ইমাম খোমেইনী (রহ.) ছিলেন এক বিস্ময়কর ব্যক্তিত্ব
পোস্ট হয়েছে: সেপ্টেম্বর ৭, ২০১৫

হাশেমী রাফসানজানী
আমরা আমাদের শরীরের প্রতিটি ইঞ্চি দিয়ে ইমাম খোমেইনী (রহ.)-এর অভাব অনুভব করি। আমরা এক বিরাট দুঃখ ও শোকসাগরে এত গভীরভাবে নিমজ্জিত যে, কেবল আমরাই অনুধাবন করতে পারি যে, আমাদের ভাগ্যে কী ঘটেছে। কিন্তু আল্লাহর অনুগত বান্দা হিসাবে আমরা সকলেই জানি যে, কোনো মানুষই চিরঞ্জীব নয়। যে দুনিয়ায় আগমন করে, একটি নির্দিষ্ট সময়ের পর তাকে দুনিয়া ছেড়ে চলে যেতেই হয়। আমাদের ইমামও এই চিরন্তন সত্যের ব্যতিক্রম ছিলেন না।
আপনাদের সকলেরই জানা আছে যে, ইমাম খোমেইনী (রহ.) এক পবিত্র ও মহিমান্বিত জীবন যাপন করে গেছেন। ইমাম (রহ.) তাঁর জীবনকালে এক বিস্ময়র ও অবিশ্বাস্য কৃতিত্ব প্রদর্শন করেছেন। ইমামের এই সাফল্য দেখলে বিশ্বের রাজনৈতিক সমীক্ষকগণ তাঁদের চোখকে খুব কমই বিশ্বাস করতে পারবেন।
সৌভাগ্যের কথা যে, ইমাম তাঁর জীবনের শেষ দশ বছরে বহু বক্তৃতা করে গেছেন এবং বহু ক্ষেত্রে অত্যন্ত বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করে গেছেন। আমরা তাঁর বিস্ময়কর ব্যক্তিত্বের বিভিন্ন দিকের বিস্তারিত প্রামাণ্য তথ্য সংরক্ষণ করেছি। আমি জানি না, ইমাম খোমেইনী (রহ.)-এর মতো বিশ্বের আর কোনো বিশিষ্ট ব্যক্তি এত প্রামাণ্য জিনিস রেখে গেছেন কিনা এটা বিচার করার সময় এখনও আসেনি। তবে আমি নিশ্চিত যে, ইমাম খোমেইনীর কর্মকাণ্ডের মধ্যে আমরা আলোচনা করার মতো অনেক কিছু পেতে পারি। তিনি অসাধারণ কর্ম ও কৃতিত্ব সম্পাদন করে গেছেন। একজন মুসলমান, একজন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব এবং বিশ্ব রাজনীতির একজন বিশেষজ্ঞের দৃষ্টিকোণ থেকে ইমাম খোমেইনীর অবদান ও ভূমিকাকে পর্যালোচনা করে দেখা যেতে পারে। আমার দৃষ্টিতে ইমাম খোমেইনী (রহ.) ছিলেন অসম্ভবকে সম্ভব করতে সমর্থ এক বিরল ব্যক্তিত্ব।
ইমাম খোমেইনী বিপ্লবের উদ্যোগ গ্রহণের আগে কোমের ধর্মতত্ত্ব স্কুলে বিজ্ঞান, নীতিশাস্ত্র, দর্শন ও সুফিবাদের শিক্ষা সংযুক্ত করে সেখানে এক বিপ্লব সাধন করেন। শিয়া মাজহাবের ইতিহাসে এর আগে এমনটি আর কখনও করা হয়নি। ইমাম খোমেইনীর জীবনের এ একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক।
ইমাম খোমেইনী বিচ্ছিন্ন অবস্থায় থেকে ইসলামের নেতৃত্ব পরিচালনায় সাফল্য অর্জন করেন। ইতিহাসে এটি একটি বিস্ময়কর ঘটনা। মহানবী (সা.)-এর পর এবং ইসলামের আবির্ভাবের পর থেকে এমন আর কখনও হয়নি। সত্যিকার অর্থে ইমাম পাহলভী রাজবংশ ও তাদের রক্তপিপাসু আত্মীয়-স্বজনের অপশাসনকে ধূলিস্যাৎ করতে সক্ষম হয়েছিলেন। ইমামের এই অমর কীর্তি সমাজবিজ্ঞানী ও রাজনীতিবিজ্ঞানীদের জন্য এক বিরাট কর্মক্ষেত্র। বিপ্লবের দিনগুলোতে প্রায়ই বলা হতো, ‘বৃহত শক্তিগুলোকে মোকাবিলা করা অসম্ভব। আমরা যদি কোনো জায়গা থেকে শুরু করি তাহলে আমাদেরকে আবার সেই স্থানে ফিরে আসতে হবে যেখান থেকে আমরা শুরু করেছিলাম। সর্বত্রই বিশ্ব তাগুতের উপস্থিতি অনুভূত হয়।’ হ্যাঁ, ইমাম এই অলীক বিশ্বাসকে ভেঙে দিয়েছেন। জনসাধারণের ওপর ঐ মিথ্যা বিশ্বাস চাপিয়ে দেয়া হয়েছিল এবং তাদের নৈতিক মনোবল ভেঙে দেয়া হয়েছিল। এর পরিণতিতে জাতির মধ্যে সৃষ্টি হয়েছিল হতাশা।
ইমাম খোমেইনী (রহ.) এই বিশ্বাসকে চ্যালেঞ্জ করেছিলেন। তিনি এই প্রচারণা মিথ্যা প্রতিপন্ন করতে সক্ষম হয়েছিলেন। তিনি বৃহত শক্তিগুলোকে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য করেছিলেন। সত্যিকার অর্থেই এ ছিল এক বিরাট কাজ। ইমাম খোমেইনী যদি বৃহত শক্তিগুলোর বিরুদ্ধে এই জিহাদ শুরু না করতেন তাহলে এই বিশ্বাস সেই উচ্চ অবস্থানেই বিরাজ করত। সত্যি বলতে কি ইমাম খোমেইনী ফিকাহ বা ইসলামী আইশাস্ত্রের ব্যাপারে নতুন দৃষ্টিভঙ্গির যে দ্বার উন্মোচন করেছিলেন, জাতির মুদিত চক্ষুগুলোকে যেভাবে উন্মীলিত করে দিয়েছেন; মলিনতা মুছে দিয়ে ইসলামের মুখমণ্ডল যেভাবে উজ্জ্বল করে দিয়েছেন, তরুণ ধর্মবেত্তাদের সামনে জ্ঞান-গবেষণার যে পথ বাতলে দিয়েছেন এবং ইসলামী ফিকাহবিদদের সামনে ইজতিহাদের যে নতুন পদ্ধতি উপস্থাপন করেছেন তা সবই এক অতি মূল্যবান মর্যাদা ও কৃতিত্বপূর্ণ কাজ। ইসলামের ওপর গভীরতর অধ্যয়ন গবেষণা এভাবেই সম্ভব।
এটি একটি আশ্চর্যজনক ঘটনা ছিল যে, ইমাম খোমেইনী (রহ.) এককভাবে সকল বিদেশী চক্রান্ত আবিষ্কার করতে সক্ষম হয়েছিলেন, সেগুলো ব্যর্থ করে দিয়েছিলেন এবং একটি বিজয় অর্জন করতে সক্ষম হয়েছিলেন। এসব এক অনন্য কাহিনী। সাম্প্রতিককালের কোনো বিপ্লবের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে যে, একটি সময় অতিক্রান্ত হওয়ার পর সে বিপ্লব দুর্বল হয়ে পড়েছে। কিন্তু ইরানে ইসলামী বিপ্লবের ক্ষেত্রে এরূপ কল্পনা করা যায় না।
‘প্রাচ্য নয়, পাশ্চাত্য নয়, ইসলামী প্রজাতন্ত্র’ এই নীতি প্রবর্তন করে ইমাম খোমেইনী রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করেছিলেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বিশ্বাস করতেন যে, কোনো বিপ্লবকে যদি টিকে থাকতে হয় তাহলে তার সূত্র ও মূল প্রাচ্য বা পাশ্চাত্যের সাথে যুক্ত থাকতে হবে। ইমাম এই ধারণাকে নাকচ করে দিয়েছেন।
আমি ইমাম খোমেইনী (রহ.)-এর চিন্তাধারার সাথে পরিচিতদের একজন। আমি তাঁর আত্মবিশ্বাস ও নৈতিক শক্তি সম্পর্কে জানি। আমি তাঁকে গভীরভাবে দেখেছি। রাজনীতি, ফিকাহশাস্ত্র, বিজ্ঞান ও নৈতিকতা ইত্যাদি সকল বিষয়েই তাঁর সাথে আমার সম্পর্ক ও যোগাযোগ ছিল। তাঁর জীবনের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য আমাকে মুগ্ধ করে।
ইমাম খোমেইনী (রহ.) ফিকাহশাস্ত্রের একজন বিশেষজ্ঞ ছিলেন। যারা ধর্মীয় রীতি পদ্ধতি সম্পর্কে অধ্যয়ন করতে চায় তাদের ফিকাহশাস্ত্রের সাথে পরিচিতি প্রয়োজন। ফিকাহশাস্ত্রে ইমাম খোমেইনীর এই বিশেষ যোগ্যতা সকলেই স্বীকার করে থাকেন। সাম্প্রতিককালে এমন কোনো ফিকাহবিদ, পণ্ডিত ও আলেম খুঁজে পাওয়া যাবে না যিনি এই মত প্রকাশ করবেন যে, ইমাম অল্প জানতেন। তাঁরা তাঁকে অত্যন্ত মর্যাদাবান ও খ্যাতিমান আলেম বলে বিবেচনা করে থাকেন।
ইমাম খোমেইনী (রহ.) জ্ঞানের যে শাখায় বিশেষজ্ঞ ছিলেন তা হলো দর্শন। কিন্তু তিনি কখনই এমনটি প্রকাশ করেননি যে, তিনি দর্শনের কোনো বিশেষজ্ঞ ছিলেন।
ইমামের আরেকটি বিশেষত্ব ও বৈশিষ্ট্য হলো সুফিবাদ। এক্ষেত্রে তিনি ছিলেন অনন্য। সুফিবাদ মানবীয় বুদ্ধিমত্তার এমন একটি শাখা যা সাধারণ মানুষের জন্য বোধগম্য নয়। এটি অর্জন করতে হয় কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে। ইমাম খোমেইনী অত্যন্ত খ্যাতনামা একজন পণ্ডিতের কাছ থেকে সুফিতত্ত্বের দীক্ষা নিয়েছিলেন। কিন্তু ইমাম তাঁর ওস্তাদকেও অতিক্রম করে গেছেন। সুফিতত্ত্বের ক্ষেত্রে ইমামের কর্মের ভিত্তিতেই এই দাবি করা যায়।
ফিকাহশাস্ত্র, দর্শনশাস্ত্র ও সুফিতত্ত্বের জ্ঞানে ইমাম ছিলেন অনন্যসাধারণ। এসব ক্ষেত্রে ইমামের অভ্যন্তরীণ যোগ্যতা ছিল অন্য সকলের ওপর।
১৯৬২ সালে ইমামকে গৃহে আটক থাকতে বাধ্য করা হয়। এ ধরনের নিঃসঙ্গ জীবন ইমাম খোমেইনী (রহ.)-এর মতো ব্যক্তিদের আত্মগঠন ও উন্নয়নের উৎস হিসাবে কাজ করে। ঐ সময়টাকে তিনি নীতিশাস্ত্রের ওপর অধ্যয়নে কাজে লাগান। তিনি নীতিশাস্ত্রের ওপরও বিশেষ দক্ষতা অর্জন করেন। কিছুকালের জন্য তিনি এর ওপর শিক্ষকতাও করেন। যাঁরা ইমামের নীতিশাস্ত্রের ক্লাস থেকে পাঠ গ্রহণ করেছিলেন তাঁরা আজও তা থেকে অনুপ্রেরণা পেয়ে চলেছেন।
সুফিতত্ত্বের প্রভাব বিভিন্ন পণ্ডিতের ওপর বিভিন্ন ধরনের। কেউ কেউ মানবজীবন ও পার্থিবজগত থেকে বিচ্ছিন্ন থেকে সুফিতত্ত্বের অধ্যয়ন করেছেন। তাঁরা খোদার প্রতি এত বেশি লীন হয়ে যান যে, তাঁদের চারিদিকে কী ঘটছে, সে সম্পর্কে তাঁরা অনবহিত থাকেন। মহানবী (সা.) কখনও এমন করতেন না। আমাদের মহান সুফিরাও এমন করতেন না। তাঁরা জনগণের সাথেই বসবাস করতেন, তাদের কল্যাণে সংগ্রাম করতেন এবং তাদের সংহতি রক্ষায় সচেষ্ট থাকতেন। ইমাম খোমেইনী (রহ.) এমনই একজন ছিলেন। এক্ষেত্রে তাঁর দর্শনই তাঁকে সাহায্য করেছে। দর্শন একজন ব্যক্তির সামনে পৃথিবীর একটি প্রকৃত চিত্র তুলে ধরে। দর্শনের জ্ঞানে সমৃদ্ধ একজন মানুষ আল্লাহকে, তাঁর সৃষ্টিকে এবং সৃষ্টি ও খোদার সম্পর্ক সম্বন্ধে জানতে পারে এবং মানুষ, মানুষের জীবনধারা, তার পরিশুদ্ধতার পথ ও তার সমাজ সম্পর্কে উপলব্ধি করতে পারে।
ইমাম খোমেইনী (রহ.) খোদা ও বিশ্বজনীনতার মধ্যে বিলীন হয়েছিলেন আবার তাঁর জনগণকেও মনে রেখেছেন, ভুলে যাননি। তিনি জানতেন তাঁর কাজ কী।
ইমাম খোমেইনী সম্পর্কে আমি যা উল্লেখ করেছি তা তাঁর প্রতি আমার মনোভাবপ্রসূত। আমি দীর্ঘ পনের বছর তাঁর কাছে সরাসরি শিক্ষালাভ করেছি। অতীতের শাসকচক্রের বিরুদ্ধে সংগ্রামকালে আমি উপলব্ধি করতে পেরেছি যে, ইমাম খোমেইনী (রহ.)-এর কাছ থেকে আমি কী শিখেছি। অনুশীলন তাঁর শিক্ষার সত্যতা আমার কাছে আরো বেশি করে ফুটিয়ে তুলেছে। আল্লাহ তায়ালা যেন মানুষকে দিক নির্দেশনার জন্য এই আলোকবর্তিকা দান করেছিলেন। গোটা বিশ্ব যেন আজ একটি গৃহে রূপ নিয়েছে, আর আল্লাহ তায়ালা যেন পৃথিবীসদৃশ সেই গৃহের সকল মানুষের জন্য সূর্য হিসাবে ইমাম খোমেইনীকে নিযুক্ত করেছিলেন।
এ ধরনের এক একটি সূর্য যেমন সমসাময়িককালের এক একটি সময়ে আবির্ভূত হয়, তেমনি ইমাম খোমেইনীও তাঁর কর্ম সম্পাদন করে আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন। তিনি তাঁর দায়িত্ব যথাসম্ভব পালন করে গেছেন। জীবনে শেষ দিনগুলোতে তিনি উপলব্ধি করেছিলেন যে, বিপ্লবের পথে কিছু বিপত্তি দেখা দিতে পারে। তাই তিনি সেসব সমস্যা মিটিয়ে দিয়ে গেছেন। তিনি আমাদেরকে সঠিক পথ দেখিয়ে গেছেন। আমরা এখন যে মশাল বয়ে নিয়ে চলেছি তার উৎস রয়েছে পবিত্র কুরআনে, মহানবী (সা.)-এর হাদীসে এবং ইসলামের শিক্ষায়।
[নিবন্ধটি ১৯৮৯ সালের জুলাই মাসে ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের মহিলা সমিতি আয়োজিত ‘ইমাম খোমেইনী (রহ.)-এর ব্যক্তিত্বের বিভিন্ন দিক’ শীর্ষক আন্তর্জাতিক কংগ্রেসে ততকালীন প্রেসিডেন্ট আকবর হাশেমী রাফসানজানী প্রদত্ত ভাষণ থেকে সংকলিত]