রবিবার, ৬ই এপ্রিল, ২০২৫ খ্রিস্টাব্দ, ২৩শে চৈত্র, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

English

আন্তর্জাতিক ইসলামী ঐক্য সম্মেলনে প্রেসিডেন্ট ড. রুহানির ভাষণ

পোস্ট হয়েছে: এপ্রিল ২০, ২০১৬ 

ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের মাননীয় প্রেসিডেন্ট ড. রুহানি এ কথার ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন যে, ইসলাম হচ্ছে দয়া-রহমত, শান্তি, স্বস্তি ও ভ্রাতৃত্বের ধর্ম। তিনি বলেন, সন্ত্রাস প্রতিরোধের জন্য আমাদেরকে চিন্তাগত উগ্রতা ও তার প্রপাগান্ডার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হবে। আজকের দিনে সিরিয়া, ইরাক, ইয়েমেন ও লিবিয়ার জনগণের বিরুদ্ধেই কেবল বড় ধরনের যুলুম হচ্ছে না; বরং দয়া ও মেহেরবানির যে ইসলাম সে ইসলামের ওপরই সবচেয়ে বড় যুলুমটি হচ্ছে।
ইরানের সরকারি তথ্য দফতরের রিপোর্ট অনুযায়ী প্রেসিডেন্টের ভাষণের পূর্ণ বিবরণ নি¤œরূপ :
بسم الله الرحمن الرحیم الحمد لله رب العالمین و صلی الله علی سیدنا و نبینا محمد و آله الطاهرین و صحبه المنتجبین
বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম। আলহামদু লিল্লাহি রাব্বিল ‘আলামীন। ওয়া সাল্লাল্লাহু ‘আলা সাইয়্যিদিনা ওয়া নাবিয়্যিনা মুহাম্মাদ ওয়া আলিহীত তাহিরীনা ওয়া সাহবিহিল মুন্তাজাবীন।
إِنَّ هَذِهِ أُمَّتُكُمْ أُمَّةً وَاحِدَةً وَأَنَا رَبُّكُمْ فَاعْبُدُونِ ‘নিশ্চয়ই তোমাদের এই জাতি অভিন্ন এক জাতি আর আমি তোমাদের প্রভু, অতএব, তোমরা আমারই ইবাদত কর।’ সর্বশেষ রাসূল ইসলামের মহান পয়গাম্বর হযরত মুহাম্মাদ মুস্তাফা (সা.) এবং তাঁর সত্যনিষ্ঠ সন্তান ইমাম জাফর সাদেক (আ.)-এর পবিত্র জন্মদিন উপলক্ষে বিশ্বের সকল মুসলমান, মহান ইরানী জাতি, সম্মানিত হাজেরানে মজলিস, সুধিবৃন্দ এবং যেসব চিন্তাবিদ সমগ্র বিশ্ব থেকে এখানে সমবেত হয়েছেন, আপনাদের সবার প্রতি মোবারকবাদ ও অভিনন্দন জানাচ্ছি। আর সম্মানিত মেহমানদের জানাচ্ছি সুস্বাগতম।
আমি আশা করি, এই সমাবেশ এবং এই মোবারক ও উচ্চ পর্যায়ের সমাবেশে যা কিছু উপস্থাপিত হবে তার ফলশ্রুতি হবে মুসলমানদের এবং ইসলামী জাতিসমূহের চিন্তাধারা পরস্পরের অধিকতর নিকটবর্তী ও ঘনিষ্ঠ হওয়া। আমরা এমন এক পরিস্থিতিতে ইসলামের মহান পয়গাম্বরের জন্মদিনের উৎসব পালন করছি, যে পরিস্থিতিতে আমরা নিজেদের জীবন, সভ্যতা, ঐক্য, শক্তিমত্তা এবং একইভাবে উন্নতি ও অগ্রগতির জন্য অন্য যে কোন সময়ের চেয়ে অধিকহারে হযরত (সা.)-এর দেখানো পথ তথা তাঁর সীরাত ও চরিত্র-আদর্শের মুখাপেক্ষী। অন্যদিকে যে কোন সময়ের চাইতে এবং অতীতের বছরগুলোর তুলনায় বিশ্বজনমতের কাছে পয়গাম্বর (সা.)-এর পরিচিতি অনেক বেশি মযলুম ও অসহায়।
যদি কোনদিন আমাদের চিন্তা ও ক্ষোভ এই বিষয়ে ছিল যে, সীমা লঙ্ঘনকারী, বিদেশি শক্তিসমূহ এবং ইসলামের দুশমনরা মুসলমানদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছে এবং কোন একটি ইসলামী দেশকে জবরদখল করেছে আর মুসলমানদের ওপর হত্যাযজ্ঞ চালাচ্ছে। দুঃখজনকভাবে আজ আমরা এমন পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়েছি যে, ইসলামী দেশগুলোর মাঝে এক দেশ আরেক দেশের ওপর হামলা করছে। অসহায় নিরপরাধ মযলুম মানুষের মাথার ওপর বোমা ও ক্ষেপণাস্ত্র ফেলছে। অথবা ইসলামী দুনিয়ার অভ্যন্তরে দীন, ইসলাম ও জিহাদের দোহাই দিয়ে বিভিন্ন দল উপদল মুসলমানদের বুকে ছুরি চালাচ্ছে। এভাবে তারা ইসলামের পয়গাম্বরকে সংশয়াবিষ্টভাবে দুনিয়ার সামনে উপস্থাপন করছে।
হয়ত কখনো আমরা চিন্তা করি নি যে, ইসলামী জাহানে আসল আগ্রাসী ও প্রকৃত সীমা লঙ্ঘনকারী অর্থাৎ জবরদখলকারী যায়নবাদী সরকারের প্রসঙ্গ, এমনকি ইসলামী জাহানের সংবাদের পাতা থেকেও ভুলে যাওয়া হবে। কিন্তু আজ যা আলোচিত হচ্ছে, তা হলো, মুসলমানদের হাতে মুসলমান নিধন অথবা কমপক্ষে যারা ইসলামের দাবিদার এবং এমন পতাকা হাতে মানুষের ওপর হামলা চালাচ্ছে, যে পতাকায় আল্লাহ তা‘আলা এবং ইসলামের মহান পয়গাম্বরের পবিত্র নাম অঙ্কিত হয়েছে।
আমরা কি চিন্তা করেছিলাম যে, দুশমন, আগ্রাসীরা এবং বিশ্বের শক্তিমদমত্তরা ইসলামকে সহিংসতা, রক্ত ও রক্তপাতের ধর্ম হিসেবে চিহ্নিত করার পরিবর্তে ইসলামী জাহানের অভ্যন্তরে মুষ্টিমেয় লোক কথায় ও কাজে ইসলামকে হত্যাযজ্ঞ, সহিংসতা, বেত্রাঘাত ও সমাজে যুলুম-অত্যাচার চালানোর ধর্ম হিসেবে চিত্রিত করবে?
এতদঞ্চলের ও ইসলামী জাহানের এহেন স্পর্শকাতর পরিস্থিতিতে আমরা সবাই যেন নিজের ওপর এক বিরাট দায়িত্বের ভার অনুভব করি। বিগত দুই বছরের বেশিকাল হল, ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরান জাতিসংঘে উপস্থাপন করেছে যে, আজকের দুনিয়ায় যে জিনিসটি আমাদেরকে হুমকির মধ্যে ঠেলে দিচ্ছে তা হচ্ছে সহিংসতা ও উগ্রবাদ। বিশ্ব যদি শান্তি ও স্বস্তি পেতে চায় তা হলে আমদের সবাইকে হাতে হাত মিলাতে হবে এবং সহিংসতা ও সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে লড়াই করতে হবে। যদিও মৌখিক ও বাহ্যিকভাবে সকল ইসলামী, অনৈসলামী ও বিশ্বের সকল দেশের পক্ষ হতে এই প্রস্তাবের প্রতি সমর্থন ও তা অনুমোদিত হয়েছিল, কিন্তু দুঃখজনকভাবে বাস্তব ক্ষেত্রে সদুদ্দেশ্য প্রমাণ করে এমন কোন পদক্ষেপ কমই দেখা গেছে।
কেন এত সহিংসতা ও রক্তপাত? আমরা কোন লক্ষ্য অর্জন করতে চাই? এই সহিংসতার উৎপত্তি কোত্থেকে হয়েছে? নিঃসন্দেহে সহিংসতার সূচনা হয় একটি জনগোষ্ঠীর চিন্তা ও মনোগত সহিংসতা থেকে। সূচনাতেই চিন্তা ও চেতনা ভারসাম্য হারিয়ে বেরিয়ে যায় তখন ইসলামী রচনাবলি থেকে যা উপলব্ধি করে তা দুঃখজনকভাবে সঠিক নয় এবং সে বুঝ ও উপলব্ধি সঠিক নয়। যদি চিন্তা থেকে সহিংসতার উৎপত্তি হয়ে থাকে এই সহিংসতা কথাবার্তা এবং পরে সংলাপে পরিবর্তিত হয়। আর তার বিপদাশঙ্কা সেদিনই দেখা দেয়, যেদিন ইসলামী বা অনৈসলামিক সমাজে সহিংসতা ও সন্ত্রাসের সংলাপে রূপান্তরিত হয়।
আলোচনা-পর্যালোচনা যে পর্যন্ত ভারসাম্যপূর্ণ, ইনসাফপূর্ণ ও বাড়াবাড়ি ও কড়াকড়িমুক্ত না হবে তার ফলশ্রুতি বাস্তব সহিংসতায় রূপ নেবে। বড়ই আফসোসের বিষয় যে, কতিপয় মাদ্রাসা যেগুলো ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, সেগুলোতে ইসলাম, কুরআন মজীদ এবং রাসূল (সা.)-এর সীরাতের যে পাঠ গ্রহণ করা হয় সে পাঠ হচ্ছে সহিংসতা ও উগ্রবাদের।
প্রথম দিন থেকেই বৈশিষ্ট্যগত যে প্রতিপক্ষ দাঁড় করানো হয়েছে, তা অনৈসলামের মোকাবিলায় ইসলাম বা কুফ্রির মোকাবিলায় ধার্মিকতা নয়। সকল আসমানি ধর্মের মূল কথাটি হচ্ছে, আল্লাহর আদেশের প্রতি শর্তহীন আনুগত্য আর আল্লাহবিহীন বা খোদাবিরোধী শক্তিসমূহ হতে দূরে থাকা। কীভাবে হতে পারেÑ আমাদের মূল ভিত্তিÑ যা আল্লাহর দাসত্ব ও কুফ্রি ও নাস্তিকতার মোকাবিলায় আল্লাহর একত্ববাদের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার কথা, তা সূচনাতেই এই মযহাবের বিরুদ্ধে ঐ মাযহাবের স্বরূপ নির্ণয়ের ওপর প্রতিষ্ঠিত হতে পারে? কুফ্রি ফতোয়া উৎসারিত হয় চিন্তাগত সহিংসতা হতে। কূপমণ্ডূকতা ও ভারসাম্যহীনতা হতেই সৃষ্টি হয় তাক্ফির। আমাদের সমাজ, মাদ্রাসা ও র্দাসগুলো কেন তাওহীদ ও পরকালের স্বরূপ পরিচিতির ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত হবে না? ইসলামে কি তাহলে ঈমানের স্বাক্ষ্যের ভিত্তি হিসেবে ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ ও মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (সা.)’ ছাড়া আর কিছু আছে? যদি মতপার্থক্য থাকে এবং ব্যাখ্যা ও তাফসীর এক না হয়, তা তো মানুষের স্বভাবের প্রতিফলন। পার্থক্য তো গ্রহণযোগ্য। কিন্তু ঝগড়া কেন? পরস্পরের মুখোমুখি দাঁড়াবে কেন? কেন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণকে কম গুরুত্বপূর্ণের জন্য বিসর্জন দেব? যেসব মূলনীতির ইসলামী জাহানে ঐক্যের ভিত্তি রচনার কথা ছিল, তা কেন ভুলে গেলাম? যে কিতাব ও কথাবার্তা বিগত শতাব্দীগুলোর সাথে সম্পর্কিত তা কেন এখনও আঁকড়ে ধরব, অথচ এসব কথার মধ্যে সমালোচনা ও পর্যালোচনার অনেক কিছুই আছে। আমাদের তো মানদণ্ড আছে। আর তা হলো, আল্লাহর কিতাব। এই কিতাবই আমাদের বিশ্বাস তথা ঈমান আকীদার মূল ভিত্তি হতে পারে।
সৌভাগ্যজনকভাবে পয়গাম্বর (সা.)-এর বহু উক্তি ও সীরাতের ব্যাপারে আমাদের মধ্যে ঐকমত্য রয়েছে। পয়গাম্বরের সীরাত বা জীবনচরিত ও তাঁর বাণীর যেসব বিষয় অকাট্য ও প্রমাণিত সেগুলোকে মূলসূত্র ও বিবেচ্য হিসেবে গ্রহণ আর বাদবাকি বর্ণনাগুলোকে অনির্ভরযোগ্য ও সমালোচনাযোগ্য হিসেবে গ্রহণ করা হোক।
বহুযুগ আগের একজন আলেম, যে আলেমের চিন্তাধারাকে সেই মাযহাবের চিন্তাশীল, গবেষক ও শীর্ষ পর্যায়ের ব্যক্তিত্বরাই সমালোচনা করে থাকেন, তাঁর কথা ও মতামতকে কেন আমরা মূল ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করব? তা নিয়ে কেন প্রচার প্রপাগান্ডা চালানো হবে? এ অবস্থায় কুফ্র ও নাস্তিকতার স্বরূপের মোকাবিলায় ইসলামের স্বরূপ তুলে ধরার পরিবর্তে সুন্নির মোকাবিলায় শিয়া স্বরূপ অথবা শাফেয়ী পরিচিতির মোকাবিলায় হানাফী পরিচিতি, কিংবা হাম্বালীর মোকাবিলায় মালেকী বা যায়দী ও আলাভী পরিচিতি কেন তুলে ধরা হবে। আমাদের একটি মাত্র পরিচিতিই আছে আর তা হল ইসলামী পরিচিতি।
কিছুসংখ্যক লোক যে ‘শিয়া নয়া চাঁদ’ নামে প্রচার চালায়, এ ধরনের প্রচারণা রোগগ্রস্ত এবং ভুল। আমাদের ‘শিয়া নতুন চাঁদ’ বা ‘সুন্নি নতুন চাঁদ’ নামে কিছু নেই। আমাদের একটি পূর্ণিমা চাঁদ আছে। আমরা সকল মুসলমান যে দুনিয়াতে বাস করছি, এখানে আমাদেরকে পরস্পরের সাথে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে।
আপনারা চিন্তাশীল, অভিজ্ঞ এবং ইসলামী দেশসমূহের সাংস্কৃতিক প্রতিনিধিদের কাছে আমি জানতে চাই যে, সিরিয়ার ধ্বংসযজ্ঞ কার স্বার্থে? আমরা যদি সিরিয়ার রাস্তঘাট ও ভবন ধ্বংস করে থাকি, যদি সিরিয়ার প্রতœতাত্ত্বিক নিদর্শন ধ্বংস করে থাকি, যদি সিরিয়ার তেল চুরি করে থাকি এবং অন্যদের কাছে বিক্রি করি আর যদি এমন একটি দেশকে দুর্র্বল করে থাকি, যে দেশ বছরের পর বছর ধরে যায়নবাদী ইসরাইলের মোকাবিলায় প্রতিরোধ করেছে, তাতে লাভটা কার? সিরিয়াকে দুর্বল করা কি ইসলামী জাহানের জন্য লাভজনক? সিরিয়াকে দুর্বল করার মধ্যে কি প্রতিবেশী দেশগুলোর জন্য কোন উপকার আছে? সিরিয়াকে ধ্বংস করার মধ্যে কি তুরস্ক, জর্দান, সৌদি আরব, কাতার, আরব আমিরাত ও অন্যান্য দেশের নির্মাণ অর্জিত হবে। সিরিয়ার ধ্বংসের মধ্যে যায়নবাদী ইসরাইল ছাড়া আনন্দিত আর কে হয়? ইরাকে যুদ্ধের কারণে আনন্দিত কে হয়? যায়নবাদী ইসরাইল ও মুসলমানদের শত্রুরা ছাড়া আর কে খুশি?
বর্তমানে বিশ্বে সহিংসতা, গুপ্তহত্যার শতকরা ৮৪ ভাগ দুঃখজনকভাবে আফ্রিকার ইসলামী অঞ্চলে, উত্তর আফ্রিকায়, ম্যধপ্রাচ্যে ও পশ্চিম এশিয়ায় সংঘটিত হচ্ছে। আমরা মুসলমান। মুসলমানের রক্ত ঝরার ব্যাপারে কি মুসলমানদের কোন দায়িত্ব নেই? এর জন্য কি আমাদেরকে জবাবদিহি করতে হবে না? এটা কি গ্রহণযোগ্য হবে যে, মুসলমানদের তেলের পয়সা আমেরিকার হাতে তুলে দেব? আর বোমা ও ক্ষেপণাস্ত্র খরিদ করব? আর তা নিয়ে ইয়েমেনের জনগণের মাথার ওপর ঢালব? এটা কি গ্রহণযোগ্য যে, আমেরিকার কাছ থেকে ট্যাংকবিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র খরিদ করব আর তা আইএস, আল-নুস্রা ফ্রন্ট ও অন্যান্য ইসলামবিরোধী সন্ত্রাসী গ্রুপের কাছে সরবরাহ করব?
সত্যিই মুসলমানদের কি জবাব আছে? ইসলামের মহান পয়গাম্বর (সা.)-এর পবিত্র রূহ, যিনি আমাদেরকে পারস্পরিক দয়া ও ভ্রাতৃত্বের জন্য আহ্বান জানিয়েছেন, যিনি আমাদেরকে কুরআনের এই বাণী শুনিয়েছেন انما المؤمنون إِخوة ‘নিশ্চয়ই মুসলমানরা পরস্পর ভাই ভাই।’ কুরআনের এই বাণীর আবেদন কী? আল্লাহর রাসূল (সা.) যে কুরআনের এ বাণী মানুষকে শুনিয়েছেন وَالمُؤمِنونَ وَالمُؤمِناتُ بَعضُهُم أَولِیاءُ بَعض ‘মুমিন নারী ও মুমিন পুরুষরা তারা পরস্পরের বন্ধু।’ এই বন্ধুত্ব কোথায়? আমরা আজ মুসলমান ও মুমিনদের মধ্যে কোন্ ধরনের বন্ধুত্ব প্রত্যক্ষ করছি? আমাদের কি হয়েছে যে, এত হত্যা, রক্তপাত ও ধ্বংসযজ্ঞের মোকাবিলায় আমরা চুপ করে রয়েছি? নাকি যারা এই রক্তপাতের মূল অনুঘটক তাদের প্রতি সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছি? এটা কি ইসলামী জাহানের জন্য লজ্জার বিষয় নয় যে, মুসলমানরা ছোট ছোট বাচ্চাদের নিয়ে, নারীদের নিয়ে প্রচণ্ড শীতের মধ্যে পানি, নদী, সাগর, হ্রদ নৌকা যোগে পাড়ি দিচ্ছে আর কোন অনৈসলামিক দেশে গিয়ে আশ্রয় নিচ্ছে। আর সেই অনৈসলামিক দেশ তাদেরকে সীমান্তে আটকে রাখছে। যদি আজ পয়গাম্বর ও পয়গাম্বরের সাহাবিগণ আমাদের মাঝে থাকতেন তা হলে কি তাঁরা এতবড় বিপর্যয় সহ্য করতেন?
আমাদের উচিত হবে চিন্তাগত ও সংলাপভিত্তিক সহিংসতা থেকে কাজ শুরু করা। চিন্তা ও তাত্ত্বিক সহিংসতার মোকাবিলায় আমাদেরকে রুখে দাঁড়াতে হবে। আমাদেরকে আজকের দুনিয়ার কৃত্রিম ও প্রকৃত আঙ্গিনায় ইসলামকে নেতিবাচকভাবে চিত্রিত করার মোকাবিলায় রুখে দাঁড়াতে হবে। আজকে বড় ধরনের যুলুম শুধু মুসলমানদের ওপর হচ্ছে না। বড় যুলুম কেবল লিবিয়া, সিরিয়া, ইরাক ও ইয়েমেনের মুসলমানদের ওপর হচ্ছে না। দয়া ও ভালোবাসায় পূর্ণ ইসলামের পরিচিতির ওপরই সবচেয়ে বড় যুলুম হচ্ছে। وَما اَرْسَلْناکَ اِلّا رَحْمَةً لِلعالَمینَ ‘আমি আপনাকে জগৎবাসীর জন্য রহমতরূপে প্রেরণ করেছি।’ ইসলামের নবী রহমতের নবী। এই দীন রহমতের দীন। এটি এমন দীন, যে দীনের প্রত্যেক নামাযের কেরাআত শুরু হয় দয়াময়, পরম দয়ালু আল্লাহর নাম নিয়ে। আর এই নামাযের সমাপ্তি হয় সালাম, শান্তি কামনা ও বন্ধুত্বের পয়গাম নিয়ে। এই ধর্ম ভালোবাসা ও ভ্রাতৃত্বের ধর্ম, যে ধর্মের পয়গাম্বরকে মানুষের ব্যাপারে হুকুম দেয়া হয়েছে যে, তাদেরকে ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখুন, তাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করুন এবং গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে তাদের সাথে পরামর্শ করুন। এই দীনে মহান পয়গাম্বর (সা.)-কে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে মানুষকে ক্ষমা করার জন্য। মানুষের জন্য ক্ষমা প্রার্থনার জন্য এবং মানুষের সাথে পরামর্শের জন্য। তিনি তো ওহীর সাথে যুক্ত ছিলেন, তিনি তো ছিলেন সৃষ্টিলোকের সবার সেরা, তাঁর সমগ্র জীবন ছিল সুন্দর চরিত্রাদর্শের প্রতীক। তিনি আমাদের কাছে এমন ইসলাম নিয়ে এসেছেন, যেখানে তিনি বলেছেন যে, সুন্দর চরিত্রের নামই হল ইসলাম। আসলে সুন্দর চরিত্রের নামই তো ইসলাম। তিনি ঘোষণা করেছেন, إِنَّمَا بُعِثْتُ لِأُتَمِّمَ مَکَارِمَ الْأَخْلَاقِ সুন্দর চরিত্রের পূর্ণতা বিধানের জন্যই আমি আবির্ভূত হয়েছি।
আজকের এই ধরনের বিশ্বে আমাদের সামনে এ ছাড়া আর কোন পথ খোলা নেই যে, আমরা মুসলমানরা পরস্পরের হাতে হাত মিলাব।
আমি এতদঞ্চলের এবং এতদঞ্চলের বাইরের সকল ইসলামী দেশের প্রতি, এমনকি যারা আজকেও তাদের প্রতিবেশীদের মাথার ওপর বোমা ও ক্ষেপণাস্ত্র ফেলছে তাদেরকেও আহ্বান জানাচ্ছি, আসুন, আমরা বিরত হয়ে যাই এবং সঠিক রাস্তাটি অনুসরণ করি।
আমরা যেন দেখি যে, মুসলমানরা কোন্ অবস্থায় আছে। আপনারা গত এক বছরে আমেরিকার কাছ থেকে কী পরিমাণ বোমা ও ক্ষেপণাস্ত্র খরিদ করেছেন? যদি এগুলোকে গরীবদের মাঝে বণ্টন করতেন, তাহলে ক্ষুধার্ত অবস্থায় কাউকে রাতে বিছানায় যেতে হতো না। যদি আইএস এর মতো গ্রুপগুলো সৈন্য ভাড়া করেেত পারে তাহলে তার পেছনে অনুঘটক হচ্ছে বস্তুগত ও সাংস্কৃতিক দীনতা।
আসুন, ইসলামী সমাজ থেকে সাংস্কৃতিক ও বস্তুগত দীনতা দূর করি। বছরের পর বছর আমরা ইসলামী ঐক্যের কথা বলেছি। ইসলামী জাহানের ঐক্য কি ইসলামী দুনিয়ার অর্থনৈতিক সংযোগ ব্যতিরেকে সম্ভবপর হতে পারে? আমাদের অর্থনীতি অনৈসলামিক দুনিয়ার সাথে যুক্ত থাকবে, আমাদের শিক্ষা-সংস্কৃতি, বিশ্ববিদ্যালয়, জ্ঞান- বিজ্ঞান অনৈসলামিক বিশ্বের সাথে যুক্ত থাকবে আর ঐক্য, একতা ও ভ্রাতৃত্বের দোহাই দেব? মুখের কথা দিয়ে কি ঐক্য প্রতিষ্ঠা হয়? পয়গাম্বর (সা.) কি মদীনায় কথা দিয়ে সরকার চালিয়েছিলেন? ইসলামের প্রথম যুগের মুসলমানরা যে বিশ্বব্যাপী বিজ্ঞান ও উন্নয়নের ঝাণ্ডা উড়িয়েছেন, তাঁরা কী ধরনের কথা বলতেন?
ধর্মীয় আলেমÑ যাঁরা ওয়ায-নসিহত করেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকবৃন্দ, মাদ্রাসা অঙ্গন, বক্তৃতার মঞ্চ সব জায়গা থেকেই কথা, সংলাপ ও প্রচারণার মাধ্যমে আসুন আমরা এমন উদ্যোগ নিই যাতে সন্ত্রাসবাদের মোকাবিলায় একটি বাঁধ তৈরি করতে পারি।
আমাদের মনে রাখতে হবে যে, সন্ত্রাসবাদ ও মানুষ হত্যা বোমা মেরে বন্ধ করা যাবে না। আমাদেরকে সংলাপের ধারা পাল্টিয়ে সন্ত্রাসবাদের গতিধারা পরিবর্তন করতে হবে। আপনারা জানেন যে, আমাদের এই ইরানেই এক সময় মোঙ্গল বংশ নামে একটি শাসকগোষ্ঠী দেশের কর্তৃত্ব দখল করেছিল। তারা আলেমদের হত্যা করেছিল। মসজিদসমূহ ধ্বংসস্তূপে পরিণত করেছিল।
কিন্তু যে সময় ইরানের আলোচনার সংস্কৃতি আলেম, গবেষক, বিশেষজ্ঞ, ফকীহ ও আরেফদের মাধ্যমে উপস্থাপিত হল এবং মোঙ্গল দরবারে আলেম, আরেফ ও ফকীহগণ সমবেত হলেন তখন এই মোঙ্গলরাই ইসলামের রহমতের বিধিবিধানের প্রবর্তক হল। তারা মসজিদ নির্মাতায় পরিণত হল।
আমাদেরকে আজকের দুনিয়ার তরুণদের চিন্তাকে দখল করতে হবে। আজকে আমাদের কাঁধে সবচেয়ে বড় যে দায়িত্বটি রয়েছে তা হল, বিশ্ব জনমতের সামনে ইসলামের চিত্রটি সংশোধিত আকারে উপস্থাপন করা। মরহুম ইমাম খোমেইনীর ভাষায় বলতে গেলে, তিনি বলেছেন, বিশ্বজনমতের সম্মুখে কোন শক্তি দাঁড়াতে পারবে না। আমরা যদি বিশ্ব জনমতকে সত্যিকার ইসলাম, সত্যিকার রহমতের দিকে আকৃষ্ট করতে পারি এবং তার প্রচার-প্রসার করতে পারি! আর আল্লাহ না করুন, যদি আজকের দুনিয়ায় সাধারণ জনমত ইসলামকে সহিংসতার দৃষ্টিকোণ থেকে দেখে, যেটি বর্তমানে এতদঞ্চলে বলবৎ রয়েছে, তা হলে কিভাবে সাধারণ জনমতকে পয়গাম্বর (সা.)-এর জীবন পদ্ধতি ও সুন্নাতের ওপর আনা সম্ভব হবেÑ যে জীবন পদ্ধতি ও দিক্ষা তিনি আমাদের সামনে পেশ করেছিলেন। আমরা সেই প্রথম দিন থেকেই বিশ্বকে জানিয়ে দিয়েছি যে, আমাদের চলার পথ হচ্ছে সহিংসতামুক্ত বিশ্ব। আমরা বলেছি যে, এই সরকারের কাছে যে কোন সমস্যা যত জটিলই হোক না কেন, আলোচনার টেবিল ও সংলাপের মাধ্যমে তার সমাধান করা সম্ভব। আমরা বিশ্বের বৃহৎ শক্তিগুলোর মোকাবিলায় আলোচনা ও যুক্তির মাধ্যমে আমাদের ও তাদের মধ্যে বহু বছর ধরে যে মতভেদ ক্রমান্বয়ে জটিলতর হচ্ছিল তার সমাধান করতে সক্ষম হয়েছি। আমরা আলোচনার টেবিলে সবচেয়ে জটিল রাজনৈতিক সমস্যার সমাধান করতে পেরেছি, যা এতদঞ্চল ও বিশ্বের সকল পক্ষের জন্যই কল্যাণকর এবং তা দুনিয়ার সামনে প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছি। দীর্ঘ বার বছর আলোচনা হয়েছে এবং আমাদের ওপর অপবাদ দেয়া হয়েছিল এবং আমাদের প্রতিবেশীদেরকে আমাদের ব্যাপারে ভয় দেখানো হয়েছিল এবং বলছিল যে, ইরান গোপন স্থানে আণবিক বোমা বানানোর কাজে ব্যস্ত আছে। এই বলে আমাদের বন্ধু ও প্রতিবেশীদের ভয় দেখানো হচ্ছিল। আমাদের প্রতিদ্বন্দ্বীদের ভয় দেখিয়েছিল। আর আমাদের দুশমনদের উস্কানি দেয়া হয়েছিল। ১২ বছর পর জানা গেল যে, ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরান কারো সাথে মিথ্যা কথা বলে না এবং এ পর্যন্ত যা কিছু বলেছে সবই সত্য। ১২ বছর পর আন্তর্জাতিক আণবিক সংস্থা ঘোষণা করেছে যে, ইরানে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করার জন্য কোন গোপন কেন্দ্র নেই। আর ইরানের পারমাণবিক দ্রব্য সামরিক লক্ষ্যে বিচ্যুত হয়ে যায় নি। আমরা এর পর থেকে শুধু সামনের দিকেই তাকাব।
কাজেই প্রমাণিত হল যে, আজকের মহা বিশ্বকে যুক্তি ও প্রমাণের সাহায্যে যুক্তি, সত্যপথ ও সঠিক ধারায় নিয়ে আসা সম্ভব। বস্তুত আজকের দুনিয়ায় বিরাট জটিল সমস্যাকে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করা সম্ভব। আমরা যদি ছয় বৃহৎ শক্তির সাথে ‘বরজাম’ সৃষ্টি করতে পারি তাহলে কেন নিজেদের সমস্যা ও জটিলতাগুলো সমাধানের ক্ষেত্রে এই মডেলটি প্রয়োগ করতে পারব না। আলোচনার টেবিলে পরস্পর কথা বলা, পারস্পরিক আলাপ আলোচনার মাধ্যমে তার অনুশীলন। আমরা যেন চিন্তা না করি যে, সন্ত্রাসী দলগুলো কোন ব্যক্তি বা দেশের জন্য কল্যাণকর। আমরা যেন চিন্তা না করি যে, যদি কোন দেশের নেতার আমরা বিরোধী হই তা হলে বোমা মেরে, ক্ষেপণাস্ত্র ছুঁড়ে সেই নেতাকে বদলাতে পারব। আমাদেরকে বুঝতে হবে যে, দেশসমূহের ভবিষ্যৎ সে দেশের জনগণের হাতে। কোন বিদেশি বা বৈদেশিক শক্তি কোন জাতির সরকার গঠনের সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিতে পারে না। আসুন, সবাই জনগণের শক্তির সম্মুখে বিনয়ের মাথা নত করি। আসুন, আমরা জনগণকে সাহায্য করি। এটা কি সম্ভব যে, কোন একটি দেশে শাসনকেন্দ্রকে দুর্বল করব আর দাবি করব যে, আমরা সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে লড়াই করছি? এমন কিছু কি হওয়া আদৌ সম্ভবপর হবে?
আজ যদি আমরা পয়গাম্বর (সা.)-এর আহ্বানে অনুকূল সাড়া দিতে চাই, তা হলে আমাদের প্রত্যেককে নিজেদের অবস্থা অনুযায়ী, আলেমরা, সম্মানিত ব্যক্তিবর্গ, শিক্ষিত সমাজ সবাইকে এই পরিস্থিতিতে বিশ্ববাসীর সামনে ঐক্য ও একতার সেøাগান, সহিংসতার অবসান, রহমতপূর্ণ ইসলামকে তুলে ধরার পদক্ষেপ নিতে হবে। পরিশেষে চূড়ান্ত পর্যায়ে আমাদেরকে সুউচ্চ কণ্ঠে ঘোষণা দিতে হবে যে, আমাদেরকে পরস্পরের নিকটবর্তী হতে হবে। এটি ইসলামী জাহানের ভবিষ্যতের জন্যই প্রয়োজন এবং তাতে সকল মুসলমানের জন্যই কল্যাণ নিহিত।
অন্যদের আগেই আমাদেরকে আমাদের বৈজ্ঞানিক অভিজ্ঞতাগুলো পরস্পরের কাছে উপস্থাপন করতে হবে। ইসলামী জাহানের সঙ্গে আমাদের অর্থনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করতে হবে। ইসলামী জাহানের গরীবদের নিয়ে চিন্তা করতে হবে। ইসলামের প্রকৃত চিত্র বাস্তব দৃষ্টান্ত, কথা ও কাজ এবং সংলাপের মাধ্যমে দুনিয়াবাসীর সামনে উপস্থাপন করতে হবে। এ কাজ যদিও কঠিন, কিন্তু তা হওয়া সম্ভব এবং তা আমাদের দায়িত্বও বটে।
মরহুম ইমাম আমাদেরকে ঐক্যের দিকে আহ্বান জানিয়েছেন আর এই সপ্তাহকে ‘ঐক্য সপ্তাহ’ বলে ঘোষণা দিয়েছেন। যে সপ্তাহটি সকল ইসলামী মযহাব ও গোষ্ঠীকে শেষ নবী পয়গাম্বরে আকরাম (সা.)-এর নাম, ঝাণ্ডা ও সীরাতের ছায়াতলে কাছে আনতে ও অধিকতর ঘনিষ্ঠ করতে সক্ষম। এই সপ্তাহে মহামান্য রাহবার ইসলামী জাহানের ঐক্য, সংহতি, ঘনিষ্ঠতা ও ভ্রাতৃত্বের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন। শুধু ঐক্য সপ্তাহ নয়, আমাদের সব দিন, সব মাস যেন ঐক্যের দিন ও ঐক্যের মাস হয়। ঐক্য ও একতার মাধ্যমেই ইসলামের দুশমনরা তাদের লক্ষ্য থেকে দূরে সরে যেতে বাধ্য হবে। আর তখনই আমরা অভিন্ন ঐক্যবদ্ধ মুসলিম উম্মাহ গঠন করতে সক্ষম হব। আল্লাহ পাক ইরশাদ করেন : إِنَّ هَذِهِ أُمَّتُكُمْ أُمَّةً وَاحِدَةً وَأَنَا رَبُّكُمْ فَاعْبُدُونِ ‘নিশ্চয়ই তোমাদের এই জাতি হচ্ছে অভিন্ন জাতি। আর আমি তোমাদের প্রতিপালক। অতএব, তোমরা আমারই ইবাদত কর।’
ওয়াস্সালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ।