‘আপনারা পারস্যের মিছরি দিয়ে গোটা বিশ্বকে মিষ্টিময় করে তুলতে পারেন’
পোস্ট হয়েছে: সেপ্টেম্বর ৮, ২০১৯

ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোহাম্মাদ জাওয়াদ জারিফ বলেছেন, বাংলাদেশের ফারসি ভাষার বোদ্ধারা ‘পারস্যের মিছরি’ দিয়ে গোটা বিশ্বকে মিষ্টিময় করে তুলতে পারেন। তিনি গত ৪ সেপ্টেম্বর (বুধবার) বাংলাদেশের ফারসি ভাষার শিক্ষকদের একটি প্রতিনিধিদলের সঙ্গে বৈঠকে এ মন্তব্য করেন। ঢাকার হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে অনুষ্ঠিত এ বৈঠকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফারসি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগ এবং আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউটের শিক্ষকদের পাশাপাশি আঞ্জুমানে ফার্সি সংগঠনের সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।
সাক্ষাতের শুরুতে ঢাকায় নিযুক্ত ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের রাষ্ট্রদূত মোহাম্মাদ রেজা নাফার বাংলাদেশে ফারসি ভাষার গুরুত্ব, ফারসি ভাষার সংক্ষিপ্ত ইতিহাস নিয়ে বক্তব্য রাখার পাশাপাশি উপস্থিত অতিথিবৃন্দকে মন্ত্রীর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন। তিনি বলেন, এখানে উপস্থিত অধ্যাপকরা বাংলাদেশি হলেও প্রকৃত অর্থে তারা ইরানি। তিনি ফারসি ভাষার একজন অধ্যাপকের একটি বক্তব্য উদ্ধৃত করেন যেখানে তিনি বলেছেন, “আমরা আগে ‘খোদা’ শব্দের সঙ্গে পরিচিত হই তারপর ‘আল্লাহ’কে চিনতে শুরু করি।”
ইরানি রাষ্ট্রদূত বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, পার্লামেন্ট স্পিকার ড. শিরিন শারমিন চৌধুরী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. একে আব্দুল মোমেনের সঙ্গে ড. জারিফের সাক্ষাতের কথা উল্লেখ করে বলেন, এসব শীর্ষ কর্মকর্তার প্রত্যেকে বলেছেন, তাদের মা ছোটবেলায় তাদেরকে কবি হাফিজের কবিতা পড়ে শোনাতেন, ফারসি কবিতা শেখাতেন এবং সর্বোপরি ফারসি ভাষার সঙ্গে তাদের আত্মার সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। সবশেষে তিনি ঢাকায় নবনিযুক্ত ইরানের কালচারাল কাউন্সেলর জনাব হাসান সেহ্হাতকে সবার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন।
এরপর বাংলাদেশে ফারসি ভাষার ভিজিটিং প্রফেসর ড. মোহাম্মাদ কাজেম কাহদূয়ী উপমহাদেশে ব্রিটিশ উপনিবেশবাদীদের শাসনামলে ফারসি ভাষা নিষিদ্ধ করার কথা স্মরণ করেন। তিনি বলেন, দক্ষিণ ভারতে স্বাধীনতা সংগ্রামী টিপু সুলতান এবং বাংলায় নবাব সিরাজ উদ্দৌলার পতনের আগ পর্যন্ত এখানে ফারসি ভাষা রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃত ছিল। ড. কাহদূয়ী আরো বলেন, ১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সঙ্গে সঙ্গে এখান ফারসি ও উর্দু বিভাগ চালু হয় এবং ব্রিটিশ শাসনের উপস্থিতিতেই বাংলায় আবার ফারসি ভাষার চর্চা শুরু হয়ে যায়। তবে ইরানে ইসলামি বিপ্লবের আগে বাংলাদেশে ফারসি ভাষার গুরুত্ব কম থাকলেও ইসলামি বিপ্লবের পর ইরান সরকারের উদ্যোগে বাংলাদেশে ফারসি ভাষার চর্চা শক্তিশালী হয়।
তিনি উদাহরণ তুলে ধরে বলেন, ফারসি ১৩৭২ সালে অর্থাৎ ১৯৯৩ সালে তিনি যখন প্রথম ভিজিটিং প্রফেসর হিসেবে ঢাকায় আসেন তখন মাত্র তিনজন শিক্ষার্থী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফারসি বিভাগে পড়াশুনা করতেন। কিন্তু ফারসি ভাষার সেই কচি চারা আজ বিশাল বটবৃক্ষে পরিণত হয়েছে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের ঢাকা, রাজশাহী ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ফারসি বিভাগে অধ্যাপক, সহযোগী অধ্যাপক ও সহকারী অধ্যাপকের সংখ্যাই এখন প্রায় ৩০ জন। আর এসব বিশ্ববিদ্যালয়ে ফারসি ভাষা ও সাহিত্যে পড়াশোনা করছেন প্রায় এক হাজার শিক্ষার্থী।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাতে আঞ্জুমানে ফার্সির সভাপতি ড. মুহাম্মদ ঈসা শাহেদী বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ফারসিকে প্রেমের ভাষা বলে জানেন এবং আলেম ও আরেফরা এই ভাষাকে খোদাপ্রেম ও ঈমানের ভাষা হিসেবে শ্রদ্ধা করেন। তিনি বলেন, আরেফ ও সুফিগণের বিশেষ প্রচেষ্টায় বাংলাদেশে ফারসি ভাষার প্রসার ঘটেছে। তিনি ভিজিটিং প্রফেসর ড. কাজেম কাহদূয়ীর ঢাকা অবস্থানের মেয়াদ আরো অন্তত এক বছর বাড়ানোর জন্য আবেদন জানান।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফারসি বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক ড. কুলসুম আবুল বাশার তার বক্তৃতায় ফারসি ভাষার অধ্যাপকদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করায় ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ফারসি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস তুলে ধরে এই বিভাগে কবি হাফেজ অথবা মৌলভীর ওপর বিশেষ গবেষণা কোর্স চালু করার পরামর্শ দেন। ড. কুলসুম আবুল বাশার বলেন, ঢাকাস্থ ইরান দূতাবাস ও ইরানি কালচারাল কাউন্সেলরের বিশেষ সহযোগিতার কারণে বাংলাদেশ ফারসি ভাষা ও সাহিত্যের ওপর লেখাপড়া ও গবেষণা সমৃদ্ধি লাভ করেছে।
আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউটের ফারসি ভাষা শিক্ষা কোর্সের শিক্ষক মিসেস শামিম বানু ইরানের ইতিহাস জানার ক্ষেত্রে ফারসি ভাষার অপরিসীম গুরুত্বের কথা তুলে ধরেন। সাক্ষাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফারসি ভাষা ও সাহিত্যের অধ্যাপক ড. আব্দুস সবুর খান ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাতে সন্তোষ প্রকাশ করে বলেন, তিনি গত ২৫ বছর ধরে ড. কাজেম কাহদূয়ীর অধীনে কাজ করতে পেরে নিজেকে ধন্য মনে করছেন। তিনি ইরানি কবি কেইসার আমিনপুরের একটি কবিতার কয়েকটি চরণ আবৃত্তি করেন।
মোহাম্মাদ জাওয়াদ জারিফের সঙ্গে সাক্ষাতে ফারসি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগের অধ্যাপক ড. আরিফ বিল্লাহ ইরানে নিজের উচ্চশিক্ষা অর্জনের কথা স্মরণ করেন এবং বাংলাদেশে ফারসি ভাষার প্রচার ও প্রসারের ক্ষেত্রে বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতার কথা তুলে ধরেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফারসি বিভাগের অধ্যাপক মুমিত আল রশিদ গত ছয় বছর ধরে ইরানের তারবিয়াতে মোদাররেস বিশ্ববিদ্যালয়ে নিজের উচ্চশিক্ষা লাভের কথা তুলে ধরে বলেন, দীর্ঘদিন ইরানে অবস্থান করার কারণে তিনি ফারসি ভাষায় অনর্গল কথা বলতে পারছেন এবং ফারসি বিভাগের প্রত্যেক শিক্ষকেরই এই সুযোগটি লাভ করা উচিত।
সবশেষে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী তার বক্তব্যে ফারসি ভাষার অধ্যাপকদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে পেরে নিজের গর্বিত হওয়ার কথা তুলে ধরেন। তিনি ফারসি ভাষাকে একটি সংস্কৃতির ভিত্তি হিসেবে তুলে ধরে বলেন, বাংলাদেশি এসব গবেষক ও পণ্ডিত প্রকৃতপক্ষে এই সংস্কৃতির শেকড়ের সন্ধান করছেন।
ড. জারিফ ফারসি ভাষাকে ইরানের ‘জাতীয় পরিচিতি’ হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, ফারসি ভাষাভাষী যেকোনো মানুষ এক হাজার বছর আগে এই ভাষায় লিখিত যেকোনো পাণ্ডুলিপি পড়তে ও বুঝতে সক্ষম। কিন্তু অন্য অনেক ভাষার ক্ষেত্রে এটি সম্ভব নয়। তিনি উদাহরণ তুলে ধরে বলেন, ইংরেজি ভাষাভাষী মানুষ শেক্সপিয়ারের লেখা পড়ে সরাসরি উপলব্ধি করতে সক্ষম নন। কিন্তু ফারসি ভাষার কবি হাফিজ, মৌলভি এবং শেখ সাদীর লেখা পড়লে মনে হবে তাঁরা যেন আজকের ভাষায় কথা বলছেন।
ড. জারিফ বলেন, ফারসি ভাষা বিশ্বের বহু সংস্কৃতির মধ্যে মেলবন্ধন তৈরি করেছে। বিশ্বের বহু দেশের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে ফারসি ভাষা ছাড়া উপলব্ধি করা সম্ভব নয়। বসনিয়া থেকে শুরু করে মধ্য এশিয়া, তুরস্ক, পাকিস্তান ও ভারতসহ আরো অনেক দেশের অনেক প্রাচীন শিল্পকর্মের ক্ষেত্রে একথা প্রযোজ্য। কাজেই দেখা যাচ্ছে, ফারসি কোনো বিশেষ দেশ, জাতি বা ভৌগোলিক সীমারেখায় আবদ্ধ কোনো মানুষের ভাষা নয়, বরং এটি প্রেমের ভাষা, এটি ব্যথার ভাষা। ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের সর্বোচ্চ নেতা যেমনটি বলেন, ফারসি ইসলামের দ্বিতীয় ভাষা। কেউ ফারসি ভাষা না জানলে তার পক্ষে ইসলামের সকল দিক বুঝে ওঠা সম্ভব নয়।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী তার বক্তব্যের অন্য অংশে চতুর্দশ শতাব্দীতে বাংলার সুলতান গিয়াসউদ্দিন আজম শাহের সঙ্গে কবি হাফিজের পত্র বিনিময়ের কথা স্মরণ করেন। গিয়াসউদ্দিন আজম শাহ কবি হাফিজকে বাংলায় আমন্ত্রণ জানালে তিনি সুলতানকে একটি গজল রচনা করে পাঠিয়েছিলেন। সেই গজলটির বঙ্গানুবাদ হয়েছে এভাবে-
ভারতের তোতা হবে মিষ্টি-মুখো সকল-ই,
পারস্যের মিছরি যবে বাঙ্গালায় চলিছে।
হে হাফিয! গিয়াসুদ্দীন শাহের সভার বাসনা
ছেড়ো না, কাজ তোমারি কাঁদা-কাটায় চলিছে।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বাংলাদেশি অধ্যাপকদের উদ্দেশ করে বলেন, আপনারা ৭০০ বছর আগে হাফিজের কাছ থেকে পারস্যের যে মিছরি গ্রহণ করেছেন তা দিয়ে আজ গোটা বিশ্বকে মিষ্টিময় করে তুলতে পারেন।
মোহাম্মাদ জাওয়াদ জারিফ তার বক্তব্যে বিভিন্ন দেশে উগ্র সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর আবির্ভাবের কথা উল্লেখ করে পবিত্র কুরআনের কয়েকটি আয়াত উদ্ধৃত করে বলেন, আমাদের সবার উচিত অন্য সব কিছুর গোলামি বাদ দিয়ে একমাত্র আল্লাহর বন্দেগি করা। তিনি বলেন, ইসলাম সম্পর্কে যদি আমাদের সঠিক জ্ঞান না থাকে তাহলে আমাদেরকে উগ্র জঙ্গি গোষ্ঠীগুলোর খপ্পরে পড়তে হবে। ড. জারিফ বলেন, কবি হাফিজের মসনভী গ্রন্থ অধ্যয়নকারী কোনো মানুষ উগ্র চিন্তাধারা পোষণ করতে পারে না।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, কাজেই ফারসি ভাষা নিয়ে আলোচনা কোনো জাতীয়তাবাদী আলোচনা নয়। আমাদের চিন্তাধারার সুস্থ বিকাশের জন্য আমাদের এই ভাষা জানা প্রয়োজন। ব্রিটিশরা যদি ফারসি ভাষা নিষিদ্ধ করে ফারসি বর্ণমালার পরিবর্তে ইংরেজি বর্ণমালার প্রচলন করে থাকে তাহলে তারা সেটা করেছে আমাদেরকে আমাদের ইতিহাস ও সংস্কৃতি থেকে বিচ্ছিন্ন করার লক্ষ্যে।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, উগ্র তাকফিরি মতবাদের পথিকৃতরা আজ বিশ্বের মুসলমানদের ওপর মহামিথ্যা চাপিয়ে দিতে চায়। ইতিহাসে কখনো শিয়া-সুন্নি বিরোধ ছিল না। আমরা যদি আমাদের ইতিহাস ও ঐতিহ্য সঠিকভাবে জানতে পারি তাহলে অন্যরা আমাদের ওপর তাদের দৃষ্টিভঙ্গি চাপিয়ে দিতে পারবে না। তিনি সীমাবদ্ধ সামর্থ্য নিয়েই ফারসি ভাষার চর্চায় যথাযথ আত্মনিয়োগের জন্য ফারসি অধ্যাপকদের প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানান।