বৃহস্পতিবার, ৩রা এপ্রিল, ২০২৫ খ্রিস্টাব্দ, ২০শে চৈত্র, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

English

ইরানের আল্পস : অশতুরানকোহ- অপরূপ সৌন্দর্যের প্রতীক

পোস্ট হয়েছে: জানুয়ারি ১৮, ২০১৫ 

news-image

মানব সভ্যতার সুপ্রাচীন ঐতিহ্য ও সৌন্দর্যের অন্যতম লীলাভূমি ইরান। বিচিত্র প্রকৃতির বিপুল সম্ভারে পরিপূর্ণ ইরান স্মরণাতীত কাল ধরে পর্যটকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে আসছে। ভূপ্রকৃতি ও ঋতু-বৈচিত্র্য এবং মানব সংস্কৃতির বিবিধ ধারায় ইসলামী রীতিনীতি ও ঐতিহ্যের সম্মিলনে ইরান দেশটা হয়ে উঠেছে অপরূপ।

অপরূপ ইরান ভ্রমণের জন্য প্রতি বছর হাজার হাজার পর্যটকের ভীড় হয়। ইরানের বিভিন্ন আকর্ষণীয় স্থানের অন্যতম হলো জাগ্রোস পর্বতমালার নয়নাভিরাম পর্যটন কেন্দ্র ‘আশতুরানকোহ’।

Oshtaran_Mountains,_Lorestan,_Iranজাগ্রোস পর্বতশ্রেণি ইরানের বৃহত্তম পর্বত শ্রেণি। উত্তর পশ্চিম অংশে লোরেস্তান এলাকায় অবস্থিত ‘ইরানের আল্পস’ নামে খ্যাত পার্বত্য ভূমি ‘অশতুরানকোহ’। অশতুরানকোহ এর দুটি বিখ্যাত পর্বতশৃঙ্গ ‘গোলাপ’ এবং ‘সান বোরান’ যথাক্রমে ৪০৫০ মিটার ও ৪১৫০ মিটার উঁচু। আজনা শহরের ১৯ কি.মি. দক্ষিণ পশ্চিমে এ শৃঙ্গ দুটির অবস্থান।

অশতুরানকোহের অন্যতম আকর্ষণীয় স্থান হলো দুটি স্বচ্ছ পানির হ্রদ। এর নাম গহর। এর দুটি অংশ উচ্চ এবং নিম্ন পর্বতের বরফ গলা পানি জমে গহর হ্রদকে রুক্ষ পাহাড়ি পরিবেশে এক টুকরা সুবজাভ পান্নার মতো রূপ দিয়েছে। বিজ্ঞানীরা বলেন, পাহাড়ি ভূমিধসের ফলে এ দুটি হ্রদের সৃষ্টি হয়।

গহর হ্রদের প্রধান অংশের দৈর্ঘ্য ১০৫ কি.মি. এবং প্রস্থ ৬০০ মিটার। উপযুক্ত পর্যটন সুবিধা প্রদান করা গেলে এই হ্রদ শ্রেষ্ঠ বিনোদন কেন্দ্রে পরিণত হতে পারে।

800px-RudkhanCastleলোরেস্তানের বনভূমি ও চারণভূমির পরিমাণ যথাক্রমে ৭৫০০০ হেক্টর ও ১২৫০০০০ হেক্টর। সামগ্রিকভাবে জাগ্রোস পর্বতমালা হালকা গাছপালায় আচ্ছাদিত। গহর হ্রদের দক্ষিণ পূর্বাঞ্চল হালকা বনানী আচ্ছাদিত। এ বনাঞ্চলে ওক, তারপিন, কাঠবাদাম, সাভিন প্রভৃতি গাছ জন্মে। লোরেস্তানের বনাঞ্চলে বাদামি ভালুক, নেকড়ে, হায়েনা, শিয়াল, গাজেলী হরিণ, বন্য ছাগল, হরিণ, চিতাবাঘ, বিভিন্ন প্রকার সরীসৃপ, বনমোরগ, ঘুঘু প্রভৃতি জীবজন্তু দেখা যায়। এছাড়া এখানকার হ্রদ এবং নদ-নদীতে রুই-কাতলাজাতীয় মাছও প্রচুর পাওয়া যায়। বসন্তকালের শুরু থেকে গরমকাল অবধি অশতুরানকোহ এর ঢালু উপত্যকাসমূহ বিভিন্ন সবুজের সমারোহে ভরে উঠে। তখন হরেক রকম পাহাড়ি ফুলের গন্ধে চারিদিক মোহিত হয়ে ওঠে। অশতুরানকোহতে এসে পর্যটকরা এর অপরূপ সৌন্দর্য দেখে অভিভূত হয়ে যায়। জনৈক পর্যটক তাঁর ভ্রমণ অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন, ‘অশতুরানকোহ এর সর্বোচ্চ চূড়ায় আমি আরোহণ করেছি। এটি আমার দীর্ঘ ভ্রমণের শ্রেষ্ঠ অভিজ্ঞতা। ক্যাম্প থেকে তাকালে তুষারাবৃত পর্বতচূড়ার নয়নাভিরাম দৃশ্য চোখে পড়ে। নীল আকাশের পটভূমিতে তুষার ঢাকা পর্বতশ্রেণি এক কথায় অপূর্ব। ১৯৭০ মিটার উঁচুতে এই পর্বতশ্রেণি ইউরোপের আল্পস পর্বতমালার কথাই স্মরণ করিয়ে দেয়। একমাত্র পার্থক্য হলো এই পাহাড়শ্রেণি লোরেস্তানের গ্রামগুলোকে আড়াল করে রাখে।’

Oshtoran_Kooh‘চূড়া থেকে দেখলে চারিদিকের দৃশ্য আরো চমৎকার। উত্তরদিকে ৩৮০০ মিটার উঁচু তুষারাবৃত সিরাক পর্বত। পশ্চিমে পর্বতচূড়াগুলো ঢালু হয়ে ধীরে ধীরে নেমে গেছে। দক্ষিণ-পশ্চিমে বিশাল এক গিরিখাদের মাঝখানে চোখে পড়ে নীলাভ গহর হ্রদ। আরো দক্ষিণে এক গিরিখাদে শোভা পাচ্ছে প্রধান হ্রদ গহর। পাহাড়ের চূড়া থেকে প্রথম আমি এই হ্রদটি দেখেছি, হঠাৎ দেখলে মনে হবে বিশাল এক টুকরো নীলা যেন মাটিতে পড়ে আছে। টলটলে স্বচ্ছ ঠাণ্ডা পানিতে আকাশের ছায়া পড়ে হ্রদটিকে করে তুলেছে অপরূপ। গহর হ্রদের সৌন্দর্য দেখে আমি অভিভূত না হয়ে পারিনি।…’

800px-Ab_sefid-aligoodarzঅশাতুরানকোহ এর চূড়ায় না উঠে কেউ আসলে এর চারিদিকের শোভা অবলোকন করতে পারবে না। বসন্তকালে এখানে দাঁড়ালে ফুরফুরে হাওয়া আপনার জন্য বয়ে আনবে পাহাড়ি ফুলের মনমাতানো সৌরভ। বিকেলের পড়ন্ত রোদের ঝিকিমিকিতে আপনাকে স্বপ্নিল পরিবেশে নিয়ে যাবে। হ্রদের পানিতে গোধুলির রঙ যখন ছড়িয়ে পড়বে তখন সোনালি পানিতে মাছের জলকেলী দেখে আপনি মুগ্ধ না হয়ে পারবেন না। আপনি ইচ্ছে করলে অশতুরানকোহের উত্তরে আজনার সমভূমিতে রক্তিম টিউলিপের সমারোহ দেখতে পারেন। কিংবা দক্ষিণ-পশ্চিমের খাল পার্বত্যাঞ্চলের পাহাড়ি ঝরনার জলপ্রপাত আপনাকে আরো মুগ্ধ করতে পারে।