান্দ সংস্কৃতির সাথে সংশ্লিষ্ট পৃথিবীতে বিশ্বের অন্যতম প্রাচীন সভ্যতাও শাহর-ই সুখতেহ। ২০১৪ সালের জুনে ইউনেসকোর বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থানসমূহের তালিকায় স্থান পায় প্রাচীনতম নগরটি। শাহর-ই সুখতেহ ভ্রমণের উপযুক্ত সময় শীত ও বসন্তকাল। এলাকাটি ঘুরে দেখতে এক ঘণ্টা থেকে এক দিন সময় লাগবে। সূত্র: মেহর নিউজ এজেন্সি।