বৃহস্পতিবার, ৩রা এপ্রিল, ২০২৫ খ্রিস্টাব্দ, ২০শে চৈত্র, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

English

আল-কুদস দিবস, ইমাম খোমেইনী ও এবারের যুদ্ধে ফিলিস্তিনিদের বিজয়

পোস্ট হয়েছে: জুন ১৫, ২০২১ 

আল-কুদস দিবস, ইমাম খোমেইনী ও এবারের যুদ্ধে ফিলিস্তিনিদের বিজয়
মুজতাহিদ ফারুকী

মসজিদুল আকসা ও আল কুদস দিবস : এবারের পবিত্র আল কুদস দিবস ছিল ১০ মে তারিখে। প্রতি বছর রমজানের শেষ জুম্মাবারে এই দিবস পালিত হয়ে আসছে গত প্রায় চার দশক ধরে। ১৯৭৯ সালে ইরানের ইসলামি বিপ্লবের পর বিপ্লবের নেতা ইমাম খোমেইনী এই দিবস ঘোষণা করেন। এ ঘোষণার তাৎপর্য যে কত গভীর ও সুদূরপ্রসারী তা স্পষ্ট হয়, এই দিনে ইহুদি রাষ্ট্র ইসরাইলের ঘৃণ্য কর্মকাণ্ডে।

প্রতি বছর তারা এই দিনে পবিত্র মসজিদুল আকসায় মুসলমানদের জুমাতুল বিদা পালনে বিঘ্নসৃষ্টি করে সম্পূর্ণ ইচ্ছাকৃতভাবে এবং গায়ে পড়ে সংষর্ষ বাঁধায়। এবারও তার ব্যতিক্রম ঘটেনি। তবে ব্যতিক্রম ঘটেছে মুসলমানদের মরণপণ সংগ্রামে, প্রতিরোধে। ইসলামের প্রথম কিবলা পবিত্র বায়তুল মোকাদ্দাস বা আল-কুদ্স আশ-শরিফ। যেটি আল আকসা মসজিদ নামে পরিচিত। হযরত ইয়াকুব (আ.) এ পবিত্র মসজিদের প্রথম নির্মাতা। পরবর্তী সময়ে হযরত দাউদ (আ.) ও তাঁর পুত্র সুলাইমান (আ.) এ মসজিদের পুনঃনির্মাণ করেন। ইসলামের পবিত্র তিনটি মসজিদের এটি একটি। জেরুজালেম, আল-আকসা মসজিদ এবং তার আশপাশের এলাকা ইসলামের বহু নবীর স্মৃতিবিজড়িত। এখানে রয়েছে অসংখ্য নবী-রাসূলের মাজার। ওহি ও ইসলামের অবতরণস্থল এ নগরী নবীদের দ্বীন প্রচারের কেন্দ্রভূমি। বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ সা. ‘মসজিদুল হারাম’ অর্থাৎ ক্বাবা শরিফ থেকে ‘মসজিদুল আকসা’ হয়ে ঊর্ধ্বাকাশে পবিত্র মেরাজ শরিফ সম্পন্ন করেন। তাই এ পবিত্র নগরীর প্রতি ভালোবাসা প্রতিটি মোমিনের হৃদয়ের গভীরে প্রোথিত। এই পবিত্র নাম শুধু একটি স্থানের সঙ্গে জড়িত নয়; বরং তা সব মুসলমানের বিশ্বাস, তাদের অন্তর্গত অনুভূতি ও সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। বিশ্বের সব মুসলমানের মনে এ মসজিদের জন্য ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা রয়েছে।
ইতিহাস থেকে জানা যায়, ৬৩৮ খ্রিস্টাব্দে দ্বিতীয় খলিফা হযরত ওমর (রা.) ফিলিস্তিনে বিনা রক্তপাতে ইসলামের পতাকা উড্ডীন করেন। কিন্তু ১০৬৯ সালে খ্রিস্টান ক্রুসেডাররা ফিলিস্তিন দখল করে নেয়। ১১৮৬ সালে কুর্দী বীর গাজী সালাহ উদ্দিন আইয়ুবী খ্রিস্টান শক্তির হাত থেকে বায়তুল মোকাদ্দাসসহ ফিলিস্তিন পুনরুদ্ধার করেন। এর পর থেকেই ইহুদিবাদীরা ও তাদের দোসর খ্রিস্টানরা নানা ষড়যন্ত্রের আশ্রয় নেয় এ পবিত্র ভূমি দখল করার জন্য। ঊনবিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে ইহুদিরা তুরস্কের খলিফা আবদুল হামিদের কাছে ফিলিস্তিনে জমি কেনার প্রস্তাব দেয়। খলিফা সে প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন। প্রথম মহাযুদ্ধের সময় পশ্চিমা মিত্র শক্তিকে গোয়েন্দাগিরিসহ নানাভাবে সহায়তা করে ইহুদিরা ব্রিটিশ সরকারের ঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠে। ১৯১৭ সালে ব্রিটিশরা ফিলিস্তিন দখল করে এবং একজন ইহুদিকে ফিলিস্তিনের গভর্নর নিয়োগ করলে তাদের নীল নকশা বাস্তবায়নের পথ খুলে যায়। ইহুদিবাদের সাথে গোপন চুক্তি অনুযায়ী দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইহুদিদের জন্য একটি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় উদ্যোগী হয় ইঙ্গ-মার্কিন শক্তি। তারা যাদের কাছে বারবার পরাজিত হয়েছে সেই মুসলমানদের দুর্বল করতে তাদের বুকের উপর অর্থাৎ ফিলিস্তিনে ইসরাইল নামের অবৈধ রাষ্ট্র চাপিয়ে দেয়। ১৯৪৭ সালের ২৯ নভেম্বর জাতিসংঘ ফিলিস্তিনের ৫৪% খাস ভূমির উপর ইসরাইল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পক্ষে প্রস্তাব পাশ করে। এর সূত্র ধরে ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী বেলফোর ১৯৪৮ সালের ১৫ মে ‘বেলফোর ঘোষণা’র মাধ্যমে অবৈধ রাষ্ট্র ইসরাইলের জন্ম দেয়। এর পর থেকে শুরু হয় ফিলিস্তিনের জনগণের উপর নির্মম নির্যাতনের পালা। লক্ষ লক্ষ ফিলিস্তিনিকে নিজেদের ঘরবাড়ি থেকে বিতাড়িত করা হয়। তারা উদ্বাস্তু হিসাবে লেবানন, সিরিয়া জর্ডানসহ বিভিন্ন মুসলিম দেশে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়। অন্যদিকে সারা বিশ্ব থেকে ইহুদিদের এনে মুসলমানদের ঘর-বাড়িতে বসিয়ে দেয় ব্রিটিশ আমেরিকার মদদপুষ্ট ইসরাইল। ১৯৬৭ সালের যুদ্ধে ইসরাইল প্রতিবেশী আরব দেশ জর্ডান, সিরিয়া ও মিসরের বিস্তীর্ণ ভূখ- দখল করে। ওদের নির্যাতন-নিপীড়ন বাড়তেই থাকে। প্রতিনিয়ত ওরা হত্যা করে চলেছে ফিলিস্তিনের নারী-শিশু বৃদ্ধ তথা সাধারণ মানুষকে। ১৯৭৩ সালের যুদ্ধেও আরবরা একরকম পরাস্ত হয়। কারণ, আমেরিকার অর্থনৈতিক ও সামরিক সাহায্যে ততদিনে ইসরাইল বিপুল শক্তি অর্জন করে। ১৯৮২ সালে ইসরাইল লেবানন দখল করে ২০ হাজারের বেশি মানুষকে হত্যা করে। ১৯৬৯ সালে বায়তুল মোকাদ্দাস মসজিদে আগুন ধরিয়ে দেয়। এরই প্রেক্ষিতে প্রতিষ্ঠিত হয় ওআইসি বা ইসলামি সম্মেলন সংস্থা। ১৯৭৪ সালে ইসরাইল আল-আকসা মসজিদে খনন কাজ শুরু করে। ১৯৭৯ সালে ন্যক্কারজনকভাবে মিসরের প্রেসিডেন্ট ইসরাইলকে স্বীকৃতি দিয়ে কাম্প ডেভিড চুক্তি করেন। ১৯৬৪ সালের ৮ মে ইসরাইলের বিরুদ্ধে সংগ্রামের লক্ষ্যে পিএলও (প্যালেস্টাইন লিবারেশন অর্গানাইজেশন) গঠিত হয়। ইয়াসির আরাফাত ছিলেন এর নেতা। তিনিও এক সময় ইসরাইলের সঙ্গে আপোসের পথ ধরেন। ১৯৭৯ সালে ইরানের ইসলামি বিপ্লবের পর আল-কুদ্স মুক্তির আন্দোলন নতুন দিশা খুঁজে পায়। বিপ্লবের নেতা ইমাম খোমেইনী (র.) আল-কুদস মুক্ত করার জন্য বিশ্বমুসলিমের প্রতি আহ্বান জানান। দিবসের গুরুত্ব সম্পর্কে ইমাম খোমেইনী বলেছিলেন, ‘দিবসটি কেবল কুদসের মাঝেই সীমাবদ্ধ নয়। এই দিবস বলদর্পী শক্তিগুলোর বিরুদ্ধে শোষিত-বঞ্চিত-নিপীড়িত জনতার দিবস। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ যেসব দেশের জুলুম অত্যাচারে বিভিন্ন দুর্বল দেশ পিষ্ট হয়েছে তাদের রুখে দাঁড়ানোর দিবস। এই দিবস বলদর্পীদের বিরুদ্ধে নিগৃহীতদের সুসজ্জিত হবার দিবস।’ তাই আল-কুদস দিবস হলো শোষণ, বঞ্চনা, অন্যায়-অবিচার, নির্যাতন-নিপীড়নের বিরুদ্ধে সোচ্চার হবার এক জ্বলন্ত প্রতীক, বিশ্বমানবতার পক্ষে, সত্য, ন্যায় ও মানবাধিকারের পক্ষেও এক অনন্যসাধারণ মানবিক আহ্বান। ইমাম খোমেইনী ফিলিস্তিনিদের অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে একটি সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করেন এবং আল-কুদস দিবস পালনের মধ্য দিয়ে বিশ্বের মুসলমানদের ঐক্যবদ্ধভাবে জেগে ওঠার একটি মঞ্চ তৈরি করে দেন যা অন্য কোনও আরব বা ইসলামি বিশ্বের নেতা কখনও করেননি। এখানেই খোমেইনীর কৃতিত্ব, তাঁর শ্রেষ্ঠত্ব। এক ভাষণে কুদস দিবসের করণীয় সম্পর্কে তিনি বলেছেন, বিশ্ব কুদস দিবসে মুসলমানদের কর্তব্য হচ্ছে বিক্ষোভ মিছিল ও সভা-সমাবেশের আয়োজন করে নিজ নিজ দেশের সরকারগুলোর কাছে জোরালো দাবি জানানো যাতে তারা অস্ত্রশক্তি ও তেল অস্ত্র নিয়ে আমেরিকা এবং ইসরাইলের বিরুদ্ধে সংগ্রামে নামে। যদি তা না করে তবে চাপ প্রয়োগ, ধর্মঘট পালন ও হুমকি প্রদর্শন করে তাদেরকে সে কাজে বাধ্য করতে হবে ৷ কারণ, ইহুদিবাদী ইসরাইল সমগ্র আরব বিশ্ব, এমনকি মক্কা ও মদীনা শরীফ দখলেরও হুমকি দিচ্ছে।
ইমাম খোমেইনী ‘আল-কুদ্স’ দিবসের ঘোষণা দিয়ে এ দিন সারা বিশ্বের মুসলমানদেরকে ফিলিস্তিনের মুক্তি সংগ্রামের প্রতি একাত্মতা ঘোষণার আহ্বান জানান। ফলে আল-কুদ্স মুক্তির লক্ষ্যে সংগ্রাম অব্যাহত থাকে। ফিলিস্তিনের আপোসকামী নেতৃত্বকে উপেক্ষা করে উঠে আসে প্রতিরোধ আন্দোলন ‘হামাস’। ১৯৮৭ সাল থেকে ১৯৯২ সাল পর্যন্ত ফিলিস্তিনের সংগ্রামী শিশু-কিশোররা ইসরাইলি সশস্ত্র হানাদার বাহিনীর উপর ইটপাটকেল নিক্ষেপের মাধ্যমে ‘ইন্তিফাদা’ আন্দোলনের জন্ম দেয়। হামাস এবং ইন্তিফাদাহর ফলশ্রুতিতে তিন তিন বার ইসরাইলি পরাশক্তি সংগ্রামী ফিলিস্তিনি জনগণের কাছে পরাজিত হতে বাধ্য হয়। ইমাম খোমেইনীর ঘোষিত দিবসটি আজ মুসলমানদের মধ্যে ঐক্য প্রতিষ্ঠায় এক অনন্য উদাহরণ। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের দৃষ্টিতে, নির্যাতিত ফিলিস্তিনিদের প্রতি সহমর্মিতা ও সত্য প্রকাশের মাধ্যম হিসাবে এ দিবসটি সব সময়ই বিশেষ গুরুত্বের অধিকারী। তাই পশ্চিমা ও ইসরাইলি গণমাধ্যম সব সময়ই এ দিবসকে খাটো করে দেখানো এবং এ ব্যাপারে বিভ্রান্তি ছড়ানোর চেষ্টা করে। তারপরও এ দিবস উপলক্ষে আয়োজিত মিছিলে লক্ষ লক্ষ মানুষের উপস্থিতির বিষয়টিকে তারা কখনই জনগণের দৃষ্টি থেকে আড়াল করতে পারেনি।
সম্প্রতি মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশ আমেরিকার প্রত্যক্ষ হস্তক্ষেপে এবং আর্থিক সুবিধা পাবার লোভে ইসরাইলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার পর ফিলিস্তিনি ও ওই অঞ্চলের বৃহত্তর আরব জনগণের মধ্যে ইসরাইলের প্রতি বিরূপতা আরও বেড়েছে। ইরান ও তুরস্ক মুসলিম উম্মার ইস্যুতে আরও বেশি সোচ্চার ও কার্যকর ভূমিকা রাখতে শুরু করেছে। আর এসব দেখে মাথা এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে ইসরাইলের। সেই সঙ্গে আছে দেশটির চরম জঙ্গীবাদী প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর ক্ষমতা হারানো ও কারাবন্দি হবার ভয়। ঘুষ খাওয়া, দুর্নীতির আশ্রয় নেওয়া এবং বিশ্বাস ভঙ্গ করার মতো বেশ কয়েকটি গুরুতর অপরাধের কারণে তাঁর বিরুদ্ধে ইসরাইলের আদালতে একাদিক মামলা রয়েছে। অভিযোগগুলির পেছনে জোরালো তথ্যপ্রমাণ আছে বলে জানা যায় ইসরাইলেরই গণমাধ্যমের খবরে। সুতরাং ক্ষমতা হারালে নেতানিয়াহুকে জেলে পচতে হবে এটা একরকম নিশ্চিতই। আবার ক্ষমতাও যে তাঁর হাতে থাকবেই এমন নিশ্চয়তাও তিনি পাচ্ছিলেন না, জনপ্রিয়তায় ধস নামার কারণে। এখন আগামী দু’বছরের মধ্যে যে নির্বাচন হবে তার আগে জনপ্রিয়তা বাড়ানো বা ভোটব্যাংক নিশ্চিত করার একটি জরুরি এজেন্ডা তাঁর সামনে রয়েছে। ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ সেই এজেন্ডার অংশ বলে অনেক আরব বিশ্লেষকই মনে করেন।
এবারের যুদ্ধ : গত ১০ মে জুমাতুল বিদার দিন জেরুসালেমে মসজিদুল আকসায় মুসলমানদের নামাজ পড়তে বাধা দেয় ইসরাইলি পুলিশ। বরাবরের মতোই বাধা দিতে পারে এমন আশঙ্কায় বহু ফিলিস্তিনি সেদিন মসজিদে উপস্থিত ছিলেন। মসজিদে পুলিশ প্রবেশের পথে ব্যারিকেড দিয়ে তারা ভেতরে শান্তিপূর্ণভাবে বিক্ষোভ দেখাচ্ছিলেন। আল কুদস দিবসের এই বিক্ষোভও তাদের নিয়মিত কর্মসূচির অংশ। পুলিশ যথারীতি তাতে বাধা দেয় এবং বিপুল শক্তি প্রয়োগ করে। পুলিশের হামলায় প্রায় ৩০০ ফিলিস্তিনি আহত হয় যাদের মধ্যে চারজনের অবস্থা ছিল গুরুতর। গ্রেফতার করা হয় বিপুল সংখ্যককে। এই হামলা এমন সময় চালানো হয় যখন গোটা ফিলিস্তিনি জনগণ ছিল ক্ষুব্ধ ও প্রতিবাদমুখর। ক্ষোভের কারণ, ওই একই সময়ে ইহুদি রাষ্ট্রটি প্রায় সপ্তাহখানের ধরে নগরীর শেখ আল জাররাহ উদ্বাস্তু শিবিরের ফিলিস্তিনিদেরকে তাদের ঘরবাড়ি থেকে জোর করে গণহারে উচ্ছেদ করছিল এবং সেসব ঘরবাড়ি ইহুদি দখলদাররা দখল করে নিচ্ছিল। এই গায়ের জোরে উচ্ছেদের সময় যে নির্যাতন করা হয় তা নজীরবিহীন। প্রতিবাদকারীদের মাটিতে ফেলে মাথা হাঁটু দিয়ে চেপে ধরেছে ইহুদি পুলিশ এমন দৃশ্য আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় প্রকাশ পায়। স্বভাবিকভাবেই পরিস্থিতি ছিল উত্তপ্ত বারুদের মতো দাহ্য। মসজিদে হামলার ঘটনা ও আল জাররায় উচ্ছেদের প্রতিবাদে ফিলিস্তিনি বিভিন্ন গ্রুপ ইসরাইলে রকেট হামলা চালায়। এসব হামলায় কোনও ক্ষয়ক্ষতি হয়নি। কিন্তু জবাবে ইসরাইল দেশের একপ্রান্তে অবস্থিত ছোট্ট একটি অবরুদ্ধ এলাকা গাজায় জঙ্গিবিমান দিয়ে বোমা ফেলতে শুরু করে। সেই বিমান হামলায় প্রথম দিনেই ২০ ফিলিস্তিনি নিহত ও বেশ কিছু ভবন ধ্বংস হয়।
গাজায় ফিলিস্তিনিদের সবচেয়ে জনপ্রিয় রাজনৈতিক দল হামাস ক্ষমতায়। ইসরাইলি দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে ফিলিস্তিনিদের যে প্রতিরোধ সংগ্রাম তার অন্যতম সেরা শক্তিশালী দল এখন হামাস। তাই ইসরাইল গাজায় হামলা চালিয়েছে হামাসকে ধ্বংস করতে। পরবর্তী ১১ দিন ধরে অব্যাহতভাবে হামলা চালিয়ে গেছে ইসরাইল। বেছে বেছে গাজার সব গুরুত্বপূর্ণ ভবন গুড়িয়ে ধূলিস্মাৎ করে দিয়েছে। ছাড় পায়নি বিশ্বখ্যাত গণমাধ্যম ও টেলিভিশন নেটওয়ার্ক আল জাজিরা ও আমেরিকান বার্তা সংস্থা এপির অফিস ভবনও। ১১ দিনের উপর্যুপরি হামলায় নিহত হয়েছে ২৪৮ জন ফিলিস্তিনি। এর মধ্যে আছে ৬৬টি শিশু ও ৩৯ জন নারী। আহত হয়েছে ১,৯১০ জন। আর বাড়িঘর হারিয়ে অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তু হয়ে পড়েছে ১,৯১০ জন ফিলিস্তিনি। এর বিপরীতে হামাস হাজারে হাজারে মিসাইল ছুঁড়েছে এটি ঠিক। কিন্তু সেগুলোর কার্যকারিতা সামান্যই। ইসরাইলের ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করার প্রযুক্তি অনেক শক্তিশালী। ফলে হামাসের হামলায় ইসরাইলের পক্ষে মারা গেছে মাত্র ১২ জন ইসরাইলি। এর মধ্যে দুটি শিশু আর তিনজন বিদেশি শ্রমিক।
তার পরও হামাসের জয়?
রকেট হামলা চালিয়ে ইসরাইলের তেমন কোনও ক্ষতি করতে না পারলেও হামাস এই যুদ্ধে বিজয় দাবি করেছে। কিভাবে এটিকে বিজয় হিসাবে দেখা যেতে পারে? চলুন দেখে নেয়া যাক। ১১ দিনের হামলা শেষে নেতানিয়াহু বা ইসরাইলের মন্ত্রিসভা যখন যুদ্ধবিরতি মেনে নিলো তখন হাজার হাজার ফিলিস্তিনি সেই মধ্যরাতেই রাজপথে ছুটে আসে। তারা রাতভর উল্লাস করে। জঙ্গিবিমানের নির্বিচার হামলা, মৃত্যুর মুখোমুখি ১১টি নিদ্রাহীন রাতের পরও ২১ মে’র সেই রাতটিও নিদ্রাহীন কাটে তাদের। তবে এই নির্ঘুম রাত্রিযাপন ছিল উল্লাসের, আনন্দের। কারণ, সাধারণভাবে সব ফিলিস্তিনিই এটিকে তাদের বিজয় হিসাবেই দেখছিল এজন্যে যে, নেতানিয়াহু একেবারে নিঃশর্তভাবে যুদ্ধবিরতি চুক্তি মেনে নিতে বাধ্য হয়েছেন। যদিও তিনি দাবি করেছেন, তাঁর বিমান বাহিনী হামাসকে শিক্ষা দিয়েছে, তাদের সুড়ঙ্গপথের নেটওয়ার্ক ও রকেট কারখানা ধ্বংস করেছে এবং ২৫ জন সিনিয়র নেতাসহ ২০০ হামাস যোদ্ধাকে খতম করেছে। অন্যদিকে ফিলিস্তিনি নেতারা বলছেন, তাঁরা দুটি শর্ত মেনে নিতে ইসরাইলকে বাধ্য করেছেন। হামাস নেতা আবদেল লতিফ আল-কানো বলেছেন, দুটি শর্ত হলো, আল আকসায় পুলিশ মোতায়েন করা যাবে না এবং শেখ জাররাহ থেকে কোনও ফিলিস্তিনি পরিবারকে জোর করে উচ্ছেদ করা যাবে না। তবে এই শর্তারোপ করতে পারাই তাঁদের বিজয় দাবির মূল কারণ নয়। যে কারণে তাঁরা বিজয় দাবি করেছেন সেটি হলো, ফিলিস্তিনি জনগণের সুদৃঢ় ঐক্যের প্রতিফলন ঘটেছে এবারের প্রতিরোধে। আর গোটা বিশ্ব ফিলিস্তিনিদের ওপর ইসরাইলি হামলার বিষয়ে অতীতের যে কোনও সময়ের চেয়ে বেশি সোচ্চার হয়েছে।
হামাসের বিজয় দাবির অনুকূলে এটাই সবচেয়ে বড় প্রমাণ যে, নিজেদের বিজয়ের ব্যাপারে ফিলিস্তিনিদের মনে কোনও সন্দেহ নেই। তারা ঈদুল ফিতরের এক সপ্তাহ পর শুক্রবার সকালে সমবেতভাবে ঈদুল ফিতরের দোয়া পাঠ করেছে এবং ঈদের খুৎবা দিয়ে ঈদের নামাজ আদায় করেছে। এরপর সবাই মিষ্টিমুখ করেছে, মিষ্টি বিতরণ করেছে। বিমান হামলার কারণে তারা এবার ঈদের জামাত পড়তে বা উৎসব পালন করতে পারেনি। অন্যদিকে নেতানিয়াহুর পরাজয় এখানেই যে, তাঁর জনগণ এটিকে বিজয় মনে করছে না। বরং নিঃশর্ত যুদ্ধবিরতি মেনে নেওয়ার ঘটনাটি তারা পরাজয় হিসাবেই দেখছে। শুনুন ইহুদি জঙ্গিবাদীদের মন্তব্য। ইসরাইলের নিউ হোপ পার্টির নেতা গিডিওন সা’র যুদ্ধবিরতিকে বলেছেন, ‘বিব্রতকর’। বলেছেন, বিশ্বের সেরা গোয়েন্দা সংস্থা ও বিমান বাহিনী ব্যবহার করেও নেতানিয়াহু হামাসের কাছ থেকে কেবল একটি ‘শর্তহীন যুদ্ধবিরতি’ আদায় করতে পেরেছেন। ইসরাইলের সংসদ বা নেসেটের চরমপন্থী সদস্য ইতামার বেন গবির বলেন, ‘এই বিব্রতকর যুদ্ধবিরতি হলো হামাসের কাছে পুরোপুরি আত্মসমর্পণ।’
গাজায় পরাজয়ের কথা স্বীকার করে ইসরাইলের অবসরপ্রাপ্ত জেনারেল আইজ্যাক ব্রিক, একটি রেডিওকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেছেন, প্রমাণিত হয়েছে, তেল আবিব কয়েকটি ফ্রন্টে একসঙ্গে যুদ্ধ করতে গেলে মহাবিপর্যয়ের মুখে পড়বে। তিনি বলেন, যখন হিজবুল্লাহও যুদ্ধে নামবে তখন আমরা কীভাবে তা মোকাবেলা করব?
গাজার ফিলিস্তিনি রাজনৈতিক বিশ্লেষক আদনান আবু আমের বলেন, এবারের যুদ্ধে হামাস সামরিক এবং রাজনৈতিক উভয় দিক দিয়েই বিজয়ী হয়েছে বলে ফিলিস্তিনিদের মধ্যে সাধারণভাবে ঐকমত্য দেখা গেছে। কারণ, ইসরাইলের বস্তুগত ক্ষতি খুব একটা করতে না পারলেও গোটা বিশ্বের সামনে ইসরাইলের ভাবমূর্তিতে মারাত্মকভাবে আঘাত করতে পেরেছে। এবারই ইসলামি, আরব ও আন্তর্জাতিক বিশ্বের বৃহত্তম অংশ ফিলিস্তিনিদের প্রতি সমর্থন জানিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন এবং তাঁর সরকার ইসরাইলের সমর্থনে আগের মতোই ন্যক্কারজনক ভূমিকা পালন করেছে যা লজ্জাজনক। কিন্তু মার্কিন কংগ্রেসে এবার চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে ইসরাইলকে বাড়তি সামরিক সাহায্য দেওয়ার একটি উদ্যোগ। দুজন সদস্য এই সহায়তা বন্ধের দাবিতে বেসরকারি বিল জমা দিয়েছেন। এতে সাহায্যদান বন্ধ হবে কিনা সেটি পরের কথা, কিন্তু এটি ইসরাইলের প্রতি মার্কিনিদের দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টাতে ভূমিকা রাখবে তাতে সন্দেহ নেই।
যুদ্ধবিরতির পর স্বাগত জানিয়ে বিশ্বের বহু দেশ শান্তির লক্ষ্যে কাজ করার জন্য উভয় পক্ষের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে। কিন্তু সুনির্দিষ্ট কোনও শান্তিপ্রক্রিয়া আদৌ নেই। একমাত্র তুর্কি প্রেসিডেন্ট এরদোগান স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, অন্যায় যুদ্ধ চাপিয়ে দিয়ে ফিলিস্তিনিদের জীবন ও সম্পদের বিপুল ক্ষতি সাধনের জন্য ইসরাইলকে যুদ্ধাপরাধের দায়ে অভিযুক্ত ও বিচার করতে হবে। ইরানও এ বিষয়ে সোচ্চার শুধু নয়, সর্বতোভাবে সক্রিয়। ইরানের বর্তমান নেতা সম্প্রতি ফিলিস্তিনি নেতাদের চিঠির জবাবে তাদের সংগ্রামে অকুণ্ঠ সমর্থন ব্যক্ত করে সব সময় তাদের পাশে থাকার আশ্বাস ও অঙ্গীকার ঘোষণা করেছেন।
ইসরাইলের ফিলিস্তিন দখল বিশ্ব মুসলিমের জন্য সবচেয়ে বেদনাদায়ক একটি ধর্মীয় ক্ষত। এই ঘটনা বিশ্বের প্রতিটি মুসলমানের হৃদয়ে সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী হাহাকারের মতো প্রতিনিয়ত অনুরণিত হয়। কিন্তু মুসলিম দেশগুলোর শাসকদের অনৈক্য এবং বিশ্বের শক্তিধর রাষ্ট্র ও সংগঠনগুলোর অব্যাহত ষড়যন্ত্রের কারণে ফিলিস্তিনিরা তাদের ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত।
বিশ্ববাসীর অজানা নয় যে, সাম্রাজ্যবাদী আমেরিকা, ইসরাইল ও তাদের ইউরোপীয় এবং অন্য সাম্রাজ্যবাদী সহযোগীরাই বিশ্বে যুদ্ধ, সন্ত্রাস ও অশান্তি সৃষ্টির প্রধান হোতা। এটা স্পষ্ট যে, ইহুদিবাদী দখলদারদের নাগপাশ থেকে ফিলিস্তিন ও আল আকসা মুক্ত না করা পর্যন্ত মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বে শান্তি প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়। তাই কুদস মুক্তির জন্য সংগ্রামরত ফিলিস্তিনি এবং অন্যান্য সংগ্রামীর নৈতিক সমর্থনসহ সব ধরনের সাহায্য-সমর্থন দিতে হবে। এ ছাড়াও আমেরিকা ও ইসরাইলের মতো যেসব দেশ বিশ্বে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস চালিয়ে যাচ্ছে এবং মুসলমানদের বিরুদ্ধে সামরিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক ও প্রচারণাগত তথা সর্বাত্মক ক্রুসেড চালিয়ে যাচ্ছে তা মোকাবিলার জন্য মুসলমানদেরকে ঐক্যবদ্ধ পদক্ষেপ নিতে হবে। আশা করার যথেষ্ট কারণ আছে যে, বিশ্বের মুসলিম দেশ ও আরব বিশ্ব এ বিষয়ে সোচ্চার হলে একদিন সেই সময়ও আসবে যখন ইসরাইলকে সন্ত্রাসী, যুদ্ধাপরাধী ও মানবতার দুশমন হিসাবে হাতেনাতে পাকড়াও করা হবে। আর এভাবেই একটি স্বাধীন সার্বভৌম ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে মুসলিম উম্মাহর অংশীদার ফিলিস্তিনিদের ওপর ইহুদি শাসকগোষ্ঠীর অব্যাহত জুলুম-নিপীড়নের চিরতরে অবসান ঘটবে।