শুক্রবার, ৪ঠা এপ্রিল, ২০২৫ খ্রিস্টাব্দ, ২১শে চৈত্র, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

English

ইমাম খোমেইনী (রহ.)-এর চিন্তাধারা ও কমিউনিজমের পতন

পোস্ট হয়েছে: জানুয়ারি ২২, ২০১৪ 

news-image

পশ্চিমের উদারনৈতিক চিন্তাধারা বিকাশের পবরর্তী বছরগুলোতে পশ্চিমা বুদ্ধিজীবীরা ভাবতে থাকলেন যে, জ্ঞান ও চিন্তার জগতে তাঁরা এক বিরাট সাফল্য অর্জন করে ফেলেছেন। কিন্তু তার অল্প সময়ের মধ্যেই তাঁদেরকে ‘কমিউনিজ্ম’ নামে আরেকটি কৃত্রিম মতবাদ উদ্ভাবন করতে হলো। ধারণা করা হয়েছিল, তাঁদের এই নতুন মতাদর্শ মানবসমাজের সমস্যা সমাধান করবে। কিন্তু মাত্র এক শতাব্দী যেতে না যেতেই ঐ মতবাদ ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে নিক্ষিপ্ত হলো।

মার্কসবাদ ও লেনিনবাদের অপরিবর্তনীয়  আদর্শের ভিত্তিতে কমিউনিজমের সাম্রাজ্যে বাহাত্তর বছর ধরে একনায়কতান্ত্রিক শাসন ও কট্টর নীতি অনুসরণের পর খোদ এর প্রতিষ্ঠাতারাই একে ছুঁড়ে ফেলে দিল।

স্মরণ করা যেতে পারে যে, সূচনাকাল থেকেই মার্কসবাদ ও লেনিনবাদ মানব ইতিহাসের অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ও ঘটনাপ্রবাহকে বিবেচনায় নেয়নি। ব্যক্তি-মানুষ মার্কসবাদ-লেনিনবাদের বিবেচনায় গৌণ। অতি সম্প্রতি তারা অবশ্য ঐ বিষয়গুলো বিবেচনা করা শুরু করেছে।

একচেটিয়া কমিউনিস্ট শাসনের ফলে সামাজিক গোঁড়ামি ও অস্বাভাবিক নিয়ন্ত্রণ সৃষ্টি হয়। ব্যক্তি-মানুষকে কমিউনিজমে কল-কারখানার খুচরা যন্ত্রাংশ ছাড়া আর কিছুই ভাবা হয় না । মূলত এই কমিউনিস্ট শাসনে কমিউনিস্ট পার্টি এবং তার সদস্যদের স্বার্থই কেবল দেখা হয়।

কমিউনিস্ট সমাজে মানুষ উৎপাদনের সরঞ্জাম বা হাতিয়ার ছাড়া কিছুই নয় এবং যতক্ষণ পর্যন্ত কোন মানুষ উৎপাদন করতে পারে, উৎপাদনের কাজে তাকে ব্যবহার করা চলে, ততক্ষণ পর্যন্তই কেবল সমাজে তার প্রয়োজনীয়তা থাকে। আদর্শগতভাবেই সেখানে সরঞ্জাম ও মানুষের মধ্যে কোন পার্থক্য করা হয় না। ধারণা করা হয়, মানুষ ও সরঞ্জামাদি বস্তুগতভাবেই সৃষ্ট এবং উভয়ই কেবল উৎপাদনের কাজে ব্যবহারের জন্য। যতক্ষণ এগুলো উৎপাদন বৃদ্ধি নিশ্চিত করতে পারবে ততক্ষণ এর কার্যকারিতা আছে, অন্যথায় তারা প্রত্যাখ্যানযোগ্য। এই দৃষ্টিভঙ্গি মানুষের স্বাভাবিক আবেগপ্রবণতার পরিপন্থী ও নিবর্তনমূলক। অথচ এটাই কমিউনিজমে নীতি ও আদর্শের ভিত্তি। এই আদর্শের একমাত্র লক্ষ্য হলো উৎপাদন। মানুষের কর্ম তৎপরতা, চিত্রকলা-সাহিত্য , রাষ্ট্র-সরকার ও জ্ঞান তথা সবকিছুই উৎপাদনের জন্য এবং উৎপাদনের পথে কোন বাধা মনে হলে তা পরিত্যাগ করা হয়। শান্তি, সম্প্রীতি, আধ্যাত্মিকতা ও আশা-আকাঙ্ক্ষা বাদ দিয়ে মানুষকে এখন নিরন্তর সংগ্রাম করতে হয় কেবল বৈষয়িক লক্ষ্যে উপনীত হতে। অথচ ভালোবাসা ও ইবাদত-বন্দেগি দিয়ে মানুষের যে জীবন বিকশিত হওয়ার কথা, অন্য কিছু দিয়ে তা পূরণ হতে পারে না। তাই সত্যিকার মানবীয় চেতনা কমিউনিজমের আদর্শ থেকে দিনের পর দিন বিচ্ছিন্ন হতে থাকে এবং কমিউনিজম ধ্বংস না হওয়া পর্যন্ত এই বেদনাদায়ক অবস্থা চলতেই থাকবে।

এটি আসলে একটি সাংস্কৃতিক অবক্ষয় এবং মুসলিম বিশ্বেও এই অবক্ষয় শুরু হয়েছে। কোন কোন মুসলিম দেশে এর আলামত লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বিভিন্ন পন্থায় মুসলিম বিশ্বকে কমিউনিজমের এই আদর্শের মোকাবিলা করতে হচ্ছে।

এই ভুল চিন্তা মুসলিম জাহানে প্রবেশ করেছে তথাকথিত জাতীয়তাবাদী প্রবণতা ও অন্যান্য পন্থার মধ্য দিয়ে। এসব চিন্তা বিস্তার লাভ করেছে ধীরে ধীরে, বিশেষ করে যেসব দেশে স্বৈরাচার ও তাঁবেদার সরকার বিদ্যমান। এদের মাধ্যমে প্রভাবিত হয় সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি, এমনকি ধর্মীয় নেতাদেরও কোন কোন অংশ।

কিন্তু সাম্প্রতিক দিনগুলোতে বিশ্বের জাতিসমূহ এবং ওয়াকিবহাল রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক মহল অত্যন্ত বিস্ময়কর ও নজিরবিহীন সব ঘটনা প্রত্যক্ষ করেছে। ধর্ম, ঈমান ও পরকালে বিশ্বাসের কুঁড়ি আজ ফুলের মতো বিকশিত হয়েছে এবং সকল বাধার বেড়াজাল ডিঙ্গিয়ে নাস্তিক্যবাদী রুশ সমাজের মোকাবিলা করে চলেছে। বিষাক্ত সাংস্কৃতিক স্বৈরাচারের শৃঙ্খল এবং বস্তুবাদের বেড়ীবাঁধ ভেঙে পড়েছে। আজকে বস্তুতান্ত্রিক সমাজবাদের ভিত্তি কেউ কল্পনাই করতে পারে না।

এই সংক্ষিপ্ত নিবন্ধে বস্তুবাদী এই চিন্তাধারার সার্বিক বিপর্যয় এবং এই বিপর্যয়ের বিস্তারিত কারণ তুলে ধরা হচ্ছে না। এই নিবন্ধে আমরা কমিউনিজমের বিপর্যয়ের এবং ইসলাম পুনরুজ্জীবনে ইমাম খোমেইনীর চিন্তাধারা কতখানি প্রভাব ফেলেছে তা সংক্ষেপে পর্যালোচনা করবে।

এই নজিরবিহীন পরিবর্তন এবং নাস্তিক্যবাদী কমিউনিস্ট চিন্তাধারার বিপর্যয়ের মধ্যে আমরা সেই বিশেষ দিকগুলোই দেখব যা সকল মানুষের স্বাভাবিক প্রকৃতির সাথে সংশ্লিষ্ট। প্রকৃতপক্ষে এই কেন্দ্রবিন্দু থেকে ইসলামী বিপ্লব ও ধর্মীয় চিন্তাধারার ঢেউ শুরু হয়েছে এবং ইমাম খোমেইনীর এই চিন্তাধারাই নাস্তিকতার ভিতকে কাঁপিয়ে তুলেছে।

ইমাম খোমেইনীর নেতৃত্বে ইরানে ইসলামী বিপ্লবের সাফল্য, মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ সমর্থিত সাবেক সরকারকে উৎখাত করে ইসলামী প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠা এবং পরে সেখানেই ইসলামী মূল্যবোধের প্রবর্তন ইরানী জাতিকে ধর্মীয় ও চিন্তাগত দিক থেকে সুরক্ষিত করেছে। এর মধ্য দিয়ে ইসলাম এই অঞ্চলে তথা সমগ্র বিশ্বে এক নতুন চিন্তাধারা বিকাশের ভিত্তি হিসাবে আত্মপ্রকাশ করেছে। এর আগ পর্যন্ত বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ও বিভিন্ন জাতি ইসলামের বিশ্বাস ও ইসলামের প্রতি কিছু কিছু ভালোবাসাও পোষণ করত, এমনকি রাষ্ট্র ও সরকারসমূহও ইসলামের খেদমত করছে বলে দাবি করতো বটে, কিন্তু প্রকৃত অবস্থা ছিল ভিন্নতর। ঐ সময় ইসলামের অনুসরণ ও অনুশীলন হতো আধুনিককালের খ্রিস্টধর্মের মতো। দৈনন্দিন জীবনাচারের সাথে ধর্মের ধর্মের কোন যোগ ছিল না, এমনকি ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব বলে যাঁরা খ্যাত ছিলেন তাঁদেরও অনেকে ঐ দাম্ভিক শাসকগোষ্ঠীরই অংশ।

ইসলামী বিপ্লবের আগে ইরানেও ইসলাম তার পরিচ্ছন্ন রূপ নিয়ে বিরাজমান ছিল না। সেই ইসলাম কেবল তার ওপর নাস্তিক্যবাদের হামলা মোকাবিলায়ই অসমর্থ ছিল না; বরং তার নিজস্ব প্রাধান্য বজায় রাখার ক্ষমতাও হারিয়ে ফেলেছিল। বিপ্লব পূর্বকালে ইসলাম তার অতীতের মহান গৌরব এবং সত্যানুসন্ধিৎসু বৈশিষ্ট্য হারিয়ে ফেলেছিল। এই সুযোগে কমিউনিস্ট বস্তুবাদ ধীরে ধীরে সমাজের ওপর তার নিয়ন্ত্রণ বৃদ্ধি করতে থাকে এবং প্রতিদিনই এক আল্লাহর প্রতি আনুগত্য কমতে থাকে।

১৯৭৭-৭৮ সালের দিকে ইমাম খোমেইনী (রহ.)-এর চিন্তাধারার বহিঃপ্রকাশ হিসাবে ইরানে ইসলামী বিপ্লবের জন্য যে নতুন জাগরণ দেখা দেয় তা ইসলামের ও ইসলামী চিন্তাধারার এক সমৃদ্ধ উৎস হিসাবে পরিগণিত হয়। সত্যি বলতে কী, এই সঠিক ভিত্তিই ইসলামী বিপ্লবকে সাফল্যের স্বর্ণদ্বারে পৌঁছে দিয়েছে। এই বিপ্লবের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এর মূল্যবোধ। যে মূল্যবোধ ইরানের সমগ্র জনগণকে প্রত্যক্ষভাবে প্রভাবিত করে। বিপ্লবের পর দেশের ভিতরে-বাইরে উভয় স্থানে এই বিপ্লবী মূল্যবোধের প্রভাব পড়ে। বিপ্লব-পরবর্তী ইরানে ইমাম খোমেইনীর নেতৃত্বে দশ বছরের শাসনামলে মহানবী মুহাম্মাদ (সা.)-এর সত্যিকার ইসলাম বাস্তবায়নের ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে।

ইরানে তথা সমগ্র বিশ্বে কমিউনিজমের বিপর্যয়ের প্রধান কারণ দুটি। প্রথমত, কমিউজিম মানবতার মুক্তির জন্য যেসব ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ দিয়েছিল, সময়ের সাথে সাথে সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে তা গোলযোগের সম্মুখীন হয় এবং এই পরিস্থিতি জনগণের মৌলিক চাহিদাও পূরণ করতে ব্যর্থ হয়।

দ্বিতীয়ত, ইসলামের ওপর আস্থাশীল জনসাধারণ ইসলামী চিন্তা-চেতনাকেই বেশি করে আঁকড়ে ধরতে শুরু করে। তারা অনুধাবন করে যে, ইসলাম স¤পর্কে অজ্ঞতা তাদেরকে ইসলাম ও সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলবে। একই সাথে ইসলাম সকল প্রকার অনিয়ম ও বস্তুবাদী চিন্তা-চেতনার বিরুদ্ধে তার ভূমিকা তুলে ধরে। নতুন প্রজন্মের যুবা-তরুণরা ইসলামের কাছে ছুটে আসে সঠিক জ্ঞানের অনুসন্ধানে। আর এ কারণে ইমাম খোমেইনীর কাছে তারা ঋণী।

বিশ্বের দেশে দেশে সমাজজীবনে ইসলামের প্রভাব বাড়ছে এবং যারা ধর্মকে ‘আফিম’ ভাবত, আজ তারা ইসলামের বিজয় দেখে বিস্ময়ে বিমূঢ় হয়ে গেছে।

(নিউজলেটার, অক্টোবর ১৯৯১)